বৃহস্পতিবার | এপ্রিল ২২, ২০২১ | ৯ বৈশাখ ১৪২৮

সিল্করুট

খাদ্যের খোঁজে সাম্রাজ্য বিস্তারের গল্প

মুহিত হাসান

শুধুমাত্র খাবারের জন্য...

কখনো সূর্য অস্ত যায় না এমন আজদাহা আকৃতির বিরাট সাম্রাজ্য যেন-তেন-প্রকারে বা যুদ্ধলুণ্ঠন-খবরদারির মারফত ব্রিটেনবাসীরা নির্মাণ করতে ব্যতিব্যস্ত হয়েছিল কেন? আজকে ইতিহাসের নেপথ্য কাহিনীর দিকে ফিরে তাকালে মনে হয়, পরে যতই জটিল সব উদ্দেশ্য যুক্ত হোক না কেন, ইংরেজদের এহেন কর্মকাণ্ডের মূলে প্রাথমিক পর্যায়ে একটিই মৌলিক চাহিদা কাজ করেছিলতা হলো খাদ্য। নানা প্রকার খাদ্যের খোঁজেই মূলত তাদের ভিন দেশের ভূমি দখল এবং সেখানে সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটানোর শুরু। খাবার কোথায়’— প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জেদই মূলত তাদের ঔপনিবেশিক বাসনার মূল অনুঘটক পরে সে বাসনাকে বাস্তবে পরিণত করার বেলায় প্রধান সহায়ক হয়ে ওঠে। কিন্তু কীভাবে? সে প্রশ্নের উত্তরই এবার কয়েকটি বাস্তব আখ্যান বর্ণনা করার ছলে দেয়া যাক।

কডের খোঁজে কানাডায়

খাবারের খোঁজে ইংরেজ রাজ স্বভূমির বাইরে প্রথম সার্থক অভিযান চালিয়েছিল আজকের কানাডায়! তা- আবার কড মাছের খোঁজে। হালের কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ড দ্বীপসংলগ্ন সামুদ্রিক এলাকায় নাকি এত কড মাছ মিলত যে পনের শতকের শেষে সেখানে আসা ইতালীয় পর্যটক জন কাবট লিখেছিলেন, সমুদ্রের অংশে এত মাছ যে জাল দিয়ে তো বটেই, এমনকি শুধু মাছ রাখার গোদা ঝুড়ি দিয়েও এখানে মাছ ধরা সম্ভব। ইংল্যান্ড কড মাছের মাহাত্ম্য অনুভব করতে পারল ষোল শতকের মাঝামাঝি এসে। তখন রাজা অষ্টম হেনরির রাজত্বকাল, খাদ্যগুদামে একটি বিশেষ কারণে কডের চাহিদা বেড়ে চলছিল। কী সেই কারণ? কারণটি ধর্মীয়। অষ্টম হেনরির আমলে খ্রিস্টীয় নানা রীতি অকাট্যরূপে মেনে চলার একটা রব উঠেছিলফলত, সপ্তাহের বিশেষ কয়েক দিন নিষ্ঠাবান খ্রিস্টানদের ছিল মাংস খাওয়া মানা। তখন কীভাবে কডের চাহিদা বাড়ছিল তা অনুধাবন করা যাবে সরকারি নৌবাহিনীর একটা হিসাব দিলে। অষ্টম হেনরির নৌবাহিনীতে সদস্য সংখ্যা ছিল হাজার ৭০০-এর মতো, সপ্তাহে দুদিন যদি তাদের একটি কড মাছের চার ভাগের এক ভাগ খেতে দেয়া হতোতবু প্রতি বছরে তাদের জন্য দুই লাখ আস্ত কডের দরকার পড়ত। এমন অবস্থায় ১৫৪৭ সালে অষ্টম হেনরি প্রয়াত হলেন, আবহাওয়ার দুর্যোগে রানী প্রথম এলিজাবেথ সিংহাসন নেয়ার পর রাজকোষে নিদারুণ টান। রানীর এক মন্ত্রী লর্ড বার্গলি হিসাব করে দেখলেন, সেনাদের একদিন কড মাছ খাওয়াতে যা খরচ, তা মাংসভোজনের রীতিমতো অর্ধেক। অতএব চলো নিউফাউন্ডল্যান্ড। কিন্তু ওখান থেকে মাছ আহরণের সুযোগ অন্যরাও ছাড়তে চাইছিল না। বিশেষত পর্তুগিজ স্পেনীয় জেলেবহরের সঙ্গে কড শিকার নিয়ে ইংরেজদের ঠোকাঠুকি ছিল নিত্যকার ঘটনা। এর মাঝেই ১৫৮৫ সালে পর্তুগিজ জেলেবহরকে প্রায় চেপে ধরলেন ইংরেজ নৌ-কমান্ডার জন হকিন্স। ধুমধাম পিটিয়ে সব পর্তুগিজ (কিছু স্পেনীয়ও) মাছ ধরার জাহাজগুলোকে সাগরছাড়া করলেন। নিউফাউন্ডল্যান্ডের সুস্বাদু নোনা কডের ওপর ইংরেজদের প্রায় একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলো। যাকে কিনা বলা যায় ইংরেজদের প্রথম সাম্রাজ্য বিস্তার অর্থনীতির স্বার্থে নির্দিষ্ট অঞ্চল দখলের পদক্ষেপ।

চিনির খনি বার্বাডোজ

কানাডা ছিল আদতে বাড়ির কাছে মত্স্যনগর, কিন্তু খাদ্যের সন্ধানে ইংরেজদের সাম্রাজ্য বিস্তারের পথ পাড়ি দেয়ার তো কেবল শুরু। এবার পানসি চলল বার্বাডোজে। সতের শতকের গোড়ায় পৃথিবীর বেশির ভাগ চিনি উত্পন্ন হতো ব্রাজিলে। কিন্তু সেখানে পয়লা ছিল পতুর্গিজদের ভিড়, পরে তাদের হটিয়ে জায়গা করে নেয় ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। অতঃপর ইংরেজদের নজর পড়ল ওয়েস্ট ইন্ডিজের ছোট্ট দ্বীপ বার্বাডোজে। বার্বাডোজে গিয়ে চিনির সন্ধান করার ক্ষেত্রে পথিকৃৎ ছিলেন যে ইংরেজ, নাম তার কর্নেল জেমস ড্রাক্স। তবে মজার ব্যাপার এই, ড্রাক্স চিনির আশায় বার্বাডোজে আসা তার সমসাময়িক ইংরেজ ব্যবসায়ীরা প্রথম দফায় সাফল্য খুব একটা পাননি। কারণ সেখানে আখ চাষের কৌশল বুঝে নিতেই লেগে গিয়েছিল এক দশকের কাছাকাছি। ১৬৪০-এর দশকে সেখানে এলেও ড্রাক্স চূড়ান্ত সাফল্য পান ১৬৫০-এর দিকে। কিন্তু সাফল্যের মূলে ছিল বার্বাডোজের স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকদের রক্ত জল করা শ্রম। আঠার শতকের শেষে বার্বাডোজে গিয়ে ইংরেজদের চিনি-সাম্রাজ্যের স্বরূপ চিনতে পারা এক জাহাজের নাবিক অ্যারন থমাস নিজের ডায়েরিতে খেদ করে লিখেছিলেন, আমি আর আমার চায়ে চিনি খাব না, কারণ এটা আদতে কৃষ্ণাঙ্গদের রক্তআর কিছু নয়।


চা চাইতে ভারতপানে

১৮৩৩ সালে আফিম যুদ্ধের চোটে ইংরেজদের যখন চীন থেকে চা-পাতা পাওয়া বন্ধ হয়ে গেল, তখন ইংরেজদের মনে হলো যে সদ্য অধীকৃত ভারতীয় ভূখণ্ডই হতে পারে তাদের অন্তহীন চা-তৃষ্ণা নিবারণের নতুন উৎস। যেমন ভাবনা তেমনি কাজ। কারণ ইংল্যান্ড চিনের মধ্যেকার বাণিজ্যিক সম্পর্কে ফাটল ধরার প্রভাব চায়ের বাজারেও পড়েছিল যথারীতি। চা আমদানির খরচ তখন হঠাৎই বেড়ে দাঁড়ায় বছরে মিলিয়ন পাউন্ড। অতএব পয়সা বাঁচানোর লক্ষ্যে সদ্য দখলীকৃত ভারতের জমিতে চা চাষের কথা তাদের ভাবতে হয়। যদিও এর আগে ১৭৭৪ সালে চীন থেকে চা-বীজ এনে ভুটানে চাষ করার চেষ্টা করা হয়েছিল, সে যাত্রা উদ্যোগটি ব্যর্থ হয় আবার এর ১৪ বছর পর আরেকবার কলকাতার শিবপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেনেও চা গাছ রোপণ করে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টাও ফলপ্রসূ হয়নি। এমত পরিপ্রেক্ষিতে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮৩৪ সালে চা সমিতি তৈরি করেন, যাদের কাজ ছিল ভারতে চা চাষ চা শিল্প স্থাপনের ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করা। সমিতি ১৮৩৫ সালে চা গাছ চায়ের বীজ সংগ্রহের জন্য চীন সফর করে। কিন্তু আফিম যুদ্ধের আগেই ১৮১৫ সালে একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তা কারলেন লেটারের আসাম থেকে প্রেরিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে আসামের সিংকো জাতিসত্তার আদিবাসীরা এক ধরনের বন্য পাতা দিয়ে পানীয় তৈরি করে পান করে। প্রতিবেদন লেখার বছর কয়েক বাদে, ১৮২৩ সালে আসামে মেজর চার্লস রবার্ট ব্রুস এক ধরনের ব্যতিক্রমী চা গাছ আবিষ্কার করতে সমর্থ হন, যার পাতাকেই সম্ভবত কারলেন লেটার বন্য পাতা বলে চিহ্নিত করেছিলেন। যদিও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বোটানিস্ট একে এক জাতের বন্য ক্যামেলিয়া বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। অবশ্য চা সমিতির চীন সফরের পর মেজর ব্রুসের খুঁজে পাওয়া গাছটিকে ইংরেজ উদ্ভিদতত্ত্ববিদরা বহু গবেষণা করে অবশেষে এক জাতের দেশীয় চা বলে স্বীকৃতি দেন। এরপর ১৮৩৭ সালে অবশেষে প্রথমবার আসামে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পরীক্ষামূলকভাবে চায়ের আবাদ শুরু করে। ভারতে সংগঠিত চা উৎপাদন শিল্পেরও গোড়াপত্তন হয়। আর দেশীয় জাতের সেই চা গাছ আবিষ্কারের স্বীকৃতি হিসেবে রবার্ট ব্রুসকে আসামে কোম্পানি চা উৎপাদন ক্ষেত্রের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। ১৮৩৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পরীক্ষামূলক তকমা ঝেড়ে ফেলে বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদনের জন্য কাজ শুরু করে। বাণিজ্যিক চা বাগান স্থাপনের প্রস্তাব অতঃপর লন্ডন ভারতের বিভিন্ন কোম্পানির কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। ১৮৩৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে চা চাষের অনুমতি চেয়ে আবেদন করে লন্ডনের তিনটি কলকাতার একটি কোম্পানি। কোম্পানিগুলোকে একত্র করে গঠিত হয় আসাম কোম্পানি নামে একটি জয়েন্ট স্টক কোম্পানি। আসামে কোম্পানির চা বাগান স্থাপনের অভিযান বিস্তৃত থেকে বিস্তৃততর হতে থাকে। ১৮৫৩ সালের হিসাবে তাদের অধীনে থাকা চা বাগানগুলোর মোট আকার ছিল দুই হাজার একর। ১৮৯৬-৯৭ সালে তা পাঁচ গুণেরও বেশি হয়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার একরে। ইংরেজদের চা তৃষ্ণার কারণে তাই উত্তর-পূর্ব ভারতের দুর্গম এলাকাও সাম্রাজ্যের প্রভাববলয়ের বাইরে রইল না। এবং তার অনিবার্য অভিঘাত হিসেবে স্থানীয় আদিবাসীদের চা-শ্রমিকে পরিণত হতে হলো, তাদের স্বভূমি অন্যে দখল করে চা-বাগান বানাল।

খাবার, স্বার্থ সাম্রাজ্য

পূর্বোক্ত কতিপয় কেস স্টাডি থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে ইংরেজদের সাম্রাজ্য বিস্তারের নেপথ্যে কিছু খাদ্যের অন্তহীন উৎস খুঁজে বের করার তাগাদা কাজ করেছিলনিজস্ব ভূমিতে সেগুলো অপ্রতুল আকারে বা প্রায় উত্পন্ন না হলেও তা ভোগের আকাঙ্ক্ষার কোনো কমতি ছিল না তাদের মধ্যে। উপরন্তু ছিল নিজেদের ভোগের চাহিদা পূরণ করে বহির্বিশ্বে ওইসব পণ্য বিক্রি করে টাকা কামানোর ধান্ধা। ফলে খাবারের খোঁজে ইংরেজদের সাম্রাজ্য যতই বিস্তার লাভ করেছে, ততই ঔপনিবেশিক শোষণের জাঁতাকলে পড়ে বিশ্বের নানা প্রান্তের সরল আদি অধিবাসীরা পরিণত হয়েছে শিকলবন্দি দাসে। লঙ্ঘিত হয়েছে সুষম বাণিজ্যিক যোগাযোগ। জোরপূর্বক অধিক উৎপাদনের কারণে পরিবেশও বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বস্তুত ইংরেজদের স্বার্থতাড়িত খাদ্যসন্ধানী অভিযাত্রা তাদের সাম্রাজ্যকে দিনে দিনে বিরাট করে করে তুললেও এর দ্বারা গোটা দুনিয়ার বাকি অসহায় মানুষদের যে অর্থনৈতিক, মানসিক পরিবেশগত ক্ষতি হয়েছেতা অপূরণীয়।

 

মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক