শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১ | ৯ আশ্বিন ১৪২৮

সিল্করুট

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত প্রথম বাঙালি সৈনিক

হাসান তানভীর

পশ্চিমবঙ্গের একটি জাদুঘরে সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা যোগেন্দ্রনাথ সেনের রক্তের দাগযুক্ত ভাঙা চশমাটি দেখলে যে কারো দেহে শিহরণ জাগবে। যোগেন্দ্রনাথ সেনের গল্পটি যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, তিনি ছিলেন ১৫তম ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টে যুদ্ধ করা একমাত্র অশ্বেতাঙ্গ ব্যক্তি এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত হওয়া প্রথম বাঙালি।

প্রথম মহাযুদ্ধে ভারতের সংশ্লিষ্টতা-বিষয়ক গবেষক ভারতীয় বংশোদ্ভূত লন্ডননিবাসী শান্তনু দাস যোগেনকে আবিষ্কার করেন। ভাঙা চশমা অন্যান্য স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে শহিদ হুসাইন একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন, যা ইয়র্কশায়ারে বিবিসি ওয়ানের ইনসাইড আউট অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত হয়েছিল।

যোগেন্দ্রনাথ সেন তত্কালীন বাংলায় ফরাসি উপনিবেশ চন্দরনগরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বর্তমানে জায়গাটির নামকরণ করা হয়েছে চন্দননগর। তিনি ১৯১০ সালে পশ্চিম ইয়র্কশায়ারের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার জন্য ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় যোগেন্দ্রনাথ লিডস করপোরেশন ইলেকট্রিক লাইটিং স্টেশনে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ১৫তম ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টে প্রথম যাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল তিনি ছিলেন তাদের অন্যতম। এটি লিডস প্যালস ব্যাটালিয়ন নামেও পরিচিত ছিল।

গবেষক শান্তনু দাস আইএএনএসকে বলেন, ২০০৫ সালে আমি চন্দননগরের ফরাসি ইনস্টিটিউটে যোগেন্দ্রনাথের ভাঙা রক্তাক্ত চশমাটি আবিষ্কার করি।

লন্ডনের কিংস কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যয়নরত শান্তনু দাস আরো বলেন, চন্দননগরের প্রদর্শনী কক্ষে লেখা ছিল, যোগেন্দ্রনাথ সেন পশ্চিম ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টের সদস্য ছিলেন। তিনি বাংলার চন্দননগরের বাসিন্দা ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯১৬ সালের ২২ মে তিনি নিহত হন। সৈনিক যোগেন্দ্রনাথ ফ্রান্সের সোমের কাছে একটি যুদ্ধে ২৮ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন। তার নাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার মেমোরিয়ালে লেখা আছে। শান্তনু বলেন, যোগেন্দ্রনাথের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য স্মৃতিচিহ্নের মধ্যে আছেএকজন ইউরোপীয় নারীর ছবি, একটি রেজর, একটি পুস্তিকা, একটি ডগ ট্যাগ এবং এক টুকরো দড়ি। পুস্তিকাটির নাম ছিল পোয়েমস অ্যাবাউট ফ্রেন্ডশিপ, যাতে সিসিলি নামের অজ্ঞাত এক তরুণীর স্বাক্ষর ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক স্থানীয় গবেষকদের সহায়তায় বেশ পরিশ্রম করে শান্তনু দাস যোগেন্দ্রনাথের সংক্ষিপ্ত জীবনের মুহূর্তগুলোকে একত্র করতে পেরেছিলেন। শান্তনু বলেন, এই ব্যাটালিয়নে তিনিই একমাত্র ভারতীয় এবং অশ্বেতাঙ্গ ছিলেন। তবে শান্তনু যোগেন্দ্রনাথের কোনো বংশধরকে শনাক্ত করতে পারেননি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ৭০ হাজার ভারতীয় সেনা প্রাণ হারায়। ১৯১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে প্রায় দেড় লাখ ভারতীয় সেনা ইউরোপে মোতায়েন ছিল। যোগেন্দ্রনাথের গল্পটি অনন্য, কারণ তিনি ব্রিটিশ ব্যাটালিয়নের অংশ হিসেবে যুদ্ধে গিয়েছিলেন, ভারতীয় ব্যাটালিয়নের নয়। ব্যাটালিয়নের অন্যতম শিক্ষিত সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তার অফিসার হিসেবে যোগ দেয়ার প্রচেষ্টায় বাধা দেয়া হয়।

ইউনিটে তার নাম দেয় জন সেন তার সহকর্মীরা তাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। যোগেন্দ্রনাথকে উত্তর ফ্রান্সের কলিনক্যাম্পসে সমাহিত করা হয়।

লিডস তার ভুলে যাওয়া ভারতীয় নায়ককে স্মরণ করে

১৯১৬ সালের জুনের ইয়র্কশায়ার ইভনিং পোস্টে একটি শিরোনাম ছিল—‘লিডস প্যালস একজন ভারতীয় কমরেডকে হারিয়েছে। সৈনিক যোগেন্দ্রনাথ সেন যুদ্ধে নিহত হয়েছেন।

সমসাময়িকদের মধ্যে জন সেন নামে খ্যাত যোগেন্দ্রনাথ সেন যখন স্বেচ্ছায় যুদ্ধ করতে গিয়েছিলেন, তখন ততটাই আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল, যেমনটি বর্তমানে লিডসের শিক্ষাবিদ ইতিহাসবিদদের মধ্যে তার খ্যাতি রয়েছে। তার প্রাক্তন শিক্ষায়তন ইউনিভার্সিটি অব লিডসের যুদ্ধ শতবার্ষিকী প্রকল্পের অংশ হিসেবে তার এবং তার যুদ্ধ সম্পৃক্ততার ওপর নতুন করে আলোকপাত করা হয়েছে। এর আগে বিবিসি ওয়ান (ইয়র্কশায়ার) ইনসাইড আউট প্রোগ্রামের একটি অংশে যোগেন্দ্রনাথের ওপর একটি তথ্যচিত্র প্রচার করেছিল।

১৯৯৩ সালে প্রকাশিত লরি মিলনার লিডস প্যালস সৈনিক যোগেন্দ্রনাথের কথা প্রথম উল্লেখ করে। লেখককে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে ব্যাটালিয়নের বেঁচে যাওয়া সৈনিক আর্থার ডালবি বলেন, আমাদের সঙ্গে একজন হিন্দু ছিল, জন সেন নামে পরিচিত। তিনি ব্যাটালিয়নের সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষ ছিলেন এবং প্রায় সাতটি ভাষায় কথা বলতে পারতেন। যোগেন্দ্রনাথ ১৯১০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে তড়িৎ প্রকৌশল পড়তে লিডসে এসেছিলেন। তার পূর্ববর্তী জীবন সম্পর্কে সামান্য যা জানা যায় তা হলো তিনি ১৮৮৭ সালে ভারতের চন্দননগরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ইংল্যান্ডে চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি তার বিধবা মা এবং বড় ভাইয়ের সঙ্গে সেখানেই বাস করতেন, যিনি ছিলেন একজন ডাক্তার।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় যোগেন্দ্রনাথ লিডস করপোরেশন ইলেকট্রিক লাইটিং স্টেশনের সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি ব্ল্যাকম্যান লেনে থাকতেন এবং মিল হিল ইউনিটারিয়ান চ্যাপেলের একজন সদস্য ছিলেন। সেখানে তার কিছু বন্ধু ছিল। লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র সংগ্রহ থেকে প্রাপ্ত ছবিগুলোতে তাকে কোলস্টারডালে প্রশিক্ষণের সময় সেনাবাহিনীর সহকর্মীদের সঙ্গে আরাম করতে দেখা গেছে এবং ছবিতে পোজ দেয়ার সময় ফুল ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় ছিলেন।

অন্য এক ছবিতে তাকে দেখা যায় জাহাজে করে মিসর থেকে ফ্রান্সের উদ্দেশে যাত্রা করছেন, যা ছিল তার প্রথম দায়িত্বপ্রাপ্ত জায়গা। যেখানে দুই মাস পরে ১৯১৬ সালের ২২ মে সোমে যুদ্ধে তিনি প্রাণ হারান। বাড়িতে লেখা একটি মর্মস্পর্শী চিঠিতে সৈনিক হ্যারল্ড বার্নিস্টন বর্ণনা করেছেন, আমরা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলাম। জন সেন নিহত হয়েছিল। তার পা ঘাড়ে শেলের স্প্লিন্টার আঘাত করেছিল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তার মৃত্যু হয়।

সৈনিক যোগেন্দ্রনাথ স্পষ্টতই তার সহকর্মীদের কাছে ভালোবাসা শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। সৈনিক ডালবি দাবি করেছেন যে তত্কালীন ব্রিটিশ সামরিক নীতির কারণে তাকে অফিসার পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। তবে এটি যোগেন্দ্রনাথকে ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টের একমাত্র অশ্বেতাঙ্গ এবং ভারতীয় হিসেবে সৈনিক পদে যোগদান থেকে আটকে রাখতে পারেনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত প্রথম বাঙালি সৈনিকও ছিলেন তিনি।

তার কমান্ডিং অফিসার লিখেছেন, পুরো কোম্পানি তাকে হারানোর বেদনা অনুভব করেছিল। তিনি সবসময় নিজেকে আগ্রহী উদ্যমী সৈনিক হিসেবে উপস্থাপন করতেন। আমি কোম্পানির অন্য অফিসাররা তাকে নিয়ে অনেক উঁচু ধারণা পোষণ করতাম। তার নাম ইউনিভার্সিটি অব লিডস মিল হিল ইউনিটারিয়ান চ্যাপেলের যুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ উভয় জায়গাতেই লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। তার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র তার ভাইয়ের কাছে প্রেরণ করা হয়েছিল। পরে তা চন্দননগর ইনস্টিটিউটে দান করা হয়েছিল, যেখানে সেগুলো প্রদর্শিত হয়।

একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ফরাসি নাগরিক (চন্দরনগর ব্রিটিশ শাসনামলে ফরাসি উপনিবেশ ছিল) এবং সম্ভাবনাময় তরুণ প্রকৌশলী হয়েও কেন তিনি একটি অচেনা জায়গায় যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তা একটি অমীমাংসিত রহস্য। পরবর্তীকালের কবি লেখক সৈনিকদের মতো যোগেন্দ্রনাথ কোনো জার্নাল চিঠি রেখে যাননি; অথবা যদি রেখেও যান, সেগুলো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার কর্মকাণ্ডগুলোই সম্ভবত ইঙ্গিত দেয় যে তিনি লিডস কমিউনিটি এর নীতিমালার প্রতি কতটা অন্তঃপ্রাণ ছিলেন।

সৈনিক যোগেন্দ্রনাথ সেনকে তার নিজ জন্মভূমি ভুলে গেলেও তাকে আশ্রয় দেয়া শহরটি তার বীরত্বের কথা স্মরণ করে। ইতিহাসবিদ ডেভিড স্টো তার সম্পর্কে বলেছেন, জন্মগতভাবে একজন বাঙালি হলেও তিনি লিডসেরও সন্তান ছিলেন।

 

হাসান তানভীর: অনুবাদক