শনিবার | মে ০৮, ২০২১ | ২৫ বৈশাখ ১৪২৮

সিল্করুট

বাগদাদি ইহুদি ও সাসুন পরিবার

এমএ মোমেন

বাগদাদি ইহুদি

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে একজন বাগদাদি ইহুদির নাম জড়িয়ে আছে, তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল জেএফআর জ্যাকব (১৯২১-২০১৬), তার পরিবারের পূর্ব পুরুষদের একজন ভাগ্যান্বেষণে সপরিবার কলকাতায় এসে স্থিত হয়েছিরেন ঊনবিংশ শতকে। বাণিজ্যমেধা তাদের পৃথিবীর সর্বত্রই অঢেল সম্পদশালী করেছে। জ্যাকবের বাবা ইলিয়াস ইমানুয়েলও তাদের একজন।

বাগদাদি ইহুদিরা ইন্দো-ইরাকি ইহুদি হিসেবেও পরিচিত। মূলত বণিক সম্প্রদায় বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কেবল বাগদাদেই নিজেদের কেন্দ্রীভূত রাখেনি, প্রাথমিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে ভারত মহাসাগরীয় এবং দক্ষিণ চীন সাগরীয় বন্দরগুলোর দিকে। কোথাও কোথাও তারাই বন্দর প্রতিষ্ঠা করেছে। বাগদাদি ইহুদিদের আত্মীয়তার এবং বাণিজ্যের নেটওয়ার্ক যুগপৎ ছড়িয়ে পড়ে ভারত, সাংহাই, হংকং, সিঙ্গাপুর, বার্মা, মালয়েশিয়া, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ব্রিটেন।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী খ্যাতনামা পরিবারগুলোর একটি বাগদাদি সাসুন পরিবার। আরো কিছু সুপরিচিত ইহুদি পরিবারের নাম উল্লেখ করছি: আব্রাভানেল, আলেক্সান্ডার, ব্যারন কোহেন, বেফার্স, ডি কোস্টা, এলেন বোগেন, গুনজবার্গ, এজরা, গুটনিক, হেলেনস্টাইন, কার, নাহমাদ, পিয়ার্স, রুবেন্স, পিসারো, রনসন, সাচ্চি, স্যাকস, স্যামুয়েলসন, শেরম্যান, ওয়াইজম্যান, গোল্ডস্মিথ প্রমুখ।

আধুনিক চীন গড়ে উঠেছে দুটি বাগদাদি ইহুদি পরিবারের হাতেএকটি সাসুন পরিবার অন্যটি কাদুরি পরিবার।

ষোড়শ শতকে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবরের বিজয়ের পর পরই পার্শিয়ান ইহুদি বণিকদের আগমনের সূচনা, সম্রাট আকবরের সময়কার ধর্মীয় উদারতাবাদ পারস্যের বাইরে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য স্থানের ইহুদিদের আগমনের পথ সুগম করে। আরবিভাষী বাগদাদি ইহুদিরা প্রথমে সুরাটে এবং পরে মুম্বাইয়ে তাদের একটি অংশ কলকাতায় থিতু হতে শুরু করে। ঊনবিংশ শতকে বাগদাদের শাসক দাউদ পাশা কার্যত ইহুদি বিতাড়নের নীতি গ্রহণ করেন, তখন এক ধাক্কায় শতাধিক বাগদাদি ইহুদি বণিক ভারতবর্ষে চলে আসেন। এটা অনস্বীকার্য যে বিতাড়িত সাসুন, এজরা, মেয়ার, ইলিয়াস, বেলিলিউস জুডাহ এবং মেয়ার পরিবারের হাতেই গড়ে উঠেছে ভারত চীনেরসহ এশিয়ার বেশ টি শ্রেষ্ঠ শহর।

বাগদাদি ইহুদি নারী

বাগদাদ, বসরা, আলেপ্পোসহ আরবিভাষী ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থান থেকে ভারতে আসা ইহুদিদের দুটি প্রধান ঘাঁটি মুম্বাই কলকাতা। ১৯৪০ দশকে কলকাতায় তাদের সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ হাজার। তাদের নারীরা আরবের ধরনের পর্দা করলেও ১৯২০-এর দশকে ধীরে ধীরে নিজেদের আবরণ হ্রাস করে। কত্থক নৃত্যশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন রিম সিসোদিয়া, সিনেমাতে আসেন নাদিরা। মোজেল এজরা হয়ে ওঠেন সম্প্রদায়ের নেত্রী এবং স্থাপন করেন কলকাতা এজরা হাসপাতাল। তার পুত্র র্যাচেল এজরাও সমাজকর্মের জন্য খ্যাতিমান। ১৮৮১ সালে নিম্ন মধ্যবিত্ত ইহুদি কন্যাদের জন্য গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়, ধনীর কন্যাদের জন্য প্রাইভেট স্কুল। ১৯১৩ তে কলকাতায় স্থাপিত হয় ইহুদি নারী লিগ। সাসুন পরিবার স্কুল স্থাপন করে। মুম্বাইতে জর্জিয়েও অ্যানি নিশ্চিত করতেন যেন দুপুরে হাসপাতালের ইহুদি ওয়ার্ডে ভালো খাবার পরিবেশন করা হয়। ইহুদিরা বাংলায় এসে ধর্মান্তরিত হয়েছে এমন নজির কম, কিন্তু বাগদাদি ইহুদি নারীর প্রেমে বিশিষ্ট হিন্দুর ইহুদি ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার ঘটনা বিরল নয়। কলকাতার হান্নাহ সেন (বাবা ধর্মান্তরিত আইনজীবী) বোম্বে গার্লস স্কুলের প্রিন্সিপাল হলেন, ফ্লোরেন্স হাস্কেল সম্পাদনা করলেন জায়ন মেসেঞ্জার। সিনেমায় খ্যাত হন সুলোচনা (রুবি মেয়ার্স), প্রমিল রামালা (এস্থার ভিক্টোরিয়া আব্রাহাম), নাদিরা (ফ্লোরেন্স এজিকিয়েল); মার্সিয়া ম্যানসফিল্ড ভারত থেকে ব্রিটেনে গিয়ে ব্রিটিশ থিয়েটার, টেলিভিশন সিনেমায় খ্যাত হলেন। পার্ল হলেন অস্ট্রেলিয়ায় ভারতের রাষ্ট্রদূত। তার প্রথম স্বামী হিন্দু, দ্বিতীয় স্বামী মুসলমান। কলকাতার আইরিস ফেরিস লন্ডনে গিয়ে হলেন গার্লস গাইডের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি, জেনারেল রিনা আইনি ভারতের হয়ে অলিম্পিকে গেলেন, স্যালি মেয়ার লুইস আমেরিকার নামজাদা প্রফেসর। তার বিখ্যাত চিত্রশিল্পী অমৃতা শেরগিলও পৈত্রিক সূত্রে ধারার নারী।

বাগদাদি ইহুদিদের একটি বড় অংশ ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ভারত থেকে বিপুল সংখ্যক সেখানে চলে গেছে। একটি ক্ষুদ্র অংশ এখনো ভারতবাসী।

সাসুন পরিবার

প্রাচ্যের রথসচাইল্ডস হিসেবে পরিচিত সমাদৃত বাগদাদের সাসুন পরিবার। পরিবারের সূচনা আইবেরিয়ান রাজদরবারের কোনো কর্মকর্তার উত্তরসূরি হিসেবে দ্বাদশ শতকে। তারপর তারা বিভিন্ন ইসলামী শাসকের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। অষ্টাদশ শতকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনী পরিবারগুলোর একটিতে উন্নীত হয় সাসুনরা। তারা যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন নিজেদের যোগসূত্র লেনদেনের মাধ্যমে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ অলিখিত করপোরেট রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

পরিবারের প্রথম সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব সাসুন বেন সালিহ (১৭৬০-১৮৩০) এবং তার পরিবারের কজন বাগদাদ এবং দক্ষিণ ইরাকের পাশাদের (শাসক) খাজাঞ্চিখানার (ট্রেজারি) প্রধান কর্মকর্তা ছিলেন। তাদের প্রতি অবন্ধুসুলভ একজন গভর্নর দাউদ পাশা নিয়োজিত হলে তার পুত্র ডেভিড জোসেফ গা ঢাকা দেন। ডেভিড সাসুন (১৭৯২-১৮৬৪) প্রথমে পারস্য উপসাগরীয় বন্দর বুশের পৌঁছেন। প্রায় চার বছর সেখানে অবস্থানের পর ১৮৩২ সালে তার পরিবার নিয়ে ভারতের মুম্বাই এসে স্থায়ী আবাসন স্থাপন করেন। শুরুতে ব্রিটিশ টেক্সটাইল ফার্ম পারস্য উপসাগরীয় বণিক গোষ্ঠীর মধ্যে দালালি ব্যবসায় নিজেদের সুরক্ষিত করেন, আর সে সময় তাদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায় আগে থেকেই ভারতে সুপ্রতিষ্ঠিত পারস্যদেশীয় বণিক সম্প্রদায়, তাদের মূল ব্যবসা ছিল আফিম রফতানি। চীন-ভারত আফিম বাণিজ্য তারাই নিয়ন্ত্রণ করত।

ব্রিটেনের সঙ্গে নানকিং চুক্তির (১৮৪২, আফিম যুদ্ধের পর শান্তি স্থাপনের চুক্তি) পর চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের পথ খুলে যায়। ডেভিড ত্রিমুখী ব্যবসা শুরু করেনভারতীয় সুতা আফিম রফতানি করছেন চীনে, চীন থেকে কেনা ভোগ্যপণ্য বাণিজ্যিক দ্রব্য নিয়ে আসছেন ব্রিটেনে, আবার সেখান থেকে ল্যাঙ্কশায়ার কাপড় নিয়ে আসছেন ভারতে। তিনি চীনের বাণিজ্য সামলাতে পুত্র ইলিয়াস ডেভিড সাসুনকে পাঠান ক্যান্টন। সেখানে থাকে ২৪ জন প্রতিদ্বন্দ্বী পার্সিয়ানের সঙ্গে তাকে লড়তে হয়। তিনি তার একটি অফিস খোলেন সাংহাইতে। তিনি ভারতীয় পার্সি জামসেদজি জেজিভয়কে অংশীদার করে নিয়ে ব্যবসা চালাতে থাকেন। ডেভিড বিপুলসংখ্যক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেন। চীনে তিনি যেভাবে বাণিজ্য সম্প্রসারণ করেছেন, তার মূলধন এসেছে মূলত আফিমের বাণিজ্য থেকে। জোসেফ (১৭৯৫-১৮৭২) এলেন সিরিয়ার আলেপ্পোয়, সেখান থেকে বাণিজ্য সম্প্রসারণ করেন আলেক্সান্দ্রিয়া এবং এথেন্স পর্যন্ত, সেখানে জাহাজ কোম্পানি স্থাপন করেন এবং ব্যাংকিং মুদ্রা বিনিময় ব্যবসা শুরু করেন। তার পাঁচ পুত্র প্রত্যেকেই সাফল্যের সঙ্গে তাদের ব্যবসা বাড়াতে থাকেন। জোসেফ মিসরের দিকে মনোযোগ দেন এবং সেখানে জোসেফ সাসুন অ্যান্ড সন্স প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইজিপশিয়ান কটন রফতানি বাজার হস্তগত করেন। তার সন্তান ইলিয়াস সাসুন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় নেমে কায়রো শহরের স্থাপত্যই পাল্টে দেন। শহরের বড় উঁচু ভবনগুলো তারই পরিকল্পনা, জমির দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকে, কায়রোর অর্থ বাজার এতটাই রমরমা হয়ে ওঠে যে তিনি সেখানে ব্যাংক স্থাপন করেন। ইলিয়াস সাসুন দূরদর্শী মানুষ ছিলেন, বুঝতে পারেন সামনের দিনগুলোয় রাজত্ব করবে পেট্রোলিয়াম। তিনি বার্মা অয়েল কোম্পানি, টার্নিশ অয়েল কোম্পানি অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানির বিপুল শেয়ার ক্রয় করেন। মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে তেল পাওয়ার সম্ভাবনা মাথায় রেখে ইরাক পেট্রোলিয়াম কোম্পানি টার্কিশ পেট্রোলিয়াম কোম্পানিতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেন। মূলত তেল সরবরাহের লক্ষ্যে দূরদৃষ্টি সম্পন্ন সাসুন বাগদান বার্লিন রেলওয়ে স্থাপনের কাজ শুরু করেন। উসমানিয়া সাম্রাজ্যে তিনিই রথচাইল্ডসের বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রধান এজেন্ট। তার নেতৃত্বেই ব্রিটিশ বিনিয়োগকারীদের কনসোর্টিয়াম প্রতিষ্ঠিত হয়। তার ব্যাংকিং ব্যবসা আফ্রিকা প্রাচ্যে সম্প্রসারিত করতে শুরু করেন।

১৯৫৭ সালে মিসরে বিপ্লবোত্তর গামাল আব্দুল নাসের সরকার ক্ষমতাসীন হলে ইহুদি সম্প্রদায়কে বহিষ্কার করতে শুরু করেন। অনেককেই তাদের প্রতিষ্ঠিত সব স্থাপনা সম্পদ ফেলে কেবল একটি স্যুটকেস নিয়ে মিসর ত্যাগ করতে হয়েছে। সাসুন পরিবারের সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়, ইলিয়াস সাসুন তার স্ত্রীকে ধরে আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরে এনে বিদেশগামী জাহাজে তুলে দেয়া হয়। ইলিয়াসের স্ত্রী যদিও মিসরীয় নাগরিক, তাকে অনাগরিক এবং অবাঞ্চিত ব্যক্তি ঘোষণা করা হলো। তাদের কেবল ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট দিয়ে গ্রিসে পাঠানো হলো। তাদের পুত্র এডুয়ার্ডো ইলিয়াস সাসুন আলেক্সান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্র। তাকে এক্সিট ভিসা না দিয়ে আটকে রাখা হলো। সাসুনদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের অবৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে ইহুদিদের সম্পদ বিক্রয়ের অর্থ নগদ অর্থ ইউরোপে পাচার করা হয়েছে। সে অর্থ ফেরত না দেয়া পর্যন্ত তাদের পুত্রকে জিম্মি হিসেবেই থাকতে হবে। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স গ্রিক সরকারের হস্তক্ষেপে মিলিয়ন ডলার মুক্তিপণ দিয়ে এডুয়ার্ডো ইলিয়াস সাসুনকে দেশত্যাগের অনুমতি হয়। মাঝখানে কেটে যায় সাত বছর। ১৯৭১ সালে তিনি পরিবারের সঙ্গে একত্রিত হন। জোসেফ সাসুন তার পরিবারের অর্থ বিনিয়োগ করা আছে বিশ্বখ্যাত কতগুলো প্রতিষ্ঠানেএগুলোর মধ্যে রয়েছে লা মেরিডিয়ান হোটেল, এয়ার ফ্রান্স, আমেরিকান এক্সপ্রেস, বিএইচপি বিলিটন, ওয়েলস ফার্গো ব্র্যাংক, এইচএসবিসি, লেহমান ব্রাদার্স, এক্সন মোবিল, ফিলিপস, ফেনডি, জর্জিও আরমানি মাইক্রোসফট, মিডল্যান্ড ব্যাংক, ফ্যাঙ্কেল পোলান, সান মাইক্রোসিস্টেম ইত্যাদি। ইলিয়াস সাসুনের মৃত্যুর সময় সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনে ঘোষণা দেয়ার প্রয়োজন হয়নি এমন অর্থের পরিমাণই ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়।

ডেভিড সাসুনের পুত্রদের মধ্যে আলবার্ট আবদুল্লাহ ডেভিড সাসুন ছিলেন প্রিন্স অব ওয়েলস, পরে রাজা সপ্তম এডওয়ার্ডের বন্ধু। আলবার্টের ছেলে স্যার এডওয়ার্ড আলবার্ট সাসুন রথচাইল্ডস পরিবারে বিয়ে করেন এবং তিনি তিনবার রক্ষণশীল দলের এমপি নির্বাচিত হন। ডেভিড ইংরেজ কবি সিগফ্রিড সাসুনের প্রপিতামহ। ডেভিডের পরিবার থেকে দুজন ইহুদি ধর্মযাজকও হয়েছেন।

সিগফ্রিড সাসুনের বাবা -ইহুদি নারী বিয়ে করায় উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্য সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হন। সিগফ্রিডের একমাত্র ছেলে জর্জ থর্নিক্রফ সাসুন একজন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী লেখক। তার তিনটি গ্রন্থ: দ্য মান্না-মেশিন, দ্য কাবালাহ ডিকোডেড এবং দ্য রেডিও হ্যাকার্স কোডবুক।

সাসুন পরিবারে বিখ্যাত ব্যবসায়ী আরো কয়েক জন সাসুন রয়েছেন। পরিবারগুলো তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল। মিসরের বিপ্লবী সরকার সাসুনদের ইহুদি সম্পদের রক্ষক পাচারকারী বলে যে অভিযোগ করেছিল, অনেক দেশেই একই অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। বাস্তবে ইহুদি আত্মীয়তার নেটওয়ার্ক, বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক ধর্মীয় নেটওয়ার্ক একই সূত্রে গাঁথা।

রচনা আর একজন সাসুনের উল্লেখ করা হবে, তিনি ভিক্টর সাসুন।

প্রাচ্যের প্লেবয় স্যার ভিক্টর সাসুন

অশ্ব, নারী সম্পদতার সব আবেগ উদ্যমজুড়ে তিনের অবস্থান। পারস্পরিক প্রতিযোগিতায় কোনোটিই তার কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ১৯৩০-এর দশকের প্রথম দিকে তিনি যখন সাংহাই এসে পৌঁছলেন, তখনকার নাগরিকদের কেউ বুঝতে পারেননি কোনো ঢেউ এসে তাদের জমিনের ওপর উপচে পড়ল। মানুষটির সম্পদ এবং সম্পদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি সাংহাই নগরজীবনের নতুন মানচিত্র রচনা করল। আরামদায়ক জীবনযাপন, বিলাসিতার সামগ্রী এবং নিত্যকার পার্টি প্রমাণ করল প্রাচ্যের ভোগের রাজধানী হচ্ছে সাংহাই।

ভিক্টর পড়াশোনা করেন ইংল্যান্ডে, কেমব্রিজ থেকে স্নাতক হওয়ার পর প্লেবয় হিসেবে ভিক্টর পরিচিত হয়ে ওঠেন। প্রথম মহাযুদ্ধ এসে গেলে তিনি রয়াল ফ্লাইং কোরে যোগ দেন এবং একটি দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হন। বাকি জীবন তাকে দুটি সিলভারের লাঠি ভর দিয়েই চলতে হয়েছে। তিনি মুম্বাই ফিরে দেখলেন মহাযুদ্ধোত্তর ভারত অস্থির অবস্থায় আছে, রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলছে, অন্যদিকে যুদ্ধের ব্যয় পুষিয়ে নিতে ব্রিটিশ সরকার উচ্চাহারে কর ধার্য করেছে; ১৯২৪ সালে পিতার মৃত্যুর পর তিনি যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পেলেন, ১৯৩১ সালের মধ্যে ভারতে তার যা কিছু উত্তরাধিকার সব গুটিয়ে সাংহাই চলে গেলেন।

সেখানে গিয়ে শুরু করলেন বড় বড় নগর, জমি ক্রয় এবং নির্মাণ করতে থাকলেন বিশাল এক একটা ভবন-ব্রডওয়ে ম্যানশনস, গার্ডেন ব্রিজ, এমবাংকমেন্ট হাউজ (তখনকার চীনের সবচেয়ে বড় ভবন), ক্যাথি ম্যানশনস, গ্রসভেনর গার্ডেনস, মেট্রোপল হোটেল, হ্যামিল্টন হাউজমধ্য ১৯৩০ দশকে তিনিই হয়ে উঠলেন কেবল সাংহাইয়ের নয় সমগ্র চীনের সবচেয়ে বড় রিয়েল স্টেট ডেভেলপার।

তার অতিথি হয়ে এলেন চার্লি চ্যাপলিন, নোয়েল কাওয়ার্ড সুন্দরী শ্রেষ্ঠ বহু নারী।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় জাপানি বোমাবর্ষণে তার অনেক স্থাপনা ধ্বংস হয়, অনেকগুলো মেরামতের অযোগ্য হয়ে পড়ে। ১৯৪৬ সালে সচেতন ভিক্টর স্পষ্ট টের পেলেন চীন দ্রুত বদলে যাচ্ছে, জনযুদ্ধ আসন্ন। তিনি তার সম্পদ বিক্রি করতে শুরু করলেন। তিন বছর পর কমিউনিস্টরা যখন ক্ষমতা দখল করল, ভিক্টর সাসুন জানলেন, তার চীনে ফেরার আর পথ খোলা নেই। মাও সেতুংয়ের দল যখন ক্ষমতা দখল করল, আমেরিকায় পথে ভিক্টর চললেন, আমি ভারত ছেড়ে এসেছিলাম, চীন আমাকে ছেড়েছে।

 

এমএ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা