শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১ | ৯ আশ্বিন ১৪২৮

সিল্করুট

ফরটিনাইনথ বেঙ্গলিজ

এম এ মোমেন

বাঙালি মায়ের ক্রন্দন

যখন বাঙ্গালী পল্টন গঠন করার, প্রস্তাব হয় অনেক বাঙ্গালী মা বিশেষ করে যাদের একটি মাত্র পুত্রসন্তান তারা আতঙ্কে শিউরে উঠেছিলেন পাছে তাদের ছেলেরা সৈন্যদলভুক্ত হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে প্রাণ হারায়!...ছেলে যুদ্ধে না হয় না- গেল। কিন্তু বাংলাদেশ তো সকল রোগেরই আকর। এই সকল রোগে কত শিশু বালক কিশোর যুবক মায়ের কোল অন্ধকার করে অনন্তধামে চলে যাচ্ছে। কই কোমল মা কি তার ছেলেকে রোগে অকালমৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারছেন?...এক সময়ে তো এই বাংলাদেশের মায়েরাই নিজের হাতে ছেলেকে বীরসাজে সাজিয়ে যুদ্ধ করতে পাঠিয়ে দিতেন। তবে আজ বাঙ্গালী মা ছেলের জন্য এতটা কাতর হয়ে কেন?

চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার কিরণ চন্দ্র দে আইসিএস ৪৯ বেঙ্গলি রেজিমেন্টের জন্য সৈন্য সংগ্রহের যে আদেশ দিয়েছেন তা এমুখ-ওমুখ ঘুরতে ঘুরতে মায়েদের কান পর্যন্ত পৌঁছেছে। সুতরাং আতঙ্কিত মায়েদের কান্না শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু জ্ঞানীজনেরা বলেছেন, এটা তো বাংলাদেশের জন্য অতিশয় সুখের সংবাদ। ৪৯ বেঙ্গলিজ গঠন করার কারণে সরকারের কাছে বাঙালিদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। এই শুভ সংবাদের পর মায়েরা কাঁদছেন আর বাবারা সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। এর কারণ কী?

৪৯ বাঙ্গালী রেজিমেন্ট স্থায়ী হয়ে যাওয়ায় কেন আমাদের মনে এত আহ্লাদ হচ্ছে তার কারণ আর কিছুই নয়আজ বাঙ্গালী জাতের অন্তত হাজার দুই-তিন লোকের মানুষের মতো মানুষ হবার পথ খুলে গেল। আগে আমাদের ধারণা ছিল যে মানুষ হতে গেলে খুব বেশি করে লেখাপড়া শিখতে হবেদেশসুদ্ধ লোককে বিএ, এমএ পাস করে উচ্চশিক্ষিত বলে পরিচিত হতে হবেএক কথায় বিদ্যের জাহাজ হতে হবে।...

স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ফেল করে বাঙালি

বাঙালিকে সৈন্যদলে নেয়া হবে। হুকুম হওয়ামাত্র দলে দলে ছেলেরা ভর্তি হতে গেল। কিন্তু ছেলেদের উৎসাহের অভাব না থাকলে কি হবে স্বাস্থ্যের অভাব বিলক্ষণই ছিল। ভর্তি হতে যেতেই ডাক্তারি পরীক্ষায় অনেককে ফেল হয়ে ফিরে আসতে হলো।...পরীক্ষায় দেখা গেল বাঙালি যুবকদের মধ্যে সৈন্য হওয়ার মতো ছোকরা খুব কম।

বর্ণনা তুলে ধরছি ১০০-এরও অধিক বছরের পুরনো স্বাস্থ্য সমাচারে প্রকাশিত ৪৯ বেঙ্গলিজ থেকে (আশ্বিন ১৩২৬)

প্রথম মহাযুদ্ধের আগে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে বাঙালি নিয়োগ করা হয়নি। ১৫০ বছর চর্চা না থাকা, তার ওপর ম্যালেরিয়া প্রকৃতি ব্যাধির আক্রমণে বাঙালির শরীর সাধারণভাবেই ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসছিল।

এমনিতে ব্রিটিশের কাছে এটা প্রতিষ্ঠিত যে বাঙালিরা ওয়ারলাইক নেশনযোদ্ধা জাতি নয়। তার ওপর সিপাহী বিদ্রোহের সময় ইংরেজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা তারা কম করেনি।

ব্রিটিশ ভারতীয় সৈন্যবাহিনীতে বাঙালিদের ঠাঁই না হওয়ার কারণ রচনায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যখন বাঙালিকে সৈন্যদলে নেয়ার প্রস্তাব মঞ্জুর হলো তখনই দেখা গেল বাস্তবিকই দলে দলে সৈন্য হওয়ার মতো যোগ্যতা জাতির নেই।

১০ বছর বয়স হতে হতেই তাদের চশমা ধরতে হলো, শরীর এমন পলকা হয়ে উঠল যে সামান্য একটু রোদ-বৃষ্টি লাগলেই মাথা ধরা, সর্দি-কাশি হতে লাগল, ব্যাধির সঙ্গে লড়াই করার স্বাভাবিক ক্ষমতা কমে আসতে লাগল। হীনবীর্য হয়ে জাতটা গোল্লায় যাওয়ার জোগাড় হয়ে এল।

দীর্ঘ রচনাটিতে স্পষ্টভাবেই বলা হলো ৪৯ বেঙ্গলি রেজিমেন্ট গঠন স্বাগত সংবাদ হলেও বৃহদর্থে বাঙালি এর উপযুক্ত হয়ে ওঠেনি। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে তাদের শরীর গঠনের দিকে মনোযোগী হতে হবে। ড্রিল হতে হবে সবার জন্য বাধ্যতামূলক।

প্রেক্ষাপট

৪৯ বেঙ্গলি রেজিমেন্ট ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি স্বল্পায়ু সেনা রেজিমেন্ট। গঠিত হয় ২৬ জুন ১৯১৭ এবং মহাযুদ্ধের পর ৩০ আগস্ট ১৯২০ রেজিমেন্ট ভেঙে দেয়া হয়। রেজিমেন্ট গঠনের ঘোষণা এসেছিল ১৯১৬ সালে।

যেভাবেই বাঙালিকে অযোদ্ধা জাতি হিসেবে বিবেচনা করা হোক না কেন কোম্পানি আমলেও বেঙ্গল আর্মি ছিল। তাতে বাঙালির পাশাপাশি ভূমিহার, বিহারি, রাজপুত পশতুন সৈন্য নিয়োগ করা হতো। ১৮৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বেঙ্গল আর্মির মোট লাখ ৫১ হাজার ৩৬১ সদস্যের মধ্যে লাখ ২৮ হাজার ৬৬৩ জনই ছিল ভারতীয়। ভারতীয়দের একাংশ বাঙালি। বোম্বাই মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির অধীনে তাদের নিজস্ব সেনাবাহিনী ছিল। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে মুখ্যত বাঙালিরা বিদ্রোহী হওয়ায় কার্যত তাদের সেনাবাহিনী থেকে বের করে দেয়া হয়। ১৯০৩ সালে তিন প্রেসিডেন্সি সেনাবাহিনী একই সাংগঠনিক কাঠামোর আওতায় মিলিত হয়ে ইন্ডিয়ান আর্মি হিসেবে চিহ্নিত হয়। বেঙ্গল কমান্ডের খ্যাতনামা কমান্ডার ইন চিফরা হচ্ছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল উইলিয়াম এলিস (১৮৯৫-৯৬), লেফটেন্যান্ট জেনারেল স্যার বেকার রাসেল (১৮৯৬-৯৮), লেফেটেন্যান্ট জেনারেল স্যার জর্জ লাক (১৮৯৮-১৯০৩) লেফটেন্যান্ট জেনারেল স্যার আলফ্রেড গ্যাসেলি (১৯০৩-০৭)

১৮০৪ সালে ফার্স্ট ব্যাটালিয়ন রেজিমেন্ট অব বেঙ্গল নেটিভ ইনফ্যান্ট্রি গড়ে তোলা হয়। ২০ বছর পর ১৮২৪ সালে মেজর জে টডের নেতৃত্বে এটাই ৪৯ রেজিমেন্ট অব বেঙ্গল নেটিভ ইনফ্যান্ট্রিতে পরিণত হয়। এটি ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বেঙ্গল আর্মির অংশ।

১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের সময় রেজিমেন্টের অধিকাংশ সৈন্য বিদ্রোহ করে। তাদের বেশির ভাগকেই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। ১৮৫৭ সালে নেটিভ ইনফ্যান্ট্রি ভেঙে দেয়া হয়। তারপর কার্যত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সৈন্যবাহিনীতে বাঙালি নিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়। তাছাড়া পাঞ্জাবের শিখ মুসলমান, নেপালের গোর্খা, ভারতবর্ষের অন্যান্য স্থান থেকে পশতুন জাঠ প্রমুখের মধ্য থেকে দেহসৌষ্ঠবে বাঙালিদের চেয়ে উত্তম, অধিকতর পরিশ্রমী, অধিকতর শক্তিশালী সৈনিক পদপ্রার্থী এত বেশি সংখ্যায় পাওয়া যায় যে তা চাহিদা পূরণ করে অন্য কোনো দুর্বল দেহ কাঠামোর কোনো জাতির প্রার্থী বিবেচনা করার সুযোগই রাখেনি। কোন কোন জাতি আবেদন করতে পারবে তা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতেই সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হতো। সেখানে বাঙালির কোনো স্থানই ছিল না। এমনকি উত্তম দেহ কাঠামোর শক্তিশালী সৈনিকেরও কার্যত কোনো কাজ ছিল না, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার নামে দেশের বিভিন্ন অংশে অবস্থান, উত্তম রেশন ভক্ষণ এবং শরীরের ওজোন বৃদ্ধিই তাদের বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।

প্রথম মহাযুদ্ধ পরিস্থিতি পাল্টে দিল। ব্রিটেন যুদ্ধ ঘোষণা করার পর হিন্দু মুসলমান উভয় পক্ষের প্রধান নেতারা ব্রিটেনের পক্ষে ভারতের লড়াইতে সম্মতি দেন। তারা প্রত্যাশা করেন আনুগত্য ভারতের স্বাধীনতা লাভ ত্বরান্বিত করবে। প্রথম মহাযুদ্ধে ১০ লাখের অধিক ভারতীয় সৈন্য ভারতবর্ষের বাইরে ব্রিটেন তথা মিত্রশক্তির পক্ষে রণাঙ্গনে লড়াই করেছে। যুদ্ধের সময় মৃত ভারতীয় সৈন্যের সংখ্যা কমপক্ষে ৭৪ হাজার। খুদাদাদ খান বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের জন্য প্রথম সর্বোচ্চ সামরিক পদক ভিক্টোরিয়া ক্রস লাভ করেন। যুদ্ধকালে আরো অনেক ভারতীয় সৈনিক সর্বোচ্চ সামরিক সম্মানে ভূষিত হন।

মহাযুদ্ধের প্রয়োজনেই বাঙালি পল্টন৪৯তম বেঙ্গলি রেজিমেন্ট গঠন করতে হয়। তার আগে বেঙ্গল অ্যাম্বুলেন্স কোর কমিটি মেসোপটেমিয়ায় পাঠানো হয়। প্রথমে ২২৮ জওয়ানের সমন্বয়ে গঠিত দুটি কোম্পানির জন্য বাঙালি পল্টনের পূর্বসূরি হিসেবে একে বলা হতো বেঙ্গলি ডাবল কোম্পানি। ১৯১৬ সালের ৩০ আগস্ট প্রথম কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে বাঙালি সৈনিকদের নিয়োগ শুরু হয়। ১২ সেপ্টেম্বর প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য প্রথম ব্যাচ নওশেরা গমন করে প্রশিক্ষণ নেয়। প্রশিক্ষণ শেষে সৈনিকরা করাচি ডিপোতে (গ্যারিসন) সমবেত হন। কেবল একটি মাত্র দলকে মেসোপটেমিয়া অর্থাৎ এখনকার ইরাকে পাঠানো হয়। জুলাই ১৯১৭ করাচিতে ৪৯ পদাতিক কিংবা ৪৯ বেঙ্গলি পদাতিকের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। তুরস্ক মুসলমান সাম্রাজ্য হওয়ায় মিত্রশক্তির পক্ষে তুরস্কের বিরুদ্ধে লড়াই করা মুসলমানদের জন্য অনেকটা ধর্মদ্রোহিতার পর্যায়ে পড়ে। এদিকে ভারতীয় অফিসাররা বিদেশেও অধীনস্থদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতেন। ক্ষিপ্ত এক নায়েক এক সেপাই ঘুমন্ত অবস্থায় থাকা তিনজন অফিসারকে গুলি করে, একজনের মৃত্যু হয়।

প্রথম মহাযুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও ৪৯ বেঙ্গলিজের সদস্যদের মেসোপটেমিয়ায় কিছুকালের জন্য রেখে দেয়া হয় এবং তাদের কুর্দি বিদ্রোহ দমনে মোতায়েন করা হয়।

সৈনিক কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালি পল্টনের হয়ে করাচিতে ছিলেন, তার মেসোপটেমিয়া যাওয়া হয়নি।

প্রথম মহাযুদ্ধে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠন করা হলেও বাঙালি সৈনিকরা তাদের পুরনো বদনাম যে তারা যোদ্ধার জাতি নয়, তা ঘোচাতে পারেনি। তারা যুদ্ধ করার সুযোগই পায়নি। তাদের বড় অংশ অসুখবিসুখে শয্যাশায়ী ছিল। এই রেজিমেন্টের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ব্যারেট রেজিমেন্টের স্কোয়াডগুলোর নাম দিয়েছিলেন: মিজলেস (হাম) স্কোয়াড, হুপিং কাফ স্কোয়াড স্কারলেট ফিভার (পীতজ্বর) স্কোয়াড। স্বর্ণকুমারী দেবী বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে বীরবন্দনা লিখেছিলেন

হে সৈনিক মহাবীর স্বদেশী আমার

তোমার বীরত্বে মুগ্ধ দ্যুলোক ভূলোক।

কিন্তু অনেক বাঙালি সৈনিক বাস্তবে মিলিটারি ফিল্ড হাসপাতালে শয্যাশায়ী ছিলেন।

বাঙালি পল্টন, ঢাকার উদ্যোগ

ঢাকা তথা পূর্ব বাংলার তরুণদের সেনাবাহিনীতে যোগদানে উদ্বুদ্ধ করার জন্য ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯১৬ ঢাকার করোনেশন পার্কে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। কলকাতা থেকে আসা সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি উদ্বুদ্ধকরণ বক্তৃতা প্রদান করেন। ৪৯তম বেঙ্গলি রেজিমেন্ট গঠনে ঢাকার অবদান শীর্ষক মুহাম্মদ লুত্ফুল হকের রচনা থেকে একটি দীর্ঘ অনুচ্ছেদের উদ্ধৃত করা বাঞ্ছনীয়:

সভায় ঢাকার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এফডব্লিউ রবার্টসন সভাপতিত্ব করেন। শহরের প্রায় সব গণমান্য ব্যক্তি সভায় উপস্থিত ছিলেন। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ঢাকার নবাব হাবিবুল্লাহ, আনন্দচন্দ্র রায়, রায় বাহাদুরচন্দ্র, কুমার দত্ত, আমিরুউদ্দীন আহমদ, ডিআইজি (পুলিশ) কেবি থমসন, ডা. নরেশচন্দ্র সেন, প্যারিলাল দাস প্রমুখ। নবাব হাবিবুল্লাহ সভার উদ্দেশ্য বর্ণনা করেন এবং তরুণদের বাঙালি পল্টনে যোগদানের জন্য অহ্বান জানান। তার ডাকে সাড়া দিয়ে তিনজন হিন্দু দুজন মুসলমান তরুণ পল্টনে যোগদানের জন্য এগিয়ে আসেন। ডা. নরেশচন্দ্র সেন এবং আরো কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি সভায় বক্তৃতা করেন। সভায় ঢাকা শহরের দুটি বেসরকারি রিক্রুটিং সেন্টার স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। একটি শ্রীশচন্দ্র চ্যাটার্জি এবং অন্যটি হাকিম হাবিবুর রহমানের বাসায়।

সহকারী রিক্রুটমেন্ট অফিসার ক্যাপ্টেন টেটের বরাতে জানা যায় যে ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা সেনানিবাসে সরকারিভাবে রিক্রুটমেন্ট কার্যক্রম শুরু হয় এবং এর দায়িত্বে ছিলেন মিলিটারি পুলিশের ক্যাপ্টেন ডালাস স্মিথ। আগস্ট বাঙালি পল্টন ঘোষণার প্রায় দেড় মাস অতিবাহিত হলেও মফস্বল শহরগুলোতে সেনা সংগ্রহের তত্পরতা আশাব্যঞ্জক ছিল না। ২৮ সেপ্টেম্বরের পত্রিকায় উল্লেখ পাওয়া যায় যে স্বদেশী আন্দোলন এবং অন্যান্য সরকারবিরোধী আন্দোলন, জেল/অন্তরীণ ইত্যাদি কারণে সৃষ্ট উত্তেজনা অস্থিরতা রিক্রুটমেন্টকে ব্যাহত করেছে, বিশেষ করে ঢাকায়। ১৪ অক্টোবরের পত্রিকায় প্রেরিত ডা. মল্লিকের চিঠি থেকে জানা যায় যে কলকাতার বাইরে ঢাকা ছাড়া আর কোনো এলাকায় বাঙালি পল্টনে সৈনিক ভর্তির বিষয়ে বিশেষ কোনো তত্পরতা লক্ষ করা যায়নি। থেকে বোঝা যায় যে ঢাকার সরকারি বেসরকারি রিক্রুটমেন্ট সেন্টার স্থাপন, নবাব হাবিবুল্লাহর সৈনিক সংগ্রহে ব্যক্তিগত উদ্যোগ ইত্যাদি কারণে ২৮ সেপ্টম্বর-পরবর্তী ঢাকায় রিক্রুটমেন্ট গতি লাভ করা শুরু করে।

১৯ অক্টোবর ১৯১৬ ঢাকা থেকে পাঁচজনের প্রথম দলকে ব্যান্ডের বাদন এবং আল্লাহু আকবর বন্দে মাতরম ধ্বনির মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে কলকাতাগামী ট্রেনে তুলে দেয়া হয়। পাঁচ সৈনিক হলেন শেখ আবদুল গফুর, শেখ লুত্ফুর রহমান, যোগেশচন্দ্র চক্রবর্তী, শম্ভুচরণ ভট্টাচার্য হেমেন্দ্র চন্দ্র। দ্বিতীয় দফায় ঢাকা থেকে নির্বাচিত যে সাতজনকে ট্রেনে তুলে দেয়া হয় তারা হচ্ছেন আবদুস সাত্তার, মফিজ উদ্দীন, আবদুস সালাম, ক্ষীতিশচন্দ্র প্রামাণিক, ভারতচন্দ্র দে, রঙ্গলাল বসু যতীন্দ্র মোহন দে। নিয়োগ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। তবে নিয়োগ আরো বেগবান করে তুলতে ১৯১৭-এর ২৪ মার্চ লেফটেন্যান্ট টেলরের অধীনে ৬০ সদস্যের বাঙালি পল্টনের একটি দল করাচি থেকে ঢাকায় আসে। (প্রাগুক্ত)

বাঙালি পল্টনে যোগদান করতে যুবকদের বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করা হলেও আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি। বালিয়াদির জমিদার তার জমিদারির এক রায়ত যোগদান করলে তিনি তার খাজনা মওকুফ করেন এবং ২০ টাকা এককালীন অনুদান প্রদান করেন। সরকারের শুভদৃষ্টিতে থাকার জন্য জমিদাররা সর্বত্রই পুরস্কার প্রণোদনা ঘোষণা করেন। প্রতি মাসে অন্তত ২৫০ জন নবনিয়োগপ্রাপ্ত সৈনিকের চাহিদার জায়গায় তা ৯০ জনে নেমে এবং আরো কমতে থাকে। লুত্ফুল হকের রচনায় উদ্বুদ্ধকরণের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। করাচি ডিপোতে প্রশিক্ষিত ৩৬ জন বাঙালি সৈনিক মার্চ (১৯১৭) সকাল ৭টায় শঙ্খনিধি উদ্যানে উপস্থিত হয়ে আবদুল গনি স্ট্রিট, র্যাংকিন স্ট্রিট, মদনমোহন বসাক লেন, নবাবপুর, বংশাল, মাহুতটুলি, বেচারাম দেউড়ি, চকবাজার, মৌলভিবাজার, মোগলটুলি, পাথরহাট্টা, বাবুবাজার, ইসলামপুর, চুড়িহাট্টা, পাটুয়াটুলি উয়াল্টার রোড, সূত্রাপুর, দিগবাজার, লক্ষ্মীবাজার, নারিন্দা সিমেট্রি রোড দিয়ে মার্চ করে। ঢাকার নবাব হাবিবুল্লাহ বাঙালি পল্টনে যোগ দিয়েছিলেন। যুদ্ধ শেষে ২৭ ডিসেম্বর ১৯১৮ নবাব হাবিবুল্লাহ যখন ফিরে আসেন, পাঁচ হাজার ঢাকাবাসী রেলস্টেশনে হাজির হয়ে তাকে সংবর্ধনা জানায় এবং বিজয়োল্লাস করে। দুই বাংলা থেকে বাঙালি পল্টনে মোট হাজার ৯৫২ জন সৈনিক ২৩১ জন ফলোয়ার্স যোগ দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ঢাকা থেকে ৬৭৩ জন। বাঙালি পল্টন পূর্ব বাংলার একমাত্র ঢাকাতেই দৃশ্যমান হয়েছে।

 

এম মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা