বৃহস্পতিবার | এপ্রিল ২২, ২০২১ | ৯ বৈশাখ ১৪২৮

বিশেষ সংখ্যা

সংগ্রামে সংগঠনে যুগলবন্দি বঙ্গবন্ধু ও তর্কবাগীশ

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

বায়ান্নর মহান ভাষা আন্দোলনে তার অবিসংবাদিত ভূমিকার কারণে, ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে প্রাদেশিক পরিষদে এবং ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের গণপরিষদে নির্বাচিত সদস্য মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ (১৯০০-১৯৮৬) ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনের পর যেদিন আওয়ামী লীগের হাল ধরেন বঙ্গবন্ধুর (১৯২০-১৯৭৫) সঙ্গে তার রাজনৈতিক যুগলবন্দি সেদিন শুরু। ভাষা আন্দোলন পর্বে মুসলিম লীগ সরকারের ট্রেজারি বেঞ্চের সদস্য হয়েও বক্ষের মানিক, আমাদের রাষ্ট্রের ভাবী নেতাছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলির তীব্র প্রতিবাদে ফ্লোর ক্রসিং করার প্রথম প্রধান নজির সৃষ্টির ইতিহাস সলঙ্গা বিদ্রোহের নায়ক আব্দুর রশীদেরই। ১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের প্রথম সভাপতির পদে তিনিই ছিলেন অন্যতম যুক্তিযুক্ত। আপাদমস্তক সংগ্রামী প্রাণচঞ্চল অথচ শান্ত সমাহিত প্রাজ্ঞ রাজনীতিকের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সাংগঠনিক যুগলবন্দি না হলে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় আরো প্রলম্বিত হতে পারত।

জুন ১৩-১৪, ১৯৫৭ সালে অনুষ্ঠিত বিশেষ কাউন্সিলে মওলানা ভাসানী সভাপতির পদ থেকে সরে গেলে মাওলানা আব্দুর রশীদ প্রথমে ভারপ্রাপ্ত পরে পূর্ণ সভাপতি পদে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ১০ বছর আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং বঙ্গবন্ধু ছিলেন সাধারণ সম্পাদক এবং মাওলানার পরই বঙ্গবন্ধু সভাপতি হন। প্রসঙ্গত যে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ সংকট, সংগ্রাম সাংগঠনিক সাফল্যের দশক ছিল ১৯৫৭-৬৭ আটান্নর আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা ছাত্র আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর মানস গঠনে অন্যতম প্রভাবক ভূমিকা ছিল আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশের।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পটভূমি নির্মাণে যেসব মনীষী কালজয়ী অবদান রেখেছেন মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ ছিলেন তাদের অন্যতম। সৈয়দ হাদি তর্কবাগীশ, মহান ভাষা আন্দোলনে তার ভূমিকা অবস্থান উদ্ধৃত করেছেন মাওলানার স্মৃতিকথন থেকেই

আমি তখন পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের সদস্য। ২০শে ফেব্রুয়ারি নুরুল আমীন সরকার ঢাকায় জারি করেন ১৪৪ ধারা। কাজেই জনসভা, মিছিল মিটিং ইত্যাদি নিষিদ্ধ ছিল। রাস্তায় রাস্তায় মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশ মিলিটারি। এরই মধ্যে দুপুর দুইটার দিকে অ্যাসেম্বলি হাউসে মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি দলের সভা বসে।

আমার মনে পড়ে ২১শে ফেব্রুয়ারি পরিষদের সভা আহ্বান করা হয়। তখন বাহিরে মুহুর্মুহু রাইফেলের গর্জন। কিন্তু কোন মন্ত্রী কিংবা পরিষদের কোন সদস্যদের মধ্যে কোন সাড়া নেই।

মাঝে মাঝে গুলি কাঁদানে গ্যাস, শেল বর্ষণের শব্দে আমি শিউরে উঠছিলাম। এক সময় হাউস থেকে বেরিয়ে আসি। দেখি রাজপথ জনশূন্য। রাইফেল লাঠি হাতে স্থানে স্থানে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশ সৈন্যরা।

আমি মেডিকেল কলেজের দিকে অগ্রসর হলাম।

কলেজের কাছে এসে আমি যে দৃশ্য দেখলাম তাতে আমি অশ্রু সংবরণ করতে পারিনি। ছাত্ররা চিত্কার করছে। দূর থেকে তারা আইন সভার সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে বেরিয়ে এসে পরিস্থিতি দেখার জন্য। আহত ছাত্ররা আর্তনাদ করছে। কারো কারো কাপড়ে ফেনাযুক্ত রক্ত। শুনতে পেলাম বহু ছাত্র হতাহত হয়েছে।

ব্রিটিশ আমলে আমার সক্রিয় রাজনীতির চল্লিশ বছরের জীবনে হাসপাতালের অভ্যন্তরে পুলিশের গুলিবর্ষণের এমন ঘটনা আমি দ্বিতীয়টি আর দেখিনি।

মর্মান্তিক দৃশ্য সহ্য করতে পারলাম না। হাউসের কাছে প্রতিবাদ জানানোর জন্য, অবস্থা বিবৃতি করার জন্য ছুটে এলাম অ্যাসেম্বলি হাউসে।

বিকাল তিনটা ত্রিশ মিনিট, স্পিকার আব্দুল করিম আসন গ্রহণ করলেন। আমি তখন সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালাম।

জনাব স্পিকার: প্রশ্নোত্তরের পূর্বে আমি আপনার কাছে একটা নিবেদন করতে চাই,

ভবিষ্যতের আশা ভরসা দেশের ছাত্ররা যখন পুলিশের গুলিতে জীবন দিচ্ছে তখন আমরা এখানে বসে সভা করতে পারি না। আমার দাবি প্রথমে ইনকোয়ারি, তারপর হাউস বসবে। এর আগে হাউস বাসতে আমি দিব না।

নিয়ে স্পিকারের সঙ্গে আমার দীর্ঘ বাকবিতণ্ডা হয়। তিনি বারবার আমাকে অ্যাসেম্বলির আইন মোতাবেক আচরণ করার কথা বলেন।

আমারও এক কথা, যে সরকার আমাদের সন্তানদের গুলি করে হত্যা করছে, সেই সরকারের আইন মানা যায় না। আমি মানব না। আগে প্রধানমন্ত্রীকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এসে বিবৃতি দিতে হবে, তারপর অধিবেশন চলবে, তার পূর্বে নয়।

আমি অধিবেশন চলতে দিব না।

তুমুল বাগবিতণ্ডার এক পর্যায়ে স্পিকার অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন। মুলতবির পর অধিবেশন আবার শুরু হলে, এক বিবৃতির মাধ্যমে এহেন জুলুমের প্রতিবাদ জানিয়ে আমি পরিষদ ভবন ত্যাগ করি। এবং চিরতরে মুসলিম লীগ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেই।

আমি একাই পরিষদ ভবন ত্যাগ করে সরাসরি চলে আসি মেডিকেল কলেজে। আমি এখানে ছাত্রদের মিছিল এবং সমাবেশে যোগ দেই। মিছিল সহযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে যেখানে বর্তমান শহীদ মিনার সেখানে যে টিনের হোস্টেল ছিল তার বারান্দায় দেখতে পাই একজন শহীদ ছাত্রের মাথার খুলি বুলেটের আঘাতে উড়ে গেছে। ছাত্রদের মধ্যে চরম উত্তেজনা। হোস্টেলে সমাগত ছাত্রদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে গিয়ে আমি কান্নায় ভেঙে পড়ি।

আজীবন সংগ্রামী খোন্দকার আব্দুর রশীদ মাত্র ১৩ বছর বয়সে জমিদার মহাজনদের বিরুদ্ধে অসহায় দুধবিক্রেতাদের সংগঠিত করে দুধের ন্যায্যমূল্য প্রদানে মহাজনদের বাধ্য করেন। ১৯১৯ সালে তিনি খিলাফত আন্দোলন অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এজন্য তার আর মেট্রিক পরীক্ষা দেয়া হয়নি।

ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশে ব্রিটিশবিরোধী সবচেয়ে বড় বিদ্রোহ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ। ১৯২২ সালে ২২ বছর বয়সে উপমহাদেশে স্বাধীনতা-সংগ্রামের রক্তাক্ত অধ্যায় ঐতিহাসিক সলঙ্গা বিদ্রোহেনেতৃত্ব দেন সেদিনের তরুণ বিপ্লবী আব্দুর রশীদ। সলঙ্গাতে তিনি কংগ্রেসের শাখা অফিস স্থাপন করেছিলেন। তার নেতৃত্বে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ সেদিন সলঙ্গা হাটে প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ব্রিটিশ সরকারের পুলিশি নির্যাতনে মারাত্মক আহত হয়ে তিনি কারাবরণ করেন। পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণে সেদিন সলঙ্গা হাটে সরকারি হিসাবেই সাড়ে হাজার মানুষ হতাহত হন। এই সলঙ্গা আন্দোলনভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে রক্তসিঁড়িহিসেবে পরিচিতি পায়। পরবর্তীকালে শিক্ষা গ্রহণের জন্য তিনি যুক্ত প্রদেশের বেরেলি ইশতুল উলুম মাদ্রাসা, সাহারানপুর মাদ্রাসা, দেওবন্দ মাদ্রাসা লাহোরের এশাতুল ইসলাম কলেজে অধ্যয়ন করেন তর্কশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করে তর্কবাগীশ উপাধিতে ভূষিত হন।

বাংলার গরিব কৃষক সমাজকে জমিদারি-মহাজনি শোষণ-নিপীড়ন থেকে রক্ষার জন্য তার আন্তরিক কর্মপ্রচেষ্টার ফল নিখিল বঙ্গ রায়ত খাতক সমিতি জাতীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন সমিতির সভাপতি এবং মাওলানা তর্কবাগীশ ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ ১৯৩৩ সালে রাজশাহীর চাঁটকৈরে নিখিলবঙ্গ রায়ত খাতক সম্মেলন আহ্বান করে ঋণ সালিশি বোর্ড আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দেন। তিনি ১৯৩৭ সালে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে নাটোরে কৃষক সম্মেলন আহ্বান করেন। দেশব্যাপী সমিতির ব্যাপক বলিষ্ঠ আন্দোলনের ফলেই গঠিত হয় ঐতিহাসিক ঋণ সালিশি বোর্ড বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ আন্দোলন মাওলানা তর্কবাগীশের অবদান, যা সফল হয়।

১৯৩৬ সালে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগে যোগ দেন। তিনি বাংলা, আসাম ভারতের বিভিন্ন স্থানে সাংগঠনিক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি অবিভক্ত বাংলার এমএলএ হিসেবে তত্কালীন ব্যবস্থাপক পরিষদে পতিতাবৃত্তি নিরোধ, বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই তিনি মুসলিম লীগ ত্যাগ করে আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য এবং ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ ১৯৫৬ সালে যথাক্রমে মারি লাহোরে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলায় বক্তৃতা প্রদান করে তিনি বাংলা ভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন।

১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনি পাবনা- আসন থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। অর্থাৎ ১৯৫৪ থেকে ১৯৭৩ সাল অবধি জাতীয় কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি। ১৯৭৬ সালের অক্টোবর মাসে তিনি গণআজাদী লীগ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৩ সালের ৩০ জানুয়ারি তার সভাপতিত্বে ১৫টি রাজনৈতিক দলের এক যৌথ সভায় ১৫ দলীয় জোট গঠিত হয়। জোটের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে তিনি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বিশিষ্ট ভূমিকা রাখেন।

বয়সে বিশ বছরের বড় হয়েও তিনি তার রাজনৈতিক সহকর্মী বঙ্গবন্ধুকে পুত্রবৎ স্নেহ করতেন এবং বঙ্গবন্ধুও তাকে যথেষ্ট সম্মান সমীহ করতেন। স্বাধীন বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিকতায় অভিষিক্ত করেন তিনিই। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার সুযোগ্য সময়োপযোগী পরামর্শ পদক্ষেপে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত হয়।

সংগ্রামী সংগঠক মাওলানা একজন সুসাহিত্যিকও ছিলেন। তার রচিত গ্রন্থগুলো হচ্ছে: শেষ প্রেরিত নবী, সত্যার্থে ভ্রমণে, ইসলামের স্বর্ণযুগের ছিন্ন পৃষ্ঠা, সমকালীন জীবনবোধ, স্মৃতির সৈকতে আমি, ইসমাইল হোসেন সিরাজী ইত্যাদি। মৌলবাদ সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আপসহীন। ১৯৮৬ সালের ২০ আগস্ট ঢাকায় তার মৃত্যু হয়। ২০০০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে।

 মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সরকারের সাবেক সচিব

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান