শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১ | ৯ আশ্বিন ১৪২৮

সিল্করুট

অযোদ্ধা জাতি বাঙালি কেমন করে যুদ্ধে গেল

ডেভিড ওমিসি । অনুসৃতি: আন্দালিব রাশদী

[যোদ্ধা জাতির সম্মান বাঙালি কখনো পায়নি। প্রথম মহাযুদ্ধ বাঙালির জন্য একটি বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করল। ডেভিড ওমিসি ইংল্যান্ডের হাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ইতিহাসের শিক্ষক সমরবিজ্ঞান গবেষক। তার লেখা মিলিটারি প্ল্যানিং অ্যান্ড ওয়ারটাইম রিক্রুটমেন্ট (ইন্ডিয়া)-এর কিছু অংশ সংক্ষেপে ভাষান্তরিত হলো। এতে প্রথম মহাযুদ্ধের জন্য বাঙালিদের নিয়োগের প্রেক্ষাপটটি জানা যাবে]

প্রথম মহাযুদ্ধ শুরুর বছর ১৯১৪ সালে হাজার ৩৩৩ জন ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তার পাশাপাশি ঔপনিবেশিক ভারতের জওয়ান কর্মকর্তা মিলিয়ে মোট সৈন্য সংখ্যা ছিল লাখ ৫৯ হাজার ১৩৪। যুদ্ধ মোকাবেলা করার জন্য বাঙালিসহ আনুমানিক ১৫ লাখ রণাঙ্গনের যোদ্ধা যুদ্ধ সহায়ক তরুণ যুবকের বড় বাহিনীউপমহাদেশে প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। তারা বিভিন্ন রণাঙ্গনে লড়াই করেছে।

যুদ্ধের আগে

১৯ শতকে এটাই প্রতিষ্ঠিত হয় যে মার্শাল রেইস সামরিক জাতির সদস্যরাই কেবল ভারতীয় সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য, অন্যরা নয়। ১৮৮৫-৯৩ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ লর্ড ফ্রেডেরিক রবার্টস ধারণাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। ভারতের দক্ষিণাংশ থেকে সেনাবাহিনী যাদের নিয়োগ করেছে তিনি তাদের মনে করেছেন আনওয়ারলাইক’—যুদ্ধের অনুপযুক্ত এবং উত্তরের কঠোর পরিশ্রমী যুবকরাই কেবল যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে। ১৮৮০ থেকে ১৯০০-এর দশক পর্যন্ত অযোগ্য জাতির সদস্যদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগই নিষিদ্ধ ছিল। কমান্ডার ইন চিফ রবার্টসের পছন্দ ছিল পাঞ্জাবের শিখ আর নেপালের গোর্খা। তখন পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে সৈনিকের অধিকাংশ সরবরাহ এসেছে পাঞ্জাব নেপাল থেকে। একক জাতি বিবেচনায় দুই মহাযুদ্ধেই সবচেয়ে বেশি সৈন্য ছিল পাঞ্জাবি আর ধর্মীয় বিবেচনায় সর্বোচ্চ সংখ্যার সরবরাহ এসেছে পাঞ্জাবের মুসলমানদের মধ্য থেকে। ১৯১৪ সালে প্রথম মহাযুদ্ধের শুরুতে ভারতীয় বাহিনীর প্রায় অর্ধেক পাঞ্জাবের, ছয় ভাগের এক ভাগ গোর্খা পাঠান। এক-তৃতীয়াশেরও কম ভারতের অন্যান্য জাতি থেকে।

দক্ষিণ আফ্রিকার যুদ্ধের পর ১৯০২ সালে কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে দায়িত্ব নিলেন লর্ড হোরাশিও হার্বার্ট কিচেনার। তার মনে হলো এটা দুর্বলভাবে সংগঠিত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা একটি সেনাবাহিনী। কেবল অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা করার জন্য সাধারণত এক রেজিমেন্ট করে সৈন্য সারা দেশেই মোতায়েন করা আছে। সৈন্যরা তেমন প্রশিক্ষণ লাভ করেনি। যুদ্ধকালে একটি ব্রিগেডের কমান্ড অনুযায়ী কেমন করে কাজ করবে তাও শেখেনি। কিচেনার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় নিয়োজিত সৈন্যর সংখ্যা কমাতে শুরু করলেন। অবমুক্ত সৈনিকদের নিয়ে এলেন বিভিন্ন কেন্দ্রে। ফিল্ড আর্মি ডিভিশনাল এরিয়া থেকে ৯তে উত্তীর্ণ করলেন। ডিভিশনাল কমান্ডারদের বুঝিয়ে দিলেন তাদের কাজ যুদ্ধ করা এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকা। সবচেয়ে বড় কথা তিনি মার্শাল রেইসের ধারণাটিকে আরো পাকাপোক্ত করলেন। দক্ষিণের রেজিমেন্ট বাতিল করে দিয়ে উত্তরের বাহিনী দিয়ে নতুন করে ক্যান্টনমেন্ট সাজালেন।

১৯১৪ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী

ব্রিটিশ অফিসার: ,৩৩৩

সংরক্ষিত অফিসার: ৪০

ভারতীয় সব র্যাংকের সৈন্য: ,৫৯,১৩৪

ভারতীয় বিজার্ভ: ৩৪,৭৬৭

ভারতীয় অযোদ্ধা: ৪৫,৬৬১

মোট: ,৪১,৯৩৪

১৯১৪ সালের আগস্টে সমগ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পক্ষে সম্রাট পঞ্চম জর্জ জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। সুতরাং তাত্ত্বিকভাবে তখন থেকেই ভারতও যুদ্ধে জড়িয়ে গেছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে আনুগত্য প্রকাশের ধুম লেগে যায়। সংবাদপত্রগুলো ব্রিটেনের পক্ষে লড়াই করার যৌক্তিকতা দেখায়। রাজনীতিবিদরা একই সঙ্গে আনুগত্য দেখাতে এবং ভারত যে স্বশাসনে সক্ষম তা বোঝাতে যুদ্ধে যোগদানে উৎসাহিত করে। প্রথম দিকে আগ্রহী নতুন যোদ্ধার হিড়িক পড়ে যায়, কিন্তু যুদ্ধ প্রলম্বিত হওয়ার পর আগ্রহে ভাটা পড়ে। ভারতীয় বাহিনীকে আগে মনে করা হতো ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ইম্পেরিয়াল ফায়ার ব্রিগেড, যাদের দায়িত্ব ভারত মহাসগরীয় অঞ্চল থেকে দূরপ্রাচ্যে চীন পর্যন্ত। সাদা মানুষের যুদ্ধে যেমন আফ্রিকায় যুদ্ধ বা ক্রিমিয়ার যুদ্ধে সাদা মানুষের স্বার্থে ভারতীয়দের লড়াই করতে হয়নি। অবস্থায় ইউরোপে জার্মানির বিরুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীকে মোতায়েন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত। ১৯১১ সালেই কমিটি ফর ইম্পেরিয়াল ডিফেন্স সিদ্ধান্ত নেয় দুটি ভারতীয় ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন একটি অশ্বারোহী ব্রিগেড ইউরোপে মোতায়েন করা হবে। ১৯১৪ সালে পঞ্চম জর্জ চেয়েছেন ভারতীয় সেনাবাহিনী ইউরোপে কাজ করুক। গভর্নর জেনারেল লর্ড হাডিং তা সমর্থন করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইন্ডিয়ান এক্সপেডিশনারি ফোর্স পাঠানো হলো মিসর, পূর্ব আফ্রিকা পারস্যে। ভারতীয় বাহিনীর জন্য প্রধান রণাঙ্গন মেসোপটেমিয়া।

কিন্তু ভারতের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়াল শান্তিকালীন সেনা নিয়োগ বিধিমালা। সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াল মার্শাল রেইস রিক্রুটমেন্ট পলিসি। যোদ্ধা জাতির সদস্য না হলে নিয়োগ দেয়া যাবে না। কারণে পর্যাপ্তসংখ্যক সৈনিক নিয়োগ দেয়া যাচ্ছে না। রিজার্ভে রাখা তালিকা থেকে যাদের ফ্রান্সে পাঠানো হলো তাদের বেশির ভাগই বুড়ো কিংবা বেঢপ আকারের। যুদ্ধে যখন মৃতের সংখ্যা বাড়তে লাগল, ভারতীয় ব্যাটালিয়নকে রণাঙ্গনে পাঠানো গেল না। তাদের করা হলো ট্রেনিং ব্যাটালিয়নের সদস্য। এর আগেই নিকলসন কমিটি ১৯১৩ সালে সৈনিক নিয়োগের ভিত্তি সম্প্রসারণ করার সুপারিশ করে দেয়। আর যুদ্ধ চলাকালে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে পুরো প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা দরকার।

১৯১৪-এর নভেম্বরে অমৃতসরে সেনাবাহিনীর সদস্য নিয়োগকারী কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রুল জানালেন, রিক্রুটমেন্ট সম্পন্ন করার পর বাছাইকৃতদের স্ত্রীরা তাদের প্রলুব্ধ করে সেনাবাহিনী থেকে সরিয়ে নেয়ার জন্য অনেকটা পথ তাদের অনুসরণ করছে। মৃতের সংখ্যা যখন বেড়ে যাচ্ছিল সৈনিকরাই তাদের আত্মীয়-স্বজনের এনলিস্টেড না হওয়ার প্ররোচনা দিয়েছে।

১৯১৫ সালের মে মাসে একজন মুসলমান হাবিলদার তার বন্ধু হাবিলদারকে চিঠিতে লেখেন: আল্লাহর দোহাই এসো না। ইউরোপের যুদ্ধে এসো না। তোমার রেজিমেন্ট কিংবা এর কোনো অংশ এখানে আসছে কিনা আমাকে জানাও, আমি খুব দুশ্চিন্তায় আছি। আমার ভাই ইয়াকুব খানকে বলো সে যেন জওয়ান হওয়ার জন্য নাম না লেখায়, দোহাই লাগে। তোমার কোনো আত্মীয়ও যদি থাকে তাদের জন্য আমার পরামর্শ হচ্ছে তালিকায় নাম লেখাতে বারণ করছি। শাবান মাসের বৃষ্টির মতো কামান, মেশিনগান, বন্দুক আর বোমা দিন-রাত সমানে বর্ষিত হচ্ছে। পাতিলে রান্না করা খাবারে সিদ্ধ না হওয়া একটা-দুটো শস্যদানার মতো কেউ কেউ বেঁচে গেছে।

মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে মহাযুদ্ধে তুরস্কের যোগদানে ভারত উপমহাদেশে বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। শেখ আল-ইসলাম হিসেবে তুরস্কের সুলতান পঞ্চম মাহমুদ (১৮৪৪-১৯১৮) মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যদের ৩৫ শতাংশই মুসলমান। এদিকে অক্ষশক্তির প্রধান জার্মান প্রচারণাও তাদের পক্ষে কাজ করছে। ভারতে মুসলমান সৈন্য নিয়োগে তাই নতুন বাধা এসে হাজির হয়। ব্রিটেনের প্রতি আনুগত্য থাকলেও ধর্মীয় আনুগত্যের প্রশ্নে তুরস্কের সুলতান জার্মানিকেই তাদের সমর্থন করার কথা। মুসলমানদের তারা অবিশ্বস্ত মনে করতে শুরু করল।

১৯১৫ সালের সিঙ্গাপুর বিদ্রোহে মুসলমান সৈন্যরা তাদের অফিসারদের বিরুদ্ধে বন্দুক তাক করে অনেককেই হত্যা করে, তাদের বেপরোয়া গুলিতে আশপাশের কয়জন ইউরোপীয় নিহত হয়। বিদ্রোহীদের অধিকাংশই ধরা পড়ে এবং তাদের ৪৭ জনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। ১৯১৫ সালের মার্চে একজন ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা ২০ জন সৈন্য নিয়ে ফ্রান্সের পক্ষ ত্যাগ করে জার্মানদের সঙ্গে মিশে যায় এবং মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে। পক্ষত্যাগী কিছু সৈন্য এবং জার্মান এজেন্ট কিছুকাল পর কাবুলে উপস্থিত হয়। তখন গুজব ছড়িয়ে পড়ে, গোটা আফগানিস্তানই পক্ষ ত্যাগ করে জার্মানদের হয়ে লড়াই করবে। ১৯১৬ সালে একটি পুরো অশ্বারোহী রেজিমেন্ট এবং ১৫তম ল্যান্সার বাহিনী মেসোপটেমিয়াকে মুসলমানদের পবিত্র প্রাঙ্গণে তুর্কি মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে অস্বীকার করে। সব মিলিয়ে ভাইসরয়ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ভারতের অভ্যন্তরেও মুহূর্তে বন্দুকের নল ঘুরিয়ে ধরতে পারে।

তার পরও ভারতে জওয়ান নিয়োগ প্রতি মাসে হাজার ২৫০ থেকে ১৯১৫ সালের শেষদিকে প্রতি মাসে ১০ হাজারে পৌঁছল। একটি অংশ পূর্ণ করবে নিহতদের শূন্যস্থান, অন্য অংশ সেনাবাহিনীর বিস্তার ঘটাবে। ১৯১৬-এর এপ্রিলে বিলেতে কেন্দ্রীয় ব্রিটিশ প্রশাসন জানিয়ে দিল, ভারতীয় বেসামরিক প্রশাসনকে দিয়ে সৈন্য নিয়োগ শুরু করা হবে। ১৯১৪-১৬ সালের মধ্যে দুই লাখেরও বেশি সৈন্য নিয়োগ করা হলো। নতুন নিয়োগের পরিসংখ্যান:

১৯১৬ সালের এপ্রিলে ফ্রেডেরিক চেমসফোর্ড ভাইসরয় পদে যোগ দিলেন। সেপ্টেম্বরে পাঞ্জাবের গভর্নর স্যার মাইকেল ডায়ার জওয়ান নিয়োগে বেসামরিক প্রশাসন এবং স্থানীয় পীর ধর্মীয় নেতাদের জড়িত করার পরামর্শ দিলেন। নিয়োগের দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে রেজিমেন্টাল ডিপো থেকে সরিয়ে প্রাদেশিক সরকারের কাছে ন্যস্ত করা হলো। সৈন্যের চাহিদা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। ১৯১৬-এর মে মাসে স্যার উইলিয়াম মেয়ারের অধীনে সেন্ট্রাল রিক্রুটমেন্ট বোর্ড গঠিত হলো। বোর্ড ভারতীয় সৈনিক নিয়োগ প্রক্রিয়া একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিল। তাতে অযোদ্ধা জাতিও সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করতে পারবে বলে স্বীকৃত হলো।

স্যার উইলিয়াম মেয়ারের (১৮৬০-১৯২২) কমিটিতে থাকলেন অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল প্রতিরক্ষা দপ্তরের সচিব, দুজন ভারতীয় সচিব এবং স্যার মাইকেল ডায়ার (জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের সময়ও তিনিই গভর্নর ছিলেন) তাদের সিদ্ধান্তের কারণেই অযোদ্ধা জাতি বাঙালি যুদ্ধের জন্য নিয়োগ লাভ করতে সুযোগ পেল। সৈনিকের চাকরি লোভনীয় করে তুলতে তাদের জন্য ফ্রি রেশন বরাদ্দ করা হয়। আর চাকরিতে ঢোকামাত্রই ৫০ টাকার একটি বোনাস প্রদান শুরু হলো।

প্রথম থেকে ১৯১৯-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত নিয়োগপ্রাপ্ত ভারতীয়র সংখ্যা ১৫ লাখ। বাঙালি সৈনিকদের রেজিমেন্ট ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ছয় হাজার।

 

আন্দালিব রাশদী: কথাসাহিত্যিক