রবিবার | জুন ২০, ২০২১ | ৬ আষাঢ় ১৪২৮

সিল্করুট

‘আমি একটি কবিতা চাই’

অনুবাদ: আন্দালিব রাশদী

শুকরিয়া রেজাইর কবিতা

এক গ্লাস চা

 

গত বছর আমি এক গ্লাস চা আলোতে তুলে ধরেছি

বছর আমি অক্সফোর্ডের রাস্তায় চা পাতার মতো ঘুরপাক খাই।

 

গত বছর আমি গাঢ় নীল আকাশের দিকে তাকিয়েছি

বছর আমি বর্ণহীন মেঘের নিচে ঘুরে বেড়াই।

 

গত বছর আমি ঝলসানো সূর্যের আনন্দ নৃত্য দেখেছি

বছর বিবর্ণ সূর্যের ভবিষ্যত্হীন আবর্তন।

 

অভিবাসন আমাকে এই চড়াই-উতরাই সড়কে নিয়ে এসেছে

আমি পিছলে পড়ি মাটির ঘ্রাণ শুঁকি, উঠে দাঁড়াই মেঘের ছোঁয়ায়।

 

এখন আমি পাখি, বাতাসে পাখা ছড়াই

অচেনা পৃথিবীতে আমি বিস্মৃত হয়ে গেছি।

 

আমাকে থামিও না, প্রশ্ন করো না যেন

আমার চোখে চোখ রাখো, আমার হূদয় অনুভব করো।

 

থেঁতলে গেছে, ব্যথা করছে, ঘা হয়েছে হূদয়ে

আমার চোখ পেঁয়াজের খোসায় ঢাকা।

 

ছিন্নভিন্ন পাখির বাসায় আমি অসহায় হয়ে বসে থাকি

মেরামতের কৌশল আমার জানা নেই।

 

আর আমার হূদয়, আমি বলি, বাস্তুচ্যুত হয়ে গেছে

নিজের জায়গাটা খুঁজে বেড়াচ্ছে।

(কবি নিজেই মনে করেন এটি জালালউদ্দীন রুমি প্রভাবিত একটি কবিতা)

 


আমি একটি কবিতা চাই

 

আমি একটি কবিতা চাই

প্যাস্ট্রির ওপর ঝাঝরির ছাঁচের মতো

প্যাস্ট্রি দিয়ে তৈরি

একটি কবিতা

তোমার আঙুলের ডগায় উজ্জ্বলতা ছড়াবে

তোমার হাত থেকে প্যাস্ট্রি যখন পড়বে

একটি কবিতা

ফুটন্ত তেলের মতো ছিটকে হুল ফোটাবে।

একটি কবিতা

সিলভারের প্লেটে সাজানো, ওপরে

বাদাম চকলেট, আড়াআড়ি পা

বসে থাকা অতিথিদের পরিবেশন করা হবে।

একটি কবিতা

আমাদের জাফরান চায়ের মতো প্রাণবন্ত

ঈদের দিন অতিথিদের দেয়া হয়।

আলো ছিটকে পড়া প্রিজমের মতো

তোমার কবিতা সাদা কাগজে স্থিত হোক

সবগুলো রঙ না দেখে

যেয়ো না কিন্তু।

 


ইলিয়াস আলাভির কবিতা

আমার আবাসভূমি কোথায়?

 

একটি আবাসভূমি, একটি কাঠের টেবিল

আমরা সেখানে চা পান করি

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি

অভিবাসন পুলিশ আমাদের ধরে ফেলার ঠিক আগের মুহূর্তে

একটি আবাসভূমি

একটি পুরনো নৌকা

এজিয়ান সাগরের মড়ো পথে দুলছে

প্রার্থনা করো যাতে সাগর শান্ত হয়ে আসে

যাতে মেঘ শান্ত হয়ে আসে

যাতে ঘূর্ণিবায়ু শান্ত হয়ে আসে।

বুড়ো ক্যাপ্টেন বলতে থাকে

ঢেউ নৃত্য শুরু হওয়ার ঠিক আগে।

আবাসভূমি হচ্ছে

তবরাত--জামের বন্দিশিবির

সিমেন্টের উঁচু দেয়াল

তার ওপরে উঁচু কাঁটাতারের বেড়া

মানুষের দীর্ঘ সারি

রুটি, একটি চিঠি এবং লজ্জা

তাল--শিয়া, কোয়েটা, ইস্তানবুল, নাওরু

আবাসভূমি সম্ভবত আল খালিলের একটি গর্ত

তৃষ্ণার্ত ওষ্ঠ আর ক্ষুধা নিয়ে

আমার প্রতীক্ষায় আছে

আমার আবাসভূমি কোথায়?

 


একটি হাজারা লোকগান


আকাশে তারারা জ্বলছে

আর আমি জেগে আছি

আমি ভাঙা দেয়ালের পেছনেই ছিলাম

মোরগের বাক শুরু হয়ে গেছে

আমার প্রেমিকের জন্য

আমি তো সেখানেই প্রতীক্ষায় আছি।

 

পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে হাজার হাজার হাজারা আফগানিস্তান কিংবা পাকিস্তানে হাজারা নিধনের প্রতিটি ঢেউ হত্যার পাশাপাশি বহুসংখ্যক মানুষকে দেশছাড়া করছে। কেবল মাজার--শরিফেই নিহত হয়েছে আট হাজার মানুষ।

স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে শুরু করে ওশেনিয়া, আটলান্টিক, প্রশান্ত ভারত মাহাসাগরের নিকটস্থ সব ভূখণ্ডেই রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী বহু হাজারার দেখা মিলবে। মূলোৎপাটিত মানুষের যাতনা বেশি বলেই অস্তিত্বের লড়াই এবং সৃষ্টিশীলতার প্রতিযোগিতায় তারা এগিয়ে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অন্তত ২০০ কবি খোলা চিঠি লিখে সংহতি প্রকাশ করেছেন হাজারার কবি জনগণের সঙ্গে:

 

আমরা সারা পৃথিবীর কবিরা হাজারা জনগণের সঙ্গে, তাদের মানবাধিকার দাবির সঙ্গে, তাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করছি। আমরা জানি আপনারা পদ্ধতিগত অপরাধের শিকার। এর মধ্যে রয়েছে গণহত্যার দাসত্ব, বাস্তুচ্ছেদ, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং আপনাদের বাড়ি ঘরে আক্রমণ। আপনাদের হাজারিস্তানে আমরাও একাত্ম। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দেলনের মতো, আমেরিকায় গণঅধিকার আন্দোলনের মতো আপনাদের আন্দোলনও সফল হবে। আমরা আপনাদের কণ্ঠস্বর শুনি, আমাদের কবিতায় তা প্রতিফলিত হয়সমকালীন বিশ্বসাহিত্যে আপনাদের কথা তুলে ধরি।

 

কবিদের খোলা চিঠি থেকে আরো কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি:

 

. সশস্ত্র পশতুন যাযাবররা আফগান সরকার তালেবান সমর্থনে হাজারা গ্রাম আক্রমণ লুণ্ঠন করছে।

. হাজারা শিল্পী, লেখক আন্দোলনকারীদের ওপর সরকারি সমর্থনে সংগঠিত আক্রমণ চলছে

. সস্ত্রাসীদের মদদ দিয়ে আফগানিস্তানের প্রায় সব রাস্তা থেকে হাজারা নারী, শিশু যুবক অপহরণ করা হচ্ছে, নির্যাতন করা হচ্ছে, এমনকি মাথা ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে রাখা হচ্ছে।

. সব প্রতিষ্ঠানে এবং সরকারে মধ্যে পদ্ধতিগতভাবে হাজারাদের অধিকারবঞ্চিত করা হচ্ছে।

. হাজারাদের ধর্মীয় সামাজিক সমাবেশে পরিকল্পিত আক্রমণ পরিচালনা করা হচ্ছে।

. হাজারা সৈনিকদের কামানের খোরাক হিসেবে রণাঙ্গনে সবচেয়ে ভয়ংকর স্থানে পাঠানো হচ্ছে।

. হাজারাদের জাতিগত উচ্ছেদএথনিক ক্লিনজিং অব্যাহত আছে। কবিদের দাবি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আফগানিস্তান পাকিস্তান সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে নিপীড়ন বন্ধ করুক।

আন্দালিব রাশদী: কথাসাহিত্যিক