বৃহস্পতিবার | এপ্রিল ২২, ২০২১ | ৯ বৈশাখ ১৪২৮

সাহিত্য

ইন্টারভিউ

মো. রিজওয়ানুল ইসলাম

আজরতউল্লাহ প্রামাণিক সাহেবের ঘুমটা আজ একটু বেশী দেরিতেই ভেঙে যায়। তৃতীয় তলায় তার ঘরটার পূর্বদিকের খোলা জানালাগুলো দিয়ে সকালের কড়া রোদ বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। রোদের তীব্রতায় শরীর ঘামে জবজব করছে। ঢুলুঢুলু অবস্থায় চোখ খুলে দেখলেন, তার রুমের ফ্যানটা ঘুরছে না। অক্টোবরের শুরুতে এখন শরৎকালের আবহাওয়া থাকার কথা। কিন্তু গত কদিন ধরেই আকাশে শুধু কালো মেঘের আনাগোনা আছে, বৃষ্টির দেখা নেই। যেন এটা অক্টোবর নয়, মে মাস। আর গতকাল রাতে যেন আরো একটু বাড়াবাড়ি রকমের গরম পড়েছিল। ব্যবসায়ী সমিতির মিটিং শেষে তার বাড়ি ফিরতে ফিরতে একটু বেশিই দেরি হয়েছিল। তারপর আবার বাসায় না ছিল বিদ্যুৎ, না কাজ করছিল ইউপিএস। ছেলে আমিনুল্লাহ প্রামাণিক তাকে বলেও ছিল, ইউপিএসের উপর নির্ভরতা না বাড়িয়ে একটা জেনারেটর লাগাতে, সঙ্গে একটা এসি। ছেলের কথায় গা করেননি তিনি। আসলে তিনি ভাবেন যে মানুষ যত আয়েশে থাকে, তার আয়েশের চাহিদা ততই বাড়ে। তিনি পরিষ্কার মনে করতে পারেন, এইতো মাত্র এক যুগ আগে তাদের এলাকায় বিদ্যুৎ এল। তিনি তো আগে দিব্যি ভাদ্র মাসের গরমে শুধু হাত পাখার বাতাসে চলতেন, আর এখন যেন ফ্যান না চালালে ঘুমাতেই পারেন না। কিন্তু এখন তার মনে হচ্ছে, বড় ছেলের কথাটা একটু ভেবে দেখা দরকার।

আজরতউল্লাহ সাহেব দোতলায় নেমে তার একমাত্র নাতি আসিফের খোঁজ করেন। তিনি দেখেন যে, সে এখনো অঘোর ঘুমে। তার মাথার কাছে একটা সোলার ফ্যান ঘুরছে, তাই এই প্রচণ্ড গরমেও তার ঘুমাতে কোন কষ্ট হচ্ছে না। আসিফকে ঘুমাতে দেখে আজরতউল্লাহ সাহেবের মনটা একটু দমে যায়। তিনি তার বউমা তারাকে বলেন, আসিফ ঘুম থেকে ওঠলেই যেন তাকে তার কাছে দোকানে পাঠানো হয়। সকালে ঘুম থেকে ওঠে নাতির সাথে খুনসুটি না করলে তার দিনটা যেন পানসে হয়। 

তিনি নাস্তার টেবিলে বসার আগে তার স্ত্রী হাজেরাকে ভাল করে বুঝিয়ে বলেন যে, দুপুরে কয়েকজন গণ্যমান্য মেহমান তাদের বাড়িতে খাবেন। কুদ্দুস একটু পরেই মাছ-মাংস দিয়ে যাবে, বউমা বাচ্চা মানুষ, তার ওপরে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে হাজেরা যেন ঝাড়া হাত-পা হয়ে না থাকেন। স্বামীর মেহমানদের আপ্যায়ন নিয়ে এত ব্যস্ততা দেখে হাজেরার একটু জানতে ইচ্ছে করে মেহমানরা কারা। তার মনে হয়, তিনি কিছুদিন থেকে যে গুঞ্জন শুনছেন যে আজরতউল্লাহ এবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দাঁড়াবেন, সেটা কি তবে সত্যি? এই মেহমানেরা কি ইলেকশনের কেউ? তিনি একটু জিজ্ঞাসু চোখে স্বামীর দিকে তাকান। কিন্তু আজরতউল্লাহ সাহেব যেন সেদিকে তাকানই না। খাবার শেষে স্বামীর হাতে পান দিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করেন যে মেহমান কজন আসতে পারে। আজরতউল্লাহ সাহেব তাকে পান চিবুতে চিবুতে জন-পনেরো মেহমান ধরে রান্নার আয়োজন করতে বলে নিচে চলে যান। দোকানে গিয়ে আজরতউল্লাহ সাহেব দেখেন, দোকানে শুধু তার কর্মচারী কুদ্দুস বসে আছে, আমিনউল্লাহর কোন দেখা নেই। তিনি একবার ভাবেন কুদ্দুসকে দিয়ে আমিনউল্লাহর খোঁজ করবেন। তার পরই ভাবেন, না, আমিনউল্লাহ জোয়ান ছেলে, এখনই ব্যবসা-বাণিজ্যে সে এত মন দিয়ে দিবে না, এটাই তো স্বাভাবিক। আর দশটা ধনী লোকের ছেলের মত তার কোন বদ খেয়াল নাই সেই তো অনেক। সে যদি নেশা ভাং করত, জুয়া খেলতো তাহলে কি হত? যখন বাবা থাকবে না তখন ঠিকই সে নিজের বিষয়-আশয় বুঝে নিবে। কুদ্দুসকে বলেন বাজার থেকে ছয়-সাত কেজি ওজনের কাতলা, ডিমওয়ালা ইলিশ, দেশী মোরগ আর কেজি ছয়েক খাসির মাংস আনতে।

‘চাচা, বেদবি না নিলে এডা কথা কনো নি’, কুদ্দুস বলে।

- ‘ক, কি কবু, ক’।

- ‘চাচা এত টাকা দিয়ে বাজার থেকে কাতল মাছ কিনমো কিসক? হামাগেরে পুকুরওতইত মেলা বড় বড় মাছ আছে।’

- ‘আরে বেকুব, সেডা কি হামি জানি না? তুই জানিস না, হামাগেরে মাছত ফিড দেয়া আছে, গন্ধ হয়, সেগলা কি মেহমানর পাতত দিমো তালে কি হামার মান সম্মান থাকপে? তুই কিন্তু মাছওয়ালাক ভাল করে কবু, ট্যাকা যত লাগে লাগুক, কিন্তু মাছ যান ভালো হয়। মাছ খারাপ হলে কিন্তু তার খবর আছে। আর শন, মাছ এত বড় হয় যান তার কোন পেটি না হয়, আর যান ভালো ত্যালথাকে। আজকা কিন্তু খালি টিও, এটিও সাহেব আসপে না, তারগে সাথে টিএনও সাহেব থাকপে, তারগক জা-তা খাবার দিলে মান-সম্মান থাকপে?’

কুদ্দুস আর কোন কথা না বলে ক্যাশ থেকে টাকা নিয়ে বাজারে চলে যায়।  সে বাজার থেকে ফিরলে তিনি তাকে বলেন যাতে হাজেরাকে সে বলে দেয় যেন দুপুরের পোলাওটা বাসমতী চালের হয়।আর সেপোলাওটাযেন সবার শেষে রান্না করা হয়। তিনি শুনেছেন যে টিএনও সাহেব বাসমতী চালের পোলাও খুব পছন্দ করেন,সে পোলাও হতে হবে আগুন গরম, তার সাথে থাকতে হবে গরম গরম ভাজা ইলিশ মাছের ডিম।

সোয়া এগারোটার দিকে আজরতউল্লাহ সাহেবের ফোনটা বেজে ওঠে। তিনি দেখেন সোনাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হেডমাস্টার লতিফ সাহেবের ফোন। হেডমাস্টার সাহেব তাকে জানান যে, টিও এবং এটিও সাহেব এসে পড়েছেন। ওনারা তার খোঁজ করছেন, তিনি কি মেহেরবানী করে একটু যেতে পারবেন? আজরতউল্লাহ সাহেব তাকে টিএনও সাহেবের কথা জিজ্ঞেস করলে হেডমাস্টার সাহেব তাকে জানান, তিনি হঠাৎ ডিসি সাহেবের ফোন পেয়ে সকালে জেলা সদরে গেছেন, তার আসতে একটু দেরি হবে। টিএনও সাহেবের আসতে দেরি হবে শুনে আজরতউল্লাহ সাহেবের মনটা একটু দমে যায়, তিনি ভাবেন, শুধু যদি টিএনও সাহেব ডিসি সাহেবের ওখানে আটকা পড়ে যান, তিনি এতগুলো টাকার বাজার করলেন! কিছুদিন পরেই তাদের এলাকার একটা বিল ইজারা দেয়া হবে, আর টিএনও সাহেব তো সেই ইজারা কমিটির প্রধান। আজকের মিটিং আর দুপুরের খাবারের সুবাদে তার একটু টিএনও সাহেবের সাথে জানাশোনা থাকলে কত দিকেই তো কত উপকার হতে পারে। আর এই টিও বা এটিও তো তেমন কোন কাজের না। আর একটা নৈশ প্রহরী কাম দপ্তরি পদের ইন্টারভিউ আছে বলেই না তাদের কদর করা। তাহলে এসব শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তার সাথে তার কাজ কি? আর মনে হয়, খোদা যা করেন, মঙ্গলের জন্যই করেন। ইউএনও সাহেব নতুন মানুষ তিনি থাকলে আবার ইন্টারভিউটা কোন দিকে যাবে তার কি ঠিক আছে? হয়তো শেষে তার ক্যান্ডিডেটের সিলেকশনটাই আটকে যাবে। তার মনে পড়ে, তিনি আজকে সকালে দোকানে বসতেই তিনি রাস্তায় জোড়া শালিক দেখেছেন, দিনটা আজকে ভালোই যাওয়ার কথা। 

তিনি মোটরসাইকেলে চড়ে সোনাকান্দি প্রাইমারি স্কুলে যাওয়ার জন্য রওনা দেন। তার গ্রামের বাড়িও সোনাকান্দি গ্রামেই ছিল। কিন্তু তিনি বছর পাঁচেক আগে গ্রামের বাড়ি ছেড়ে বাজারে এসে নতুন করে চারতলা বাড়ি করেছেন। গ্রামের বাড়িতে জায়গাটা কম। আর তাছাড়া সব কাজকর্মই বাজার কেন্দ্রিক। আজকাল এই এলাকায় নতুন নতুন এনজিওর অফিস হচ্ছে, সেইসব অফিসে অনেক দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে চাকরি করেন। তারা গ্রামে থাকতে চান না, তাই বাজারে বাসা ভাড়ার টাকাও বেশি পাওয়া যায়- এসব ভেবে তিনি বাজারেই বাড়ি করেছেন। তবে গ্রামের বাড়িতে না থাকলেও এই গ্রামের সাথে তার সব যোগাযোগ আছে। তিনি গ্রামের মসজিদ কমিটির সভাপতি, আবার প্রাইমারি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটিরও তিনি সভাপতি। অবশ্য মসজিদ কমিটির সভাপতি সহজে হতে পারলেও স্কুল ম্যানেজিং কমিটিতে থাকার জন্য তাকে অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়েছে। তার নিজের কেউ তো প্রাইমারি স্কুলে পড়ে না। তার নিজের নাতিকেও তিনি বাজারের কেজি স্কুলে নার্সারিতে দিয়েছেন। তাই বুদ্ধি করে তিনি কুদ্দুসের ছেলে নবাবকে ভর্তির সময়ে অভিভাবক হিসেবে তার নাম দিয়েছেন। তিনি হয়তো বিদ্যোৎসাহী কোটাতেও স্কুল ম্যানেজিং কমিটিতে থাকতে পারতেন; কিন্তু সেটা নিয়ে কখন কোন ঝামেলা বাঁধে তাতো বলা যায় না। লতিফ সাহেব দীর্ঘদিন ধরে সোনাকান্দি স্কুলে আছেন, তিনি আজরতউল্লাহ সাহেবের কথা রাখেন, কিন্তু যদি কোন হেডমাস্টার এসে ত্যাঁদড়ামি করে? এসব ভাবনা ভেবেই তিনি তার বিদ্যোৎসাহী নয়, সরাসরি অভিভাবক হিসেবে ম্যানেজিং কমিটিতে ঢুকেছেন। কিন্তু তাও কি কম হ্যাপায় পড়তে হয়েছে? গত বছরে তো শেষে রীতিমত ইলেকশনে জিতেই তাকে কমিটিতে ঢুকতে হয়েছে। আর টাকা-পয়সা ছাড়া কোন ইলেকশন হয়? আর প্রতিপক্ষের লোকজনের কত অপপ্রচার! তার প্রচারণা, আজরতউল্লাহ প্রামাণিক নিজেই ম্যাট্রিক ফেল, সে লেখাপড়ার বোঝেটা কি? তার উপর তাঁর নিজের তো কেউ স্কুলে পড়ে না, তাঁর কি এই স্কুলের প্রতি কোন মায়া থাকবে?

আজরতউল্লাহ সাহেবের লোকজনও সুন্দর করে এসব অপপ্রচারের উত্তর দিয়েছে- আরে আজরতউল্লাহ সাহেব সেই মিলিটারি আমলে মেট্রিক পরীক্ষা দিয়েছেন, তখন তিনি টেস্ট পরীক্ষায় পাস করেছিলেন, সেটাই বা কম কিসে? তখন কি আর লেখাপড়া এত সোজাছিল? আজকাল তো লিখলেও পাস, না লিখলেও পান। আর এই যে কি জানি একটা সিস্টেম চালু হয়েছে খালি একটা করে টিক চিহ্ন দিলেই পাস। আর আজরতউল্লাহ সাহেবের নিজের কেউ স্কুলে পড়ে না এর মানে কি? কুদ্দুস তো সেই ছোটবেলা থেকে আজরতউল্লাহ সাহেবের খেয়েপড়েই মানুষ, তার ছেলে কি আজরতউল্লাহ সাহেবের পর? আর স্কুলের ম্যানেজিং কমিটিতে থাকার জন্য তার নিজের পরিবারের কারো স্কুলে পড়তে হবে কেন? এই যে এমপি সাহেব গেলবার এমপি হলেন, তিনি কি এই এলাকার লোক? ভোটের আগে কেউ তাকে এলাকায় কোনদিন দেখেছে? আর উপজেলার চেয়ারম্যান সাহেবে এই এলাকায় বাড়ি আছে বটে, কিন্তু তিনি আর কদিনই বা সেখানে থাকেন? 

সোনাকান্দি স্কুলে মোটর সাইকেল থেকে নেমেই তিনি দেখেন যে, স্কুলের মাঠে একটা কার পার্ক করা আছে। তিনি ভাবেন যে, এটিও সাহেব তো দূরের কথা, টিও সাহেবেরই কি কার আছে? তবে কি টিএনও সাহেব ইতিমধ্যেই চলে এসেছেন? তিনি একটু ধন্দে পড়ে যান। স্কুলের শিক্ষকদের রুমে ঢুকে অবশ্য তিনি দেখেন টিএনও সাহেব সেখানে নেই। তিনি দেখেন ছয় সদস্য বিশিষ্ট সিলেকশন কমিটির পাঁচজন- টিও, এটিও, হেডমাস্টার, সহকারী শিক্ষক শামীম, আর তিনি সেখানে উপস্থিত।  শুধু টিএনও সাহেব নেই। টিও সাহেব তাকে জানান যে, টিএনও স্যার তাকে মোবাইলে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি জেলা সদরে আটকে গেছেন। কমিটির সদস্যরা যেন তার জন্য অপেক্ষা না করেই ইন্টারভিউ নিয়ে ফেলেন। 

হেডমাস্টার লতিফ সাহেব কমিটির সদস্য সচিব। তিনি সবাইকে জানান যে, দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী পদে ১৯টা দরখাস্ত পড়েছিল। কিন্তু সেগুলোর মধ্যে ষোলটা দরখাস্তই যাচাই-বাছাইয়ে বাদ পড়ে গেছে, কেননা কেউ কেউ বিজ্ঞপ্তির শর্তমতে এই ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা না, আবার কেউ কেউ এসএসসি পাসের কোন সনদ জমা দেয়নি। শুধু তিনটা দরখাস্তই সব শর্ত পূরণ করেছে, তাই সেই তিনজন দরখাস্তকারীকেই শুধু ইন্টারভিউতে ডাকা হয়েছে। টিও সাহেব যে দরখাস্তগুলো শর্টলিস্ট হয়নি সেগুলো একবার দেখে নিয়ে নিতে চান। হেডমাস্টর সাহেব কাগজপত্রগুলো তাকে দিলে তিনি সেগুলোর কিছু এটিও সাহেবকে দেন, আর কিছু নিজে দেখা শুরু করেন। আজরতউল্লাহ সাহেবের খুব বিরক্তি পায়। আরে, গত সপ্তাহেই তিনি থানা শিক্ষা অফিসে গিয়ে টিও সাহেবের সাথে দেখা করে একটা খাম দিলেন। সেই খাম ভর্তি একহাজার টাকার কড়কড়ে সত্তরটা নোট। এটিও সাহেবকেও তিনি বাজারে তার দোকানে বসে এরকম একটা খামে করে নগদ ৩০ হাজার টাকা দিয়েছেন। হেডমাস্টার সাহেব বোকা কিসিমের মানুষ, টাকা পয়সার গুরুত্ব বোঝেন না। কিন্তু তাঁকেও তো বুঝিয়ে বলেছেন, আলম ছেলেটা খুব ভাল, ইন্টারমিডিয়েট পাস, বাবা নেই বলে বেচারা অনার্স পাস করতে পারল না। তার মত একটা ভাল ছেলেকেই এই চাকরিটা দিতে হবে। সে দায়িত্ববান ছেলে; ডাকলে সব সময় পাওয়া যাবে। আর হামিদ ছেলেটা অনার্স পাস বটে, কিন্তু সে কি আর এই দপ্তরীর চাকরি করবে? সে তো মাস্টার্স পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা করছে, সে কি এই চাকরিতে সময় দিবে? তবে এই চাকরি দেয়া হলেও সে আর কয়দিনই বা চাকরি করবে? সে একটা ভাল চাকরি পেলে অন্য কোন চাকরিতে চলে যাবে। আর তাছাড়া সে এই স্কুলের ভাল ছাত্র ছিল। ফার্স্ট থেকে না হলেও সব সময় ওপরের দিকেই তার রোল থাকতো। দপ্তরীর মত একটা চাকরিতে কত রকমের কাজ থাকবে, তাকে দিয়ে কি এই কাজ হবে? 

আর সালাম তো মাত্র ম্যাট্রিক পাস, বাউন্ডুলে ছেলে তাকে কীভাবে নেয়া যাবে? সে আলমের থেকে ডিগ্রিতেও পিছিয়ে, আচার-আচরণ, দায়িত্ব জ্ঞানেও দুজনের কোন তুলনা হয় না। শুধু একটা কাগজ কলমে কিছু থাকতে হয় বলেই না এই ভাইবা, না হলে তো আলমকে এই চাকরিতে এমনিতেই দেয়া যেত। আর আলম যদি চাকরিটার ব্যাপারে সিরিয়াস না হত, তাহলে কি আর তার পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ছয় শতাংশ ধানী জমি বিক্রি করে তার হাতে নগদ ৪ লাখ টাকা ক্যাশ দিয়ে যেত? তিনি তাকে বলেছিলেন যে, ইন্টার পাস ছেলে, সে তো অন্য কোন চাকরি খুঁজলেই পাবে। কিন্তু সে তাকে ভালো করে বুঝিয়ে বলেছে যে, সে গত দুই বছর ধরে নানা জায়গায় দরখাস্ত করেও কোন চাকরি পায়নি। আর দপ্তরীর হলেও এটা সরকারি চাকরি। তার খুব দরকার। প্রভিডেন্ট ফান্ড, পেনশন নাই, তাতে কি? আজ নাই, কাল হবে?

এটিও সাহেব কাগজপত্র থেকে মুখ তুলে বলেন, ‘আমিতো কাগজপত্র সব দেখলাম, আমার কাছে তো সবকিছু ঠিকঠাক আছে বলেই মনে হয়। এটিও সাহেব কি বলেন?’

-‘জ্বী স্যার, আমার কাছেও তাই মনে হয়।’

-‘ঠিক আছে, হেডমাস্টার সাহেব, এখন তাহলে ইন্টারভিউ শুরু করা যাক। ক্যান্ডিডেটরা সব এসেছে তো?’

- ‘জ্বী স্যার, তারা তিনজন সে তিনজন তো সেই সকাল সাড়ে ৯টা থেকেই এসে বসে আছে।’

আজরতউল্লাহ সাহেব তখন হেডমাস্টার সাহেকে জিজ্ঞেস করেন, মেহমানদের চা-নাশতা খাওয়ানো হয়েছে কিনা। তাঁদের আসার সাথে সাথেই চা-নাশতা খাওয়ানো হয়েছে জেনে আজরতউল্লাহ সাহেবের বিরক্তিতে মন খিঁচে যায়। তিনি বুঝতে পারেন না যে, হেডমাস্টার সাহেবের আর কবে আক্কেল হবে? তাকে ছাড়াই তিনি নাশতা দিয়ে ফেললেন? কিন্তু মেহমানদের সামনে তিনি আর কথা বাড়ালেন না। প্রথম ক্যান্ডিডেট সালাম এসে সালাম দিয়ে রুমে ঢুকে। এই প্রচণ্ড গরমেও সে ফুল শার্ট-প্যান্ট পড়ে এসেছে। মাথায় চপচপে তেল দেয়া, সুন্দর করে সিঁথি তোলা। সে দরদর করে ঘামছে।

টিও সাহেব তাকে জিজ্ঞেস করেন, বলো তো, ‘সকাল থেকে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে' এর ট্রান্সলেশন কি হবে? সে ‘রেইন রেইন’ করে তোতলাতে থাকে। তারপর তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয়ের নাম কি?’ এরও তিনি কোনো উত্তর পান না, সালাম ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

- ‘আচ্ছা বলো তো বিদ্রোহী কবি বলা হয় কাকে?’

- ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে।’ এবারে সালাম ঝটপট উত্তর দেয়।

‘হু’ বলে টিও সাহেব অন্যদেরকে প্রশ্ন করতে বলেন। অন্যদের প্রশ্নেরও সালাম কোন সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারে না।

এবার দ্বিতীয় ক্যান্ডিডেট আলম ইন্টারভিউ রুমে আসলে টিও সাহেব আজরতউল্লাহ সাহেবকে প্রশ্ন করতে বলেন। তিনি বলেন, ‘আচ্ছা, বাবা বলো তো, দুইয়ে দুইয়ে চার হয়- এর ট্রানসলেশন কি? 

- ‘টু অ্যান্ড টু মেক ফোর?’

- ‘বেশ, বেশ, বাবা এবার বলো তো দেখি, আমাদের দেশ স্বাধীন হয় কবে?’

- ‘১৯৭১’

- ‘বাহ, বেশ, টিও সাহেব আমার আর কোন প্রশ্ন নেই। আপনারা আপনাদের প্রশ্ন করেন।’

টিও সাহেব এবং এটিও সাহেব আলমকে বেশ কয়েকটা প্রশ্ন করেন। এর মাঝে সে শুধু বাংলাদেশের রাজধানীর নাম এবং শিক্ষামন্ত্রীর নাম বলতে পারে। তার অবস্থা দেখে আজরতউল্লাহ সাহেবের মনে একটু আফসোস হয় যে তিনি কেন যে, নিজের প্রশ্নগুলো যেমন আগেই আলম কে বলে দিয়েছেন সেভাবে আগেই টিও সাহেবের এবং এটিও সাহেবের প্রশ্নগুলো আগেই ঠিক করে তাকে জানিয়ে দিলেন না। অবশ্য তিনি জানেন টিও সাহেব আর এটিও সাহেব খামটা পেয়েছেন, তারা যত প্রশ্ন করুক না কেন, এখন নিশ্চয়ই বেঁকে বসবেন না।

এবার সবশেষ ক্যান্ডিডেট হামিদের পালা। টিও সাহেব আর এটিও সাহেব তাকে বেশ কিছু প্রশ্ন করেন। সমকালীন বিশ্ব, সাহিত্য, ব্যাকরণ, ইংরেজি ট্রান্সলেশন কিছুই বাদ থাকেনা। হামিদ তাঁদের কিছু প্রশ্নের উত্তর দেয়, আবার অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেও না।

এবার টিও সাহেব আজরতউল্লাহ সাহেব কে বলেন, ‘প্রশ্ন করেন’।

আজরতউল্লাহ সাহেব বলেন, ‘আচ্ছা বাবা বলো তো, আমি জন্মাবধি অত্র এলাকায় বসবাস করিতেছি বিধায় এখানকার সকলেই আমার সুপরিচিত এবং আত্মীয়ের মত, তাহাদের কাহারো সাথে আমার কোনো রূপ বিবাদ-বিরোধ নাই, বড়জোর অতি কদাচিৎ মান-অভিমান হইতে পারে’ এর ট্রানসলেশন কি হবে? 

তার এই দীর্ঘ বাক্য হামিদ ঠিকমত বুঝতে পারে না, সে আবার বাক্যটা বলার জন্য অনুরোধ করে। আজরতউল্লাহ সাহেব আবারো বাক্যটা বলেন। তিনি গত কয়েকদিনে বাক্যটা মনে মনে আউড়েছেন, তাই তার একটা শব্দও নড়চড় হয় না। ‘বুঝলা তো বাবা, শুধু বিএ, এমএ পাস দিয়ে হবে না। ইংরেজিও জানতে হবে। ইংরেজি না জানলে আর লেখাপড়ার কি দাম থাকলো?’

হামিদ একটু চিন্তা করে হাল ছেড়ে দেয়। হামিদের এই নাজেহাল অবস্থা দেখে সহকারী শিক্ষক রওনকের মন ছোট হয়ে যায়। তিনি এই স্কুলেন কেবলই গত মাসে যোগদান করেছেন। তিনি ঠিক কি কারণে আলমকে অন্য দুজনের থেকে ভিন্ন রকম প্রশ্ন করা হচ্ছে তা নিশ্চিত করে না বুঝলেও এটা বুঝেন যে, এখানে কোন একটা সমস্যা আছে। তিনি কিছু বলে উঠতে চাইলে অন্যদের অলক্ষ্যে হেডমাস্টার সাহেব তাকে চোখের ইশারায় অনুনয় করেন কিছু না বলতে। তিনি তার বাবার বয়সী হেডমাস্টার সাহেবের অনুনয় ফেলতে পারেন না, চুপ করে থাকেন। হামিদ সবাইকে সালাম জানিয়ে বিদায় নেয়। 

হামিদ চলে গেলে কমিটির সব সদস্য তাদের কাগজে লেখা নম্বরগুলো হেডমাস্টার সাহেবের কাছে জমা দেয়। হেডমাস্টার সাহেব পাঁচজনের নম্বর যোগ করে দেখেন পঞ্চাশের মধ্যে সালাম পেয়েছে ২০, হামিদ পেয়েছে ৩০, আর আলম পেয়েছে ৪০। শুধু সহকারী শিক্ষকের কাছে হামিদ বেশি পেয়েছে, আর আজরতউল্লাহ সাহেবের কাছে পেয়েছে শূন্য। টিও সাহেব এটা দেখে বলেন, ‘নাহ, আজরতউল্লাহ সাহেব, এটা কেমন হলো? আপনি হামিদ ছেলেটাকে শূন্য দিলেন কেন? অন্তত দুই-চার নম্বর তো দিতে পারতেন।’

‘স্যার দ্যাখেন, আমার তো একটা নীতি আছে, তাকে আমি একটা প্রশ্ন করেছি, সে তো উত্তর দিতে পারেনি! তাকে আমি নাম্বার দেব ক্যামনে?

টিও সাহেব আর কথা বাড়ান না। তিনি এবং কমিটির সদস্যরা কমিটির সম্মিলিত সুপারিশে সই করেন। তারপরে দুই মেহমান আর হেডমাস্টার সাহেবকে নিয়ে তিনি রওনা দেন তার বাড়িতে খেতে যাওয়ার জন্য। টিও সাহেব স্কুলের অন্য শিক্ষকদের বলে দেন যে, টিফিনের পর যেন ক্লাস ঠিকমতো শুরু হয়।


মো. রিজওয়ানুল ইসলাম: নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক