রবিবার | জুন ২০, ২০২১ | ৬ আষাঢ় ১৪২৮

সিল্করুট

হাজারা

এম এ মোমেন

ষোড়শ শতাব্দীতে মোগল সম্রাট বাবর হাজারিস্তান নামে যে আফগান পরগনার উল্লেখ করেছেন, তা কাবুলিস্তানের পশ্চিমে, থোরের পূর্বে এবং গজনির উত্তরে অবস্থিত! হাজারিস্তান বা হাজারেস্তানের দুই হাজার বছরের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পার্বত্য জনপদ ১৮৮২-এর আগে পুরোপুরি স্বাধীন ছিল। জনপদের বাসিন্দারা হাজারা।

ব্রিটিশ শাসক ব্রিটিশ বাহিনীর সমর্থন নিয়ে আফগান আমির আবদুর রহমান এখানে আক্রমণ চালায় এবং দখল করে নেয়। ফৈজ মোহাম্মদ কাতিবের গ্রন্থ সিরাজ আল তাওয়ারিখ- উল্লেখ করা হয়েছে, ১৮৮০-৯১ আমির আবদুর রহমানের শাসনামলে হাজারাদের গণহত্যার অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। মূলত তখন থেকেই হাজারা জাতিগোষ্ঠীর এথনিক ক্লিনজিং শুরু। আমির আবদুর রহমান হাজারিদের মাথার খুলি দিয়ে মিনার বা টাওয়ার বানানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়।

হাজারা ঐতিহাসিক আসকার মুসাভি লিখেছেন:

কাবুল কান্দাহারের বাজারে হাজার হাজার পুরুষ, নারী শিশু ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করা হয়েছে। আমিরের আদেশ অগ্রাহ্য করতে কেউ যেন সাহসী না হয়, সেজন্য তাদের সদা সতর্ক রাখতে নিহত হাজারাদের করোটি দিয়ে বহুসংখ্যক মিনার তৈরি করে রাখা হয়েছিল।

হাজারা জনগোষ্ঠী বৃহৎ অর্থে ফার্সিভাষী শিয়া মুসলমান সম্প্রদায়, তাদের ব্যবহূত ভাষা হাজারাগি আফগান রাষ্ট্রভাষা ফার্সি দারির মাঝামাঝি একটি ভাষা, যাতে উভয় ভাষার মানুষের সঙ্গে কথোপকথন চালিয়ে যাওয়া যায়। আফগানিস্তানের কাছাকাছি হাজারাদের বড় আরেকটি আবাসস্থল হচ্ছে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের কোয়েটা।

হাজারাদের ওপর পরিকল্পিত নির্যাতন অব্যাহত থাকে। তারা জীবন বাঁচাতে এবং জীবিকার সন্ধানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিতে শুরু করে। আফগানিস্তানে হাজারা সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা প্রায় ৪২ লাখ, পাকিস্তানে নয় লাখ, ইরানে পাঁচ লাখ, ইউরোপে দেড় লাখ, অস্ট্রেলিয়ায় দুই লাখ কানাডায় ১০ হাজারের বেশি। এখনকার প্রবণতা অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, সুইডেন, ডেনমার্ক নরওয়েতে আবাস স্থাপন।

ইন্দোনেশিয়ায় সাড়ে তিন হাজার হাজারা রয়েছে। তারাও অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় আছে। ইন্দোনেশিয়া থেকে অস্ট্রেলিয়াসমুদ্রপথে এক হাজারের বেশি হাজারা যুবক, নারী শিশু।

ষোড়শ শতাব্দীর শুরু থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত হাজারা জনগণ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং শিয়া তরিকাভুক্ত হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে আহমদ শাহ আবদালি (দুররানি বংশের স্থপতি) বিপুলসংখ্যক হাজারাকে তার সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করলে সৈনিক হিসেবে তারা বেশ সাহসিকতার পরিচয় দেয়।

ঊনবিংশ শতাব্দীদে দোস্ত মোহাম্মদ খানের রাজত্বকালে তাদের ওপর কর ধার্য করা হয়। হাজারেস্তানের একটি অংশ তখনো সার্বভৌমত্ব বজায় রেখেছিল। আমির আবদুর রহমান খানের সময় ধ্বংসাত্মক সেনা অভিযান হাজারা জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ নিহত বাস্তুচ্যুত হয়। দক্ষিণাঞ্চলের হাজারারা আফগান শাসন মেনে নেয় এবং উত্তরের সঙ্গে তাদের আন্তঃহাজারা বিরোধ শুরু হয়। সময় হাজারা বিদ্রোহ হয়। শেখ আলী হাজারা সম্প্রদায়ের নেতা সৈয়দ জাফরকে মাজার--শরিফে বন্দি করে রাখে। ১৯০৯ সালে আফগান বাদশাহ সাধারণ ক্ষমায় কারাবন্দি সব হাজারাকে মুক্তি দেন। কিন্তু হাজারা শোষণ অব্যাহত থাকে। ১৯৩৩ সালে বাদশাহ মোহাম্মদ নাদির খান আবদুল খালিক হাজারার হাতে নিহত হলে বিশ্বাস সৃষ্টির সুযোগগুলো বন্ধ হয়ে যায়। আবদুল খালিকের সঙ্গে তার পরিবারের কিছুসংখ্যক নিরপরাধ মানুষকেও ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।

১৯৪৫-৪৬ সালে বাদশাহ জহির শাহর সময় হাজারাদের ওপর বিশেষ করারোপ করা হয় এবং তা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা অব্যাহত থাকলে হাজারা বিদ্রোহীরা বেশ কজন সরকারি কর্মকর্তাকে অপহরণ হত্যা করে।

১৯৯৫ থেকে আফগানিস্তান তালেবানি শাসনে চলে এলে মূলত তালেবানদের হাতে তাদের জীবনে আরো লাঞ্ছনা নেমে আসে। বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক সমীকরণে সুলতান আলী কাস্তমান্দ ১৯৮১-৯০ পর্যন্ত আফগানিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯২ সালে পশতুনদের হাতে দুজন হাজারা নিহত হলে একজন হাজারা পুলিশ কমান্ডার নয়জন বেসামরিক পশতুনকে গুলি করে হত্যা করলে হাজারাবিরোধী আবেগ তুঙ্গে ওঠে। কয়েক দফা শান্তি চুক্তি করা হলেও বাস্তবে এর তেমন প্রতিফলন ঘটেনি। হামিদ কারজাই আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর জনসংখ্যানুপাতে মন্ত্রিত্ব প্রদান এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির উদ্যোগ অনেকটাই সুফল বয়ে আনে।

কিন্তু তার পরও সাম্প্রদায়িক বিরোধ (শিয়া-সুন্নি) তুচ্ছ কারণেই শুরু হয়ে যায়। পুরনো ক্ষত প্রজ্বলিত হয়ে ওঠে এবং উভয় পক্ষই প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে। শিয়া-সুন্নি বিরোধ ছাড়াও আরো একটি বিষয় হালে আলোচিত হচ্ছে। তা হলো হাজারাদের মোঙ্গলয়েড উত্তরাধিকার। তারা দেখতে পশতুনদের মতো নয়, চীনাদের মতো বলে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে।


কিছু কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য

মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র রাষ্ট্র পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনে হাজারাদের বিশেষ সমর্থন ছিল। বেলুচিস্তানের প্রথম ব্যারিস্টার কাজী মোহাম্মদ ইসা হাজারা গোত্রের। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সঙ্গে তার বিলাতের ছাত্রজীবনে পরিচয়। দেশে ফিরে তিনি নিজ প্রদেশে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করেন।

.   আফগানিস্তান যখন সোভিয়েত দখলে চলে যায় তখন শহরাঞ্চলের আধুনিক শিক্ষিত হাজারা সম্প্রদায় ধর্মনিরপেক্ষ সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে সমর্থন করে, কিন্তু গ্রামাঞ্চলের অশিক্ষিত স্বল্পশিক্ষিত সবাই ধর্মনাশা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে লড়াই করে। হাজারাদের নিজেদের মধ্যেও কঠোর বৈরিতা সৃষ্টি হয়।

.   জীববিজ্ঞানের জিনপ্রযুক্তির সাম্প্রতিক পরীক্ষায় এটা স্পষ্ট হয়েছে যে চীনের উইঘুর মুসলমানদের সঙ্গে তাদের জিনগত মিল রয়েছে।

.   কয়লা উত্তোলন, অন্যান্য খনির কাজ এবং সড়ক নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে হাজারাদের পাকিস্তানে আগমন।

তিন খ্যাতিমান হাজারা

যার যার পয়সায় ইউনিভার্সিটির ক্যাফেটেরিয়ায় এক টেবিলে খেতে খেতে কবি আবদুল মুকিম খান বললেন, তিনি পাকিস্তানি হিসেবে ততটা গর্বিত নন। আমি ভাবলাম আমি বাংলাদেশী বলেই সম্ভবত আমাকে খানিকটা সন্তুষ্ট করতে তিনি কথা বলে থাকবেন। তিনি থাকেন রসফোর্ড রোডের একটি ডরমিটরিতে, আমি থাকি ৫৪ নম্বর ওয়ারউইক রোডে সাবলেট। সেদিনই তিনি বললেন, পাকিস্তানিরা তাদের সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন মনে করে।

আমি বললাম তুমিও তো পাকিস্তানি।

মুকিম খান বললেন, একাত্তরের আগে তুমিও তো পাকিস্তানি ছিলে।

হ্যাঁ, তারপর আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছি, স্বাধীন হয়েছি।

মুকিম খান বললেন, আমি সব জানি, কিন্তু তুমি সম্ভবত হাজারা এথনিক গোষ্ঠীর কথা জানো না। আমি কোয়েটার হাজারা পরিবারের একজন। আমরা পাকিস্তানের নির্যাতিত একটি জাতিগোষ্ঠী।

১৯৯৩-এর হাড় কাঁপানোা শীতে একজন জলজ্যান্ত হাজারার সঙ্গে আমার পরিচয়। মুকিম খান বললেন, তার অতি দূর সম্পর্কের একজন আত্মীয়ের নাম আমি শুনে থাকতে পারি। তিনি জেনারেল মুসা খান, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন। বেলুচিস্তানের গভর্নর ছিলেন। তিনি তার বড় পদ নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন। আবদুল মুকিম খানের ভাষায় হি ওয়াজ ইউজলেস, হাজারা সম্প্রদায়ের জন্য তিনি লড়াই করেননি।

স্কুলজীবনে খবরের কাগজ পড়ার অভ্যাসের কারণে এবং কথিত সাধারণ জ্ঞান-এর প্রশ্নোত্তর দেয়ার প্রয়োজনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফের নাম জানতেই হয়েছে। ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তার কামান্ডার-ইন-চিফ পদটিতে আসীন হন জেনারেল মুসা খান এবং ১৯৬৬ সালে তার স্থলাভিষিক্ত হন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। মুসা খানের নাম জানলেও হাজারা জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে আমার পরিচিতি ১৯৯৩ সালে আবদুল মুকিম খানের মাধ্যমেই। তিনি ভুল বলেননি, তারা এক ধরনের বর্ণবাদের শিকার। বছরই জানুয়ারি ১১ জন নিরীহ খনি শ্রমিক বোমার আঘাতে নিহত হয়েছেন। এটা অনেকটা রুটিন আক্রমণ। এখানে তিন খ্যাতিমান হাজারার কথা উল্লেখ করছি। নাম নির্বাচনে সম্পূর্ণভাবে আমার রুচি কাণ্ডজ্ঞান ব্যবহার করেছি। বলা আবশ্যক, হাজারাদের মূল আবাস আফগানিস্তান।

জওয়ান থেকে জেনারেল

জওয়ান টু জেনারেল আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে মুসা খান গর্বের সঙ্গেই উল্লেখ করেছেন, সেনাবাহিনীর একজন সাধারণ জওয়ান হিসেবে ১৯২৬ সালে তার যাত্রা। তিনি ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে কমিশন পেয়ে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে মিত্র শক্তির পক্ষে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

ব্রিটিশ ভারতের বেলুচিস্তানের কোয়েটায় হাজারা সম্প্রদায়ের একটি সর্দার পরিবারে ২০ অক্টোবর ১৯০৮ সালে তার জন্ম। বাবা সর্দার ইয়াজদান খান ছিলেন একটি গোত্রের প্রধান। জওয়ান হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে শায়েক হিসেবে হাজারা পাইওনিয়ার ডিভিশনে কিছুকাল দায়িত্ব পালন করার পর ১৯৩২ সালে দেরাদুন মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণ শুরু করেন। ১৯৩৫ সালে কমিশন লাভ করেন। সেনাবাহিনীর একজন গুরুত্বপূর্ণ হকি খেলোয়াড় ছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে তিনি যখন পাকিস্তান হকি ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট তখন পাকিস্তান হকিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে তিনি বার্মা এবং উত্তর আফ্রিকার রণাঙ্গনে লড়াই করেন। মেশিনগান ব্যাটালিয়নে ভূমিকার জন্য ১৯৪২ সালে তিনি মেম্বার অব ব্রিটিশ এম্পায়ার খেতাব পান। ১৯৪৭- দেশভাগের সময় তিনি পাকিস্তানে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন।

১৯৮৫ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুনেজোর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান মুসলিম লীগে যোগদান করেন। প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হক তাকে বেলুচিস্তানের গভর্নর নিয়োগ করেন। গভর্নর থাকা অবস্থায় ১৯৯৬-এর ১২ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন। তার প্রাক-মৃত্যু-ইচ্ছের প্রতি সম্মান জানিয়ে তাকে ইরানের রাজাভি খোরাশানের মাশাদে সমাহিত করা হয়।

দেরদুনে প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী তার দুই সহপাঠীর একজন ভারতের এবং একজন বার্মার (মিয়ানমার) সেনাপ্রধান হন। একজন স্যাম বাহাদুর মানেকশ এবং অন্যজন স্মিথ ডুন।

মৃত্যু থেকে প্রত্যাবর্তন

ফৈজ মোহাম্মদ কাতিব হাজারা মূলত একজন ঐতিহাসিক। আফগানিস্তানের ইতিহাস জানতে হলে তাকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। এখনো আধুনিক আফগান ঐতিহাসিকদের দাবি, তাকে ফাদার অব আফগান হিস্ট্রি ঘোষণা করা হোক।

ফৈজি কাতিবের জন্ম ১৮৬০ সালে আফগানিস্তানের গজনি প্রদেশে। তিনি ক্যালিগ্রাফিতে দক্ষ হয়ে ওঠেন। দেশের একজন শ্রেষ্ঠ তরুণ শিক্ষক হিসেবে তিনি আফগান আমির আবদুর রহমান খানের পুত্র হাবিবুল্লাহ খানের সহচর গাইড নিযুক্ত হন। তিনি ইতিহাস গ্রন্থ রচনায় হাত দেন। তাহফুতুল হাবিব আফগান হিস্ট্রি রচনার সময় তিনি বাধাগ্রস্ত হয়েছেন। তবু তিনি কাজটি সম্পন্ন করেছেন। তিনি আরো ১০টি বই লিখেছেন। হাজারাদের মধ্যে তিনি শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী হিসেবে পরিচিত। ১৯৩১ সালের মার্চ তিনি তেহরানে মৃত্যুবরণ করেন।

নারী স্বাধীনতা বনাম তালেবানি মৃত্যু

শায়মা রাজায়ির জন্ম ১৯৮৯। আধুনিক আফগান তরুণদের রোল মডেল এবং কারো কারো বেলায় হার্ট থ্রুব এই সুদর্শন নারী। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে পয়েন্ট ব্ল্যাংক গুলি করে তাকে হত্যা করে। প্রথম দিকে এটাকে অনার কিলিং বিবেচনা করে শায়মার দুই ভাইকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু তদন্তের পর তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।

যুদ্ধবিদ্ধস্ত আফগানিস্তানে তারুণ্য জাগিয়ে তুলতে গণমাধ্যমে তিনি কাজ করে যাচ্ছিলেন। আফগান রক্ষণশীল সমাজে অনেকটা বিদ্রোহী হয়েই তিনি টেলিভিশনে উপস্থাপনা শুরু করেন। সেই চ্যানেলটি মূলত মিউজিক চ্যানেল, নাম টলো টিভি। তিনি হিজাব বর্জন করে অনেকটাই পাশ্চাত্য দেশীয় উপস্থাপকদের মতো অনুষ্ঠান করে যাচ্ছিলেন। সে অর্থে তিনিই আফগান টেলিভিশনে ধর্মীয় পোশাকের বাইরে প্রথম আফগান নারী। কিন্তু আফগান সমাজপতিরা তাকে একই সঙ্গে ধর্মের বিরুদ্ধে এবং তাদের ক্ষমতার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করলেন। এমনকি আফগান সুপ্রিম কোর্টের চিফ জাস্টিসও বিবৃতি দিলেন: এটি আমাদের সমাজ সংস্কৃতিকে কলুষিত করবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আফগান জনগণকে ধর্ম থেকে সরিয়ে নেবে এবং দেশকে ধ্বংস করবে। টেলিভিশন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জনগণ অন্য দেশের সংস্কৃতি অনুকরণ করবে এবং আফগানিস্তানকে পৃথিবীর সামনে হাস্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করবে। প্রকৃত পক্ষে বিদেশী সংস্কৃতি যত না তার চেয়ে বেশি টার্গেট ছিলেন শায়মা রাজায়ি। তিনি কখনো কখনো পাশ্চাত্যের পোশাক পরে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতেন। রক্ষণশীলরা তাকে নিয়ে গুজব রটাতে থাকে। তারা তাকে রেস্তোরাঁয় বিদেশীদের সঙ্গে মদ্যপান করতে দেখেছে। শায়মা মৃত্যুর হুমকি পেতে শুরু করলেন। তালেবান আমলেই তিনি কাবুল ছেড়ে সপরিবারে পাকিস্তানে চলে এসেছিলেন। তালেবান শাসনের অবসান ঘটলেও আফগান সমাজের নিয়ন্ত্রক ধর্মীয় অভিভাবকরা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেননি। তার খুনের সংবাদ পৌঁছতেই টেলিভিশনে তার সহ-উপস্থাপক সাকেব ইসার স্টুডিওতেই লুকিয়ে থাকেন এবং একজন বিদেশী সাংবাদিকের সহায়তায় সুইডেনে পালিয়ে যান। নিহত শায়মা এখন হয়ে উঠেছেন গণতন্ত্র নারী মুক্তির আইকন।

 

এম মোমেন : সাবেক সরকারি কর্মকর্তা