রবিবার | জুন ২০, ২০২১ | ৬ আষাঢ় ১৪২৮

সিল্করুট

ময়মনসিংহের জমিদারের চোখে ফতেহপুর সিক্রি

ধরণীকান্ত লাহিড়ী চৌধুরী

আকবর বাদশাহর রাজধানী

ফতেহপুর-সিক্রির বহির্ভাগে অদ্যাপিও স্থানে স্থানে বহু সুন্দর সুন্দর উদ্যানের অট্টালিকার ভগ্নাবশেষ বিদ্যমান থাকিয়া এক সময়ে যে এখানে বহু ধনী আমির ওমরাহ বাস করিতেন, তাহা প্রমাণ করিয়া দেয়। কথিত আছে যে আকবর বাদশাহ দুইটি পুত্র সন্তানের অকাল মৃত্যুতে বড়ই ম্রিয়মান হইয়া পড়েন। তিনি নিঃসন্তান অবস্থায় নানা চিন্তার মধ্যে বড়ই বিরসভাবে কালাতিপাত করিতে থাকেন, সে সময়ে সিক্রি পাহাড়ের নিভৃত গুহাভ্যন্তরে পারস্য দেশের বিখ্যাত ফকির মঈনউদ্দিন চিশতির শিষ্য সালিম চিশতি নামধেয় জনৈক ফকির বাস করিতেন। সভাসদবর্গের উপদেশে আকবর শাহ এই ফকিরের কৃপাপ্রার্থী হইলেন, তখন সিক্রিতে সামান্য বসতি ছিল এবং চারদিকে জঙ্গলাবৃত ছিলফকির জন-কোলাহল হইতে দূরে নিভৃত স্থানে বসিয়া ঈশ্বরোপাসনা করিতেন।

সম্রাট পূর্বেও এই ফকিরের মাহাত্ম্য অবগত ছিলেন, এখন সভাসদগণের উপদেশে এবং এই ফকিরের অদ্ভূত ক্ষমতা সম্বন্ধে বিশেষরূপে অবগত হইয়া ইহার কৃপাপ্রার্থী হইলেন। ১৫৬৯ খ্রিস্টাব্দে আকবর বাদশাহ উজবেক আমিরদিগকে দমন করিয়া প্রত্যাবর্তনকালে সিক্রিতে ফকিরের নিকট স্বীয় মনঃকষ্টের কারণ প্রার্থনা জ্ঞাপন করেন, কিন্তু ফকির সাহেব বাদসাহের মনোবাঞ্ছা পূরণ করিতে অস্বীকার করায়, তিনি যখন মনের দুঃখে প্রত্যাবর্তন করিতেছিলেন তখন ফকির সাহেবের ছয় মাস বয়স্ক শিশু নিজ জীবনদানে বাদশাহকে পুত্র-বর প্রদান করেন। জগদীশ্বরের কৃপায় সেই বৎসরই নিঃসন্তান আকবর বাদশাহর পুত্রের জন্ম হয়। কথিত আছে যে অম্বর রাজকুমারী গর্ভাবস্থায় এস্থানে অবস্থান করিয়াছিলেন এবং এখানেই জাহাঙ্গীর ভূমিষ্ঠ হন। অদ্যাপি জনসাধারণে জাহাঙ্গীরের আঁতুড়ঘর দেখাইয়া থাকে। আকবর শাহ ফকিরের প্রতি কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ ফকিরের নামানুকরণে পুত্রের নামও সালিম রাখেন। কুমারের জন্মের পর হইতেই সিক্রিতে রাজকীয় বাসস্থান ইত্যাদি নির্মিত হইতে আরম্ভ হয় এবং ক্রমে ইহা সুন্দর সুন্দর সৌধমালায় বিভূষিত হইয়া মনোহর নগরের আকার ধারণ করে।

১৫৬৩ খ্রিস্টাব্দে আকবর বাদশাহ গুজরাট প্রদেশস্থ মির্জা হোসেনের বিদ্রোহ দমন করিয়া প্রত্যাবর্তন করত তাহার এই নতুন রাজধানীর নাম ফতেহপুর রাখেন। ক্রমে ইহা প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত হইয়া সর্ব প্রকারে সুরক্ষিত হইতে থাকে। কিন্তু কয়েক বৎসর পরে আকবর বাদশাহ ফতেহপুর হইতে পুনরায় রাজধানী আগ্রাতে পরিবর্তন করেন। তিনি কেন এইভাবে ইহাকে পরিত্যাগ করিলেন সম্বন্ধে নানা প্রকার জনপ্রবাদ শুনিতে পাওয়া যায়; কেহ কেহ বলেন যে নবপ্রতিষ্ঠিত রাজধানীর নিকট কোনো স্রোতস্বিনী প্রবাহিত না থাকায় নগরে জলের বিশেষ কষ্ট হওয়ায় তাহাকে এই নগরী পরিত্যাগ করিতে হইয়াছিল কথা আমাদের নিকট সম্পূর্ণ অলিক বলিয়া প্রতীয়মান হয়। দ্বিতীয় প্রবাদ বাক্যই আমাদের নিকট যথার্থ বলিয়া প্রতীয়মান হয়। ফকির সালিম চিশতি রাজধানী হওয়ায় দিবারাত্র কোলাহলে ঈশ্বর চিন্তার ব্যাঘাত হয় দেখিয়া আকবর শাহকে ফতেহপুর-সিক্রি হইতে রাজধানী পরিবর্তনের নিমিত্তে অনুরোধ করেন, বাদশাহও তদনুযায়ী কার্য করেনতদবধি ক্রমশ ইহা জনশূন্য হইয়া নীরবতার পূর্ণ আধার হইয়া পড়ে। জাহাঙ্গীর বাদশাহের আত্মজীবনী হইতে জানিতে পারা যায় যে তাহার রাজত্বে ফতেহপুর সিক্রির মধ্য দিয়া যাতায়াত বিশেষ ভয়-সংকুল হইয়া পড়িয়াছিল।

ফতেহপুর সিক্রির নির্জন প্রাসাদাবলি ইহার চতুর্দিকের ধ্বংসাবশেষ দেখিবার বটে। ভারতের ভূতপূর্ব বড়লাট লর্ড কার্জনের আদেশে এই সমুদয় প্রাসাদাবলির পূর্ণ জীর্ণ-সংস্কার হইয়া এবং ইহাদের লুপ্তপ্রায় চিত্রসমূহের পুনরুদ্ধার হইয়া এখন ইহা নব-শ্রী ধারণ করিয়াছে। বুলন্দ দরওয়াজার সম্বন্ধে আর দুই একটি কথা বলা আবশ্যক বিবেচনা করি। ফার্গুসন সাহেবের মতে পৃথিবীতেও এইরূপ উচ্চ খিলান আছে কিনা সন্দেহ এবং ইহা ভারতে অদ্বিতীয়; উচ্চ ভূমির পৃষ্ঠে ইহার বিরাট প্রস্তর দেহ অদ্যাপিও নব-যৌবনের দৃঢ়তায় বিরাজিত ভূমি হইতে ইহার উচ্চতা ১৩০ ফুট। ইহার ওপর হইতে আগ্রার তাজমহল দেখিতে পাওয়া যায় এবং চারদিকের দৃশ্যাবলি বড়ই সুন্দর দেখায়। বুলন্দ দরওয়াজার বিশাল দেহের নিকট ফতেহপুর সিক্রির অন্যান্য প্রাসাদাবলি নিতান্ত ক্ষুদ্র বলিয়া বিবেচিত হয়।

ফতেহপুর সিক্রির বিশেষ বিশেষত্ব এই যে এখানকার সমুদয় প্রাসাদই আকবর বাদশাহের নির্মিত, এখানে অন্য কোনো সম্রাটের নির্মিত কোনো সৌধ ইত্যাদি নাই। এক স্থানে একটি কূপকে Jumping well কহেএই বৃহৎ কূপের বা ইন্দারার মধ্যে ছোট ছোট ছেলেরা, যুবকেরা এমনকি পঞ্চাশ বৎসর বয়স্ক বৃদ্ধেরাও প্রত্যেকে দুই আনার পয়সা লইয়া অত্যুচ্চ প্রাসাদ-শিখর। হইতে লাফ দিয়া পতিত হয়ইহা দেখিবার বটে; কূপের মুখের ভাগ একটি ছোট পুকুরের ন্যায় বৃহৎ হইবে।

সালিম চিশতির দরগা বীরবলের বাসস্থান

বুলন্দ-দরওয়াজার তোরণ অতিক্রম করিলেই এক বহুদূর বিস্তৃত প্রস্তর মণ্ডিত প্রাঙ্গণ দেখিতে পাওয়া যায়। তাহার চতুর্দিকে উন্নত সৌধশ্রেণী, মধ্যস্থলের চত্বরের উত্তরাংশে শ্বেত মর্ম্মরের বেদীর ওপর নাতিবৃহৎ নাতিক্ষুদ্র একটি দরগা অবস্থিত, ইহাই সালিম চিশতির দরগা নামে প্রসিদ্ধ। এই ক্ষুদ্র অনিন্দ্য সুন্দর দরগাটি আকবর শাহ জাহাঙ্গীর বাদশাহ সালিম চিশতির ওপরে তাহদের ভক্তি শ্রদ্ধার অপূর্ব নিদর্শন স্বরূপ নির্মাণ করিয়া দিয়াছেন। এই দরগাতেই সালিম চিশতির কবর স্থাপিত। অদ্যাপি হিন্দু মুসলমান বন্ধ্যা স্ত্রীলোকগণ সন্তান লাভাকাঙ্ক্ষায় স্থানে আগমন করিয়া থাকেন।

মুসলমান হিন্দুরা সকলেই সালিম চিশতির দরগার প্রতি সম্মান

প্রদর্শন করিয়া থাকেন। বহির্ভাগ হইতে সালিম চিশতির দরগা সমস্তই শ্বেত মর্মর প্রস্তর নির্মিত বলিয়া অনুমিত হয়। চতুর্দিকের প্রাচীরের ঝিল্লিকাটা (trellis work) থাকায় দূর হইতেই বড় মনোরম বোধ হইয়া থাকে। কবর-প্রকোষ্ঠের বারান্দা বারান্দার ওপরে ঘরের চালার মতো হেলানো কার্নিস বিদ্যমান। বাহিরের প্রাচীর-গাত্রে কোরানের বচন-সকল অঙ্কিত রহিয়াছে। প্রকোষ্ঠের অভ্যন্তরে প্রায় ফুট উচ্চ পর্যন্ত শ্বেত মর্মর প্রস্তরে বাকি অংশ লোহিত প্রস্তর দ্বারা গঠিত। সালিম চিশতির কবরের ওপরে চারিটি আবলুস কাষ্ঠের থামের ওপর কাষ্ঠেরই নির্মিত একটি চাঁদোয়া আছে, চাঁদোয়ার মধ্যে তাহার পায়ায় যে সমুদয় ঝিনুকের কারুকার্য আছে, তাহা অতীব সুন্দর, বিশেষত প্রকোষ্ঠ-মধ্যে আধ-আলোক আধ-অন্ধকারের সম্মিলনে সর্বপ্রথমে উহা দৃষ্টিতে পড়ে।

সালিম চিশতির মৃত্যুর অব্যবহিত পরে ১৫৭২ খ্রিস্টাব্দে এই দরগা নির্মিত হইয়াছিল বলিয়া কোনো কোনো ঐতিহাসিক পণ্ডিত স্থির করিয়াছেন। এই দরগার কিঞ্চিৎ দক্ষিণে একটি চৌবাচ্চা আছে এবং তাহার অল্প পূর্ব-উত্তরে সালিম চিশতির পরিবারস্থ রমণীবৃন্দের সমাধি-স্থান। উহার পার্শ্বেই চিশতি সাহেবের পৌত্র জাহাঙ্গীর বাদশাহের রাজত্বকালে বাঙলার শাসনকর্তা ইসলাম খাঁর সুন্দর সমাধি সৌধ বিরাজিত। উত্তরাংশে আকবর শাহের চির সহচর অকৃত্রিম বন্ধু আবুল-ফজল তাহার ভ্রাতা রাজকবি ফৈজির বাসস্থান। চত্বরের পূর্ব দিকের দ্বার দিয়া বহির্গত হইয়া উত্তরাংশে কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইলেই যোধাবাই মহল অবস্থিত। এই মহালের সম্মুখেই অশ্বশালা। অশ্বশালার ঠিক উত্তর দিকে এবং যোধাবাই মহালের উত্তর-পশ্চিমকোণে রাজা বীরবলের প্রাসাদ অবস্থিত। এই প্রাসাদটি পরম রমণীয়। তিন শত বৎসরেরও বেশি কাল উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে ইহা নির্মিত হইয়াছিল, কিন্তু অদ্যাপিও ঠিক নতুনই আছে। প্রাচীর গাত্রের কারুকার্য অদ্যাপিও সুস্পষ্ট সুন্দর। কীন সাহেব এই প্রাসাদের বর্ণনা-প্রসঙ্গে প্রশংসার সহিত লিখিয়াছেন: it seems as if a Chinese ivory worker had been employed upon a byclopean Monument.’ প্রকৃতপক্ষেই দৃঢ় প্রস্তর গাত্রে এইরূপ চারুকার্যাবলি বিস্ময়ের উদ্রেক করে এবং তাহা দানবীয় কার্য বলিয়া মনে হয়। রাজা বীরবলের কৌতুক রহস্য ভারতে সর্বত্র সুপরিচিত। ইহার সম্বন্ধে দেশে নানাবিধ, গল্প প্রবাদ শুনিতে পাওয়া যায়। চঞ্চলা অদৃষ্ট দেবী যে কখন কাহার ওপরে সন্তুষ্ট হন বলিতে পারা যায় না। দরিদ্র ভাট ব্রাহ্মণের তনয় হইয়া যেরূপ প্রতিভাবলে বীরবল বাদশাহ আকবরের মনোরঞ্জন করিয়া বাদশাহের নর্মসচিব হইতে সক্ষম হইয়াছিলেন তাহা প্রকৃতই আশ্চর্য বলিতে হইবে। বাদশাহ বীরবলকে এতদূর বিশ্বাস করিতেন ভালোবাসিতেন যেকি যুদ্ধে, কি অবসর কালে, সর্বদাই বীরবলকে সঙ্গে রাখিতেন। রাজা বীরবলের সম্রাটের ওপর এইরূপ প্রাধান্য দেখিয়া অন্যান্য আমির-ওমরাহগণ অসন্তুষ্ট ছিলেন। আকবর শাহের একান্ত বিশ্বাস-ভাজন ছিলেন বলিয়াই বীরবলের বিরুদ্ধে নানাবিধ মিথ্যা অভিযোগ আনয়ন করিয়াও কেহ কিছু করিয়া উঠিতে পারেন নাই।