শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১ | ৯ আশ্বিন ১৪২৮

সিল্করুট

বাঙালি পল্টন: সূচনা এবং গঠন

মাহমুদুর রহমান

ভারতের ইতিহাসের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কালপর্বে সেনাবাহিনীর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে বাঙালির সংখ্যা খুবই কম। নেপালি গোর্খা, শিখ, জাঠ, রাজপুত, মারাঠারা সাহসী বা যুদ্ধবাজ বলে পরিচিত থাকার কারণে ভারতের সৈন্যবাহিনীতে তাদেরই বেশি দেখা যেত। মূলত মোগল আমলে ভারতের বিস্তৃত অংশ এক শাসনের অধীন হলে মোগল বাহিনীর মধ্যেই প্রথম বিভিন্ন অঞ্চলের সৈন্য একত্রিত হয়। পরবর্তী সময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ক্ষমতা লাভ করার পর ধীরে ধীরে কোম্পানি সেনাবাহিনী তৈরি করে। ১৮৫৭ সালের পর ভারত মহারানীর শাসনের অধীনে এলে সেনাবাহিনী মূলত ব্রিটিশরাজের সেনাবাহিনীর অংশ হয়ে ওঠে এবং শৃঙ্খলার সঙ্গে নিয়মতান্ত্রিকভাবে বাহিনী সজ্জিত করা হয়। কিন্তু সেখানেও বাঙালি সেনা ছিল দুর্লভ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তৈরি ৪৯ বেঙ্গলি রেজিমেন্ট প্রথম বাঙালিদের অন্তর্ভুক্ত করে।

ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকা অবস্থায় বাংলায় যারা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করেছেন তাদের অনেকেই দুটি কথা বারবার বলতেন: বাঙালির ইতিহাস নেই, বাঙালি যুদ্ধ করতে পারে না। কিন্তু আসলে বাঙালির সে অর্থে যুদ্ধ করার কখনো প্রয়োজনই হয়নি। কৃষিভিত্তিক জীবন অর্থনীতিতে তারা নিরুপদ্রব জীবনযাপনেই অভ্যস্ত ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনামলে মধ্যবিত্ত বাঙালিদের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সময়ে অনেকেরই মনে হয়েছিল, শাসনের সঙ্গে সেনাবাহিনীর একটা ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে। ফলে নিজেদের অধিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য হলেও সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন। অবশ্য একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের অন্যতম সূতিকাগার ছিল বাংলা। সেখানে বাঙালি সৈন্যদের উপস্থিতি নিয়ে তর্ক হতে পারে, কিন্তু বাংলা বাঙালি সময় থেকেই ব্রিটিশদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছিল।

ব্রিটিশ বাহিনীর ইতিহাসের দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, সেখানে অঞ্চল, ধর্ম, জাতি ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে সেনা ভর্তি এবং দল গঠন করা হতো। যেমন পাঞ্জাব রেজিমেন্ট, রাজপুত ব্যাটালিয়ন, গোর্খা রেজিমেন্ট ইত্যাদি। প্রথমেই যেমন বলা হয়েছে, এসব জাতির সাহসী এবং যুদ্ধবাজ বলে পরিচিতি থাকার কারণে এদের সেনাদলে অগ্রাধিকার দেয়া হতো। মারাঠারা বরাবরই যুদ্ধবাজ, রাজপুতরাও তাই। আবার কোনো কোনো অঞ্চলে ফসল উৎপাদন কম হওয়া, অনাবৃষ্টি ইত্যাদির কারণে কাজের অভাব থেকেও অনেকে সেনাদলে যোগদান করত। বাঙালির সে রকম কোনো প্রয়োজন না থাকায় সেনাদলে যোগদানে তারা বরাবরই অনাগ্রহী। কিন্তু কোম্পানি শাসনে কলকাতা যখন রাজধানী তখন স্বাভাবিকভাবেই সেটি রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ হয়ে ওঠে এবং ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা কলকাতা যখন অর্থনীতি, শিক্ষার ক্ষেত্রে উন্নতি করে তখন সেখানকার মানুষের মধ্যে নতুন চিন্তার উন্মেষ স্বাভাবিক।

ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের সংখ্যালঘু হয়ে থাকার ব্যাপারে অনেকেই চিন্তিত ছিলেন। সামরিক রাজনীতি কিংবা মনস্তত্ত্ব যারা জানতেন তারা বুঝেছিলেন যে ব্রিটিশরাজের বাহিনীতে বাঙালিদের অন্তর্ভুক্তি অত্যন্ত জরুরি। বাহিনীতে বাঙালি যে একদম ছিল না, এমন নয়। তবে আজকের দিনে দেশের সেনাবাহিনীতে যোগদান যেমন গর্বের, দেশমাতৃকার জন্য জীবনপণ করার সেই ব্রত বাঙালি যুবকেরা তখন স্বদেশী আন্দোলন-এর মধ্যে পেয়েছিল। ব্রিটিশদের প্রতি ঘৃণা এবং দেশকে মুক্ত করার জন্য ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে দল গঠন করার সময় স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার কোনো ইচ্ছা বা আগ্রহ তাদের হয়নি। কিন্তু ব্রিটিশদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে এবং আরো নানা কারণে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগদানের প্রয়োজন অনুভব করে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে অনেকেই বাঙালিদের ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগদানের পক্ষে প্রচারণা শুরু করেন। বিশেষত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রচারণা জোরদার হয়।

তত্কালীন বাংলার অগ্রগণ্য রাজনৈতিক সামাজিক ব্যক্তিত্ব স্যার সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী এক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। রাষ্ট্রগুরু নামে পরিচিত সুরেন্দ্রনাথ বাঙালিদের অনুপ্রাণিত করার পাশাপাশি তিনি বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের মনোযোগও আকর্ষণ করেন। সময়ে ব্রিটিশদের সঙ্গে থেকে কাজ করার একটা প্রবণতা অনেকের মধ্যেই লক্ষ করা যায়। যেমন সুরেন্দ্রনাথ তার সম্পাদিত বেঙ্গলি পত্রিকায় লিখেছিলেন, সরকারের সঙ্গে মতানৈক্য থাকতেই পারে, কিন্তু শত্রুর সামনে সেসব মতানৈক্য ভুলে এই মহান সাম্রাজ্য রক্ষায় আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়াই উচিত।

ভারত যেহেতু ব্রিটিশ শাসনের অধীনেই ছিল, যুদ্ধে ব্রিটিশদের ক্ষয়ক্ষতি হলে সে ভার ভারতের কাঁধেও পড়ত, তাতে সন্দেহ নেই। সেদিক থেকে মহান সাম্রাজ্যকে রক্ষা করার জন্য আহ্বানের যুক্তি দাঁড় করানো যায়, কিন্তু তত্কালীন পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাঙালি অনেক যুবক স্বদেশী আন্দোলনকে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং তাদের দেখাদেখি আরো অনেকে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। বিশেষত ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ-পরবর্তী সময়ে বাঙালিদের ক্ষোভ প্রতিবাদের মুখে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলেও ব্রিটিশ সরকারের প্রতি বাঙালির ক্ষোভ কমেনি। অন্যদিকে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, বাঙালির আন্দোলনের কারণেই বঙ্গভঙ্গ রদের অব্যবহিতপরই ব্রিটিশ সরকার ভারতের রাজধানী স্থানান্তর করে।

এমতাবস্থায় সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকারের কোনো ইচ্ছাই ছিল না। বাঙালিদের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের ভরসা ছিল না। তাই সমাজের অগ্রগণ্য ব্যক্তিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। স্যার সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী এক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। বর্ধমানের মহারাজা বিজয়চাঁদ মাহতাবকে প্রধান করা হয়। কমিটিতে স্যার সুরেন্দ্রনাথ নিজে থাকার পাশাপাশি এখানে যুক্ত হয়েছিলেন ঢাকার নবাব বাহাদুর সৈয়দ নবাব আলী চৌধুরী, সরলা দেবী, এমনকি শেরেবাংলা কে ফজলুল হক। কমিটির ক্রমাগত দাবির মুখে এক পর্যায়ে ব্রিটিশ সরকার সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে রাজি হয়। ১৯১৬ সালের আগস্ট বাঙালিদের নিয়ে দুটি কোম্পানি করার অনুমতি দেয়া হয়।

বাঙালিদের নিয়ে গঠিত কোম্পানি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বিংশ শতাব্দীর বাংলা সম্পর্কে বলা হতো, বাংলা আজ যা ভাবে, ভারত তা কাল ভাববে। সেনাবাহিনীতে সেই বাঙালির পিছিয়ে থাকা চলে না। লড়াকু জাতি হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ পাওয়া বাঙালির প্রয়োজন ছিল। দ্বিতীয় বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ। সৈন্যবাহিনীতে বাঙালিদের নিজস্ব একটি পরিচয় তৈরি হওয়ার মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ক্ষেত্রে প্রবল দাবি উত্থাপনের আকাঙ্ক্ষা। প্রসঙ্গে অশোক নাথ লিখেছেন, এর মধ্য দিয়ে বাঙালিরা দুটো দিকে সফল হলো। প্রথমত, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্যান্য দেশ, যেমন অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড বা কানাডা যেমন আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পেয়েছে, ভারতকেও সে রকমটা দেয়া হোক, দাবি যেমন জোরালোভাবে পেশ করা যাবে। দ্বিতীয়ত, বাঙালিরা লড়াকু জাতি নয়, তকমাটা মুছে ফেলা যাবে।

বাঙালিদের নিয়ে যে দুটি কোম্পানি তৈরি করা হয় তা বেঙ্গলি ডাবল কোম্পানি নামে পরিচিত হয়। ছয়জন ভারতীয় অফিসারের সঙ্গে ভাইসরয়েজ কমিশন্ড অফিসার (ভিসিও) এবং আরো হাজার ১৮ জন সদস্য নিয়ে তৈরি ডাবল কোম্পানির প্রধান হিসেবে লেফটেন্যান্ট এসজি টেইলরকে দায়িত্ব দেয়া হয়। সেপ্টেম্বরে ডাবল কোম্পানিকে ৪৬ পাঞ্জাবি অধীনে প্রশিক্ষণের জন্য নওশেরা পাঠানো হয়। প্রথম পর্যায়ের প্রশিক্ষণ শেষে দ্বিতীয় পর্যায়ের জন্য করাচি পাঠানো হয়। ১৯১৭ সালের জুলাই মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে ৪৯ বেঙ্গলি রেজিমেন্ট তৈরি হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে যা আমাদের কাছে বাঙালি পল্টন নামেই পরিচিত।

বাঙালিদের জন্য যেমন বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ছিল তেমনি এই ৪৯ বেঙ্গলি রেজিমেন্ট ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এই প্রথমবার ব্রিটিশ বাহিনীতে ধর্ম, জাতি ইত্যাদির প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে কেবল বাঙালি পরিচয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়। এছাড়া ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অন্যান্য রেজিমেন্টে সাধারণত কৃষক, মজুরশ্রেণীর মানুষ অন্তর্ভুক্ত হতো। কিন্তু বাঙালি রেজিমেন্টের ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র লক্ষিত হয়। তত্কালীন বাংলার উচ্চবিত্ত, শিক্ষিত পরিবার থেকেও অনেকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। ব্রাহ্মণ থেকে শুরু করে ঢাকার নবাব পরিবারকেউই বাদ পড়েনি। বগুড়ার ভোলানাথ চৌধুরী, ঢাকার জগদীশ চন্দ্র বসু, বর্ধমানের বগলাচরণ ব্যানার্জী ময়মনসিংহের প্রমথনাথ ঘোষের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তার বন্ধু শৈলজানন্দও যোগ দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পরিবারের চাপে পারেননি। আবার দৃষ্টিশক্তির সমস্যার কারণে বাঙালির কিংবদন্তি নেতা সুভাষ চন্দ্র বসু বাদ পড়েছিলেন।

এখান থেকেই বোঝা যায়, বাহিনীতে যোগদানের জন্য বাংলার যুবকদের মধ্যে যথেষ্ট আগ্রহ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছিল। অশোক নাথ লিখেছেন, তরুণ আর যুবকদের মধ্যে উৎসাহ এতটাই তৈরি হয়েছিল যুদ্ধে যাওয়ার জন্য, যাতে অন্যান্য পেশায় তিন গুণ পর্যন্ত বেশি আয় ছেড়ে দিয়েই তারা সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে এগিয়ে এসেছিলেন। সে সময়ে একজন সিপাহীর মাসিক বেতন ছিল ১১ টাকা। বেতন কম হওয়ার কারণে পরিবারের যে ক্ষতি হবে, সেটা পুষিয়ে দিতে সমাজের বিশিষ্টজনেরা চাঁদা তুলে যুদ্ধে যাওয়া ওই যুবকদের পরিবারের হাতে অর্থ তুলে দিতেন।

কিন্তু এত আগ্রহ নিয়ে বাঙালি যুবকেরা যোগদান করলেও ব্রিটিশ নীতিনির্ধারকরা আগ্রহের মর্যাদা দেয়নি। কারণ ৪৯ বাঙালি পদাতিক বাহিনীকে কখনো সম্মুখসমরে প্রেরণ করাই হয়নি। তাদের নানা সময়ে নানা পাহারার ক্ষেত্রে মোতায়েন করা হতো। বেঙ্গলি রেজিমেন্ট তৈরির পরপর যখন লেফটেন্যান্ট কর্নেল আর্থার ব্যারেটকে এর দায়িত্ব দেয়া হয়, তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। কেননা লড়াকু বালুচ রেজিমেন্ট থেকে সরিয়ে বাঙালিদের দায়িত্ব লাভ করে তিনি নাখোশ হয়েছিলেন। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ৪৯ বাঙালি রেজিমেন্টকে মেসোপটেমিয়ায় মোতায়েন করা হয়, কিন্তু তাদের পাহারা বাদে কোনো দায়িত্ব দেয়া হয়নি। দুঁদে ব্রিটিশ অফিসাররা বরাবরই রেজিমেন্টকে তাচ্ছিল্য করতেন। নানা সময়ে সেই বিদ্রূপের পরিচয়ও বেরিয়ে এসেছে। যেমন মেসোপটেমিয়ায় যখন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক স্যার উইলিয়াম মার্শাল রেজিমেন্ট পরিদর্শনে আসেন, তিনি স্মৃতিকথায় সে অভিজ্ঞতা তুলে ধরে লিখেছেন, প্রথম স্কোয়াডের কাছে পৌঁছতেই লেফটেন্যান্ট ব্যারেট ঘোষণা করেছিলেন, ওটা হচ্ছে মিজলস স্কোয়াড দ্বিতীয় স্কোয়াডটাকে পরিচয় করালেন হুপিং কাফ স্কোয়াড বলে, তৃতীয়টা ছিল স্কারলেট ফিভার স্কোয়াড

মধ্যপ্রাচ্যের আবহাওয়া বাঙালি সৈনিকদের জন্য সুখকর ছিল না, কিন্তু কথা ব্রিটিশরা সম্ভবত ভুলে গিয়েছিলেন যে দলটি সদ্য গঠিত, যাদের সত্যিকার অর্থে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ পর্যন্ত দেয়া হয়নি। তড়িঘড়ি প্রস্তুত করে দায়িত্বে পাঠানো একটি দলের পক্ষে যা করা সম্ভব, বাঙালি সৈনিকেরা তা করেছিল, কিন্তু প্রকৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো তো আর সম্ভব নয়। হাম, হুপিং কাশিই কেবল নয়, আরো অনেক ধরনের রোগের শিকার হয়েছিলে বাঙালিরা। এমনকি মৃত্যুও হয়েছে অনেকের। ১৯১৭ সালের ২৭ ডিসেম্বরের এক বার্তা অনুসারে দেখা যায়, একজন ভারতীয় সৈন্য সেরিব্রো মেনিনজাইটিসে ভুগে বাগদাদে আইসোলেশন হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছে। অল্প সময়ের মধ্যে দল তৈরি করে দায়িত্বে না পাঠিয়ে আরো দীর্ঘ সময় প্রশিক্ষণ দিলে বাঙালি সৈনিকদের এমন অবস্থা হয়তো হতো না।

রেজিমেন্টের বাঙালিদের কোনো অর্জন নেই এমনও নয়। সুবেদার-মেজর শৈলেন্দ্রনাথ বসু ইন্ডিয়ান ডিস্টিংগুইশড সার্ভিস মেডেল মেনশনস ইন ডিসপ্যাচেস মেডেল লাভ করেন। তিনি রসদ যোগাযোগপথের দায়িত্বে কর্মরত ছিলেন। সেনাবাহিনীতে যেমন কৃতিত্ব দেখিয়েছেন, তেমনি তিনি দেশেও কৃতী ছিলেন। ব্রিটিশ দলকে হারিয়ে মোহনবাগান প্রথম যেবার আইএফএ শিল্ড অর্জন করে, তিনি দলের উপদেষ্টা ছিলেন। জ্যেষ্ঠতার বিচারে তার পরই ছিলেন অধিক্রম মজুমদার, যিনি কলকাতা হাইকোর্টের একজন আইনজীবী ছিলেন। পরবর্তীকালের বিখ্যাত সমাজকর্মী রণদাপ্রসাদ সাহাও ৪৯ বাঙালি রেজিমেন্টের সদস্য ছিলেন। খেলাফত আন্দোলন অটোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণে মুসলমানদের অংশগ্রহণ কম থাকলেও অনেক মুসলমান যুবক রেজিমেন্টে যোগদান করেছিলেন। এদের মধ্যে ঢাকার নবাব পরিবারের খাজা হাবিবুল্লাহর নাম উল্লেখ করতে হয়। তিনি অভিজাত মুসলিম পরিবারের হয়েও সেনাবাহিনীতে যুক্ত হয়েছিলেন। এছাড়া আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কথা তো বলাই বাহুল্য। আমাদের কাছে বাঙালি পল্টন মূলত কাজী নজরুলের কারণেই অধিক পরিচিত। হাবিলদার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি তার অনেক কবিতা রচনা করেছিলেন।

ব্রিটিশদের নানা চিন্তা অবিশ্বাসের পরও বাঙালি পল্টন তাদের দায়িত্ব পালনে ত্রুটি করেনি। জাত-পাতের ভেদ-বিভেদের বাইরে তৈরি স্বতন্ত্র দলটিকে সাধারণ দায়িত্বের বাইরে সম্মুখসমরের সুযোগ দেয়া হলে হয়তো তাদের সামর্থ্যের পূর্ণ পরিচয় লক্ষ করা সম্ভব হতো। ডাবল কোম্পানি গড়ে তোলায় ব্রিটিশ কর্তাদের সিদ্ধান্তেও কিছু ভুল ছিল, যার ফলে দু-একটি অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু সবকিছুর পরও বাঙালি রেজিমেন্ট তার স্বতন্ত্রতার কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। রেজিমেন্টই প্রথম দেখিয়েছিল সেনাবাহিনীতে জাত-ধর্মের বাইরে গিয়ে শৃঙ্খলায় মনোযোগ দেয়া অধিক গুরুত্ববহ।

 

মাহমুদুর রহমান: লেখক