শনিবার | মে ০৮, ২০২১ | ২৫ বৈশাখ ১৪২৮

বিশেষ সংখ্যা

ফসলি সনের প্রবর্তন

ম. ইনামুল হক

বাংলা পঞ্জিকার বয়স ১৪২৭ বছর শেষ হচ্ছে। কিন্তু অনেকে বলেন, মোগল সম্রাট আকবরের সময় তার সভাসদ আমির ফতেউল্লা সিরাজি ১৫৫৬ ইংরেজি সালে পঞ্জিকার প্রচলন করেছিলেন। তারা বলেন, ফতেউল্লা সিরাজি হিজরি সাল অনুযায়ী খাজনা আদায়ের অসুবিধা দূর করার জন্য চান্দ্র হিজরি বছরকে সৌরবছরে রূপান্তর করে বাংলা সনের জন্ম দেন। কিন্তু কথাটি সত্য নয়। কারণ বাংলা সন দক্ষিণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশে প্রচলিত একই সময়ে শুরু হওয়া পঞ্জিকাগুলোরই অন্যতম একটি ঐতিহ্যপূর্ণ পঞ্জিকা। মোগল সম্রাট আকবরের সভাসদ ফতেউল্লা সিরাজি বাংলা সন নতুন করে উদ্ভাবন করেননি, বরং তিনি বাংলার সমতলে চলতি বাংলা পঞ্জিকাকে খাজনা আদায়ের বছর হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

বর্তমান বাংলা পঞ্জিকা একটি ফসল পঞ্জিকা। এর প্রথম দিনটি থেকে শেষ দিন পর্যন্ত সময়ে রয়েছে বাংলার তিনটি ফসল মৌসুম। মৌসুমগুলো যথা আউশ, আমন রবি অনুযায়ী বাংলা বছরকে চার মাস ধরে সহজেই ভাগ করা যায়। পঞ্জিকার প্রথম দিন নববর্ষ হিসেবে শেষ দিন হালখাতা হিসেবে যথেষ্ট গুরুত্ব ধুমধামের সাথে পালন করা হয়। বাংলা পঞ্জিকার ব্যাপারে একটি বিষয় বেশ গুরুত্বপূর্ণ এই যে কেবল বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গ নয়, বাংলা নতুন বছর আগমনের সন্ধিক্ষণের কয়েকটি দিন সারা দক্ষিণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একই সময়ে (১৪-১৫ এপ্রিল) বিশেষ ধুমধামের সাথে পালন করা হয়। এসব হচ্ছে, কাম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, চীন, মালয়েশিয়া ইন্দোনেশিয়ার কিছু অংশ, শ্রীলংকা, তামিলনাড়ু, অন্ধ্র, কেরালা, ওড়িশা, বিহার, আসামসহ সমগ্র উত্তর উত্তর-পূর্ব ভারত, ভুটান, নেপাল পাকিস্তানের পাঞ্জাব কাশ্মীর।

বাংলাদেশ ভারতের বেশকিছু গবেষক বাংলা পঞ্জিকার উৎপত্তি নিয়ে বই লিখেছেন। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত (১৯৯৩) ‘বাংলা সনের জন্মকথাশীর্ষক একটি বইতে মো. আবু তালিব নানামতের কথা বলেআইন--আকবরী বর্ণনা দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন যে আকবরের সময়ই বাংলা সনের উৎপত্তি হয়। কিন্তুআইন--আকবরীগ্রন্থে বাংলা সনের উৎপত্তি বিষয়ে লেখা হয়নি, বরং এতে লেখা হয়েছে হিজরি সাল অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে সমস্যার কথা এবংএলাহী সনপ্রবর্তনের কথা। মোগলরা তাদের সাম্রাজ্যে খাজনা আদায়ের জন্য হিজরি সাল ব্যবহার করছিল। হিজরি সাল চান্দ্র বছর হওয়ায় সৌরবছরের তুলনায় প্রতি বছর গড়ে ১১ দিন এগিয়ে যায়। দিল্লির মোগল শাসকেরা ১৫৭৬ সালে আফগানদের হাত থেকে বাংলা জয় করে নেয়। বাংলা অঞ্চলে শস্য চাষ এলাকায় মৌসুমি বায়ুর আগমনের ওপর নির্ভরশীল বিধায় হিজরি সাল অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে গিয়ে সমস্যা দেখা দিল। সম্রাট আকবর তার সভাসদ জ্যোতির্বিদ আমির ফতেউল্লা সিরাজির পরামর্শে ১০ মার্চ ১৫৮৫ এক ফরমানের মাধ্যমে বাংলা অঞ্চলের রাজস্ব আদায় পদ্ধতি স্থানীয় শস্য পঞ্জিকার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করেন।

বাংলা সনের জন্মকথাবইটিতে আইন--আকবরীর কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, আকবরের সভার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে সৌরবছর প্রয়োগ করার পক্ষপাতী ছিলেন। আকবর এটা জেনে ভারতে প্রচলিত সৌরবছরগুলোর অনুরূপ খাজনা আদায় পঞ্জিকা প্রণয়নের জন্য ১০ মার্চ ১৫৮৫ এক হুকুম জারি করেন। আকবরের হুকুমনামা অনুযায়ী যে নতুন সালের প্রবর্তন করা হয় তার নামএলাহী সন আমির ফতেউল্লা সিরাজি একই সময়ে খাজনা আদায়ের জন্য এলাকাভিত্তিক কয়েকটি ফসলি পঞ্জিকা চালু করেন। সেগুলো হলো বাংলা, আমলি (ওড়িশা), বিলায়েতি (মধ্য ভারত), ফসলি (উত্তর ভারত) সুরসেনি (মহারাষ্ট্র) আকবরের সিংহাসনে আরোহণের বছর ধরে এলাহী সালের বছর শুরুর দিন হলো ১১ মার্চ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ/২৮ রবিউস সানি ৯৬৩ হিজরি। যদিও তার সিংহাসনে আরোহণের প্রকৃত দিন ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৫৫৬।

আমির ফতেউল্লা সিরাজি এলাহী সন প্রবর্তনের সময় আকবরের সিংহাসনে আরোহণের বছরটি ঠিক রাখেন, কিন্তু বছর শুরু করেন ওই সময়ে হিজরি সালের বছর শুরুর দিন দিয়ে। আজকের বাংলা পঞ্জিকার ১৪২২ বছর শেষ হচ্ছে, হিজরির চলছে ১৪৩৭ সাল। বাংলা যেহেতু সৌরবছর এবং হিজরি যেহেতু চান্দ্রবছর আমরা পেছনের দিকে গেলে এমন এক সময়ে পৌঁছব যখন বাংলা হিজরির বয়স একই ছিল। আকবরের সিংহাসনে আরোহণের বছর ছিল ১৫৫৬ ইংরেজি সাল যখন বাংলা হিজরির উভয়েরই বয়স ছিল ৯৬৩ বছর। আমাদের কাছে লক্ষণীয় যে খলিফা ওমর ৬৩৮ সালে হিজরি পঞ্জিকা গণনার আদেশ দেন হিজরতের প্রকৃত বছর ৬২২ সাল থেকে। এমনকি হিজরতের প্রকৃত দিন অনুযায়ী বছর গণনার শুরু না করে চলতি আরবি মাসের প্রথম দিন মহররম থেকে ওই হিজরি সালের প্রারম্ভ ধরা হয়েছিল।

প্রতীয়মান হয়, কোনো রাজার রাজ্যাভিষেকের বছর ধরে যেসব সন গণনা শুরু করা হয় সেসব বছরে যেদিনই রাজার অভিষেক হোক না কেন, ঐতিহ্যের খাতিরে পঞ্জিকার শুরুর দিন অপরিবর্তিত রাখা হয়। আরো প্রতীয়মান হয়, আকবরের সভাসদ ফতেউল্লা সিরাজিএলাহী সনপ্রবর্তনের সময় (কার্যকর ১১ মার্চ ১৫৫৬) হিজরি সালের শুরুর দিনটি গ্রহণ করেন। কিন্তু সিরাজি বাংলা অঞ্চলে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে আগে আরোপিত হিজরি সালের পরিবর্তে বাংলা অঞ্চলে ঐতিহাসিকভাবে প্রচলিত বাংলা পঞ্জিকা গ্রহণ করেন। সিরাজির ব্যবস্থার ফলে বাংলা পঞ্জিকার শুরুর দিন বা সৌরবছর গণনার কোনো পরিবর্তন হয়নি।

দেখা যাবে, পৃথিবীর সব দেশের মানুষই ঐতিহাসিকভাবে কোনো সৌর অথবা চান্দ্র পঞ্জিকার সাথে অভ্যস্ত থেকেছে। পঞ্জিকাগুলো ভিন্ন দেশের জলবায়ুর কারণে মাস ঋতুতে ভিন্ন ছিল। যেসব দেশে চান্দ্র পঞ্জিকা প্রচলিত ছিল, যেমন আরব দেশগুলোতে, তিন বছর অন্তর একটি মাস দুবার প্রয়োগ করে (মলমাস বা intercalary months) সৌরবছরের সাথে সামঞ্জস্য আনা হতো (‘আল বেরুণীলেখক এম. আকবর আলী। ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা ১৯৮০) দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয় আচার পালন ফসল উৎপাদনের সময় হিসাবের জন্য চান্দ্র-সৌর পঞ্জিকা ব্যবহার করা হতো। মোগল আমলে রাজস্ব আদায়ের গুরুত্ব কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজন যা- ছিল না কেন আমাদের আজকের জাতীয় জীবনে বাংলা পঞ্জিকার গুরুত্ব অপরিসীম। পঞ্জিকা হিজরি থেকে ভিন্ন জাতের, শকাব্দ থেকে ভিন্ন ঐতিহ্যের খ্রিস্টাব্দ থেকে ভিন্ন ঋতুবৈচিত্র্যের। তাছাড়া বর্তমান বাংলা পঞ্জিকার গোড়ার বছর এমন এক সময় (৫৯৩ খ্রিস্টাব্দ) নির্দেশ করে যখন বাংলার সমতলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেছে।

বাংলাদেশে যে অর্থবছরটি চালু আছে তা ইংরেজি (গ্রেগরিয়ান) পঞ্জিকাভিত্তিক। এর শুরু হয় জুলাই থেকে অর্থাৎ বর্ষা ঋতুর আগমনের পর। বছরটি শেষ হয় ৩০ জুন, সেটাও বর্ষা ঋতুর আগমনের পর। অতএব আমরা একই অর্থবছরে পাই দুটি বর্ষা ঋতু এবং অন্যান্য পাঁচটি যথা শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত গ্রীষ্ম ঋতু। তবে জমির খাজনা আদায়ের জন্য তহশিলদাররা যে বছর পালন করেন তা বাংলা পঞ্জিকার ভিত্তিতেই হয়, বিগত বাংলা বছর বাবদ। অর্থাৎ একটি বাংলা বছরে যেসব ঋতু আছে সেসব ঋতুতে যেসব ফসল হয় তার ভিত্তিতেই খাজনা ধরার নিয়ম। বাংলা পঞ্জিকায় ছয়টি ঋতু। গ্রীষ্ম দিয়ে পঞ্জিকার শুরু এরপর বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত বসন্ত। বাংলার ফসল পঞ্জিকাও ছয়টি ঋতুনির্ভর। গ্রীষ্ম বর্ষা আউশ ধানের, শরৎ হেমন্ত আমন ধানের এবং শীত বসন্ত রবিশস্যের। চৈত্রের দাবদাহের শেষে যখন বছর শেষ তখন মাঠের ফসলও শেষ। জমির খাজনা ছাড়াও বাংলা পঞ্জিকা চলে ব্যবসাক্ষেত্রে, বার্ষিক হিসাব পরিচালনার জন্যে। চাষী বছর শেষে ফসল তুলবেন, ব্যবসাদার বিগত বছরের পাওনা-দেনা মিটিয়ে নতুন বছরের হালখাতা করবেন। এভাবে চৈত্রের শেষ দিন চৈত্রসংক্রান্তি হিসেবে এবং নতুন বছরের প্রথম দিন হালখাতা প্রস্তুতের দিন হিসেবে পালন বাংলার ঐতিহ্য। বাংলা পঞ্জিকার এসব ঐতিহ্য হাজার হাজার বছরের পুরনো।

দেখা যায়, বাংলাদেশে তিনটি বছর চালু আছে। প্রথমটি ঘরের, গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, যা প্রতি জানুয়ারিতে শুরু হয়ে ডিসেম্বরে শেষ হয়। দ্বিতীয়টি দেশের গ্রামাঞ্চলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে, বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী, যা বৈশাখে শুরু হয়ে চৈত্রে শেষ হয়। তৃতীয়টি সরকারি অর্থ ব্যবস্থায়, গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, যা জুলাইয়ে শুরু হয়ে জুনে শেষ হয়। আপাতদৃষ্টিতে এতে কোনো সমস্যা না থাকলেও সমস্যা আছে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে এবং এর সাথে জড়িত অর্থ ব্যবস্থায়, যেখানে রয়েছে চরম অব্যবস্থা। ১৭ মার্চ ১৯৯৩ বাংলাদেশ অবজারভারে প্রকাশিত একটি পত্রে আমি প্রথম বাংলাদেশের বাংলা পঞ্জিকার ভিত্তিতে অর্থবছর চালু করার প্রস্তাব করেছিলাম। বৈশাখ ১৪১২ (ইংরেজি ১৯৯৫) দৈনিক জনকণ্ঠে বিষয়ে আমি বিস্তারিত লিখেছি। জুন ১৯৯৭ বিষয়ে বাংলাদেশ অবজারভারের সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনে বাংলা পঞ্জিকার ওপর আমার কভার স্টোরি প্রকাশিত হয়। এরপর দুই বঙ্গের অনেক পত্রিকায় আমার লেখা মুদ্রিত পুনর্মুদ্রিত হয়েছে।

সরকার পরিচালনায় বছরব্যাপী উন্নয়নকাজ ব্যয় নির্বাহ হয় প্রধানত দুভাবে, যথা আপত্কালীন কাজ ব্যয় এবং পরিকল্পিত কাজ ব্যয়। চলতি অর্থবছরের শেষের দিকে অর্থাৎ মে-জুনে আগাম বন্যা হলে শুরু হয় আপত্কালীন কাজ। কাজ ব্যয় ব্যবস্থায় কোনো সমস্যা থাকার কথা ছিল না, কিন্তু সমস্যা হলো আপত্কালীন বরাদ্দ পাওয়া গেলে তা অবশ্যই ব্যয় করতে হয়, অন্যথায় বছর শেষে বরাদ্দপ্রাপ্ত দপ্তরকে ব্যর্থতার দায়ভার গ্রহণ করতে হয়। এখানেই রয়েছে সব অব্যবস্থার মূল এবং পুকুর চুরির মতো দুর্নীতির সুযোগ। আর্থিক অব্যবস্থাই অপচয়, দুর্নীতি লুটপাটের ক্ষেত্র তৈরি করে। অব্যবস্থার কাগুজে রূপ অনিয়ম গোঁজামিল। আমরা জানি ব্যাংকের ঋণ আদায় হয় না। ব্যাংকের ঋণগ্রহীতার হদিস পাওয়া যায় না। জনগণ প্রকল্পের সুবিধা না পেতেই প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা করে দেয়া হয়। প্রকল্পের মালপত্র পড়ে থাকে, প্যাকিং খোলা হয় না।

আগাম বন্যার কারণে সরকারের আপত্কালীন ব্যয় আগের অর্থবছরের শেষে এবং পরবর্তী অর্থবছরের বর্ষা শরত্কালে চলতে থাকে। একটু খতিয়ে দেখলে স্পষ্ট হবে, সমগ্র অর্থবছরব্যাপী সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে একটি দুষ্টচক্র কাজ করে যায়। এদেরই যোগসাজশে সরকারের পরিকল্পিত আপত্কালীন ব্যয় অব্যবস্থায় ভোগে। এরাই আগাম বর্ষার অজুহাতে বিশৃঙ্খলভাবে প্রকল্পের কাজ করতে থাকে। অথচ জুনের ভেতরেই প্রকল্প শেষ করার তাগিদ থাকে। তাই বর্ষার শুরুতে তড়িঘড়ি করে প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা করতে হয়। সরকারের অর্থ পরিকল্পনা এমন যে তাতে শেষ কোয়ার্টারের দুর্যোগের জন্য কোনো বিশেষ বিবেচনা থাকে না। দুষ্ট লোকেরা এটারই সুযোগ নেয়। তারা সামান্য কিছুতেই খারাপ আবহাওয়ার অজুহাত দিয়ে কাজ খারাপ করে। অজুহাতে তারা প্রকল্পটি ত্রুটিপূর্ণভাবে বুঝিয়ে দেয় অথবা সরকারকে বেকায়দায় ফেলে সময় ব্যয়বৃদ্ধি করে ছাড়ে। এভাবে অনেক প্রকল্প চরম অব্যবস্থা বা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। সুবিধাভোগীরা সবসময় ঘোলা জল সৃষ্টি করে তাদের ব্যর্থতার দায়ভার সরকারের ঘাড়ে চাপাতে চায়। আমি মনে করি, বর্তমান চলতি কায়দার জুলাই থেকে জুনের অর্থবছর এসবের জন্য অনেকখানি দায়ী।

সরকারের বাজেট অর্থছাড় প্রক্রিয়া সারা বছর চারটি কোয়ার্টারে বিভক্ত। জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বরের প্রথম কোয়ার্টার, যা সাংবার্ষিক বন্যায় বিপর্যস্ত থাকে। অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বর দ্বিতীয় কোয়ার্টারে হয় শীতের আগমন। জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ তৃতীয় কোয়ার্টার শেষে শীতের বিদায়। এপ্রিল, মে, জুন চতুর্থ কোয়ার্টারে দেখা দেয় আগাম বন্যার বিপর্যয়। অক্টোবর-নভেম্বর সাইক্লোনের মাস, এপ্রিল-মে আগাম বন্যার মাস। অতএব উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য প্রকৃত কাজের সময় পাওয়া যায় ডিসেম্বর থেকে মার্চ, দেড় কোয়ার্টার সময় মাত্র। বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা ফসলি পঞ্জিকা অর্থবছর গ্রহণ একটি অতিপ্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বলে আমি মনে করি। বাস্তবতার নিরিখে আমি দেখাব ফসলি পঞ্জিকা অনুযায়ী বাংলা অর্থবছর চালু হলে আমাদের কী কী সুবিধা হতে পারে। তবে এর আগে আমাদের বর্তমান অর্থবছর অন্যান্য কয়েকটি দেশের অর্থবছরের একটু তুলনা করে দেখি। নিচের তালিকায় পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের কয়েকটি দেশের অর্থবছর দেখানো হলো। দেখা যায় যুক্তরাজ্য, ভারত, জাপান ইত্যাদি দেশ তাদের বাস্তব চাহিদামতো বসন্তের শেষ থেকেই অর্থবছর গণনা করছে।

পাকিস্তানে বর্ষা শুরু হয় জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে (শ্রাবণ ভাদ্র মাস তাদের বর্ষাকাল) অতএব জুলাই থেকে ৩০ জুন অর্থবছর হওয়া তাদের জন্য বেশ সুবিধাজনক। ব্রিটিশরাজ থেকে একই সময়ে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত ভারত তাদের বাজেট ব্যয় ব্যবস্থায় ঋতু অনুযায়ী এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত অর্থবছর পালন করে। পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের বাজেট ব্যয় যে চারটি কোয়ার্টারে হিসাব সমাপ্ত করা হয়, তার শেষ কোয়ার্টারে আসে বৃষ্টি বন্যা। আর বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শেষ কোয়ার্টারেই সবচেয়ে বেশি দেখানো হয়। বাংলাদেশের চলতি অর্থ ব্যবস্থা আমাদের দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে হাওর অঞ্চলের ফসল উৎপাদন পরিবেশ ব্যবস্থাপনায়ও বিরূপ প্রভাব ফেলে চলেছে। আমরা পাকিস্তানি ঐতিহ্য ত্যাগ করে বাংলা ফসলি পঞ্জিকা অনুযায়ী অর্থবছর গ্রহণ করে নিলে সহজেই এসবের সমাধান পেতে পারি।

আমাদের অর্থবছরটি যদি চৈত্র মাসে শেষ হয় তাহলে মে-জুনে এলোপাতাড়ি বা তাড়াহুড়ো করে কাজ শেষ করার কোনো প্রয়োজন থাকবে না। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের কাজ যেহেতু পরবর্তী অর্থবছরের, তাই সময়-সুযোগ বুঝে করা যাবে। এতে সরকার বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়বে না, প্রকল্পগুলোও সুচারুভাবে সমাপ্ত করা যাবে। বাংলাদেশ সরকারের বার্ষিক বাজেট প্রক্রিয়ায় মে মাস নাগাদ এটি তৈরি হয়ে পার্লামেন্টে উত্থাপিত হয়। জুনের পার্লামেন্ট সেশনে এটি অনুমোদন পায়। অর্থবছর যখন শুরু হয় তখন চলে পুরোদমে বর্ষা। তাই সময়ে চলতি কাজগুলো শ্ল­ হয়ে যায়। বর্ষা শরৎ শেষে অর্থবছরের নতুন কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও অনেক সময় টেন্ডার ইত্যাদির জন্য পিছিয়ে যায়। তাই বাজেটের অন্তর্ভুক্ত নতুন কাজ শুরু হতে হতে হেমন্ত পেরিয়ে যায়। বাংলা অর্থবছর গ্রহণ করলে বাজেট যেটা জুনে পাস হয় তা হবে ফাল্গুন বা মার্চে। ফলে অনুমোদিত বাজেটের প্রস্তুতিমূলক কাজ বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে বা মে-জুনে শুরু করা যাবে। এরপর উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ হেমন্ত আসামাত্রই শুরু করার কোনো বাধা থাকবে না। সরকারি বাজেটের বর্ষাজনিত অব্যবস্থা দূর করতে পারলে সব ক্ষেত্রেই পরিস্থিতির উন্নতি করা সম্ভব হবে। আমরা বাংলা ফসলি পঞ্জিকা অনুযায়ী একটি হাওর পঞ্জিকা প্রণয়ন করেছি, যা পালন করলে ফসলহানি হবে না।

সারা বাংলায় প্রচলিত বর্তমান বাংলা পঞ্জিকাসূর্যসিদ্ধান্তমোতাবেক সবচেয়ে প্রাচীন, ‘বিশুদ্ধসিদ্ধান্তকিছুটা ভিন্ন; তবে বাংলাদেশের সরকারি পঞ্জিকাটি বহু সংশোধনের পর বর্তমানে একটি চমত্কার রূপ নিয়েছে। বর্তমানে এর বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র আশ্বিন মাস ৩১ দিনের এবং কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ চৈত্র মাস ৩০ দিনের করে গোনা হয়। ফাল্গুন ২৯ দিনের। তবে যে বছর ইংরেজি (গ্রেগরিয়ান) ক্যালেন্ডারে অধিবর্ষ (লিপ ইয়ার) হয় সে বছর ফাল্গুন মাস হয় ৩০ দিনের। ফলে ইংরেজি অধিবর্ষের বছর বাংলা ফাল্গুনের দ্বিতীয়ার্ধ বাদে বাংলা পঞ্জিকার দিনগুলো প্রতি বছরই ইংরেজি পঞ্জিকার নির্দিষ্ট তারিখে পড়ে। বাংলাদেশের ভূমি রাজস্ব আদায় এবং দেশব্যাপী ব্যবসাপাতি বাংলা ফসলি পঞ্জিকা অনুযায়ী সম্পাদিত হয়। সরকারি অর্থ ব্যবস্থায় বাংলা ফসলি পঞ্জিকা অনুসরণ করলে এটি একটি সামগ্রিক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে। চলতি ব্যয় ব্যবস্থার হিসাব ইংরেজি মাসওয়ারি হয় বিধায় অর্থবছরটি ভারতের মতো এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ করা যেতে পারে। তবে অর্থবছর শেষে সমাপ্ত কাজের আর্থিক হিসাব চূড়ান্ত করার জন্য ১৩ এপ্রিল বা ৩০ চৈত্র পর্যন্ত সময় দেয়া যেতে পারে।

. ইনামুল হক: সাবেক মহাপরিচালক, পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা; চেয়ারম্যান, জল পরিবেশ ইনস্টিটিউট