বৃহস্পতিবার | এপ্রিল ২২, ২০২১ | ৯ বৈশাখ ১৪২৮

সিল্করুট

ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও কড মাছ

আল আমিন

শনিবার, ১৫৪৫। মেরি রোজ রণতরীর নাবিকদের জন্য সেটি ছিল একটি বিশেষ দিন। কেননা সেদিন নাবিকদের জন্য দিনের খাবার হিসেবে মাছ নির্ধারিত ছিল। জাহাজের ডেকে যে যেখানে একটু জায়গা পেয়েছিল, সেখানেই বসে তৃপ্তি সহকার মাছ দিয়ে আহার করেছিল। মাছ তাদের ভাগ্যে প্রতিদিন জুটত না, নাবিকদের কাছে কড মাছ ছিল সোনার হরিণের মতো। ১৮৫ জন সেনা, ৩০ জন বন্দুকধারী এবং ২০০ জন মেরিনার রণতরীটিকে আসন্ন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করছিল। কিন্তু কঠোর পরিশ্রমের পর এমন মাছের ভোজ তাদের মনে স্বস্তি বয়ে এনেছিল। সেদিন সকালে নিকোলাস কুপার দুজন রাঁধুনিকে সঙ্গে করে জাহাজের সম্মুখভাগে অবস্থান নিয়েছিলেন। পেছনে কিছু নাবিক গত ২৪ ঘণ্টায় জালে আটকা পড়া কড মাছ সংগ্রহ করতে ব্যস্ত। জাহাজের নাবিকরা ছয়-আট জনের দল তৈরি করে খেতে বসেছিল। যারা তাদের দলের খাদ্য সংগ্রহের দায়িত্বে ছিল, তারা জাহাজের ডেকে জড়ো হয়েছিল নিজেদের মাছের ভাগ পেতে। প্রত্যেকের জন্য একটি ২৪ ইঞ্চি কড মাছের এক-চতুর্থাংশ করে নির্ধারিত ছিল। নিজ নিজ ভাগের মাছ একটি কাঠিতে করে কাপড়ে মুড়িয়ে নিয়েছিল, যাতে রান্নার পর বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায়। এরপর রান্নার জন্য সেগুলো নিচের ডেকে নিয়ে যাওয়া হলো।

অচিরেই পুরো জাহাজ রান্না করা মাছের ঘ্রাণে জেগে উঠল। রান্না শেষ হলে ক্ষুধার্ত নাবিকদের কাছে তা আনা হলো। এছাড়া এদিন প্রত্যেকের ভগ্যে আট আউন্স পনির দুই আউন্স মাখন জুটত। আর বন্দরে পৌঁছলে প্রত্যেকের ভাগ্যে জুটত আরো একটি করে আস্ত রুটি। বাসি, পচা, পোকাখাওয়া বিস্কুট খেয়ে খেয়ে দিনাতিপাত করার পর এমন একটি দিন কার না ভালো লাগে! নাবিকদের কাছে শনিবার ছিল এক আকাঙ্ক্ষিত অবকাশ আকণ্ঠ খাওয়ার পর গলা ভেজানোর জন্য বিয়ারেরও ব্যবস্থা ছিল এদিন।

নাবিকরা যখন খাওয়ায় মন-প্রাণ ঢেলে দিয়েছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তখন ব্যস্ত তাদের ভাগ্য নিয়ে। পোর্টসমাউথ বন্দরে, মেরি রোজের পাশে, নোঙর করা ছিল হেনরি গ্রেস দিউ এখানে রাজা অষ্টম হেনরি নৌসেনাপতি ভিসকাউন্ট লিসেল, মেরি রোজের কমান্ডার, উপসেনাপতি জর্জ ক্যারিউকে সঙ্গে নিয়ে এক আলোচনায় বসেছেন। ১২ দিন আগে যুদ্ধ লড়তে প্রস্তুত ফরাসি এক নৌবহর এরই মধ্যে ইংল্যান্ডের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছে। তিনজনে মিলে যুদ্ধের জন্য এক নকশা তৈরি করলেন। আসন্ন যুদ্ধের অন্যতম বড় জাহাজ মেরি রোজের অবস্থান ছিল সেই নকশার একদম মাঝখানে।

পরের দিন যুদ্ধ শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই মেরি রোজের প্রায় সব নাবিক পানিতে ডুবে মারা যায়। বন্দুকধারীরা এক রাউন্ড গুলি ছুড়তেই পানির এক বিশাল ঝাপটা এসে মেরি রোজকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। উপরের ডেকে যারা ছিল তারা প্রায় সবাই জালে আটকে পড়ে ডুবে মরেছিল। ৪২৫ জন নাবিকের মধ্য মাত্র ২৫ জন; খুব বেশি হলে ৪০ জন মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল।

ডুবে যাওয়া জাহাজ আমাদের জন্য রেখে গিয়েছে টিউডরদের কিছু চিহ্ন। যেমন জুতো, পোশাক, ওষুধের বোতল, ব্যান্ডেজ রোল, বন্দুক, তীর, বাটি, ১৭৯টি নরকঙ্কাল, একটি ইঁদুর এবং একটি কুকুরের কঙ্কাল। এর মধ্যে ছয়টি নরকঙ্কাল পাওয়া গিয়েছিল জাহাজের রান্নাঘরে। জাহাজ যখন ডুবছিল, নিকোলাস এবং তার সহকর্মীরা সম্ভবত রান্নাঘরে কর্তাদের জন্য সুস্বাদু মাংস রান্না করতে ব্যস্ত ছিল। রান্নাঘরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ১০টির মতো দস্তার প্লেট, যাতে করে কমান্ডারদের খাদ্য পরিবেশন করা হতো। নিচের ডেকের একটি খোল থেকে মেরিন আর্কিওলজিস্টরা ভাঙা বাক্সসহ গবাদিপশু শূকরের কশেরুকা এবং হাজার হাজার মাছের মেরুদণ্ড উদ্ধার করেন। এগুলো ছিল কড মাছ এবং শূকরের মাংসের উচ্ছিষ্ট।

খাদ্যের জন্য টিউডর সৈনিকরা সাধারণত স্থানীয় উেসর ওপরই নির্ভর করত। রাজা অষ্টম হেনরির অধীনে ইংল্যান্ড খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। মেরি রোজে যে গরু শূকরের মাংস আবিষ্কৃত হয়েছে তা আসত সে দেশেরই শূকর গবাদিপশু থেকে। পনির তৈরি হতো গ্লুচেস্টারে বা চেশিয়ারে, মাখন হ্যাম্পশায়ারে। কিন্তু কড মাছ স্থানীয় পণ্য ছিল না। ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজ হতে পাওয়া হাজার হাজার মাছের অস্থির জিনগত বিশ্লেষণ ইঙ্গিত করে যে আইসল্যান্ডের আশপাশে উত্তর সাগরের উত্তরাংশে কড মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু শুধু একটি মাছের অস্থি পরীক্ষা করে জানা যায় যে সেটি আমেরিকা মহাদেশের উত্তর-পূর্ব উপকূলের পানির মাছ, জিন সে সাক্ষ্যই দিচ্ছে। ষোলো শতকের মাঝামাঝি সময়ে খাদ্যের চাহিদা পূরণ করতে টিউডররা আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্য দিয়ে হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিত। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বৈশিষ্ট্য থেকে দেখা যায় ইংল্যান্ডে খাদ্য সরবরাহের জন্য ব্রিটিশরা সাধারণত দূরবর্তী উেসর ওপরই নির্ভর করত।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত তৈরিতে কড মাছের অবদানকে বারবার ছোট করে দেখানো হয়েছেগুরুত্ব পেয়েছে সামুদ্রিক অভিযান মসলার অনুসন্ধান। কিন্তু কথা অস্বীকার করার জো নেই যে পশ্চিমের কড মাছ শিকারিরাই প্রথম আটলান্টিক মহাসাগরের বায়ু স্রোত সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করে। যা পরবর্তীকালের মসলা অনুসন্ধানকারীদের সহায় হয়।

মধ্যযুগে খ্রিস্টানদের মধ্যে উপবাসের দিন মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ হওয়ায় ইউরোপে মাছের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছিল। চৌদ্দ শতকে ডাচরা লবণ দিয়ে মাছ সংরক্ষণের এক অভিনব পদ্ধতি (জরান পদ্ধতি) আবিষ্কার করে। ফলে, দূর-ইউরোপে যেসব ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান শুক্রবার মাংস খেতে পারত তারাও এখন থেকে মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকল। পনেরো শতকে জরান পদ্ধতি নরওয়ের অধিবাসীরা আয়ত্ত করে ফেললে হ্যানসিটিক লীগের মাধ্যমে তারা উত্তর ইউরোপের স্টকফিস কড মাছের পুরো বাজার দখল করে নেয়। লীগ উত্তর সাগরকে একচেটিয়াকরণের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে ইংরেজরা বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হয়। অবশ্য আইসল্যান্ডের সীমানার মধ্যেই তারা বিকল্পের খোঁজ পেয়ে যায়।

আইসল্যান্ডের মাছের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্রিস্টলের ব্যবসায়ীদের হাতে চলে যেত। বস্তুত পনেরো শতকের মাঝামাঝি সময়ে প্রধান মাছের বাজার হিসাবে ব্রিস্টল শহরের উত্থান হয়। ব্রিস্টলে তখন আইবেরিয়ান পেনিনসুলার মদের প্রচুর চাহিদা। স্প্যানিশ পর্তুগিজরা মাংসের বিকল্প হিসেবে মদের বিনিময়ে সাশ্রয়ী সুস্বাদু কড মাছের প্রতি অধিকতর আগ্রহী ছিল। আর তাই, ব্রিস্টলের ব্যবসায়ীরা জাহাজ বোঝাই করে কড মাছ কিনতে আইসল্যান্ডে যাত্রা করত। মদের বিনিময়ে মাছ ব্যবসা ব্রিস্টল শহরকে নাবিকদের তীর্থে পরিণত করেছিল।

সুতরাং, জুয়ান ক্যাবোট (জন ক্যাবোট) যখন উত্তর ব্রিস্টল থেকে উত্তর সাগরের পথে স্পাইস আইল্যান্ডের খোঁজে যাত্রা করেছিলেন, এটাকে দৈবাৎ বলা যায় না। ৩৫ দিনের অভিযানের পর ক্যাবোট কানাডার উত্তর-পূর্ব উপকূলে পৌঁছান। ক্যাবোটের আবিষ্কার শুধু নিছক সমুদ্রপথ ছিল না। এটা ছিল রাজা সপ্তম হেনরির স্বপ্নের নিউফাউন্ডল্যান্ড

সময়ের আবর্তে ইংরেজ জেলেরা নিউফাউন্ডল্যান্ড অভিযানে যেতে বাধ্য হয়েছিল। ১৫০৯ সালে রাজা অষ্টম হেনরি ইংল্যান্ডের সিংহাসনে আসীন হলে, তিনি ফ্রান্সের অধীনে থাকা ইংল্যান্ডের রাজ্যগুলো পুনরুদ্ধারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। ১৫১১ সালে মেরি রোজের নির্মাণকাজ শেষ হয়। দ্য অ্যান্থনি রোল-এর রেকর্ড অনুযায়ী রাজা অষ্টম হেনরির সাম্রাজ্যে ১৫৪৫ সালে সমদ্র জাহাজের সংখ্যা পাঁচ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৫৮-তে দাঁড়ায়। সমুদ্র উপকূলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারে এসব সমুদ্র জাহাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

টিউডর নৌবহরের বিশ্বায়নের ফলে কড মাছের চাহিদা বাড়তে থাকে। দ্য অ্যান্থনি রোল-এর রেকর্ড বলছে, রাজা হেনরির নৌবহরে প্রায় ,৭০০ জন কর্মী ছিল। যদি প্রত্যেকে সপ্তাহে দুদিন একটি কড মাছের এক-চতুর্থাংশ করে পায়, তবে বার্ষিক মাছের চাহিদার পরিমাণ দাঁড়ায় ,০০,০০০টি। বর্ষাকাল পেরোলে মাছ ধরার বহরগুলোকে সামরিক কাজে লাগানো হতো। বস্তুত মাছ সরবরাহকারীদের চাহিদা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে ফরাসি জেলেরাও নিউফাউন্ডল্যান্ডের মাছ নিয়ে ইংল্যান্ডের দক্ষিণ বন্দরে অবস্থান নিয়েছিল।

১৫৪৭ সালে, অষ্টম হেনরির মৃত্যুর পর কয়েকবার তীব্র শীত ফসলের ফলন ভালো না হওয়ায় খাদ্যের সংকট দেখা দেয়। সংকট থেকে বাঁচতে জোগানদাররা সর্বাত্মক চেষ্টা করে। ১৫৫৮ সালে রানী প্রথম এলিজাবেথের সচিব লর্ড বার্গলি যে হিসাব দেন তাতে জানা যায়, চারজন লোকের জন্য একদিনের মাছের খরচ মাংসের খরচের অর্ধেক ছিল। অর্থনৈতিক দুরবস্থা কাটিয়ে উঠতে তিনি মাংসের পরিবর্তে মাছের পরিমাণ বাড়িয়ে দেন। আবার আয়ারল্যান্ডের বিদ্রোহও কড মাছের চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছিল। সৈনিকরা খাদ্য হিসেবে মাছকেই প্রধান্য দিচ্ছিল। কড মাছের অত্যধিক চাহিদার কারণেই সেনা সরবরাহকারীদের দুটি জাহাজ সহকারে নিউফাউন্ডল্যান্ডে পাঠানো হয়েছিল।

আইসল্যান্ডে ড্যানিশ কর্তৃপক্ষ ইংরেজদের কাছ থেকে লাইসেন্স ফি দাবি করায় নিউফাউন্ডল্যান্ডে জেলেদের আনাগোনা বাড়তেই থাকে। এরই মধ্যে বাস্ক সম্প্রদায়ের জেলেরা নিউফাউন্ডল্যান্ডের মত্স্যভূমি থেকে অন্তর্হিত হতে শুরু করেছিল। স্পেনের ক্যাথলিকরা উত্তর ইউরোপের প্রোটেস্ট্যান্টদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে স্পেনের রাজা বাস্কদের নৌবহরকে ডাচদের বিপক্ষে যুদ্ধে লাগায়। ষোলো শতকের শেষদিকে নিউফাউন্ডল্যান্ডের বন্দরে শুধু ইংরেজরাই কর্তৃত্ব করতে শুরু করে।

মধ্যযুগ থেকেই ইংল্যান্ড আমদানি করা সব রাজকীয় খাবারের খরচ বহন করতে পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভর করে আসছিল। পনেরো শতকে ইংল্যান্ড অ্যান্টওয়ার্পের সঙ্গে যে পশমের ব্যবসা শুরু করে, তারই লভ্যাংশ ব্যয় হতো মদ, মসলা, অলিভ ওয়েল, কিশমিশ কিনতে। ১৫৫০-১৫৬০ সালের অর্থনৈতিক মন্দার কারণে পশমের ব্যবসায় ধস নামে, কিন্তু খাদ্যে এর কোনো প্রভাব পড়ে না। কড মাছ অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা থেকে ইংল্যান্ডকে রক্ষা করে। ষোলো শতকের অন্তিম লগ্ন থেকেই, বসন্ত শেষ হতে না হতেই, প্রতিদিন ডাচ, ফরাসি কিছু স্প্যানিশ নৌবহর নিউফাউন্ডল্যান্ডের বন্দরে নোঙর করত। তাদের নৌবহর বোঝাই থাকত মদে। ইংরেজরা তাদের সঙ্গে কড মাছ দিয়ে মদের বিনিময় শুরু করে। ফলে বিনিময় শেষে, ১৬২০ সাল পর্যন্ত মাত্র ১০ শতাংশ মাছ ইংল্যান্ডে ফেরত আসত। সেপ্টেম্বরে ইংরেজ জেলেরা জাহাজ করে ব্যারেল ব্যারেল মদ নিয়ে ঘরে ফিরত। সঙ্গে থাকত অল্প কিছু কড মাছ, যা সামরিক অফিসারদের কাছে বিক্রি করা হতো।

নিউফাউন্ডল্যান্ডের মাছ ইংল্যান্ডের বাণিজ্যকে বিভিন্ন শাখায় বিস্তৃত করেছিল। দূর-দূরান্তের ব্যবসায়ী বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছিল। ১৬১৫ সাল নাগাদ ২৫০টি জাহাজ নিউফাউন্ডল্যান্ডে অভিযানে অংশ নেয়। দেশটির বন্দর অর্থনীতিতে তখন নিউফাউন্ডল্যান্ডের মাছের একক আধিপত্য। প্রায় ছয় হাজার কর্মী, যাদের সমুদ্র অভিযানে অনীহা ছিল, বিভিন্নভাবে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলতারা জাহাজ নির্মাণ, দড়ি পাকানো প্রভৃতি কাজ করত। তখন আটলান্টিক সমুদ্র অভিযান ছিল পশ্চিমা দেশগুলোর নাবিকদের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।

সপ্তদশ শতকে ইংরেজদের বাণিজ্যিক জাহাজগুলো মাছধরা জাহাজের যৌথ রূপ লাভ করে। জেমস ইয়েঞ্জ ১৬৬৪ সালে তৃতীয়বারের মতো নিউফাউন্ডল্যান্ডে যাত্রা করেন। প্লিমাউথ থেকে তিনি রবার্ট বোন অ্যাডভেঞ্চার জাহাজে নিউফাউন্ডল্যান্ড যাত্রা করেন। এটি ছিল একই সঙ্গে বাণিজ্যিক এবং মাছ ধরার বিশেষ জাহাজ। দুই মাস তারা নিউফাউন্ডল্যান্ডে কড শিকার করেন। এরপর তিনি চলে যান জেনোয়া। সেখানে মাছের পরিবর্তে সংগ্রহ করেন জাহাজ ভর্তি মদ, অলিভ অয়েল কিশমিশ। ১৬৩০-এর দশকে ২৫০ টন ওজনের এই মালবাহী জাহাজ ভর্তি নিউফাউন্ডল্যান্ড কড দক্ষিণ ইউরোপে ৪৬৫ পাউন্ডে বিক্রি করা যেত। তার মানে, অভিযানের ,৩০০ পাউন্ড বিনিয়োগের বিপরীতে এর পরিমাণ শতকরা ১৪ ভাগ। কিন্তু ফিরতি জাহাজ যেসব পণ্য নিয়ে ফিরত সেগুলো বিক্রি করলে মূল বিনিয়োগের দ্বিগুণ মুনাফা চলে আসত।

কড মাছ ইংল্যান্ডের বাণিজ্যিক অর্থনীতিতে নগদ অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি করেছিল। ১৫৫০-এর অর্থনৈতিক মন্দার আগ পর্যন্ত ইংল্যান্ড বিশ্ব বাণিজ্যে একরকম নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছিল। তাদের অধিকাংশ ব্যবসায়িক অভিযানে অ্যান্টওয়ার্পের চ্যানেল ব্যবহার করা হতো। নির্ভর করতে হতো ইউরোপের বাজারগুলোর ওপর। কিন্তু ১৫৭০ সালে অ্যান্টওয়ার্প ব্যর্থ হলে ইংরেজ ব্যবসায়ীরা বিশ্ববাজারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে শুরু করে এবং এর মধ্য দিয়েই লেভেন্ট, মস্কোভি পূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্যের পথ সুগম হয়।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্ম হয়েছিল নিউফাউন্ডল্যান্ডের পাথুরে সৈকতে। জেলেরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে দিনের পর দিন অস্থায়ী জীর্ণ কুটিরে বাস করে, মাছের রক্ত হাড়ের অভিশাপকে হার মানিয়ে, উদ্ভাবনীমূলক কৌশল কাজে লাগিয়ে এবং দূরত্বকে জয় করে ইংরেজ সাম্রাজ্যের ভিত দাঁড় করিয়েছিল। নিউফাউন্ডল্যান্ডের কড মাছের বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে ১৫৭০ থেকে ১৫৮৯ ইংরেজদের নৌবহরের মাল বহন করার ক্ষমতা সাত গুণ বৃদ্ধি পায় এবং ইউরোপের প্রধান সমুদ্র শক্তি হিসেবে ইংল্যান্ডের আবির্ভাব ঘটে। কড মাছের বাণিজ্য ছিল ব্রিটিশদের প্রথম ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কেলে খাদ্যপণ্য প্রসেসিং। মাছ খাদ্য বাণিজ্য পণ্য হিসেবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তির একট শক্ত গাঁথুনি নির্মাণ করেছিল।

 

আল আমিন: লেখক