শনিবার | জুলাই ২৪, ২০২১ | ৯ শ্রাবণ ১৪২৮

সিল্করুট

এক হাতে তৈরি টুন্ডে কাবাব

শাকের আনোয়ার

লক্ষ্ণৌ শহরের প্রত্যেকটি বিশেষ বা আইকনিক খাবারের নেপথ্যেই একটি কৌতূহলোদ্দীপক গল্প লুকিয়ে আছে। কথাটা আশ্চর্যের হলেও সত্যি। এটাও খোলাসা করে নেয়া ভালো, লক্ষ্ণৌ খাদ্যসংস্কৃতি প্রাথমিকভাবে অভিজাত বা শাসকশ্রেণীর আকাঙ্ক্ষা চাহিদায় তৈরি হওয়া জিনিসই বটে। ক্ল্যাসিকসম ইতিহাসগ্রন্থ গুযিশতা লখনৌ বইতে আবদুল হালিম শরর যেমনটা লিখেছিলেন, লখনৌয়ে প্রথম থেকেই বড় বড় জবরদস্ত শখের বাবুর্চিখানা ছিল এবং তার ফলে প্রথম শ্রেণীর বাবুর্চিও এখানে আবির্ভূত হয়েছিল। নতুন নতুন খানার আবিষ্কার রন্ধনে বৈচিত্র্য সম্পাদন তখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল।...

অতি বিখ্যাত গোলৌটি কাবাবের কথাই ধরা যাক। তখন লক্ষ্ণৌ চতুর্থ নবাব আসফউদ্দৌলা বৃদ্ধ হয়েছেন। বয়সকালে দুই পাটি দাঁতের অবস্থাও নড়বড়ে। সহজে চিবিয়ে আগের মতো আর রকমারি কাবাব খেতে পারেন না। কিন্তু মন ঠিকই কাবারের স্বাদ নেয়ার জন্য অস্থির। অনেক ভেবে উপায় একটা বের করলেন তার রাজসিক রসুইখানার প্রধান বাবুর্চি হাজি মুহম্মদ ফখরে আলম। বাজারে লভ্য সেরা ভেড়ার মাংস এনে তা একেবারে মিহি করে বেটে নিলেন প্রথমে। তারপর সঙ্গে কাঁচা পেঁপের ক্বাথ, নারকেলের মিহি কুচি মরিচ-আদা-রসুন-এলাচ-পোস্ত-দারুচিনির মিশ্রণে তৈরি হলো কাবাবের বেস আর শক্ত হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় কাঠ-কয়লা বা তন্দুরে নয়, কাবাব সেঁকা হলো তপ্ত তাওয়ায় ঘিয়ের ওপর ঢিমা আঁচে। মুখে দিলেই যাতে উধাও হয়ে যায় থুড়ি গলে যায় মুহূর্তে তাই এর নাম রাখা হলো গোলৌটি, যে শব্দের আক্ষরিক অর্থ মিহি বা নরম নবাব যখন গোলৌটি কাবাব প্রথমবারের মতো আস্বাদন করলেন, তখন মুগ্ধতা রসনাতৃপ্তির আনন্দে রীতিমতো তিনি আত্মহারা হয়েছিলেন। যেন মুখে দিলেই গলে যায়। চিবানোর পরিশ্রমটুকুও করতে হয় না! অগত্যা, এর পর থেকেই লক্ষ্ণৌ নবাবি রসনায় গোলৌটি কাবাব স্থায়ী আসন তো করে নিলইপরে তার জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ল সাধারণ মানুষের মধ্যেও।

গোলৌটি কাবাবের জাতভাই আরেকটি আছে, নাম তার টুন্ডে কাবাব। সময়টা উনিশ শতকের শেষ দিকে, লক্ষ্ণৌ নবাবিয়ানা অস্ত গেলেও তার খাবারের জৌলুস কমেনি। শহরের তরুণ অথচ রীতিমতো দক্ষ এক বাবুর্চি হাজি মুরাদ আলী গোলৌটি কাবাব বানানোর জন্য ছাদে বসে ভেড়ার মাংস বাটতে গিয়ে হঠাৎ পড়ে গিয়ে নিজের এক হাত ভেঙে ফেলেন। সেই হাত আর জোড়া লাগেনি। কিন্তু তার মনের জোর ছিল সাংঘাতিক। এক হাত দিয়েই তিনি ভেড়ার মাংসের জায়গায় মহিষের মাংস ১৫০ রকম মসলা মিশিয়ে এক বিশেষ ধরনের কাবাব তৈরি করে ফেলেন পরে, যা কিনা মুখে দিলে গোলৌটির মতোই গলে যায়, কিন্তু স্বাদে-গন্ধে একেবারে আলাদা। উর্দুতে এক হাতবিহীন ব্যক্তিকে বলা হয় টুন্ডে এক হাত নিয়েই যে নতুন কাবাব তৈরিতে মুরাদ আলী রীতিমতো জাদু দেখিয়েছিলেন, তার নাম তাই মুখে মুখে হয়ে দাঁড়ায় টুন্ডে কাবাব। পরে ১৯০৫ সালে লক্ষ্ণৌ শহরে নামেই নিজে কাবাবের দোকান দিয়েছিলেন মুরাদ, যা কিনা এখনো সগৌরবে কাবাবপ্রেমীদের তৃপ্ত করে যাচ্ছে।


লক্ষ্ণৌ রসনার আরেক বৈশিষ্ট্য পোলাওপ্রীতি। না, বিরিয়ানি নয়। লক্ষ্ণৌ খাদ্যপ্রেমীরা বরাবরই পোলাওকে বিরিয়ানির বহু উপরে স্থান দিয়ে এসেছেন। লক্ষ্ণৌ-রসনায় নিখুঁত পোলাও রান্না করতে পারা বাবুর্চিরা বিশেষ কদর বরাবরই পেতেন। বিরিয়ানিকে সেখানে মনে করা হতো, অধিক সন্ন্যাসীতে গাঁজন নষ্ট কিসিমের একটা ঘটনা বহু রকম মসলা উপাদান মিশিয়ে যাকে মলগোবা বা ঘ্যাঁটের মতো করে তোলা হয়। অন্যদিকে পোলাও বহিরঙ্গে সাদাসিধে, কিন্তু অন্তরঙ্গে তার মতো সুস্বাদু সুন্দর চালের পদ কমই আছে। আর পোলাওয়েরই বা কত বাহার ছিল লক্ষ্ণৌতে! আবদুল হালিম শরর লিখেছেন তার স্মৃতিতে থাকা পাঁচ রকমের পোলাওয়ের কথা গুলজার পোলাও, মোতি পোলাও, কোকো পোলাও, নূর পোলাও চম্বেলি পোলাও। তবে কেবল তার স্মৃতি খুঁড়ে আনা খণ্ডিত তথ্যমাত্র, প্রকৃতপক্ষে তখন লক্ষ্ণৌতে নাকি ৭০ রকমের আলাদা আলাদা পোলাও তৈরি হতো! পোলাও ভক্ষণে নবাবদের আগ্রহ-উদ্দীপনা দেখে বাবুর্চিরাও তখন ভারি তত্পর হয়েছিলেন নতুন নতুন কিসিমের উদ্ভাবনে। এক বাবুর্চি উদ্ভাবন করেছিলেন আনারদানা পোলাওয়ের। যার প্রত্যেকটি চালের অর্ধেক লাল, অর্ধেক সাদা দেখে মনে হতো যেন রত্নপাথর। আরেকজন তৈরি করেছিলেন নবরত্ন পোলাওনয় রঙের চাল মিশিয়ে তৈরি এক আক্ষরিক অর্থেই ঝলমলে পদ। শহরের আবুল কাসেম খান নামের এক অভিজাত ব্যক্তির বাড়িতে আবার তৈরি হতো ভারি পোলাও তার জন্য প্রথমে ৩৪ কেজি মাংস পানিতে ফুটিয়ে তার থেকে ইয়াখনি বা সুরুয়া বের করে নিতে হতো! তারপর সেই মাংসের সুরুয়ায় উত্তম মানের সরু চাল দমে সেদ্ধ করে তৈরি হতো ভারি সুস্বাদু পোলাও। নামে ভারি হলে কী হবে, তা নাকি মুখে দিলে নিমিষে উধাও হয়ে যেত। আর স্বাদের কথা তো ছেড়েই দিলাম।


আর ছিল রুটি বা পরোটার রমরমা। এককালে লক্ষ্ণৌবাসী অওধের বাদশাহ গাজীউদ্দিন হায়দার খানের পরোটা খাবার গল্প এখানে না করলে ভুল হবে। তিনি প্রতি সকালে ছয়টা করে পরোটা খেতেন। এই অব্দি ঘটনা খুব সাদামাটা, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো প্রত্যেকটি পরোটা ভাজা হতো পাঁচ কেজি ঘিতে! মানে প্রতিদিন মোটমাট ৩০ কেজি ঘিয়ের কারবার। দেখে একদিন রসুইখানার হেড বাবুর্চি আগা মীরকে ডেকে দরবারের প্রধান উজির বললেন, পরোটা পিছু যেন এক কেজির বেশি ঘি খরচ না করা হয়। এমনিতেই রাজকোষের দশা বাড়ন্ত। বাবুর্চি বড় উজিরের হুকুম তলব করলেন ঠিকই, কিন্তু পরে দেখা গেল কীওই এক কেজি ঘিয়ে ভাজা পরোটা বাদশাহর পেটে হজম হচ্ছে না। অগত্যা সেই আগের ব্যবস্থায় ফিরে যেতে হলো।

সবজি, মিঠাই বা মাছের পদের বেলাতেও লক্ষ্ণৌ অভিজাতরা মুখ ফিরিয়ে রাখতেন না। মছলি-মুসল্লমের কথা খুব একটা অপরিচিত তো নয়। আবার স্রেফ কাঁচা কুমড়ো দিয়ে তৈরি ঝাল তরকারি বা আমের মোরব্বালক্ষ্ণৌ রসুই কারিগররা ছিলেন সবজির সব রকম পদ রান্নাতেই দক্ষ। ভুট্টার তৈরি রায়তা বা বিশেষ প্রক্রিয়ার তৈরি সুলতানি ডালের কথা শুনলেই বোঝা যায় যে লক্ষ্ণৌ রসনায় একতরফাভাবে শুধু আমিষই রাজত্ব করে না। মিঠাইয়ের মধ্যে জলেবি, ইমরতি বালুশাহী ছিল বিশেষ জনপ্রিয়। অবশ্য এই কয়টি পদ আদি অকৃত্রিমরূপে লক্ষ্ণৌ রসনার অংশ নয়। বাঙালির চেনা জিলিপি, অমৃতি বালুসাঁই মিষ্টি এখানে এসে মডিফাই হয়ে গেছে আরকি।

তবে সবসময় যে লক্ষ্ণৌ নবাবদের কথা শুনেই বাবুর্চিদের চলতে হতো, তা নয়। কখনো-সখনো রান্না খাওয়ার ব্যাপারে বাবুর্চিরাই শেষ কথা বলতেন। প্রসঙ্গে নবাব আফসউদৌলার সময়কার একটি প্রচলিত গল্প দিয়ে নিবন্ধ শেষ করা যাক। একবার এক বাবুর্চি এসে নবাবকে বলল, আমি গোটা মাষকলাই রান্না করি। নবাব তাকে কী মনে করে নিয়োগ দিলেন। অবশ্য সেই বাবুর্চির হাতের ডাল রান্নাও ছিল অপূর্ব। তবে সে একটা শর্ত জুড়ে দিয়েছিল, তা হলো—‘নবাবের যখন আমার হাতের ডাল খাবার ইচ্ছা হবে, একদিন আগে হুকুম দিতে হবে। তৈরি হয়েছে বলে যখন খবর দেব, তখনই এসে খেয়ে নিতে হবে। এভাবেই চলছিল। কিন্তু একদিন হলো কী, নবাব হুকুম দিয়েও সময়মতো ডাল খেতে এলেন না। পরপর তিনবার খবর দেয়ার পরও যখন তিনি এলেন না, তখন সেই বাবুর্চি ডালের হাঁড়ি নিয়ে একটা প্রায় মরা গাছের গোড়ায় পুরোটা ফেলে দিয়ে দরবার ছেড়ে চলে গেল। আর ফিরলও না। এমন দক্ষ বাবুর্চি, হোক না মাত্র একটি পদই রান্না করেতাকে হারিয়ে তো নবাবের মন খারাপ। অনেক খোঁজখবর করেও তার সন্ধান আর মিলল না। সপ্তাহখানেক পর দেখা গেল এক আজব ঘটনা, বিদায়ী বাবুর্চি যে মরা গাছের গোড়ায় ডাল ফেলে গিয়েছিলতা রীতিমতো নতুন করে জেগে উঠেছে। জীর্ণ দশা আর নেই, উল্টো ফলে-ফুলে ভরা।

 

শাকের আনোয়ার: প্রাবন্ধিক