শনিবার | মে ০৮, ২০২১ | ২৫ বৈশাখ ১৪২৮

সিল্করুট

সাংহাই রাজত্বের অবিনাশী সম্রাট

হারুন রশীদ

১৯৪১ সালে জাপান যখন পার্ল হারবার আক্রমণ করে, চীনারা তারও ১০ বছর আগে থেকে জাপানি বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। প্রায় এক দশক ধরে তারা জাপানিদের কাছ থেকে দেশকে মুক্ত করার সংগ্রাম করে যাচ্ছিল। ১৯৩২ সালে মাঞ্চুরিয়াকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য জাপানিরা প্রাচ্যের প্যারিস বলে খ্যাত চীনা অর্থনীতির ভিত্তিভূমি সাংহাই আক্রমণ করেছিল। সে সময় সাংহাই শহরের কেন্দ্রস্থলে আটকা পড়েছিল পশ্চিমা ব্যবসায়ী কূটনীতিকদের একটা বসতি। আশ্চর্যজনকভাবে বোমার আগুন তাদের স্পর্শ করতে পারেনি। কারণ সাংহাইয়ের কেন্দ্রস্থলে সেই পশ্চিমা বসতির মধ্যে ছিলেন ভিক্টর সাসুন নামের এক ধনকুবের, যিনি তার বাণিজ্য সাম্রাজ্যের ঢাল দিয়ে জাপানি আগ্রাসন থেকে আড়াল করে রেখেছিলেন পশ্চিমা সমাজকে। তিনি পশ্চিমা স্বার্থরক্ষার পাশাপাশি ইউরোপ থেকে পালিয়ে আসা হাজার হাজার ইহুদিকেও আশ্রয় দিয়েছিলেন।

ভিক্টর সাসুন বাগদাদের এক বিখ্যাত ইহুদি পরিবারের সন্তান। উনিশ শতকের শুরুতে ভিক্টরের প্রপিতামহ ডেভিড সাসুন ৩৭ বছর বয়সে বাগদাদের শাসকের কোপানলে পড়ে এক মধ্য রাতে পালিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন এবং দুই পুরুষের মধ্যে রথচাইল্ড পরিবারের মতো প্রভাবশালী সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। ভিক্টরের পিতামহ পারিবারিক ব্যবসার ধারা ছেড়ে E.D. Sassoon and Co. নামে নিজের একটি প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপন করেন। অক্লান্ত পরিশ্রমের সাহায্যে সাসুন পরিবার মুম্বাই সাংহাইতে নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে দাঁড় করান। তুলা আফিম ছিল তাদের বাণিজ্যিক অগ্রগতির প্রধান দুই স্তম্ভ।

ভিক্টর সাসুনের জন্ম ১৮৮১ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইতালির নেপলসে। তার পিতামাতা ভারতে যাওয়ার পথে সেখানে যাত্রাবিরতি করেন, যাত্রা বিরতির সে সময়ে তার জন্ম হয়। ভিক্টরের শিক্ষাদীক্ষা এবং বেড়ে ওঠা ইংল্যান্ডের ব্রিটিশ পরিমণ্ডলে।

বড় হওয়ার পর ভিক্টরকে মুম্বাই সাংহাই পাঠানো হয় পারিবারিক ব্যবসায় দেখাশোনা করার জন্য। তরুণ রমণীমোহন ভিক্টর ব্যবসা দেখাশোনার পাশাপাশি নারী, ঘোড়া এবং সম্পদের ওপর সমানভাবে ছড়ি ঘোরাতে পারঙ্গম হয়ে ওঠেন। ১৯১৪ সালে ইংল্যান্ড যখন মহাযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল, তখন দেশপ্রেমিক সাসুন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে রাজকীয় বিমান বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনায় তার বৈমানিক হওয়ার স্বপ্ন চিরতরে ঘুচে গেল। বাকি জীবন ধনকুবেরকে দুটো রুপালি হাতলের বেতের লাঠির ওপর ভর দিয়ে কাটাতে হয়েছিল।

এরপর সাসুন মুম্বাই ফিরে এসে বস্ত্র শিল্পের একজন প্রভাবশালী সদস্যে পরিণত হলেন, সেই সঙ্গে ঘোড়দৌড় সমাজেও নেতৃত্বের আসন গ্রহণ করলেন। ঘোড়দৌড় নিয়ে তিনি এতটাই মোহাবিষ্ট ছিলেন যে একবার মন্তব্য করেছিলেন There is only one race greater than the Jews and that is the Derby.

১৯২৪ সালে পিতার মৃত্যুর পর তিনি পারিবারিক ব্যবসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিলেন। তখন থেকে তিনি স্যার ভিক্টর সাসুন নামে সমাজে পরিচিত হতে শুরু করলেন। কিন্তু সে সময় ভারতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ট্যাক্সের হার দুটোরই ঊর্ধ্বমুখী ছিল। প্রখর বাস্তববাদী ভিক্টর বুঝতে পারলেন ভারতে এখন আর ব্যবসার সুবিধা হবে না। তিনি তার প্রায় সব বাণিজ্যিক কার্যক্রম সাংহাইতে সরিয়ে নিলেন।

সাংহাই গিয়ে সাসুন দেখলেন ওখানকার সামাজিক বাণিজ্যিক পরিবেশ দুটোই অনুকূল। সস্তা শ্রম, নিম্ন কর ইত্যাদি সুবিধা ছাড়াও বিদেশীরা আরো অনেক সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করতে পারে। প্রথম দিকে সাংহাইর ব্যবসায়ী সমাজ ভিক্টরকে বুঝতে পারেনি। তিনি যত না ঝানু ব্যবসায়ী ছিলেন, তার চেয়ে বেশি ছিলেন আর্থিক ব্যবস্থাপনার জাদুকর। মাত্র এক দশকের মধ্যে তিনি সাংহাই শহরের চেহারা পাল্টে দিলেন। শিগগিরই সাংহাইয়ের ব্যবসায়ী সমাজ স্যার ভিক্টরের অনুরক্ত হয়ে পড়ল। তারা দেখতে পেলেন আমেরিকার পরে সাংহাই শহরেই পৃথিবীর উচ্চতম দালানগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ত্রিশের দশকের মাঝামাঝিতে এসে সাসুন সাংহাইর শীর্ষ আবাসন ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন।

স্যার ভিক্টর সাসুনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান ক্যাথে হোটেল বা সাসুন হাউজ, যেটি বর্তমানে Fairmont Peace Hotel নামে পরিচিত। হোটেলটি ছিল নানকিং রোডের প্রবেশপথে, যা শহরের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। সাংহাই শহরের সবচেয়ে উঁচু ১০তলা দালানের প্রথম চারটি তলায় ছিল অফিস, শপিংমল দুটি ব্যাংক। তৃতীয় তলার পুরোটি ছিল .ডি. সাসুন অ্যান্ড কোংয়ের সদর দপ্তর। সেখান থেকে ভিক্টর সাসুন তার সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন। ওপরে বাকিতলাগুলো ছিল হোটেল। তার সময়ের এক কিংবদন্তি ছিল সাংহাই শহরের ক্যাথে হোটেল। আগাগোড়া মজবুত কংক্রিটের ঢালাই দিয়ে নির্মিত হোটেলটির চূড়া ছিল সবুজ রঙের পিরামিড আকৃতির, যা ১৯৩০-এর দশকে সাংহাই শহরের গৌরবজনক অগ্রগতির প্রতীক। হোটেলটি ছিল শিল্পকলার একটা মাস্টারপিস, হোটেলের আভিজাত্য সেবা ছিল অতুলনীয়। বিশ্বের খ্যাতনামা বরেণ্য লোকেরা হোটেলে থেকেছেন। যেমন কমেডিয়ান চার্লি চ্যাপলিন, প্রখ্যাত নাট্যকার নোয়েল কোয়ার্ডসহ আরো অনেকে।

১৯৩২ সালে যখন জাপানিরা সাংহাই আক্রমণ করে, ক্যাথে হোটেল এবং তার মালিক তখন বিখ্যাত সুপরিচিত। হোটেলটি সাংহাই শহরের চলমান যুদ্ধক্ষেত্রের এত কাছাকাছি ছিল যে এর কর্মী অতিথিরা হোটেল থেকে বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে লড়াই প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেতেন। ছুটে আসা বুলেটে হোটেলের বাইরের দেয়াল ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়েছিল। তবু আত্মপ্রত্যয়ী সাসুন বলতেন, তিনি যেন চলমান ওই যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখ সারিতে বসে ব্যাপারটা উপভোগ করছেন। একবার সাসুন একটু বাড়াবাড়ি দুঃসাহস দেখিয়ে ফেললেন। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হোটেলের সামনে গেলেন চলমান যুদ্ধ ক্যামেরায় ধারণ করার জন্য। হঠাৎ তার মাথার পাশ দিয়ে সাঁই করে একটা বুলেট ছুটে গিয়ে পেছনের জানালা ভেদ করে হোটেলে ঢুকে গেল। তাকে দেখে জাপানি স্নাইপার মনে হচ্ছিল বলে এক অতি সতর্ক চীনা সৈন্য গুলি করে বসেছিল। কিন্তু সে ঘটনা যখন চীনা জেনারেলের কানে গেল, তিনি জলদি একজন দূত পাঠিয়ে বললেন, তিনি খুব দুঃখিত ঘটনার জন্য। ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিকে সাজা দেয়া হবে। অন্যদিকে জাপানি বাহিনীও তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করল সম্মানিত ক্যাথে হোটেলের গায়ে বুলেটের দাগের জন্য। সাংহাই শহরে এতই বিস্তৃত ছিল স্যার ভিক্টর সাসুনের প্রভাব।


অস্ত্রবল সৈন্যবল দুটোতেই এগিয়ে থেকে চীনারা দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে গেলেও শেষমেশ জাপানিরাই শহরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করল। শুধু সাসুন প্রভাবিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এলাকাটা অক্ষত ছিল। সাংহাই আবারো নতুন করে জেগে উঠল। ১৯৩৫ সালের মধ্যে শহরের রিয়েল এস্টেট ব্যবসা আবারো তুঙ্গে উঠল এবং সাসুন আগের মতোই সেখানে রাজত্ব করতে লাগলেন।

আপাতদৃষ্টিতে স্যার ভিক্টরকে ধীরস্থির আশাবাদী দেখালেও ভেতরে ভেতরে তিনি খুব উদ্বিগ্ন বোধ করছিলেন। তিনি কোটি কোটি পাউন্ড বিনিয়োগ করেছেন সাংহাইতে, যদি জাপানিরা কোনো একদিন এসব দখল করে নেয়, তাহলে তিনি তার পূর্ব পুরুষের এক শতকের সব পুঁজি হারিয়ে ফেলবেন।

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যখন অবনতির দিকে যাচ্ছিল, তখন ব্যবসার অবস্থাও খারাপ হতে শুরু করল। হিটলার ক্ষমতায় আসার পর জার্মানিতে ধরপাকড় শুরু হলে ইহুদিরা দলে দলে দেশ ত্যাগ করতে শুরু করল। অনেক দেশ ইহুদিদের ঢুকতে দিচ্ছিল না। কিন্তু সাংহাই ছিল ব্যতিক্রম। সেখান যাওয়ার জন্য কোনো পাসপোর্ট লাগত না এবং তারা ইহুদি শরণার্থীদের জন্য দুয়ার খুলে রেখেছিল। সাসুন তাদের খাবার-দাবার এবং শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন। তাদের থাকার জন্য সম্পূর্ণ এমবাংকমেন্ট হাউজটি ছেড়ে দিলেন। তিনি ইহুদি শিশুদের দুধের খরচের জন্য অনেক টাকা-পয়সা খরচ করতেন।

একবার এক ইহুদি ডাক্তার এক পোলিও রোগীর জন্য অত্যাধুনিক যন্ত্র চাইলেন, যেটি এশিয়ার কোথাও ছিল না। স্যার ভিক্টর যন্ত্রটি পশ্চিম থেকে আনার ব্যবস্থা করে দিলেন। শুধু তা- না, তিনি সাংহাইর সব হাসপাতালে যন্ত্র রাখার নির্দেশ দিলেন এবং চাইনিজ বা ইউরোপিয়ান যে কাউকে যেন সেটা দেয়া হয়।

১৯৩৭ সালের গরমকালে এসে পরিস্থিতি আবারো অস্থিতিশীল হয়ে উঠল। পিকিংয়ের কাছে মার্কো পোলো ব্রিজে এক জাপানি সৈন্য অপহরণসংক্রান্ত গুজবকে কেন্দ্র করে আবারো আক্রমণ চালায় জাপান। দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। নগর হিসেবে গুরুত্বের কারণে সাংহাইবাসী আবারো ভয়াবহ যুদ্ধের তাপ অনুভব করল।

১৩ আগস্ট ১৯৩৭ বিকাল সাড়ে ৪টার সময় ব্লাডি স্যাটারডে নামক হত্যাকাণ্ডের সূচনা হয়, যখন চীনা বোমারু বিমান থেকে ইজুমো নামক এক জাপানি জাহাজে বোমা ফেলার চেষ্টা করা হয়। আকাশ থেকে দুটো বোমা যখন ছাড়া হয়, তখন নিচে সমবেত জনতার উল্লাস দেখা গিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে একটি বোমা গিয়ে পড়ল নানকিং রোডে ক্যাথে হোটেলের নিকটবর্তী প্যালেস হোটেলের ছাদে। হোটেলটি অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয় নিমেষে। তার পরের বোমাটি সবচেয়ে ভয়াবহ রক্তপাত ঘটায়। এটা ক্যাথে হোটেলের পাশ ঘেঁষে যাওয়া জনাকীর্ণ রাস্তার ওপর পতিত হয়। স্যার ভিক্টরের প্রধান সহযোগী লুসিয়েন ওভাডিয়া তখন নিজের অফিসে ছিলেন যখন বোমাটা বিস্ফোরিত হয়। দিনটা খুব গরম ছিল বলে তিনি দুটো জানালাই খুলে রেখেছিলেন। পাশের রাস্তার সেই বিস্ফোরণের প্রচণ্ড ধাক্কা এসে তাকে খড়ের পুতুলের মতো উড়িয়ে নিয়ে নিয়ে ছুড়ে দিল ঘরের অন্যপ্রান্তে। নিতান্ত ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি। আঘাত সামলে ওঠার পর তিনি ক্ষয়ক্ষতি দেখার জন্য নিচে নামেন। দেখা গেল তার হোটেলের অধিকাংশ জানালার কাচ ভেঙে চুরমার হয়ে গেলেও হোটেলটা অক্ষত আছে। দ্রুততার সঙ্গে ব্যবস্থা নিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হোটেলটা আবার চালু করা হয়।

কিন্তু হোটেলের বাইরের অবস্থা ছিল ভয়ানক। রাস্তার গাড়িঘোড়া সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সিটে বসা যাত্রীরা সব পুড়ে কয়লা হয়ে আছে। শত শত মরদেহ এমন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে যে তাদের চেনার কোনো উপায় নেই। বিচ্ছিন্ন হওয়া দেহাবশেষের অংশ ছিটকে হোটেলের পাঁচ-ছয়তলার দেয়ালেও লেগে ছিল।

ভয়ানক যুদ্ধের মধ্যেও সাসুন নিয়ন্ত্রিত সাংহাইয়ের আন্তর্জাতিক কমিউনিটি নিজেদের আবাসস্থলকে আলাদা করে বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। যুদ্ধের কোনো ছোঁয়া নেই বিদেশী অধ্যুষিত অঞ্চলে। জাপানিরা রিয়েল এস্টেটের ওপর কোনো আঘাত হানেনি, কারণ এতে ব্রিটেন আর আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। জাপানিরা ইঙ্গ-মার্কিন লোকদের সঙ্গে ঝামেলায় না গিয়ে তাদের কোমলতার সঙ্গে বুঝিয়ে দেয়, তারা ওই অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিল। চেষ্টা সাসুনের প্রতিরক্ষা দেয়াল ভেদ করতে সক্ষম হয়নি। তিনি সফলতার সঙ্গে জাপানিদের তার এলাকা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।

সাংহাইতে তখন বহু জাতের শরণার্থীতে পরিপূর্ণ। বাসস্থানের মূল্য যখন আকাশচুম্বী হয়ে গেছে, সাসুন তখন নিজের সম্পদ বৃদ্ধি করে যাচ্ছিলেন। সে সময় মার্কিন মিডিয়ার জনপ্রিয় ব্যক্তি হিসেবে তিনি সবসময় উত্তেজনাকর বক্তব্য দিতেন। ১৯৩৮ সালে আমেরিকা সফর করার সময় খোলামেলাভাবেই সাংহাই এর নতুন প্রভুর কঠোর সমালোচনা করে ইঙ্গিত দিলেন ইঙ্গ-মার্কিন-ফরাসি জোটের অর্থনৈতিক অবরোধ জাপানি আগ্রাসন থেকে চীনকে মুক্ত করবে সহসা। ১৯৩৯ সালের আরেক সফরে তিনি আমেরিকান রেডিওতে বলেন, জাপানি জনগণের উচিত শিগগিরই ক্ষমতালোভী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জেগে ওঠা। তার এসব বক্তব্যে জাপানি কর্তারা ক্ষেপে যায়, জাপানি সংবাদপত্রে তাকে গ্রেফতার করার জন্য আহ্বান জানানো হয়। তবু তার গায়ে হাত দিতে কেউ সাহস করেনি।

সাংহাইয়ের জাপানি কর্তৃপক্ষ স্যার ভিক্টরকে পরামর্শ দিতে শুরু করল যে এখানে তার যে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি এবং দালানকোঠা আছে, তাদের নিরাপত্তার জন্য জাপানিদের সাহায্য নেয়া উচিত। তাদের ইঙ্গিত ছিল সরাসরি। স্যার ভিক্টর যেন জাপানি কোম্পানির সঙ্গে তার কিছু সম্পদ একীভূত করেন। এক জাপানিজ কর্নেল দুজন সহকারীকে নিয়ে তার সাসুন হাউজে বেড়াতে এলেন। কর্নেল সাসুনকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে বাউ করলেন। সেই সঙ্গে সাসুনের ডান হাত ওভাডিয়ার আগমনেও একইভাবে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করলেন। তার কোমরে সামুরাই তরবারি ঝুলছিল। তিনি ওভাডিয়াকে একটা তালিকা দিয়ে বললেন, সাংহাইর কোনো কোনো দালানগুলোকে জাপানিরা সাসুনের সঙ্গে একীভূত করতে চায়। এক পলক চোখ বুলিয়ে সাসুন বুঝিয়ে দিলেন যে সম্রাটের সম্পত্তিগুলো পোকায় খাওয়া বস্তিঘরের চেয়ে সামান্যই উন্নত। রকম প্রস্তাবের কথা আগেভাগে অনুমান করে সাসুন আরেকটি বিকল্প তালিকা তৈরি করে রেখেছিলেন জাপানিদের দেয়ার জন্য। ওভাডিয়া সেটি কর্নেলের হাতে তুলে দিলেন। সে তালিকায় ছিল জরাজীর্ণ পরিত্যক্ত কিছু দালান। দেখে কর্নেল রাগে বিস্ফোরিত স্বরে বললেন, এটা জাপানিদের প্রতি একটা সরাসরি অপমান। আমরা আপনাকে কখনই ক্ষমা করব না।

সাসুনের সাম্রাজ্যে কোনোভাবে দাঁত বসাতে না পেরে এবং জোর করে নেয়ার উপায় না থাকাতে (উপায় না থাকার কারণ জাপান সরকারের উচ্চপদস্থ কিছু কর্তার সঙ্গে সাসুনের বন্ধুতা ছিল) জাপানিরা পরোক্ষ মাস্তানি ধরনের কৌশল অবলম্বন করল। তারা সাংহাইজুড়ে গুম, খুন নানা রকম অত্যাচার শুরু করল। চীনা ব্যবসায়ীদের অপহরণ করে আটকে মুক্তিপণ আদায় করা শুরু হলো। যেসব চীনা ব্যবসায়ী, ব্যাংকার সংবাদকর্মী অস্থায়ীভাবে সাসুনের সাম্রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছিল, তারা ছিল জাপানিদের প্রিয় টার্গেট।

স্যার ভিক্টরের সাম্রাজ্যে কোনোভাবেই হাত গলাতে না পেরে জাপানিরা শেষ চেষ্টা হিসেবে নতুন একটা পথে এগোল। ক্যাথে হোটেলে তার সঙ্গে একটা প্রাইভেট ডিনার পার্টির আয়োজন করা হলো। সেখানে কেতাদুরস্ত এক জাপানি অফিসার তার সঙ্গে যোগ দিয়ে জানালেন যে তিনি চীনা মুদ্রার ওপর অতিনির্ভরশীল হয়ে গেছেন। এটা কিন্তু ভালো হচ্ছে না। চীনাদের পরাজয় সময়ের ব্যাপার। চীনারা পরাজিত হলে তাদের মুদ্রাগুলো অচল হয়ে যাবে এবং স্যার ভিক্টর বিপদে পড়ে যেতে পারেন। স্যার ভিক্টর খুব নির্বিকার স্বরে বললেন, তিনি ওটা নিয়ে মোটেও চিন্তিত নন। সাংহাইতে বরং তার দেনার পরিমাণই বেশি। তার অধিকাংশ টাকা-পয়সা ভিন্ন দেশে, ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় রাখা আছে। জাপানি অফিসারের চোখ কপালে উঠল, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য যে স্যার ভিক্টরের মতো একজন ব্যাংকের দেনার ওপর ভাসছেন? স্যার ভিক্টর বললেন, আপনাকে বুঝতে হবে যেখানে চারপাশে এত চোর-ডাকাতের উপদ্রব, সেখানে টাকা-পয়সা ছড়িয়ে রাখার মতো বোকামি কে করবে?

যদিও সাসুন সাম্রাজ্যের বাইরের সাংহাই একটা ছোটখাটো টোকিও হিসেবে পরিচিত ছিল, তাদের নির্দেশেই সবকিছু চলত, কিন্তু তাদের কর্তৃত্বের বাইরে ছিল সাসুন সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরভাগ। তিন বছর ধরে জাপানিরা চেষ্টা করে গেছে স্যার ভিক্টরকে কবজা করতে, কিন্তু তিনি তার ব্যবসায়িক সহযোগীরা সেটাকে নাকচ করে দিয়েছেন। পার্ল হারবারের আগ পর্যন্ত সাংহাইয়ের সাসুন সাম্রাজ্য অক্ষত ছিল নিজস্ব বলয়ে।

অবশেষে সেই দিন এসে গেল। ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর পার্ল হারবারে আক্রমণ করল জাপান। তার পরই সব হিসাব উল্টে যায়। জাপানিরা ক্যাথে হোটেলে প্রবেশ করে। পরিস্থিতি সম্পর্কে আগাম অনুমান করতে সক্ষম ভিক্টর সাসুন তার আগেই সরে গিয়েছিলেন মুম্বাইতে। সেখান থেকে যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন বিশ্বযুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত।

ভিক্টর সাসুনের গড়ে দেয়া ভিত্তির হাত ধরে পরবর্তী সাংহাই উঠে দাঁড়িয়েছিল প্রাচ্যের অন্যতম সেরা নগরী হিসেবে। সবুজ পিরামিড গম্বুজের ফেয়ারমন্ট পিস হোটেল এখনো ক্যাথে হোটেলের ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হুয়াংপু নদীর তীরে।

 

হারুন রশীদ: প্রাচীন সভ্যতা ইতিহাস অনুসন্ধানী লেখক