বৃহস্পতিবার | এপ্রিল ২২, ২০২১ | ৯ বৈশাখ ১৪২৮

সিল্করুট

ইংরেজের গুড়, চিনি ও শস্য আইন

এম এ মোমেন

১৭৩৩ সালের গুড় আইনের পুরো নাম দ্য মোলাসেস অ্যাক্ট’—ব্রিটিশ উপনিবেশ নয় এমন কোনো অঞ্চল বা ভিন্ন দেশের উপনিবেশ থেকে আমদানি করা গুড়ের ওপর প্রতি গ্যালন পেন্স কর ধার্য করা হয়। বিলটি উত্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী স্যার রবার্ট ওয়ালপোল। পার্লামেন্টে পাস হওয়ার পর ১৭ মে ১৭৩৩ তা রাজার সম্মতি লাভ করে আইনে পরিণত হয়। ২৪ জুন ১৭৩৩ থেকে আংশিক এবং ২০ ডিসেম্বর ১৭৩৩ থেকে পুরো আইন কার্যকর হওয়ার কথা। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে রাজস্ব আদায় করে কোষাগারের সমৃদ্ধির লক্ষ্যে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। বাস্তবে এটি ব্রিটিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইক্ষু মালিকদের চাপে প্রণয়ন করা। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে তাদের উৎপাদিত গুড় চিনির দাম কম থাকলে তা বেশি বিক্রি হবে আর পেন্স করারোপের কারণে অন্য দেশীয় বা উপনিবেশের গুড়ের মূল্য বেড়ে যাবে এবং তা বাজার হারাবে।

তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের পুরোটতেই ইক্ষু প্ল্যান্টেশন। অর্ধেকটা ডাচ, স্প্যানিশ ফরাসিদের দখলে। সবাই ক্রীতদাস ঠিকা শ্রমিক দিয়ে চাষাবাদ করায়। তাদের আগ্রাসী বিপণনের কারণে ব্রিটিশ মালিকদের গুড় মার খেয়ে যাচ্ছিল। এই গুড় শুধু মিষ্টি স্বাদের খাবারের জন্যই নয় পানীয় রাম তৈরিতেও বিপুল পরিমাণে ব্যবহূত হতো।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের অংশবিশেষ ডাচ ওয়েস্ট ইন্ডিজ স্প্যানিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ হিসেবে ডাচ স্প্যানিশদের অধিকারে ছিল। তারাও গুড় বাজারজাত করতে গিয়ে ব্রিটিশ বাধার মুখোমুখি হতে থাকে। এই তিন ব্রিটিশবিরোধী শক্তির উৎপাদিত স্বল্প মূল্যের গুড় যখন ব্রিটিশ বাজারে প্রবেশ করে তখন ব্রিটিশ প্লান্টারদের গুড়ের চাহিদা কমে যেতে থাকে। ভোক্তারা কম মূল্যে একই মানের অন্যদের গুড়ের দিকে আকৃষ্ট হয়।

দ্য মোলাসেস অ্যাক্ট ১৭৩৩ প্রয়োগ করে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির গুড় প্রতিহত করা এবং শত্রুভাবে তাদের ধ্বংস করাও একটি অন্যতম উদ্দেশ্য বলে পার্লামেন্টে আলোচনা হয়। ঐতিহাসিক জন মিলার লিখেছেন, এই আইন ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটির অর্থনীতির জন্য ভয়ংকর হুমকি হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু অচিরেই দেখা গেল ব্রিটিশ আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হচ্ছে। যিকঞ্চিত কর জমা হচ্ছে ঠিকই কিন্তু ফ্রেঞ্চ, ডাচ স্প্যানিশ প্লান্টারদের বিপুল পরিমাণ গুড় চোরাই পথে ব্রিটেনে ঢুকে পড়ে সস্তায় বিক্রি হয় এবং কার্যত ব্রিটিশ প্লান্টাররাই বড় ধরনের মার খায়। শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তারা ঘুষ নিয়ে বড় বড় চালান ঢোকার সুযোগ করে দেয়। আইনকে অকার্যকর করতে তিন দেশীয় প্লান্টার্স সিন্ডিকেট যতটা সম্ভব কম লাভে তাদের মালামাল ব্রিটেনে পৌঁছার ব্যবস্থা করে। আইনের কারণে ক্ষিপ্ত হয় নিউ ইংল্যান্ড (যুক্তরাষ্ট্রের ছয়টি অঙ্গরাজ্য : কানেটিকাট, মেইন, ম্যাসাচুসেটস, নিউ হ্যাম্পশায়ার, রোড আইল্যান্ড ভারমন্ট) গুড়ের ওপর শুল্ক তাদের ব্রিটিশ বিদ্বেষে আরো আগুন ঢেলে দেয়। স্ট্যাম্প অ্যাক্ট বা টাউনশেল্ড অ্যাক্টের মতো মোলাসেস অ্যাক্ট ১৭৭৩-এর আমেরিকান বিপ্লবের একটি কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আইনের ব্যর্থতার একটি বড় নজির: ১৭৩৩ সালে প্রথম বছর প্রতি গ্যালনে পেন্স কর হিসেবে আদায় হয় ৩৩০ পাউন্ড। ১৭৩৮-১৭৪১ এই চার বছর গড়ে আদায় হয় ৭৬ পাউন্ড, যা শুল্ক কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা প্রশাসনিক খরচের চেয়েও অনেক কম।

১৭৬৩ সালে ব্রিটিশ বোর্ড অব ট্রেডের প্রেসিডেন্ট চার্লস টাউনশেল্ড কর পেন্স থেকে কমিয়ে পেন্স নির্ধারণের প্রস্তাব করেন। ১৭৬৪ সালে গুড় আইন বাতিল হয়ে যায় এবং পেন্স কর ধার্য করে চালু হয় চিনি আইন। হিজ ম্যাজেস্টির আমেরিকান সুগার কলোনির কল্যাণের জন্য প্রণীত আইন শেষ পর্যন্ত অসন্তোষই সৃষ্টি করল। হাতছাড়া হয়ে গেল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, যা এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অংশ।

রাজাকে দিলে প্রতি গ্যালনে পেন্স আর শুল্ক কর্মকর্তাকে ঘুষ দিলে প্রতি গ্যালনে দেড় পেন্স! এই রেট তখন সর্বজনবিদিত। টাকাটা কে পেল এটা ব্যবসায়ীরা উপেক্ষা করল, তার প্রয়োজন লাভ।

১৭৩৩ সালের গুড় আইনের বড় ক্ষতি মেনে নিয়ে ৩১ বছর পর ব্রিটেন আইন সংশোধন করে ভিন্ন নামে চিনি বিল আনল। নতুন প্রধানমন্ত্রী জন গ্র্যানভিল বিষয়টি পেশ করলেন। এপ্রিল ১৭৬৪ পাস হলো দ্য সুগার অ্যাক্ট এতে গ্যালনপ্রতি কর ধরা হলো পেন্স। এতে তিনটি উদ্দেশ্যের কথা বলা হলো: . কর বেশি হলে চোরাচালান রোধ করা সম্ভব নয়, তা আইনের শাসনকে চ্যালেঞ্জ করে, . কতিপয় অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করে ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণ। . ফ্রেঞ্চ-ইন্ডিয়ান যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং ব্রিটিশ ঋণ পরিশোধ।

ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ধরে নিয়েছিল কর অর্ধেক কমিয়ে আনাতে তাদের আমেরিকান উপনিবেশগুলো সন্তুষ্ট হবে। কিন্ত যেখানে দেড় পেন্স দিলেই শুল্ক কর্মকর্তারা ছেড়ে দেয় সেখানে পেন্সের আইন তো ব্যর্থ হতে বাধ্য। ১৭৬৬ সালে শুল্ক সংশোধন করে যখন চোরাচালানির ব্যয়ের চেয়ে কমিয়ে গ্যালনপ্রতি সেন্ট করা হলো সাফল্য এল সে সময়। ১৭৬৫ থেকে ১৭৭৪ এই ১০ বছরের গড় বার্ষিক শুল্ক আদায়ের পরিমাণ ৩০ হাজার পাউন্ড। ট্যাক্স ফাঁকি রোধে যে আদালত স্থাপন করা হয়েছিল তা ছিল জুরি নেতৃত্বাধীন। বিচারের প্রক্রিয়া দীর্ঘ নিষ্পত্তির হার ছিল সামান্য। এবার স্থাপন করা হয় কমিশনভিত্তিক অ্যাডমিরালটি কোর্ট। কর ফাঁকির যা আদায় করে দিতে পারবে, কোর্ট কমিশন পাবে তার শতকরা পাঁচ ভাগ। কর আদায়ের প্রশ্নে এটা কার্যকর হলেও অসন্তোষ বাড়তে থাকে।

ব্রিটেনের ঋণ ছিল ৭৫ মিলিয়ন পাউন্ড। কিন্তু সাত বছর মেয়াদের ফ্রেঞ্চ ইন্ডিয়ান ওয়ারের পর ১৭৬৪ সালে ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৩০ মিলিয়ন পাউন্ড। কলোনি প্রতিরক্ষায় ব্যয় করা অর্থ ব্রিটেন তাদের কাছ থেকেই তুলে নিতে চায় আর কলোনির প্রতিবাদীরা মনে করে এটিও শোষণ। ১৭৬৪ সালে বস্টনের ৫০ জন ব্যবসায়ী ব্রিটেনের পণ্য আমদানি বন্ধের ঘোষণা দেন। নিয়ে সহিংসতাও দেখা দেয়। এসব সহিংসতাই রেভিনিউ অ্যাক্টের মাধ্যমে পেনি কর নির্ধারণ ত্বরান্বিত করে। একই সঙ্গে যা আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলনকে জোরদার করে।

ঊনবিংশ শতকের শুরুতে ব্রিটেনে কৃষিজমির মালিক ছিল মোট জনসংখ্যার মাত্র শতাংশ। ব্রিটেন গণতন্ত্রের যত বুলিই কপচাক না কেন পার্লামেন্ট ৯৭ ভাগ মানুষের দাবি নস্যাৎ করে দেয় ভাগ মানুষের স্বার্থে। ৯৭ ভাগের দাবি খাদ্যশস্যের প্রশ্নে সরকার যেন নমনীয় দরিদ্রবান্ধব আচরণ করে বিদেশ ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে আসা খাদ্যশস্য অবাধে ঢুকতে দেয়। শস্য মানে গম, যব, বার্লি ইত্যাদি। কিন্তু ভূমি মালিকদেরই দৌরাত্ম্য পার্লামেন্টে। তারা আমদানির বিপক্ষে তাদের জমিতে উৎপাদিত শস্য বেশি দামে দেশবাসীকে কিনতে বাধ্য করবে। নেপোলিয়নিক যুদ্ধের সময় এমনিতে আমদানি সম্ভব হয়নি। সুযোগে ভূমির মালিকরা গমের দাম বাড়িয়ে দেয়। গমের আবাদি জমির পরিমাণ বৃদ্ধি  করে। রুটির দাম এত বেড়ে যায় যে তা নিয়ে বিক্ষোভ হয়, অসন্তোষ বিরাজ করতে থাকে। ভূ-মালিক চাষীরা (ব্রিটিশ কৃষক আমাদের গামছা কাঁধে ভূমিহীন চাষী নয়, তারা বড় বড় ফার্মের মালিক) আশঙ্কিত ছিল যে যুদ্ধের পর (১৮১৫) আবার শস্য আমদানি শুরু হলে তাদের শস্যের দাম পড়ে যাবে এবং তাদের লভ্যাংশ অনেক হ্রাস পারে। ১৮০৪ সালের প্রথম কর্ন অ্যাক্টে দেশীয় উৎপাদকদের উৎসাহিত করতে শস্য আমদানির ওপর কিছু পরিমাণ কর আরোপ করা হয়েছিল। যুদ্ধের পর আমদানি শুরু হলে দেখা গেল প্রতি কোয়ার্টার শস্যের দাম ১৮১২ সালের ১২৯ শিলিং পেন্স থেকে ১৮১৫ সালে ৬৫ শিলিং পেন্সে নেমে আসে। জমির মালিকরা হাউজ অব কমনসের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। পার্লামেন্ট নতুন বিল আনা হয় দেশে গমের দাম প্রতি কোয়ার্টার ৮০ শিলিং অতিক্রম না করা পর্যন্ত বিদেশ থেকে আমদানির অনুমাতি দেয়া হবে না। এতে সাধারণ মানুষ ক্ষিপ্ত হয়, তারা পার্লামেন্ট ঘেরাও করে। যেদিন ১৮১৫ সালের কর্ন অ্যাক্ট পাস হয় ক্ষিপ্ত জনতার হাত থেকে পার্লামেন্ট সদস্যদের রক্ষা করার জন্য পার্লামেন্ট ভবনের চারদিকে সশস্ত্র পাহারা বসানো হয়।

জনগণ ক্ষিপ্ত। রুটির দাম বেড়ে যায়। শিল্প স্থাপনার মালিকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন, কারণ শ্রম মজুরি বাড়ানোর আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। ১৮৩৯-এর বাণিজ্যিক মন্দা শুরু হয়। খরায় শস্যহানি ঘটে। অসন্তোষ ধূমায়িত হয়ে ওঠে।

স্টকপোল থেকে নির্বাচিত এমপি রিচার্ড কবডেন অ্যান্টিকর্ন লিগ গঠন করেন এবং তা বিপুল সমর্থন লাভ করে। আয়ারল্যান্ডে আলুর ফলন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দুর্ভিক্ষ শুরু হয়। রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রী রবার্ট পিল শস্য আইন বাতিলের প্রস্তাব ক্রমাগত নাকচ করতে করতে ১৮৪৬ সালে আইনে বড় ধরনের সংশোধন করতে বাধ্য হন। আমদানি করা প্রতি কোয়ার্টার গম, যব বার্লির ওপর এক শিলিং কর ধার্য করা হয়। কার্যত পুরনো আইনটি বাতিলই হয়ে যায়। আইনটি অব্যাহত রাখার পক্ষে ১১২ ভোট এবং বাতিলের পক্ষে ২৪১ ভোট পড়ে।

রবার্ট পিল ভূ-মালিক চাষীদের সমর্থন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ সে বছরই তাকে পদত্যাগে বাধ্য করে।

কর্ন বাতিল হওয়ায় উপনিবেশগুলোর রফতানির দরজা আবার খুলে যায়। দুর্ভাগ্যবশত ঔপনিবেশিক কাঠামোতে সেখানকার চাষী ভূ-মালিকদের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা সামান্যইমধ্যবর্তী স্বার্থগুলো লাভের বড় অংশ তুলে নেয়।

প্রধানমন্ত্রী রবার্ট পিলকে নিয়ে আলোচনায় সবার আগে উঠে আসে, একটি দরিদ্রবান্ধব গণমুখী আইনের কারণে তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব হারালেন।

 

এম মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা