রবিবার | জুন ২০, ২০২১ | ৬ আষাঢ় ১৪২৮

সিল্করুট

শত বছরের নিপীড়িত এক জাতিসত্তা

রুহিনা ফেরদৌস

বেলুচিস্তানের কোয়েটায় ২০২১ সালের শুরুটাই হয়েছিল সংখ্যালঘু হাজারা সম্প্রদায়ের লোকদের রক্ত ঝরার মধ্য দিয়ে। ঘটনাটি ঘটে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই, তারিখে। সেদিন কোয়েটা থেকে ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমের পাহাড়ি এলাকার কয়লাখনির ১১ শ্রমিককে হত্যা করা হয়। যাদের প্রত্যেকেই শিয়া মতাবলম্বী হাজারা সম্প্রদায়ের। হত্যার দায় স্বীকার করে ইসলামিক স্টেট (আইএস)

কয়েক মাসের ব্যবধানে কখনো সপ্তাহান্তে পুনরাবৃত্তি ঘটে ধরনের নির্মমতার। ২০০৩ সালে যেমন বেলুচিস্তানের রাজধানীর অর্থাৎ কোয়েটার একটি মসজিদে শুক্রবারের জুমা নামাজে জড়ো হওয়া হাজারাদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। এখানেই ঘটনার শেষ হয় না। উগ্রপন্থী আততায়ীদের একজন শরীরে লুকানো বিস্ফোরকে নিজেকে উড়িয়ে দিলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে শিশু-কিশোরসহ নামাজরত ৫৮ জন হাজারা। আহত হয় দুই শতাধিক। তেমন ২০০৪ সালে পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার আশ্বাস দেয়া হলে কোয়েটার হাজারারা আশুরার তাজিয়া মিছিল নিয়ে বের হয়। তবে সে নিরাপত্তার বেড়াজাল ভেদ করে আততায়ী বোমা নিয়ে পৌঁছে যায়। মিছিলে হামলায় নিহত হয় ৪০ জন, আহত শতাধিক।

২০১৩ সালের জানুয়ারি। কোয়েটার আলমদার সড়কে হাজারাদের লক্ষ্য করে উগ্রপন্থীরা আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ ঘটালে কমপক্ষে ৮০ জন তত্ক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করে। গুরুতর আহতের সংখ্যা ১২০। উদ্ধারকর্মীরা যখন আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করছিল তখনই দ্বিতীয় দফায় আরেকবার শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে। ন্যক্কারজনক সে হামলার দায় স্বীকার করে পাকিস্তানের নিষিদ্ধঘোষিত চরমপন্থী দল লস্কর- জাংভি (এলইজে) পুলিশ সদস্যরাও সেদিন লাশের মিছিল থেকে বাদ যায়নি

২০১৯ সালের এপ্রিলে শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণে কমপক্ষে ২০ জন হাজারা মারা যায়। হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হয় কমপক্ষে ৪৮ জন। হামলায় দায় স্বীকার করে আইসিসের মুখপাত্র যথারীতি বিবৃতি দেয়।

কিছুদিন পর পর বেলুচিস্তানের সংখ্যালঘু হাজারা সম্প্রদায়কে এভাবেই লক্ষ্যবস্তু করা হয়। পাকিস্তানে এর শুরুটা হয়েছিল ১৯৯৯ সালে। কোয়েটাতে হাজারা সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তি বেলুচিস্তানের তত্কালীন শিক্ষামন্ত্রী সরদার নিসার আলির ওপর অজ্ঞাত পরিচয় বন্দুকধারীদের অতর্কিত হামলার মাধ্যমে। তিনি কোনো রকমে প্রাণে বেঁচে গেলে তার গাড়ির চালক নিহত হন।

১৯৯৯ থেকে ২০২১, প্রায় প্রতি বছরই চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর হামলার শিকার হচ্ছে হাজারারা। এর মধ্যে ২০০৯ সালে কমপক্ষে ১১ বার, ২০১১ সালে নয়বার ২০১২ সালে ১৮ বার হামলা চালানো হয়েছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়টির ওপর।

কারা হাজারা জনগোষ্ঠী? উত্তরটা পেতে হলে খানিকটা পেছনে তাকাতে হবে। ফারসিভাষী মূলত শিয়া মতাবলম্বী ক্ষুদ্র এথনিক জাতিগোষ্ঠীটি মধ্য আফগানিস্তানের হাজারাজাত পার্বত্য অঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দা। মোগল সম্রাট বাবর তার আত্মজীবনী বাবরনামাতে আফগানিস্তানের হাজারিস্তান এবং ১৫০৫ সালে পঞ্জশির উপত্যকায় হাজারাদের তুর্কি আদিবাসীদের সঙ্গে যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেছেন। যদিও হাজারা জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক উৎস সম্পর্কে বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত আছে। যুক্তরাষ্ট্রের পোর্টল্যান্ড ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশিয়া এবং আফগানিস্তান বিষয়ক গবেষক প্রফেসর গ্রান্ট ফার মনে করেন, হাজারা জনগোষ্ঠী মূলত ১৩ শতকের (বর্তমানের আফগানিস্তানের) মঙ্গল বংশের অবশিষ্ট সদস্য। হাজারাদের পূর্বপুরুষরা চেঙ্গিস খানের ছেলে চাগাতাইয়ের সৈনিক ছিল। চাগাতাই ত্রয়োদশ শতাব্দীতে চেঙ্গিস খানের কাছ থেকে অঞ্চল শাসনকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পান। হাজারাদের মুখের আদলেও মধ্য এশিয়ার মোঙ্গলীয় প্রভাব প্রকটভাবে লক্ষ্যনীয়। তাছাড়া মুখের উঁচু হাড় ছোট চোখের কারণে তাদের অন্য নৃগোষ্ঠীদের থেকেও খুব সহজে আলাদা করে চেনা যায়। অন্য একটি গবেষণাতে দেখা যায়, দুই-তৃতীয়াংশ হাজারা পুরুষ চেঙ্গিস খানের ওয়াই ক্রমোজোম বহন করে। কিছু গবেষক অবশ্য এমনটাও মনে করেন যে হাজারা জনগোষ্ঠী তুর্কি আর মোঙ্গলদের মিশেলে সৃষ্টি, কিন্তু তাদের শারীরিক অবয়বে মোঙ্গল প্রভাবের আধিক্য বেশি। হাজারা নামটা এসেছে মোঙ্গলদের একটা যোদ্ধা দলের এক হাজার সেনা নিয়ে গঠিত বাহিনীর নামানুসারে।

তবে এখন হাজারা বলতে পাহাড়ি ক্ষুদ্র সম্প্রদায়টিকেই বোঝায়। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে হাজারা জাতির পূর্বপুরুষ হিসেবে গণ্য করা হয় তুর্কি মোঙ্গলদেরই। মুখের গড়ন শুধু নয় তাদরে ভাষা সংস্কৃতি মোঙ্গলীয় মধ্য এশিয়ার তুর্কি জাতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। কোনো কোনো গবেষক আবার এটাও মনে করেন যে ইলখানাত তিমুরিদ জাতির সঙ্গে মধ্য এশিয়া থেকে অন্য মোঙ্গোলদের মতো চাগতাই মোঙ্গলের একটি দল হাজারাজাত অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে মিলিত হতে একটি স্বতন্ত্র গোষ্ঠী গঠন করে।

সম্রাট বাবরের বইয়ে হাজারাদের প্রথম উল্লেখের কথা আগেই বলেছি। পারস্যের সাফাভি রাজবংশের বাদশাহ আব্বাসের দরবারের ইতিহাসবিদরাও জনগোষ্ঠীটির কথা বলে গেছেন। সাফাভি রাজবংশ শিয়া মতবাদকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। সময়টা মূলত মুসলিম ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কালপর্ব হিসেবে বিবেচিত। ধারণা করা হয় সাফাভিদের শাসনামলে ষোল শতাব্দীর শেষ কিংবা সতের শতাব্দীর শুরুতে হাজারারা শিয়া মতাদর্শ গ্রহণ করে।

তবে ১৯ শতকের শেষ সময় থেকেই হাজারারা ধর্মীয় এবং জাতিগতভাবে নির্মূলের শিকার হয়ে আসছে। ইতিহাসবিদদের মধ্যে কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন, আফগান আমীর আবদুর রহমান খান তার (১৮৮০-১৯০১) শাসনামলে অর্ধেক হাজারা জনগোষ্ঠীকেই নিশ্চিহ্ন করে গেছেন। ১৮৮০ সালে দ্বিতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ শেষে আবদুর রহমান হাজারাজাত অঞ্চলকে নিজের অধীনে আনার সিদ্ধান্ত নেন। স্থানীয় হাজারারা বাধা প্রদান করলে সেনারা তাদের ওপর ব্যাপক নৃশংসতা চালায়। পরবর্তী সময়ে হাজারারা বিদ্রোহ করলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন তিনি। সে যুদ্ধে হাজারা জনগোষ্ঠীর প্রায় ৬০ শতাংশই মারা যায়। আর বাকিরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ১৮৯০ সালের শুরুতে আফগান শাসকের নির্মমতার হাত থেকে বাঁচতে হাজারারা দলে দলে প্রতিবেশী ইরান তত্কালীন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার (বর্তমানের পাকিস্তান) কোয়েটায় আশ্রয় নিতে থাকে। তবে বেশির ভাগ হাজারাই আশ্রয় নেয় পাকিস্তানের কোয়েটায়।

হাজারাদের যে অংশটি আফগানিস্তানে থেকে যায়, পরবর্তী তারাও স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। একসময় তালেবানরা দেশটির দখল নিলে তারা এবং তাদের সহযোগী আল-কায়েদা হাজারাদের ধর্মদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করে। তালেবান হাজারাদের মাঝে সংঘাত চরমে পৌঁছায় ১৯৯৭ সালের মাঝামাঝি, যখন মাজার--শরিফের হাজারা যোদ্ধারা অস্ত্র ত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তালেবানকে পাল্টা জবাব দেয়। তালেবানদের বিরুদ্ধে হাজারারা রীতিমতো বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ১৫ ঘণ্টার তুমুল লড়াইয়ে ৬০০ তালেবান জঙ্গি নিহত হয়। যুদ্ধ থেকে পালানোর সময় বিমানবন্দর থেকে আরো হাজারখানেক তালেবান ধরা পড়ে। হাজারা বিদ্রোহীরা তালেবানের কাছ থেকে আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চল কাবুলের আশপাশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।

পরের বছরই তালেবানরা দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে প্রতিশোধ নিতে আসে এবং মাজার--শরিফ পুনর্দখল করে। হাজারা হত্যার উৎসব শুরু হয় যেন। খুঁজে খুঁজে নন-পশতুন অধিবাসী বিশেষ করে হাজারাদের পেলে সঙ্গে সঙ্গে গুলি করতে শুরু করে তারা। জাতিসংঘ ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেডক্রসের হিসেবমতে, দুদিন ধরে চলমান গণহত্যায় পাঁচ-ছয় হাজারাকে হত্যা করা হয় তখন।

যদিও তলেবান বা আফগান জিহাদের আগে থেকেই আফগানিস্তানে হাজারা বিরোধী ঘৃণার প্রচলন ছিল তাদের ধর্ম বিশ্বাস এবং নৃতাত্ত্বিক উেস কারণে। ১৮৯০ সাল থেকেই সেখানে হাজারারা জাতিগত ঘৃণা এবং ধর্মীয় বৈপরীত্যের বলি হয়ে আসছে। তাই ১৯৯০ সালের রক্তক্ষয়ী আফগান গৃহযুদ্ধের সময় জাতিগত ঘৃণার আগুন দাবানলে পরিণত হতে সময় লাগে না।

এদিকে পাকিস্তানের কোয়েটায় হাজারারা সেই বিশ শতক থেকে অনেকটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করে এলেও আফগান যুদ্ধের প্রভাব উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর রোষানল থেকে মুক্তি মেলে না। বেলুচিস্তানেও তাদের ওপর শুরু হয় হত্যা, নিপীড়ন, গুম আর সন্ত্রাসী আক্রমণ। যার শুরুটা ১৯৯৯ সালে সরদার নিসার আলিকে অতর্কিত হামলার মাধ্যমে। আফগানিস্তান ফেরত জঙ্গিরাই নতুন উদ্যমে কোয়েটার হাজারাদের ওপর হামলা শুরু করে। লস্কর--জাংভির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা প্রদান করা হয় যে তারা পাকিস্তানের আনাচে-কানাচে থাকা প্রত্যেক হাজারাকে হত্যা করতে চায়, ঠিক যেভাবে তারা আফগানিস্তানে তাদের ভাইদের হত্যা করেছিল।

ধর্মের দিক থেকে হাজারারা প্রধানত শিয়া মুসলিম। এদিকে পাকিস্তান আফগানিস্তান সুন্নি প্রধান। বহুকালের শিয়া-সুন্নি বিরোধের স্ফুলিঙ্গ নেভেনি এখানে। তাছাড়া হাজারাদের মুখের গড়ন মধ্য এশিয়ার হওয়ার কারণে বেলুচিস্তানের অন্য জনগোষ্ঠীদের থেকে এদের সহজেই আলাদা করা যায়। ফলে চেহারা দিয়ে নিশানায় পরিণত করাও সহজ তাদের।

এদিকে তালেবানদের উত্থানের আগে থেকেই আফগান আইনের কারণে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত হাজারারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বা রাষ্ট্রীয় বড় কোনো পদেও অধিষ্ঠিত হতে পারেনি। তালেবানের শাসনামলে সে বৈষম্যমূলক আইনগুলো যেমন বলবৎ ছিল, তেমনি পীড়নের মাত্রাও বেড়েছিল কয়েক গুণ। অপহরণ, হত্যা আর ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে গোষ্ঠীর লোকদের কেবলই কোণঠাসা করে দেয়া হয়েছে।

১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত হাজারাদের ওপর কমপক্ষে তিনটি নথিভুক্ত গণহত্যা পরিচালনার রেকর্ড আছে তালেবানদের বিরুদ্ধে। ১৯৯৮ সালের আগস্টের মাজার--শরিফ ঘটনা যেমন। তালেবানরা মাজার--শরিফ শহরে কমপক্ষে দুই হাজার বেসামরিক মানুষকে হত্যা করে, যাদের বেশির ভাগই হাজারা সম্প্রদায়ের। এর দুই বছর পর তালেবান রোবাটাক পাস এলাকায় আরো কয়েক ডজন হাজারাকে হত্যা করে। ২০০১ সালের জানুয়ারিতে বামিয়ান প্রদেশের ইয়াকোলং জেলায় হাজারাদের বিরুদ্ধে আরো একটি গণহত্যা চালানো হয়।

২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক তালেবান সরকার উত্খাত পরবর্তী সময়ে সাময়িকভাবে হাজারাদের নিরাপত্তা বাড়লেও কিছুদিনের মধ্যেই তালেবানরা আবার শক্তিশালী হয়ে ওঠে। নতুন জঙ্গি দলের আগমন ঘটে। ফলে নতুন দফায় নির্যাতন নেমে আসে হাজারাদের ওপর।

আফগানিস্তানে যেমন হাজারারা শুধু তালেবানদের সহিংসতায় পড়েনি, স্থানীয় প্রভাবশালী জাতিগোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকেও বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়েছে। তেমনি পাকিস্তান সরকারও তাদের শতভাগ নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। পাকিস্তানে প্রায় দুই দশক ধরে তারা হত্যা, নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। কোয়েটা শহরের আশপাশেই তাদের নিয়ে একের পর এক হত্যাযজ্ঞ সম্পন্ন হয়েছে। মৃত্যুর তালিকায় আছে পরিণত বয়স্ক নারী-পুরুষ থেকে শুরু করে ছোট শিশু-কিশোরও। নিত্য পীড়ন থেকে বাঁচতে হাজার হাজার হাজারা পাকিস্তান ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমিয়েছে। যদিও প্রক্রিয়াটিও সহজ নয়। অনেকে ধরা পড়ে। ফিরে আসতে বাধ্য হয়। তবু জীবন বদলের আশায় তারা পাকিস্তান-আফগানিস্তান-ইরান ছাড়তে চান। ২০১৭ সালে তথ্য প্রকাশিত হয় যে প্রায় ৭০ হাজার হাজারা পাকিস্তান থেকে পালিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয় নিয়েছে।

চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ক্রমাগত আক্রমণের কারণে পাকিস্তান সরকার কোয়েটা শহরের উপকণ্ঠে পূর্ব পশ্চিম প্রান্তে দুটি আলাদা জায়গা বানিয়ে তাদের নিরাপত্তা দেয়ার চেষ্টা করলেও তা খুব একটা কার্যকর হয়নি। হাজারাদের চলাচল সীমিত করে দেয়া হয়েছে। হাজারাদের থাকার জায়গাগুলোর প্রবেশপথে বসানো আছে নিরাপত্তারক্ষী। তবে এভাবে সম্প্রদায়ের মানুষেরা আরো বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আগে কোয়েটা শহরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হওয়ার পরেও তারা দ্রুত সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে নিজেদের গুছিয়ে নিতে সক্ষম ছিল। কিন্তু এখন তাদের চলাচল সীমাবদ্ধ করে দেয়ার কারণে সম্প্রদায়টির অর্থনীতিও ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। সামান্য কিছু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যা তারা করতে পারত তাও নিরাপত্তার ঘেরাটোপে বন্দি। তাই হাজারারা মনে করে পাকিস্তান ছেড়ে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া বা অন্য কোনো দেশে উদ্বাস্তু হয়ে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই।

অভিযোগ আছে, হাজারাদের জন্য পৃথক বাসস্থান আর কিছু ব্যক্তির নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করলেও সমস্যার মূলে কখনো হাত দেয়নি পাকিস্তান প্রশাসন। জঙ্গিদের তত্পরতা নির্মূল করতে কোনো বাস্তবিক পদক্ষেপ না থাকার কারণে তারা কোয়েটা প্রদেশে নির্বিঘ্নে তাদের অভিযান জারি রেখেছে।

জনগোষ্ঠীর লোকেরা বেশ সংস্কৃতিমনা। ধর্মীয় গোঁড়ামিমুক্ত। হাজারারা তাদের সংগীত কবিতার জন্যও বিখ্যাত। শিক্ষিত সম্প্রদায় হিসেবেও পরিচিত নারী-পুরুষের সমান অধিকারে বিশ্বাসী হাজারারা ছেলে মেয়ে শিশুদের শিক্ষার বেলাও পার্থক্য করে না। কিন্তু ধর্মীয় আচার রীতি রেওয়াজের পার্থক্যের কারণে আফগানিস্তান পাকিস্তান উভয় দেশেই হাজারা সম্প্রদায় বিভিন্ন জঙ্গি দল যেমন তালেবান, আল-কায়েদা, লস্কর--জাংভি কিংবা দায়েশ মূল লক্ষ্যবস্তু এখনো।

ধারণা করা হয় বিশ্বজুড়ে বর্তমানে ৩০ লাখের বেশি হাজারা জনগোষ্ঠী রয়েছে। আর একটি হিসাবমতে সংখ্যাটি ৪৭ লাখের কাছাকাছি। যাদের বেশির ভাগের বসবাস আফগানিস্তান, পাকিস্তান ইরানে। ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা আর আমেরিকাতেও উদ্বাস্তু হয়ে পাড়ি জমিয়েছে তারা। এদিকে জাতিসংঘের ২০১৫ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানে লাখ ৫১ হাজার আফগান উদ্বাস্তুর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হাজারা জনগোষ্ঠীর লোক রয়েছে। পাকিস্তানের কোয়েটাতেই আছে পাঁচ লাখের বেশি। আর দেশটির অন্যান্য অঞ্চল মিলিয়ে ১০ লাখের কাছাকাছি। সুইডেনের অভিবাসী সংস্থা পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান প্রকাশ না করলেও জানায় যে আফগানিস্তান থেকে ২০১৫ সালে যত অভিবাসী সুইডেনে প্রবেশ করেছে তাদের ৭০ শতাংশই হাজারা। পাকিস্তানের মতো ইরানেও যে হাজারারা বসবাস করছে তাদের কোনো আইনি সনদ নেই। তাছাড়া চেহারার স্বতন্ত্রতার কারণে ইরানের অন্য অধিবাসীদের থেকে তাদের সহজে আলাদা করা যায়। তাই এখানেও আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর লোকেদের কাছে যেমন পীড়নের শিকার হতে হয়, তেমনি নিয়ত পালিয়ে বেড়াতেও হয় হাজারাদের।

তথ্যসূত্র: দ্য ডন, গার্ডিয়ান, রয়টার্স আন্ডারস্টান্ডিং দি অ্যাগোনিস অব এথনিক হাজারাস শীর্ষক গবেষণাপত্র

 

রুহিনা ফেরদৌস: সাংবাদিক লেখক