বুধবার | মে ২৭, ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

রঙঢঙ

নীলাম্বরী নীলগিরি

শিউল মনজুর

চান্দের গাড়ির ড্রাইভার হঠাত্ করেই রাস্তার পাশে গাড়ি ব্রেক করলেন। ছোট ছেলে সুবর্ণকে নিয়ে আমি তার পাশেই বসা ছিলাম। জিজ্ঞেস করলাম, চিম্বুক কি চলে এসেছি?

ড্রাইভার বলল, আরো কিছুদূর গেলে চিম্বুক। এটা মিলনছড়ি। এখানে পুলিশের চেক পোস্ট বলে গাড়ি থেমেছে। এরই মধ্যে গাড়ির পেছন থেকে হইচই করে নেমে পড়েছে সবাই। আমিও সুবর্ণকে নিয়ে নেমে পড়ি। তখন আমরা সমতল থেকে কয়েক হাজার মিটার উপরে। চেক পোস্টের চারদিকে সবুজ অরণ্য। অরণ্যের মাঝখানে আমরা। দূরে কয়েকটি পাহাড়ের মধ্য দিয়ে অনেক নিচে প্রবাহিত হচ্ছে নদীর মতো একটা কিছু। আমরা পুলিশ চেক পোস্টের দিকে এগিয়ে যাই। দুই ছেলে সুবর্ণ ও সৌহার্দ্য দুজনই আমার সঙ্গে। চেক পোস্টের রেজিস্টার খাতায় প্রয়োজনীয় তথ্য লিপিবদ্ধকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছেন আমাদের ১৩ সদস্যের টিমের লিডার সুবর্ণর খালু। আমি এক ফাঁকে চেক পোস্টের তরুণ পুলিশ কনস্টেবলকে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কোন নদী?

&dquote;&dquote;সাঙ্গু। এটি বান্দরবান জেলার সবচেয়ে বড় নদী। স্থানীয়রা যাকে শঙ্খ নদী বলে। এতক্ষণে সবাই গাড়িতে উঠে বসেছে। যাচ্ছি চিম্বুকে। শেষবার মিলনছড়ির চারদিকে তাকিয়ে দেখি, লাবণ্যের সবুজ দ্যুতি খেলা করছে দূরের পাহাড়গুলোয়। এ সুন্দর যেন বর্ণনাতীত। ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে দিল। পাহাড়ের ভেতর আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে চান্দের গাড়ি এগিয়ে যেতে থাকে। যাওয়ার পথে চোখে পড়ে আদিবাসীদের ঘরবাড়ি। তাদের বাড়িগুলো অনেকটা মাচার মতো। মাটি থেকে কয়েক ফুট উপরে। অনেক আদিবাসী তরুণী ও নারীকে দা দিয়ে লাকড়ি বানাতে দেখা গেল। অনেকে পশু চরাচ্ছিল। পাহাড়ের ঢালু জায়গায় জুম চাষের বাগানও চোখে পড়ল। কিন্তু বান্দরবানের পাহাড়ে ফাঁকে ফাঁকে কাঁঠাল, আনারস, পেঁপে, কলা, আখ, আম, জাম, পেয়ারা ইত্যাদি ফলেরও ব্যাপক চাষ রয়েছে। একটি আদিবাসী পাড়ার পাশ কেটে বের হলো আমাদের গাড়ি। বেশকিছু দোকান দেখা গেল। সেখানে আদিবাসী নারীরা বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করছিল। তবে দোকানগুলো ব্যতিক্রম। এখানে তাদের নিজস্ব উত্পাদিত জিনিসপত্র তো রয়েছেই, পাশাপাশি দেশ-বিদেশের কিছু পণ্যও তারা বিক্রি করে। এখানে মূলত আদিবাসী পুরুষরা তেমন কোনো কাজ করে না। আদিবাসীদের সমাজ ব্যবস্থা আমাদের চেয়ে একেবারেই আলাদা। গাড়ির গতি মন্থর হলো। রাস্তার বাঁ পাশে অসংখ্য দোকান চোখে পড়ল। ড্রাইভার গাড়ি পার্ক করতে করতে বলল, আমরা চিম্বুক এসে পড়েছি। ডান পাশের পাহাড়টাই চিম্বুক পাহাড়।

গাড়ি থেকে নেমেই সবাই ঢকঢক করে পানি খাওয়া শুরু করলাম। ক্যালেন্ডারের পাতায় তখন অক্টোবর মাস। অথচ গরম একটুও কমেনি। এবার হেঁটে জায়গাটা ঘুরে দেখার পালা। পাশে বেশক’টি আদিবাসী দোকান। যে যার মতো ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। রাস্তার পাশে গড়ে ওঠা এ ছোট দোকানে নানা রঙের নানা রকম চাদর, গামছা, লুঙ্গি, ক্যাপ ও নানা রকম প্রসাধনীসহ শিশুদের বিভিন্ন খেলনা রয়েছে। এরই মধ্যে দলের নারী সদস্যরা নেমে গেছেন গামছা ও চাদরের দরকষাকষিতে। আমিও এগিয়ে যাই। দোকানি একজন আদিবাসী নারী। নাম ডলি মারমা। ভদ্রমহিলা খুব সুন্দর বাংলায় কথা বলেন। ডলির পাশের দোকানে আরেক তরুণী দাঁড়িয়ে। তার নাম কলি। শখ করেই ডলি মারমা ও কলি মারমার সঙ্গে কথা হলো তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সংসার নিয়ে। এরই মধ্যে সবার কেনাকাটা পর্ব শেষ হলে সবাই চিম্বুক পাহাড়ের দিকে এগিয়ে যাই। চিম্বুক পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার জন্য নিচ থেকেই শুরু হয়ে গেছে পিচ ঢালা রাস্তা। উঠতে উঠতে চোখে পড়ল পুলিশ ক্যাম্পের সাইনবোর্ড। আরো কয়েকটি সাইনবোর্ড চোখে পড়ল। চিম্বুক বন্যপ্রাণীদের অভয়ারণ্য। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে মনটা আনন্দে নেচে উঠল। এ যেন অন্য রকম সুন্দর আবেশ। সবুজের মধ্যে আমরা দাঁড়িয়ে। সেই সঙ্গে রোদ-মেঘের খেলা প্রকৃতিকে করে তুলেছে বিচিত্র সুন্দরের অধিকারী। চিম্বুকের চূড়ায় দাঁড়িয়ে মনে হলো, গোটা বান্দরবান আমাদের চোখের সামনে সবুজ লাবণ্য নিয়ে দণ্ডায়মান।

চিম্বুক দর্শন শেষ করে আমরা ফিরে আসি পার্কিং প্লেসে। ধীরে ধীরে গাড়িতে সবাই যার যার আসনে বসে পড়ি। ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে দেয়। এখান থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে নীলগিরি। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পৌঁছে যাব। বান্দরবান থেকে নীলগিরির দূরত্ব ৪৬ কিলোমিটার। তাহলে বান্দরবান থেকে চিম্বুকের দূরত্ব ২৮ কিলোমিটার। অর্থাত্ ২৮ কিলোমিটার দূরত্ব পার হয়ে এখন আমরা &dquote;&dquote;নীলগিরির পথে। চারপাশের নানা দৃশ্য দেখতে দেখতে আমাদের গাড়ি একটা জায়গায় এসে থামে। জায়গাটা তিনমুখী রাস্তার মিলনস্থল। ড্রাইভার বলল, ‘আপনারা একজন নেমে আসেন। এখানে আর্মি চেক পোস্ট আছে।’ আমি ও সুবর্ণর খালু নেমে এলাম। দেখা গেল এক জায়গায় বড় করে লেখা ণ জংশন। এখানে তিনটি রাস্তা তিনদিকে গেছে। অনেকটা ণ-এর মতো। এ কারণেই বোধ করি জায়গাটার নাম রাখা হয়েছে ণ জংশন। ণ জংশন থেকে একটি রাস্তা রোমার দিকে চলে গেছে, অন্যটি থানচির দিকে। ড্রাইভার ও সুবর্ণর খালু চেক পোস্টের কাজ শেষ করে আবার ফিরে আসেন। কয়েকটি রেস্টুরেন্ট ও রিসোর্টের সাইনবোর্ড চোখে পড়ল। মনে হচ্ছে, এখানে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। আমরা উঠে পড়ি গাড়িতে। গাড়ি আবার চলতে শুরু করে নীলগিরির দিকে।

 

নীলগিরির কাছাকাছি হতেই গাড়ির পেছন থেকে সমস্বরে শব্দ বেজে ওঠে। ওই যে নীলগিরি। আমার ভেতরে রোমাঞ্চ প্রবাহিত হয়। চান্দের গাড়ি পার্কিং প্লেসে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে আমি ও সুবর্ণ নেমে পড়ি। আমি একবার ঘড়ির দিকে তাকাই। দুপুর সাড়ে ১২টা বাজে। নীলগিরির প্রবেশপথের সাইনবোর্ড, ব্যানার চোখে পড়ে। এরই মধ্যে রিপন সাহেব অর্থাত্ সুবর্ণর খালু নীলগিরি প্রবেশের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার জন্য কাউন্টারে বসা লোকের সঙ্গে কথা বলছেন। আমাদের টিমের সদস্যরা এরই মধ্যে আশপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ কেউ গাছের নিচে ছায়ায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে আবার কেউ কেউ সেলফি তুলতে ব্যস্ত। রিপন সাহেব সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইশারায় জানালেন, আমরা এবার নীলগিরির ভেতরে প্রবেশ করতে পারি। গেট দিয়ে পিচ ঢালা বাঁকানো পথ বেয়ে উপরে উঠতে থাকি। মনে হলো, কয়েকটি উঁচু টিলা নিয়ে নীলগিরি গড়ে উঠেছে। চারপাশে পরিচ্ছন্নতার ছোঁয়া। নীলগিরির চূড়ায় পৌঁছে অপরূপ দৃশ্য অবলোকন করে আমরা দারুণ তৃপ্তিবোধ করি। এ যেন স্বর্গের কাছাকাছি মর্ত্যের সাজানো বাগান। যদিও মাথার অনেক উপরে সাদা মেঘপুঞ্জ ঘুরছে আপন খেয়ালে। কিন্তু চূড়ায় দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকিয়ে প্রকৃতির যে অভাবনীয় সৌন্দর্য আজ দেখলাম, তা যেন চিরন্তন অস্তিত্ব নিয়ে আমৃত্যু বেঁচে থাকবে স্মৃতির পাতায়। নীলগিরির নীল ছোঁয়া নীলাম্বরীর পরশ নিতে নিতে আমরা একেকটি দৃশ্যকে বন্দি করি ক্যামেরায়। আর ভাবতে থাকি ক্যামেরায় নয়, মনের ক্যামেরায় নীলগিরির স্বর্গদৃশ্য গাঁথা হয়ে রইল জীবন্ত হয়ে। নীলগিরির বিভিন্ন দিক ঘুরতে ঘুরতে একসময় দেখা হয়ে গেল নীলগিরি রিসোর্টের এক কর্মকর্তার সঙ্গে। তিনি এখানকার ক্যাম্প কমান্ডার। তার পর তার সঙ্গে নীলগিরির ব্যবস্থাপনা ও পর্যটন বিষয়ে বেশকিছু কথা হলো। তিনি জানালেন, এখানে মেঘদূত, আকাশলীনা, মারমা, ইনছায়া, ইখিয়াই, মারুইপ্রে, মরুইফং, নীলাঞ্জনা নামের ছোট-বড় চমত্কার আটটি কটেজ ও খাওয়া-দাওয়ার জন্য একটি ক্যাফেটেরিয়া রয়েছে। তবে এখানে থাকা-খাওয়ার জন্য কয়েক মাস আগে অ্যাডভান্স বুকিং দিতে হয়। সেনাবাহিনী, বিমান ও নৌবাহিনী, সরকারি কর্মকর্তা ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিশেষ সুবিধা রয়েছে। পাবলিকরাও কটেজ ও ক্যাফেটেরিয়া বুকিং দিতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে তাদের হিসাব আলাদা। এর মধ্যে হঠাত্ করে নোটিস ছাড়াই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলে কমান্ডার সাহেব করমর্দন করে দ্রুত তার কাজে চলে যান। আমি মাথার উপরে তাকিয়ে দেখি, মেঘ একদম পাহাড়ের কাছাকাছি নেমে এসেছে। অপূর্ব! তাহলে নীলগিরিতে যে মেঘের সঙ্গে মিতালি করা যায়, সেটি মিথ্যে নয়। আমি, সুবর্ণ ও শানু অন্যান্য পর্যটকের মতো দৌড়ে একটা কটেজের ছোট্ট বারান্দায় আশ্রয় নিই। এখানে আরো কয়েকজন পর্যটক আশ্রয় নিয়েছেন। একজন জানালেন, নীলগিরিতে এমন বৃষ্টি প্রায়ই হয়। বৃষ্টির মধ্যে নীলগিরি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মন ভরে উপভোগ করলাম। খুব কাছ থেকে দেখলাম, মেঘ উড়ছে। মেঘ ও পাহাড়ের মিতালি যেন অন্য রকম দৃশ্য। তবে বৃষ্টি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। খণ্ড খণ্ড মেঘ দূরে উড়ে গেলে বৃষ্টিও থেমে যায়। কটেজ থেকে বেরিয়ে আসি। ঝলমলে রোদ আবার উঠেছে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অন্যদিকে পা বাড়াই। আরেকটি টিলায় উঠি। বড় ছেলে সৌহার্দ্য বলে, বাবা ওইটা কী? দেখি টিলার মাথা কেটে হ্যালিপ্যাড তৈরি করা হয়েছে। বললাম, হেলিকপ্টার নামার জন্য এমন সুন্দর করে ব্যবস্থা করা হয়েছে। সৌহার্দ্য বেশ কয়েকটি ছবি তুলল। আমিও সুবর্ণ ও শানুর কয়েকটি ছবি তুলি। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে দেখতে মনে হলো, আমার দেশ সত্যিই নয়নাভিরাম। এ দেশের সঙ্গে আর কোনো দেশের তুলনা হয় না। এজন্যই বোধ করি জীবনানন্দ দাশ  লিখেছেন, বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর।

 

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সায়েদাবাদ, কলাবাগান, পান্থপথ, ফকিরাপুল থেকে শ্যামলী, হানিফ, ইউনিক, ডলফিন, এস আলম প্রভৃতি বাস রাত ১০-১১টার মধ্যে বান্দরবান শহরের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। আবার বান্দরবান শহর থেকে চান্দের গাড়ি, প্রাইভেট কার, আতুল নামের সিএনজি (বেবি ট্যাক্সি) করে নীলগিরি যেতে পারেন। নীলগিরি ছাড়াও বান্দরবান জেলায় মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্স, শৈলপ্রপাত, নীলাচল, মিলনছড়ি, চিম্বুক, বগা লেকসহ অসংখ্য নান্দনিক জায়গা রয়েছে। থাকার জন্য বান্দরবান শহরে রয়েছে অসংখ্য রিসোর্ট, হোটেল, মোটেল।