শনিবার | মে ০৮, ২০২১ | ২৫ বৈশাখ ১৪২৮

বিশেষ সংখ্যা

চৈত্র-বৈশাখে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোক-উৎসব

সালেক খোকন

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা কীভাবে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়? চৈত্র-বৈশাখে তাদের উৎসবগুলো কেমন? সেসব জানতে ঘুরে বেড়িয়েছি সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী গ্রামগুলোতে। খুব কাছ থেকে দেখেছি তাদের উৎসবকেন্দ্রিক আচারগুলোও। তা জানাতেই লেখার অবতারণা।

সমতলের পাহান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের দিয়েই শুরু করছি। গবেষকরা মনে করেন মুণ্ডা জাতির পুরোহিতরাইপাহাননামে পরিচিত। কিন্তু বাংলাদেশে বসবাসরত পাহানরা নিজেদের আলাদা জাতি হিসেবেই পরিচয় দেয়। এদের পূর্বপুরুষরা এসেছে ভারতের ছোট নাগপুর রাঁচি থেকে। অধিকাংশের বসবাস উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর, বগুড়া নওগাঁয়।

বৈশাখের আদি রীতি অনুসারে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা নতুন বছরের প্রথম সকালে পান্তা ভাত খায়। কেন? এমন প্রশ্নের উত্তর মেলে সত্তর বছর বয়সী শ্যামল পাহানের মুখে। তার বাড়ি দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জের শালবনের ভেতরে, পাহান গ্রামে। গানের সুরে তার উত্তরটি ছিল এমন

হামে লাগে প্রথমে আদি বাসীই

পনতা ভাত ভালোবাসি...’

ওই দিন দুপুরে ভাতের সঙ্গে এরা ১২ ভাজা অর্থাৎ ১২ পদের তরকারি রান্না করে। সন্ধ্যায় ঠাকুরকে ভক্তি দিয়ে নাচগানের আয়োজনও করে এরা।

বৈশাখের মতো চৈত্রের শেষদিনেও পাহানরা পালন করে নানা আচার। ওইদিন বাড়িঘর পরিষ্কার করে একে অন্যের গায়ে কাদা আর রং ছিটায় এরা। পূর্বপুরুষদের রীতি অনুসারে যার গায়ে কাদা বা রং দেয়া হয় তাকেই খেতে দিতে হয় প্রিয় পানীয় হাঁড়িয়া। পাহানরা বিশ্বাস করে এতে তাদের বন্ধুত্ব আরো সুদৃঢ় হয়। চৈত্রের শেষদিন এবং বৈশাখের প্রথম দিনের উৎসবকে পাহানরা বলে সিরুয়া-বিসুয়া।

এছাড়া তারা চৈত্র মাসেই চৈতালিপূজার আয়োজন করে। রোগ থেকে মুক্তি পেতে ঠাকুরের কৃপালাভই পূজার উদ্দেশ্য। আগের রাতে উপোস থেকে পরেরদিন দুপুরে পূজার প্রসাদ দিয়ে উপোস ভাঙাই এর নিয়ম। মঈনকাটা বা বেলগাছের নিচে মাটির উঁচু ডিবি তৈরি করে, লাল নিশান আর ধূপ কাঠি টাঙ্গিয়ে, পান, সুপারি, দুধ, কলা, দূর্বাঘাস, বাতাসা, কদমফুল, সিঁদুর, হাঁড়িয়া দিয়ে ধূপ জ্বালিয়ে ঠাকুরকে পূজা দেয়া হয় চৈতালিপূজায়। একই সঙ্গে বলি দেয়া হয় মানতের কবুতর, হাঁস কিংবা পাঁঠা। পূজা শেষে চলে খিচুড়ি খাওয়া। রাতভর চলে হাঁড়িয়া খাওয়া আর নাচ-গান।

পাহানদের মতো সাঁওতালদের আদি উৎসবগুলোও আবর্তিত হয় নানা ঋতুকে ঘিরে। আদি আচার পালনের মাধ্যমে এরা যেমন নতুন বছরকে বরণ করে, তেমনি চৈত্রের শেষে বাহাপরব উৎসব পালন করে ধুমধামের সঙ্গে। দিনাজপুরের মহেশপুর গ্রামে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের বাহাপরব বৈশাখ উদযাপন প্রত্যক্ষ করেছি খুব কাছ থেকে।

সাঁওতালদের ভাষায়বাহামানেফুলআরপরবমানেঅনুষ্ঠানবাউৎসব শালফুলকে সাঁওতালরা বলেসারজম বাহার বাহাপরবের অনুষ্ঠানে এরা শালফুলকে বরণ করে নেয় কিছু আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে। এর আগে সাঁওতাল নারীরা ফুল ব্যবহার থেকে বিরত থাকে।

উৎসবে গোত্রপ্রধান উপোস অবস্থায় পুজো দেন বোঙ্গার (দেবতা) সন্তুষ্টি লাভের জন্য। একটু উঁচু জায়গায় তিনটি ধনুক গেড়ে দেয়া হয়। কুলার মধ্যে রাখা হয় চাল, সিঁদুর, ধান, দূর্বা ঘাস আর বেশকিছু শালফুল। উৎসবের প্রথমদিন পুজোর মাধ্যমে প্রথমে মুরগি বলি দেয় এরা। অতঃপর সাঁওতাল নারীরা শালফুল গ্রহণ করেন নানা আনুষ্ঠানিকতায়। একই সঙ্গে ওই দিনই বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিলি করা হয় শালফুল। যে ফুল বিলি করে তাকে পা ধুয়ে বাড়ির ভেতরে নেয়া হয়। সাঁওতালদের বিশ্বাস এভাবে ফুল রূপে দেবতা বা বোঙ্গাই তার ঘরে প্রবেশ করে।

দ্বিতীয় দিনে সাঁওতালরা একে অন্যের গায়ে পানি ছিটানো অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এদের বিশ্বাস পানি ছিটানোর মধ্য দিয়ে পুরনো যত হিংসা, বিদ্বেষ, শত্রুতা আছে তা দূর হয়ে যায়। বাহাপরবের তৃতীয় দিনটিতে চলে শুধুই নানা আনন্দ আয়োজন। খোঁপায় শালসহ নানা রঙের ফুল ঝুলিয়ে, হাত ধরাধরি করে নাচেন নারীরা। কণ্ঠ আকাশে তুলে তারা গায়:

তোকয় কোকে চিয়ে লেদা বীর দিসাম দঃ,

তোকয় কোকে টান্ডি লেদা বীর দিসাম দঃ..’

বৈশাখের প্রথম প্রহরে সাঁওতালরা পুরনো বছরের পান্তা খেয়ে নতুন বছরের শুভ সূচনা করে। অতঃপর তাদের একদল তীর-ধনুক নিয়ে বেরিয়ে পড়ে শিকারে। অন্যরা দলবেঁধে নদীতে ছোটে মাছ মারতে। মাছ মারাকে সাঁওতালরা বলেহাকু গোজ চালাও নারীরা বাড়ি বাড়ি তেলের চিতল পিঠা তৈরি করতে থাকে। দুপুরে নানা পদ দিয়ে ভোজ সেরে নেয় এরা। এক সময় সাঁওতালরা বৈশাখে বিশ পদের রান্না দিয়ে ভোজ সারত। বিকাল থেকে সাঁওতাল গ্রামগুলোতে আয়োজন চলে ঝুমুর নাচের। সাঁওতাল নারীরা দলবেঁধে হাত ধরাধরি করে নেচেগেয়ে বরণ করে নেয় নতুন বছরকে। রাতভর চলে প্রিয় পানীয় হাঁড়িয়া খাওয়া।

তুরি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের উৎসব দেখতে একবার আমাদের পায়ের ছাপ পড়ে দিনাজপুরের লোহাডাঙ্গা গ্রামে। দারিদ্র্যের মধ্যেও এরা আঁকড়ে রেখেছে পূর্বপুরুষদের জাতধর্ম আর সংস্কৃতিটাকে। পুরনো বছরকে বিদায় নতুন বছরকে এরা বরণ করে নেয় আদি রীতিতে।

তুরিরা চৈত্র মাসের শেষ পাঁচদিন চৈতাবলি অনুষ্ঠান পালন করে। শুরুর দিন থেকেই এরা ছাতুগুড় খেয়ে নাচগান করে। চৈত্রের শেষদিন এরা বাড়িতে রান্না করে সাত পদের তরকারি। চৈত্রকে বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে চলে নাচ-গান পর্ব।

চৈত্রের পরের দিনই বৈশাখ। কিন্তু বৈশাখ শুরু হলেই তুরিরা বন্ধ করে দেয় মাছ-মাংস খাওয়া। পুরো এক মাস এরা খায় শুধুই নিরামিষ। বৈশাখের প্রতি রাতে তুরি পাড়াতে চলে কীর্তন। কীর্তন করতে হয় শুধুই পুরুষদের। সৃষ্টিতত্ত্ববিষয়ক কীর্তনই অধিক গাওয়া হয়। সময় দূর-দূরান্ত থেকে নানা বিশ্বাসের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা ভিড় জমায় তুরি পাড়ায়। বৈশাখের শেষের দিকে এরা প্রতি বাড়ি থেকে চাল তুলে একত্রে খিচড়ি রান্না করে খায়। ওইদিন আয়োজন হয় গান আর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নৃত্যের। এভাবেই বছরের প্রথম দিন থেকেই সৃষ্টিকর্তার কৃপালাভের আশায় চলে তুরিদের আদি আচারগুলো।

অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মতো ভুনজারদের জীবনপ্রবাহও নানা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে আবর্তিত হয়। চৈত্র মাসের শেষদিন আর বৈশাখ মাসের প্রথম দিনটি এরা পালন করে বিশেষ আচারের মাধ্যমে। তাদের ভাষায় এটি চৈত-বিসিমা উৎসব। উৎসবের অংশ হিসেবে চৈত্র মাসের শেষ সন্ধ্যায় বাসন্তী পূজা হয়। কেন এমন আচার? এর উত্তর মেলে দিনাজপুরের সীমান্তবর্তী বহবলদীঘির ভুনজার গ্রামের প্রধান বাতাসু ভুনজারের মুখে।

একসময় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী গ্রামগুলোতে চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না। তখন ডায়রিয়া আর বসন্তে মারা যেত শত শত লোক। রোগ থেকে মুক্তি পেতেই ভুনজাররা মাটির ঘটিতে আমপাতা, কলা, নারকেল, ধূপ আর চার ফোঁটা সিঁদুর দিয়ে ঠাকুরের পূজা করে। বসন্ত রোগ থেকে মুক্তির পূজা বলেই এর নামকরণ হয়েছে বাসন্তী পূজা। কেউ কেউ এদিনেই বলি দেয় মানতের হাঁস, মুরগি কিংবা পাঁঠা। এর আগে চৈত্রের শেষ শুক্রবার এরা উপোস থাকে। উদ্দেশ্য ঠাকুরের সন্তুষ্টি রুজি বৃদ্ধি। উপোস অবস্থায় খাওয়া যায় শুধুই ফলমূল আর দুধ। বাসন্তী পূজা শেষে ভুনজাররা কালাইসহ নানা ধরনের ছাতু-গুড় খেয়ে আনন্দ ফূর্তিতে মেতে ওঠে। রাতভর চলে নাচের আসর।

বৈশাখের প্রথম দিন খুব ভোরে ভুনজাররা দলবেঁধে বেরিয়ে পড়ে শিকারের উদ্দেশ্যে। তবে ঘর থেকে বের হওয়ার আগে এরা কাঁচামরিচ আর পেঁয়াজ দিয়ে সেরে নেয় পান্তা খাওয়া। এদের বিশ্বাস পান্তা খেলে সারা বছর গায়ে রোদ লাগলেও তারা কষ্ট পাবে না। পান্তার পানি বছরজুড়ে তাদের শরীরকে ঠাণ্ডা রাখবে। শিকার থেকে ফিরে ওই দিন বিকালেই শিকারগুলো দিয়ে এরা সম্মিলিতভাবে খিচুড়ি রান্না করে। রাতভর চলে নাচ-গান আর প্রিয় পানীয় হাঁড়িয়া খাওয়া। এভাবেই নতুন বছরকে বরণ করে নেয় ভুনজাররা।

আবার ওরাওঁ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা আদি থেকেই কৃষি পেশার সঙ্গে যুক্ত। তাই এদের উৎসবগুলোও আবর্তিত হয় ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে। বৈশাখের প্রথম প্রহরেই এরা দলবেঁধে শিকারে বের হয় তীর-ধনুক নিয়ে। কিন্তু তার আগেই এরা পুজো দেয় বাঘমন্ত্রীকে। এদের বিশ্বাস এটা না করলে শিকার তো মিলবেই না বরং জীবন হারানোর মতো বিপদ ঘটবে। ওইদিন রাতে চলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নাচ-গান আর প্রিয় পানীয় হাঁড়িয়া খাওয়া। এভাবে বছরের প্রথম দিনটিকে এরা দলবদ্ধতা বীরত্বের প্রতীক হিসেবে নানা আচার পালনের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করে।

এদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত নিজস্ব আচার, উৎসব সংস্কৃতি। দারিদ্র্য সংখ্যাগরিষ্ঠের আগ্রাসী সংস্কৃতির চাপে আজ তা প্রায় বিপন্ন। তবুও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা ধরে রেখেছেন নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উৎসবগুলোকে। যুগে যুগে যা সমৃদ্ধ করেছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাহিত্যকে।

সালেক খোকন: লেখক গবেষক