বৃহস্পতিবার | এপ্রিল ২২, ২০২১ | ৯ বৈশাখ ১৪২৮

সিল্করুট

ব্রিটেন ভালো খাবারের লোভে সাম্রাজ্য বাড়িয়েছে!

আন্দালিব রাশদী

ব্রিটিশ আবহাওয়া, ব্রিটিশ নারী এবং ব্রিটিশ খাবার বিশ্বজনের আস্থা অর্জন করতে পারেনি বলে ব্রিটিশ পুরুষরাই আফসোস করে থাকেন। তাদের অন্যতম কবি ডিলান টমাস, লেখক ভার্জিনিয়া উলফ, সমারসেট মম খাবারের নিন্দা করেছেন। ব্রিটিশ খাবার নিম্নমানের না ভুল বোঝাবুঝির শিকার নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে বিলেতে ন্যাটো সম্মেলনে ফরাসি প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাক যা বলেছেন তা গণমাধ্যম লুফে নিয়েছে। ২০০৫ সালের বৈঠকে জ্যাক শিরাক বলেছিলেন: যাদের খাবার এত বাজে তাদের বিশ্বাস করা যায় না। আর ফ্রান্সের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ইউরোপের কৃষিতে ব্রিটিশদের একটিই অবদানম্যাড কাউ ডিজিজ। ফিনল্যান্ডের পর পৃথিবীতে সবচেয়ে বাজে খাবার দেশে।

জ্যাক শিরাকের আক্রমণ এখানেই শেষ হয়নি। তিনি ভ্লাদিমির পুতিনকেও বিস্বাদ ব্রিটিশ সরকারের কথা বলেছেন। ন্যাটোর সাবেক মহাসচিব স্কটিশ জর্জ রবার্টসন যখন তাকে স্কটিশ খাবার তুলে দিলেন, তিনি বললেন, তাহলে এখান থেকেই ন্যাটোর সমস্যাগুলোর সৃষ্টি হচ্ছে।

খাবার-দাবারের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ এবং মিডিয়া ব্যক্তিত্ব অ্যান্ড্রু জিমার্ন, বলেছেন ২০০ বছর আগের ফাইন ইংলিশ ডিশ ব্যাপারটা ছিল প্রশংসার কিন্তু ২০ বছর আগে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের খাবার ছিল পৃথিবীতে সবচেয়ে বাজে, সবচেয়ে পানসে সেদ্ধ।

ব্রিটিশ খাবার নিয়ে যেসব মিথ রয়েছে, সেগুলো হচ্ছে তাদের খাবার ভীষণ একঘেয়ে, পানসে এবং বিস্বাদ, বেশি সেদ্ধ, বৈচিত্র্যহীন। বৈচিত্র্যহীনতার অভিযোগটি ব্রিটিশরা একটি যুক্তি দিয়ে নাকচ করার চেষ্টা করেআমাদের ৭০০ স্বাদের পনির রয়েছে। আছে অন্য কোনো দেশের?

মার্থা হ্যারিসন বলেছেন, ব্রিটিশরা কেন নতুন নতুন উপনিবেশ সৃষ্টি করে সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে, আমি বাজি ধরে বলতে পারি তার কারণ তারা ভালো খাবারের খোঁজে বেরিয়েছিল। বাজে খাবার খেতে খেতে তাদের জন্য আমার মায়ের রান্নার মতো কথাটার মানে বিস্বাদ খাবার। জ্যাকি ম্যাসন বলেছেন, পৃথিবীতে ব্রিটিশই একমাত্র দেশ যেখানে খাবার যৌনতার চেয়েও ভয়ংকর। বিল মার্থানো মার্থা হ্যারিসনের কথায় প্রতিধ্বনী করেছেন, মরিয়া হয়ে ওঠা ইংরেজ যুবকরা এক পেট ভালো খাবার খেতে এখানে ওখানে গিয়েছে আর তাতে উপজাত (বাইপ্রডাক্ট) হিসেবে সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটেছে। বিল মার্থানো অবশ্য বলেছেন, ব্রিটিশরা আসলে খাবারকে ঘৃণা করে সেজন্যই তাদের রান্না এত বাজে। অর্থনীতিবিদ জন কেনেথ গলব্রেইথ একটি বাজে নাশতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, এত বাজে যে তা রান্না করার মতো দক্ষতা ইংরেজদের নেই।

বিখ্যাত ব্রিটিশ কথাশিল্পী সমারসেট মম বলেছেন, ইংল্যান্ডে কেউ যদি বলতে চান ভালো ব্রেকফাস্ট করেছে, তা হলে তাকে দিনে তিনবার ব্রেকফাস্ট করতে হবে। প্রায় শতবর্ষ আগের কথা: ব্রিটিশদের খাবার খারাপ হলে কি হবে, তাদের টেবিল ম্যানার ভালো।

১৭৪৮ সালে সুইডিশ পর্যটক পেহর কাম লিখেছেন, ইংলিশ ম্যান বিফরোস্ট আর পুড়িং ছাড়া কিছু বানাতে জানে না, তিনি যা লিখেননি তা হচ্ছে মাংস আর পুডিংয়ের উপকরণও আসে অন্য দেশ থেকে।

ভালো খাবারের লোভে সাম্রাজ্যবাদী হয়ে ওঠা এবং ক্রমাগত উপনিবেশ সৃষ্টির ধারণাটির মধ্যে কিছুটা রসিকতা এবং কিছুটা বাড়াবাড়ি তো অবশ্যই আছে, কিন্তু অখণ্ডনীয় সত্যও লুকিয়ে আছে। ১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাজকীয় সনদ লাভ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন অকুল গাঙ্গে নাও ভাসায় তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল নিজেদের খাবার সুস্বাদু করার মসলা জোগাড় করা। মসলার লোভেই কোম্পানি সাগরে লড়াই করেছে পর্তুগিজ, ডাচ, স্প্যানিশ ফ্রেঞ্চদের সঙ্গে। তখন আকাশ জয়ের স্বপ্ন ছিল অবাস্তব, নদী সাগর সড়কপথ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল, কাজেই সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী গড়ে ওঠেনি। গড়ে উঠেছে জলদস্যুবাহিনী, প্রাইভেটিয়ার্স এবং কোম্পানির লড়াকু নৌসেনা। তারাই ব্রিটিশ সাম্রাজ্য সৃষ্টি করেছে, উপনিবেশ থেকে খাবার সরবরাহ করেছে, উপনিবেশের সংস্কৃতির বিশেষ করে খাবারটা তারা এতটাই আত্মস্থ করেছে যে কোনো ব্রিটিশ নাগরিকের প্রিয় পাঁচটি খাবারের নাম জিজ্ঞেস করলে চিকেন টিকা মসলা রাখা চলবেই। কিংবা তন্দুর চিকেন, পিলাও নামে এদেশীয় পোলাও তাতে থাকতে পারে।

ব্রিটিশ খাদ্যাভ্যাস

খ্রিস্টপূর্ব ১০ থেকে হাজার: শিকারের যুগ; প্রাণী পাখি শিকার, মাছ ধরা এবং লতাপাতা কিছুটা কাঁচা, কিছুটা আগুনে ঝলসানোএই ছিল খাবার।

খ্রিস্টপূর্ব থেকে হাজার ২০০: ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে প্রথম পশুপালন এবং গম উৎপাদন শুরু হয়, খাবারও বদলাতে থাকে।

ব্রোঞ্জযুগ, খ্রিস্টপূর্ব হাজার ২০০ থেকে ৮০০: শস্যের বৈচিত্র্য, শিম, মটর উৎপাদন শুরু হয়।

লৌহযুগ খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ থেকে ৪৩১ খ্রিস্টাব্দ: পানীয় মাদকের উদ্ভব; মুরগির হাড় আবিষ্কৃত হওয়া প্রমাণ করে সময় মুরগি খাওয়া শুরু হয়। রোমানরা খরগোশ, আঙুর, বাদাম, রসুন, মরিচ, পিঁয়াজ, বাঁধাকপি, বাদাম নিয়ে আসে।

মধ্যযুগ ৪০০-১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দ: চিনি আবিষ্কৃত হয়। ১০৯৯ সালে ব্রিটেনে প্রথম মিষ্টিদানা উল্লেখিত হয়। তবে আঠার শতক পর্যন্ত তা ছিল বহুমূল্য দুর্লভ।

টিউডর যুগ ১৪৮৫-১৬০৩: প্রথম টার্কি পালনের রেকর্ড ১৫৪১ সালে। ১৫৭০ সালে স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা আলু নিয়ে আসে, যা কালক্রমে অন্যতম প্রধান খাবারে পরিণত হয়। চালের ব্যবহার পঞ্চদশ শতাব্দীতে বাড়ে বিশেষ করে রাইস পুডিং তৈরিতে।

স্টুয়ার্ট যুগ ১৬০৩-১৭১৪ খ্রিস্টাব্দ: কমলা, কফি এবং চা এর সঙ্গে ব্রিটেন পরিচিত হয়। তবে এসব তখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার অনেক বাইরে।

আধুনিক যুগ ১৭১৪ থেকে বর্তমান: উপনিবেশ থেকে খাবার আসতে শুরু করে। ব্রকোলি (১৭০০), টমেটো (১৭৫০), চকোলেট বার (১৭৫০) এবং রেমড বিন (১৮৮৬) ব্রিটিশ খাবারে ঢুকতে শুরু করে। এমনকি ব্রিটিশদের নিত্যদিনের খাবার ফিশ ফ্যান্ড চিপস ১৮৭০-এর দশকে প্রথম পরিবেশিত হয়। অবশ্য তার আগে ১৭৮০ দশকে আসে পর্ক পাই।

এখনো আছে শতবর্ষ আগের ছিল এমন কিছু ব্রিটিশ খাবারের নাম মনে করা যেতে পারে: ব্যাঙ্গার অ্যান্ড ম্যাশ (সসেজ আলুবাটার), কবলার (ফলের মিশ্রণ), বিফ ওয়েলিংটন, ব্ল্যাক পুডিং (হোমারের অডেসিতে রক্তের এই পুডিংয়ের উল্লেখ রয়েছে), বাবল অ্যান্ড স্কুইক (আলু বাঁধাকপি), কলিফ্লাওয়ার চিজ, কটেজ পাই, শেপার্ডস পাই, কাম্বারল্যান্ড সসেজ, ল্যাঙ্কাশায়ার হটপট, হজ পুডিং, ফিশ অ্যান্ড চিপস, পর্ক পাই, স্টেক অ্যান্ড কিডনি পাই, রোস্ট ল্যাম্ব উইথ মিন্ট সস, সানডে রোস্ট, ইয়র্কশায়ার পুডিং, অ্যাপল পাই, জিপসি টার্ট, হোয়াইট ব্রেড, কর্ন ব্রেড, পাউন্ড কেক, সামার পুডিং, ভিক্টোরিয়া স্কজ কেক ইত্যাদি।

খাবারের জন্য ব্রিটেনকে উপনিবেশের ওপর ভরসা করতে হতো। লোকসংখ্যায় চাহিদার অনুপাতে ১৮৪৬ সালের হিসাবে ব্রিটেনে তিন-চতুর্থাংশ শস্য উৎপাদিত হতো। কিন্তু ১৯৪১ সালে তা এক-পঞ্চমাংশে নেমে আসে। সারা পৃথিবী যেখানে খাদ্য শস্যের উৎপাদন বাড়িয়েছে, ব্রিটেনে তা কমার কারণ রহস্যজনক মনে হতে পারে। যেখানে ব্রিটেনের বিত্তবৈভব বেড়েছে, তারা সপ্তসিন্ধু দশদিগন্ত জয় করেছে, সেখানে ব্রিটেনের মানুষ খাবার উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে মনে করার কারণ নেই। আসলে সে সময় বিভিন্ন উপনিবেশ থেকে প্রচুর খাদ্যশস্য ব্রিটেনের বন্দরে নামানো হয়েছে। উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে আমদানি ব্যয় অনেক কম হওয়ায় অর্থনীতির সাধারণ সূত্র ধরেই তারা কৃষি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে শিল্পের দিকে মনোযোগ দিয়েছে।

সাম্রাজ্য ব্রিটেনের হলেও তার প্রধান উপনিবেশ ভারতের আর্থিক সামর্থ্য ছিল ব্রিটেনের প্রায় দেড় গুণ। ১৮৭০ সালের হিসাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে মোট উৎপাদনের ৩৭ দশমিক ১৯ ভাগ উৎপাদিত হয়েছে ব্রিটেনে আর ৫০ দশমিক শূন্য ভাগ ব্রিটিশ ভারতে। অন্যান্য ব্রিটিশ উপনিবেশের মধ্যে আয়ারল্যান্ডে দশমিক ৩৮ শতাংশ, কানাডাতে দশমিক ৩৯ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ায় দশমিক ১৪ শতাংশ, মিসরে দশমিক ৬৯ শতাংশ, সিংহল (এখনকার শ্রীলংকা), বার্মা (মিয়ানমার), নিউজিল্যান্ড, হংকং, সিঙ্গাপুর অন্যান্য মিলিয়ে দশমিক শতাংশ। ১৯১৩ সালে হিসাব অনেকটাই বদলে যায় জিডিপির ৪৭ দশমিক শূন্য শতাংশ তখন ব্রিটেনের আর ভারতের নেমে ৪২ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অস্ট্রেলিয়া কানাডায় কিঞ্চিৎ বেড়েছে। অন্য প্রধান উপনিবেশগুলোয় কমেছে।

কৃষিপণ্য থেকে শুরু করে ভোগ্যপণ্য পর্যন্ত সব বাণিজ্যিক পণ্যের বেলায় ব্রিটেন উপনিবেশগুলোর ওপর মার্কেন্টালিজম তত্ত্বের আরোপ করে। এর প্রায়োগিক দিকগুলো হচ্ছে:

. উপনিবেশ সৃষ্টি করা। . উপনিবেশ প্রভুদেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে না। . প্রধান বন্দর দখলে নিয়ে একচেটিয়াত্ব কায়েম করা। . অর্থলাভের জন্য স্বর্ণ, রৌপ্য ইত্যাদি কোনো মূল্যবান ধাতব পদার্থ বিক্রি করতে পারবে না, এমনকি মূল্য পরিশোধের জন্যও প্রদান করতে পারবে না। . ব্রিটেন ছাড়া অন্য কোনো দেশের জাহাজে বাণিজ্যপণ্য আনা-নেয়া করতে পারবে না। . দেশীয় সম্পদ ব্যবহার হ্রাস করা। . নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার সৃষ্টি করে দেশীয় পণ্যের ভোগ হ্রাস করা। . শ্রম মজুরি কমিয়ে দেয়া। . রফতানি ভর্তুকি দিতে বাধ্য করা। ১০. ভর্তুকি দিয়ে উৎপাদন বাড়ানো।

ব্রিটেনের মার্কেন্টাইলিস্ট নীতি যুদ্ধও ডেকে আনে। বাণিজ্যিক রুটে অন্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী দেশের সঙ্গে যুদ্ধের এটা অন্যতম কারণ। ১৭৪৭ সালে ব্রিটেনে প্রকাশিত রান্নাবান্নার প্রথম বইটিতে মাত্র তিনটি মসলার উল্লেখ ছিল। মরিচ, হলুদ আদা। উনিশ শতকের রান্নার বই প্রায় সব মসলার উল্লেখ করে এসব মসলা উপনিবেশগুলোকে কম মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য করা হতো।

এত বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হওয়ার পরও ব্রিটেনে খাদ্য নিরাপত্তার বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। মধ্যযুগে থেকে উনিশ শতকের আগ পর্যন্ত ব্রিটেন বিভিন্ন মাত্রার শতাধিক দুর্ভিক্ষ এবং দুর্ভিক্ষ অবস্থা মোকাবেলা করেছে। শিল্প বিপ্লবের পর মাথাপিছু আয় বাড়ায় প্রান্তবর্তী শ্রমিক পরিবারগুলো খাবার কেনার সামর্থ্য অর্জন করে।

ব্রিটেনের দুর্ভিক্ষ: উপনিবেশের দায়!

ব্রিটিশ ভারতে ক্ষুধায় মারা যায় বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ। ব্রিটেন সে দায় নিতে নারাজ। কিন্তু নিজেদের দুর্ভিক্ষের কথা ব্রিটেন স্মরণ করে। দুর্ভিক্ষের কারণে মৃতদের স্মরণ করতে ডাবলিনে স্থাপন করা হয়েছে হাঙ্গার মেমোরিয়াল। ১৮৪৫ সালের মহাদুর্ভিক্ষ আয়ারল্যান্ডে মৃতের সংখ্যা ১০ লাখ।

ব্রিটেন যদি বিশাল ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য স্থাপন না করত তা হলে কী হতো? ক্ষুধা দুর্ভিক্ষ হতো ব্রিটেনের নিত্যসঙ্গী।

১৬৫১ সালে ইংরেজ দার্শনিক হবস মানুষের অস্তিত্বের যে বর্ণনা দিয়েছিলেনsolitary, poor, nasty, short, brutish সেটাই ছিল ব্রিটেনের বাস্তব অবস্থা। সপ্তম অষ্টম শতকে শিল্পবিপ্লব পূর্ববর্তী ব্রিটেনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বলতে গেলে ছিলই না, তার ওপর জনসংখ্যা বৃদ্ধি যে চাপ সৃষ্টি করে ম্যালথাসিয় সমাধান ছাড়া এর কোনো বিকল্প ছিল না। উপনিবেশের কাঁচামাল অর্থ শিল্প বিপ্লবের সূচনা বিকাশ ঘটায় এবং উপনিবেশ থেকে পাঠানো খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যোপাদান লাগাতার দুর্ভিক্ষ রুখে দাঁড়ায়। খাদ্য নিরাপত্তা ব্যক্তি রাষ্ট্রের স্বাধীনতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাদের শোষণ উপনিবেশের সৃজনশীলতা উৎপাদন সক্ষমতার স্থলে আঘাত করে। একটি উদাহরণ ঘানাব্রিটিশ কলোনি হওয়ার আগের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং খাদ্যে রফতানি করা দেশ গোল্ড কোস্ট (ঘানা) ভীষণ খাদ্য ঘাটতির দেশে পরিণত হয়।

ভারত উপমহাদেশ ব্রিটেনের সম্পর্ক নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক উপমহাদেশের সম্পদেই ব্রিটেনে সম্পদের বিকাশ হয়েছে, শিল্প বিপ্লব সম্ভব হয়েছে। এর পেছনে কাজ করেছে ব্রিটেনের শ্রমশক্তিযে মানুষগুলোর খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে উপনিবেশের সস্তা খাদ্যশস্য অন্যান্য আহার্য সামগ্রী।

ভাত ব্রিটিশ জনগণের প্রধান খাদ্য কখনই ছিল না, কিন্তু ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন ধরনের প্লানটেশনের শ্রমিকদের ভাতের প্রয়োজনই ছিল সবচেয়ে বেশি। চাহিদা মেটাত ভারত ব্রিটিনের এশীয় উপনিবেশগুলো।

ব্রিটিশ স্টেকের স্বাদ যারা ভোলেননি তারা অনেকেই জানেন না প্রাণীগুলো অস্ট্রেলিয়া কিংবা নিউজিল্যান্ডের চারণভূমিতে বেড়ে উঠেছে। এক সময় জাহাজে জীবন্ত গরু মহিষ পাঠানো হতো। উনিশ শতকের শেষার্ধে বিশেষ ব্যবস্থায় জাহাজে ফ্রিজিং করে মাংস আনা শুরু হয়। প্রথম দিকে অবস্থাপন্ন মানুষ মাংস পুরনো বিষাক্ত মনে করে প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু দাম এতটাই কম যে সাধারণ মানুষ কিনে নিতে পারে, ভোক্তার সংখ্যা তাদের মধ্যে বেশি। খাদ্য পরিবহন আমদানি রফতানিতে বিপ্লব ঘটিয়ে দেয় ফ্রিজিং। ব্রিটেনের মার্কিন উপনিবেশ ১৮৮১ সালে পাঠায় ১০৬ মিলিয়ন পাউন্ড গরুর মাংস। আসতে থাকে টিনজাত খাবার। প্রায় সবই আসে ব্রিটেনের উপনিবেশ থেকে।

ব্রিটিশরা কলা পেয়েছে, উপনিবেশকে কলা দেখিয়েছে

১০ এপ্রিল ১৬৩৩।

সিটি অব লন্ডনের হবর্নে একটি দোকানে এক ছড়া ফল ঝুলানো হয়েছে। আর কাজটা করেছেন ব্যবসায়ী উদ্ভিদ বিজ্ঞানী এবং বনাজি ওষুধ বিক্রেতা টমাস জনসন। বিলেতের মানুষ প্রথম ফলটাকে দেখল। হলদে ত্বকের ফলটির নাম ব্যানানা। ব্রিটেনের নতুনতর উপনিবেশ বারমুদা থেকে তুলে আনা হয়েছে। কলার সঙ্গে ব্রিটিশদের এটাই প্রথম পরিচয়।

রোমান সম্রাট অক্টাভিয়াস অগাস্টাসের ব্যক্তিগত চিকিৎসক এন্টোনিয়াস খ্রিস্টপূর্ব ৬৩ থেকে ১৪ অব্দের মধ্যে আফ্রিকান ফলটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। পশ্চিম আফ্রিকা থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরুতে কলাগাছ এনে পর্তুগিজরা চাষের ব্যবস্থা করেন। পরে জানা যায় আফ্রিকা থেকে আনলেও এর উৎস হচ্ছে পূর্ব এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল। কলা কোথাও কোথাও হয়ে ওঠে মূল খাবার আবার কোথাও কেবলই ফল। ব্রিটেন এক সময় হয়ে ওঠে কলার অন্যতম ভোক্তা দেশ। কেবল কলা বা একক পণ্যের রফতানিকারক দেশকে আখ্যা দেয়া হয় ব্যানানা রিপাবলিক।

 

আন্দালিব রাশদী: কথাসাহিত্যিক