শনিবার | মে ০৮, ২০২১ | ২৫ বৈশাখ ১৪২৮

বিশেষ সংখ্যা

শকাব্দ থেকে বঙ্গাব্দের জন্মকথা

হুমায়ুন কবির

বঙ্গাব্দের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শকাব্দ। এটি ভারতবর্ষে প্রচলিত একটা প্রাচীন অব্দ। শকাব্দের উৎপত্তি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে যেমন মতভেদ আছে, তেমনি এর উৎস সম্পর্কে বিশদ জানাও যায় না। তবে বলা হয়ে থাকে শক-ক্ষত্রপদের (১৩০-৩৯৫ খ্রিস্টাব্দ) উদ্ভবের সঙ্গে শকাব্দের জন্মের যোগসূত্র রয়েছে। তাদের নিজস্ব দলিলপত্রে রাজ্যাভিষেকভিত্তিক সনের উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু সরাসরি শকাব্দ নেই। তবে তাদের বর্ষই যে পরবর্তী সময়ে শকাব্দে পরিণত হয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই।

শকাব্দের প্রারম্ভ বছর নিয়েও বিতর্ক আছে। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, এটি ৮৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। আবার কারো মতে এর শুরু ১২০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে। কেউবা মনে করেন, এটি ১২৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। তবে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আলবেরুনী উল্লেখ করেছেন যে বিক্রমাব্দ শকাব্দের মধ্যে পার্থক্য ১৩৫ বছর এবং শকাব্দের যাত্রা পরে। সুতরাং বিক্রমাব্দের শুরু ৫৭ খ্রিস্টপূর্ব হলে শকাব্দের শুরু ৭৮ খ্রিস্টাব্দে। পরবর্তী বেশির ভাগ ঐতিহাসিকই আলবেরুনীর তথ্যকেই সঠিক মনে করেন। মূলত প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থসূর্য সিদ্ধান্তেরসৌরবর্ষ গণনার বিধি মেনেই শকাব্দের মাস দিন গণনা করা হতো। অর্থাৎ রবিসংক্রান্তি অনুসারে অব্দে ক্ষণগণনার রীতি।

ভারতবর্ষে যে কয়টি অঞ্চলে শকাব্দের প্রচলন বেশি ছিল তার মধ্যে রয়েছে পাঞ্জাব, দাক্ষিণাত্য, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, রাজস্থান, দিল্লি তামিলনাড়ু। তালিকায় বাংলা অঞ্চলের নামও ছিল। এমনকি তুর্কি সেনাপতি বখতিয়ার খিলজির বঙ্গবিজয়ের পরও এখানে শকাব্দের প্রচলনের প্রমাণ মেলে। পরে তিনি শকাব্দের পাশাপাশি প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে হিজরি সনের ব্যবহার শুরু করেন। হিজরি সন অনুযায়ী চাষিরা জমির খাজনা দিতেন ফসল ওঠার অব্যবহিত পর। হিজরি সন চান্দ্রমাস অনুযায়ী হওয়ার ফলে ফসল তোলার সময়ের সঙ্গে রাজস্ব ব্যবস্থার সংগতি আনা কিছুতেই সম্ভব হচ্ছিল না। এদিকে অসময়ে খাজনা দিতে গিয়ে চাষিরা পড়ছিলেন চরম বিপাকে। সম্রাট আকবরের শাসনকালের ২৯ বছর পর সমস্যা সমাধানের পন্থা নিয়ে কথা ওঠে।

আকবরের রাজদরবারের খ্যাতিমান ঐতিহাসিক আবুল ফজল (নবরত্নের একজন) রীতিমতো হিসাব করে বুঝিয়ে দেন যে ৩২টি সৌরবর্ষ ৩৩টি চান্দ্রবর্ষের সমান হওয়ায় চাষিরা অতিরিক্ত এক বছরের খাজনা দিতে বাধ্য হবেন। খাজনা আদায় যাতে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে হয় এবং চাষিদের যাতে কোনোভাবেই অতিরিক্ত খাজনা না দিতে হয়, সে কথা মাথায় রেখে সম্রাটের নির্দেশ অনুযায়ী রাজজ্যোতিষী ফতেহউল্লাহ শিরাজি চান্দ্রমাস সৌরমাসভিত্তিক এক নতুন পঞ্জিকা তৈরি করেন। এর পেছনে শুধু খাজনা আদায়ে সুবিধা নয়, আকবরের ধর্মীয় চেতনা রাজনৈতিক অভিলাষও কাজ করেছিল। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সব জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি সর্বভারতীয় জাতি গড়তে চেয়েছিলেন তিনি। সেজন্য তিনি একটি অভিনব সমন্বয়বাদী ধর্ম প্রচার করেন। নাম দেন দীন--ইলাহী। প্রচলন করেন ইলাহী মুদ্রাও। মুদ্রা শিলালিপিতে আরবির পরিবর্তে ফারসি ভাষা চালু করেন। একই উদ্দেশ্যে নতুন সনও প্রবর্তন করেন, যার নাম দেয়া হয় তারিখ--ইলাহী।

আকবর সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন ১৫৫৬ সালে বা ৯৬৩ হিজরিতে আর নতুন পঞ্জিকা চালু হয় ১৫৮৪ সালে। পরে চালু হলেও সম্রাটের সিংহাসনে আরোহণের স্মৃতিকে চিরভাস্বর করে রাখতে ফতেহউল্লাহ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ বা ৯৬৩ হিজরি সনকে মূল ধরে তারিখ--ইলাহী বিন্যাস করেন। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার, ফতেহউল্লাহ শিরাজি কিন্তু নতুন পঞ্জিকাটি চালু করার সময় চান্দ্রমাসের আরবীয় মডেল ব্যবহার করেননি, করেছিলেন পারস্য মডেল, যা শকাব্দের মতোই সৌরমাসভিত্তিক ছিল। ১৫৮৫ সাল থেকে ফতেহউল্লাহ শিরাজি উদ্ভাবিত নতুন সালফসলি সননামে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যাপকভাবে প্রসিদ্ধি লাভ করে।

পরবর্তী সময়ে ফসলি সনই বাংলা সাল বাবঙ্গাব্দনাম ধারণ করে। প্রথমদিকে তারিখ--ইলাহির মাসগুলো ছিল যথাক্রমে ফারওয়ারদীন, আর্দিবিহিশত, খুরদাদ, তীর, মুরদাদ, শাহরীয়ার, মিহির, আবান, আজার, দে, বাহমান ইসপন্দর। যদিও পরবর্তী ঠিক কোন সময়ে মাসগুলোর নাম বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ইত্যাদিতে বিবর্তিত হয়, সে ব্যাপারে ঐতিহাসিকরা নির্দিষ্টভাবে কিছু বলতে পারেননি। তবে এটা নিশ্চিত, নাক্ষত্রিক নিয়মে বাংলা সনের মাসগুলোর নামকরণ করা হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন নামগুলো নেয়া হয়েছে ৭৮ খ্রিস্টাব্দে সাকা জাতির রাজত্বের সময় প্রচলিত শকাব্দ থেকে: . বিশাখা থেকে বৈশাখ। . জাইষ্ঠা থেকে জ্যৈষ্ঠ। . আষাঢ়া থেকে আষাঢ়। . শ্রাবণা থেকে শ্রাবণ। . ভাদ্রপাদা থেকে ভাদ্র। . আশ্বিনী থেকে আশ্বিন। . কৃতিকা থেকে কার্তিক। . পূস্যা থেকে পৌষ। . আগ্রৈহনী থেকে অগ্রহায়ণ। ১০. মাঘা থেকে মাঘ। ১১. ফাল্গুণী থেকে ফালগুণ। ১২. চিত্রা থেকে চৈত্র।

বাংলা সনের প্রথম বছর ছিল ৯৬৩ হিজরি। এর আগে কোনো বাংলা সন নেই। সঠিক হিসাবের জন্য পরিবর্তিত বাংলা সালের দৈর্ঘ্য হয় ৩৬৫ দিন। কিন্তু সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে পৃথিবীর ৩৬৫ দিন ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড লাগে। বাড়তি সময়টা সমন্বয়ে গ্রেগরীয় বর্ষে প্রতি চার বছর পরপর ফেব্রুয়ারি মাসের সঙ্গে একদিন যোগ করা হয়। শুরুর দিকে বাংলা সনে অতিরিক্ত সময়কে গণনায় নেয়া হয়নি। পরে ঘাটতি দূর করার উদ্যোগ নেয়া হয়।

বাংলা সনের প্রথম মাস হিসেবে বৈশাখ হওয়ার গল্পটিও মজার।তারিখ--ইলাহি আগে বাঙালিরা প্রচলিত শকাব্দ অনুযায়ী চৈত্র মাসকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে ব্যবহার করত। পরে যখন ৯৬৩ হিজরিতে হিজরি পঞ্জিকার প্রথম মাসমহররমবৈশাখ মাসে শুরু হয়, তার সঙ্গে মিল রেখে চৈত্রের বদলে বৈশাখকেই ধরা হয়তারিখ--ইলাহিরপ্রথম মাস। এরপর ১৯৬৬ সালে বাংলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে . মুহাম্মুদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে প্রচলিত বাংলা পঞ্জিকার সংস্কার করা হয়। . শহীদুল্লাহ বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস ৩১ দিনে এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র ৩০ দিনে গণনার সুপারিশ করেন। একই সঙ্গে তিনি কেবল লিপ ইয়ার বা অধিবর্ষের অতিরিক্ত দিনটি ফাল্পুন মাসে জুড়ে দেয়ার কথা বলেন এবং লিপ ইয়ার গ্রেগরীয় পঞ্জিকা অনুযায়ী বিবেচনা করতে বলেন। সরকার শহীদুল্লাহর প্রস্তাবগুলো মেনে নিয়ে ১৯৮৭ থকে তা সরকারিভাবে চালু করে। তারপর থেকেই বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল নববর্ষ পালন করা হয়।

মোটা দাগে হলো শকাব্দ থেকে বঙ্গাব্দের জন্মবৃত্তান্ত। শুধু শকাব্দ নয়, বঙ্গাব্দের সঙ্গে ইসলামী হিজরি খ্রিস্টান গ্রেগরীয় পঞ্জিকাও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এটা অস্বীকার করার জো নেই। অথচ দুঃখজনক বিষয় হলো, আমরা নিজস্ব ঐতিহ্য সম্পর্কে ব্যাপকভাবে উদাসীন এবং বংলা পঞ্জিকাকে নিছকই ব্যবসায়ীদের হালখাতার একটা অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করি। অন্য ক্ষেত্রে অনেকটা একে অবহেলা করি। ধরনের মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা জরুরি।

মনে রাখা চাই, আমাদের আর্থসামাজিক বাস্তব জীবনযাত্রা বিশাল গ্রামীণ জনপদের প্রায় প্রতিটি কর্মকাণ্ড উৎসব-অনুষ্ঠানে বাংলা সনের ব্যবহার ব্যাপক অপরিহার্য। সেই বিবেচনায় সন আমাদের জাতীয় জীবনে বেশ গুরুত্ববহ; সামাজিক, ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক দিক থেকেও ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত আলোচিত তথ্যগুলো আকবরের আমলে চান্দ্র হিজরি অব্দের সংস্কারের মধ্যেই বঙ্গাব্দের সূচনার ইঙ্গিত দেয়। এর বিপরীত কোনো ঘটনা নির্দেশক বিশ্বাসযোগ্য তথসূত্র আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত মতই গ্রহণযোগ্য। বাংলা সন আমাদের প্রাত্যহিক জীবন কৃষিব্যবস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। এটি নিয়ে উন্মোচনমূলক, বিস্তৃত গবেষণার অবকাশ রয়েছে। নতুন প্রজন্মের গবেষকরা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে সচেষ্ট হবে বলে ধারণা।

হুমায়ুন কবির: সাংবাদিক