শনিবার | মে ০৮, ২০২১ | ২৫ বৈশাখ ১৪২৮

সিল্করুট

মুম্বাই নগরীর সাসুন উত্তরাধিকার

দেবযানী মোদক

অক্টোবর, ২০১৯। মুম্বাই।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই সবার আগে যে কাজটা করেছিলাম, সেটা হলো কওসারের সঙ্গে মুঠোফোনে আলাপটা সেরে নেয়া। ২৪ বছর বয়সী উচ্ছল তরুণী কওসারের সঙ্গে আমার আগে কখনো দেখা হয়নি। তবে মুম্বাই যাচ্ছি শুনেই জেবা আপু আমাকে বলেছিলেন, you must meet Kawsar! She is such an angel living there in Mumbai!

নতুন কোনো শহরে ভ্রমণের সুযোগ পেলে সেই শহর গড়ে ওঠার ইতিহাস যেমন আগ্রহ তৈরি করে, তেমন করেই আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে ওই অঞ্চলের মানুষ, তাদের সংস্কৃতি, ভাবনা আর জীবনধারা। এই কৌতূহলটা নেহায়েত কিশোরীবেলায় পড়ে আসা ভ্রমণ আর অ্যাডভেঞ্চারের বইগুলো পড়ার কারণে অপ্রয়োজনে মনের ভেতর গড়ে ওঠে, নাকি নিতান্তই মানবিক, সে আলোচনায় না গিয়েও বলা যায়, নাগরিক দিয়েই যখন নগর সৃষ্টি হয়, তখন এই দুই সত্তাকে মিলিয়ে দেখলেই মনে হয় বোধটা সূক্ষ্মভাবে তৈরি হতে পারে। 

কওসারের সঙ্গে আমার দেখাটা হয় ডক্টর ভাউ দাজি লাড মিউজিয়ামের সামনে। পরিকল্পনাটা ওরই ছিল। পাশেই বাইকালা জু। কিন্তু বনের পশুপাখিকে ধরেবেঁধে খাঁচায় পুষে রাখার রীতির প্রতি কওসার বা আমার কারোরই বিশেষ আগ্রহ না থাকায় আমরা জাদুঘরের দিকেই পা বাড়ালাম। কওসার জানাল, এটি মুম্বাইয়ের সবচেয়ে পুরনো জাদুঘর। একনজরে মুম্বাইয়ের অতীত থেকে বর্তমান নিয়ে আমাকে একটা ধারণা দিতেই যে মেয়েটি জায়গাটি বেছে নিয়েছে, সেটা বোঝা গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই। জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় যারা ভূমিকা রেখেছিলেন তাদের একজন ছিলেন বিখ্যাত সাসুন পরিবারের অন্যতম পুরুষ ডেভিড সাসুন।

শুরুতে এই গল্পটা বলে নেয়ার কারণ, ভারতীয় উপমহাদেশে ইহুদি সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস প্রভাব-প্রতিপত্তির ইতিহাসটা সেই ভাউ দাজি লাড মিউজিয়ামেই প্রথমবারের মতো আমার সামনে বিস্তৃতভাবে এসে ধরা দেয়। অঞ্চলে ইহুদি সম্প্রদায়ের বসবাসের ইতিহাস চর্চা খুব একটা সহজলভ্য নয়। জাদুঘরে অবশ্য তার ব্যতিক্রম। একজন সাধারণ বাংলাদেশীর মুম্বাইয়ের সঙ্গে পরিচিতিটা হয় যার মাধ্যমে, সেই বলিউডের গালগল্পেও ইহুদি সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতিনিধিত্ব আজকাল আর তেমন করে চোখে পড়ে না। মুম্বাই দর্শনের পর ঘটনা যেকোনো কৌতূহলী মনে ভাবনার খোরাক জোগাবে। কারণ ডক্টর ভাউ দাজি লাড মিউজিয়াম থেকে শুরু করে ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ টার্মিনাস স্টেশনের আশপাশের রাস্তাগুলোতে ঘুরে বেড়ানোর সময় রাস্তার পাশের ভাস্কর্যগুলো ভিন্ন এবং হারিয়ে যাওয়া এক ইতিহাস-সংস্কৃতির দিকে ইঙ্গিত করে। এসব ভাস্কর্য এখনো প্রমাণ রাখে যে মুম্বাই নগরে এককালে ইহুদি সম্প্রদায়ের কেবল আনাগোনাই ছিল না, তাদের কেউ কেউ জৌলুশ আর প্রতিপত্তিতে অন্যদের পেছনে ফেলে বিস্তর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

বর্তমান সময়ে মুম্বাইতে ইহুদি সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যাটা নেহায়েত পাঁচ হাজারের কিছু বেশি হতে পারে, তবে অতীতটা ভিন্নই ছিল। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ভারতবর্ষে ইহুদি সম্প্রদায়ের তিনটি গোত্রের আনাগোনা দেখা গিয়েছেবেনে ইসরায়েলি, মালাবার ইহুদি বাগদাদি ইহুদি। এদের মধ্যে বেন ইসরায়েলিরাই এসেছিলেন সবার আগে। সপ্তম-অষ্টম খ্রিস্টাব্দের দিকে তারা উপমহাদেশে বসত গাড়তে শুরু করেন। মালাবার গোত্রের ইহুদিদের বেশি দেখা গিয়েছে কোচিন আর কেরালার দিকে। আর বাগদাদি ইহুদিরা, যারা মূলত এসেছিলেন ইরাক থেকে, তাদের কেউ কেউ কিন্তু বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে মুম্বাই শহরে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে নিয়েছিলেন। আর তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নামটি সাসুন পরিবারের।

সাসুনরা মূলত ব্যবসায়ী হিসেবেই তাঁদের প্রতিপত্তি অর্জন করে। বস্ত্র, পাট আর আফিমের বাণিজ্য করে বেশ প্রসার লাভ করে তারা।  মুম্বাইয়ের বিখ্যাত সাসুন ডকের নামের মধ্যে পাওয়া যায় প্রতিপত্তির অবশিষ্টাংশ। মাছ ধরার নৌকা ট্রলারগুলোর জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহূত সাসুন ডকের প্রতিষ্ঠা সাসুন পরিবারের হাতেই। ১৮৭৫ সালে সাসুনদের নির্মাণ করা ডকটি মুম্বাইয়ের প্রথম ওয়েট ডক। এর নকশা ব্রিটিশদেরও পছন্দ হয়েছিল। তারা ভারতের বিভিন্ন স্থানে ডক নির্মাণে সাসুনদের নকশা ব্যবহার করেছে।

সাসুনরা শুধু ডক নির্মাণ নয় আরো অনেক কারণে মুম্বাইয়ের ইতিহাসে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন। ইংল্যান্ডের ল্যাংকাশায়ার থেকে কাপড় আমদানি না করে তারা মুম্বাইতে ১৭টি টেক্সটাইল কারখানা স্থাপন করেন, যেখানে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। তখন মুম্বাইয়ে বসবাসরত অর্ধেক পরিবারের জীবিকার ব্যবস্থা হতো সাসুন পরিবারের কারখানায় সরাসরি কর্মসংস্থান কিংবা পরোক্ষভাবে তাদের ব্যবসার মাধ্যমে।

১৮৩০ সালের দিকে বাগদাদি ইহুদি সম্প্রদায়ের ডেভিড সাসুন মুম্বাইতে তার প্রতিপত্তি গড়ে তোলেন। সপরিবারে মুম্বাই চলে আসা ডেভিড সাসুন ব্যবসায়িক বোধবুদ্ধিতে ছিলেন বেশ পাকা। ফলে হিব্রু ভাষায় পড়াশোনা করে এবং খুব ভালো ইংরেজি না বলতে পেরেও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন মুম্বাইয়ে বাণিজ্য সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। তার ছেলে এলিয়াস কাপড়ের ব্যবসায় বেশ শক্ত ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। ফলে ১৮৬০-এর দশকে তিনি মুম্বাইতে প্রায় ১৭টি কাপড়ের কারখানার মালিক বনে যান। বলাই বাহুল্য, সে সময়কার সবচেয়ে বড় কাপড়ের কারখানার মালিক হয়ে ওঠেন এলিয়াস সাসুন। ১৮৬০-এর দশকে সম্পদ সৃষ্টিতে সাসুনরা ভারতের পার্সিদের পেছনে ফেলে দিয়েছিল।

১৮৭৫ সালে গড়ে তোলা সাসুন ডকের মালিকানা পেয়েছিলেন ডেভিড সাসুনের জ্যেষ্ঠ সন্তান আলবার্ট সাসুন। ব্রিটিশ শাসিত ভারতে কাপড় আর আফিমের ব্যবসা করে দারুণভাবে প্রসার লাভ করেছিলেন তিনিও। সেই সঙ্গে সামাজিক কার্যক্রমের জন্যও নাম কুড়িয়েছিলেন। জাদুঘরে ব্যক্তির ভাস্কর্যটিও লক্ষণীয়। তবে আলবার্টও শেষ পর্যন্ত ইউরোপেই চলে যান।

জাদুঘর ডকের পাশাপাশি সাসুন পরিবারের হাতে মুম্বাইতে স্থাপিত হয়েছিল ডেভিড সাসুন লাইব্রেরি, দ্য মাসিনা হসপিটাল, জ্যাকব সাসুন হাই স্কুল। নগরের বিখ্যাত স্থাপনা গেটওয়ে অব ইন্ডিয়া, ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স নির্মাণে তারা বিপুল অর্থ অনুদান দিয়েছেন।

সাসুনদের কলকারখানা কিছুই আজ আর অবশিষ্ট নেই, ইহুদিরাও মুম্বাইতে আর তেমন প্রভাবশালী নয়। কোথায় গিয়েছেন মুম্বাইয়ের বিকাশে বিরাট ভূমিকা রাখা সম্প্রদায়ের মানুষগুলো? কেউ হংকং, কেউ ব্রিটেন, কেউ বা ইসরায়েল চলে গেছেন, আর সাসুনদের ১৭টা কাপড়ের কারখানার কী হয়েছিলসেটা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও ধরে নেয়া যায়, কালের পরিক্রমায় সেসবের মালিকানা হয়তো চলে এসেছিল ভারতীয় ব্যবসায়ীদের হাতেই।

বর্তমানে যদিও মুম্বাইতে ইহুদিদের সমাজ জীবন আজ আর তেমন চোখে পড়ে না, তবে অতীত থেকে বর্তমানের পদযাত্রায় বস্ত্রশিল্পে, বাণিজ্যে, স্থাপত্যশৈলীতে মুম্বাই যে সমৃদ্ধি লাভ করেছে, তার পেছনে সাসুন পরিবারের অবদান ইতিহাসে, নানা নিদর্শনে এখনো জীবন্ত হয়ে আছে।

 

দেবযানী মোদক: লেখক