বৃহস্পতিবার | মার্চ ০৪, ২০২১ | ২০ ফাল্গুন ১৪২৭

সিল্করুট

চকোলেট না থাকলে স্বর্গে যাব না

এম এ মোমেন

সুন্দরী চিত্রশিল্পী জেইন সিব্রুক কোনো রকম রাখঢাক না করে বলেছেন, ঈশ্বরকে জানিয়ে দাও চকোলেট না থাকলে আমি স্বর্গে যাব না।

জর্জ বার্নার্ড বললেন, যুদ্ধের সময় কার্তুজ কোন কাজে লাগে? তার বদলে আমি সব সময় পকেটে চকোলেট রাখি।

অজ্ঞাত এক মনীষীর কথাও স্মরণ রাখতে হবে; যেভাবেই হোক পৃথিবীকে রক্ষা করো, কারণ অন্য কোথাও চকোলেট নেই।

প্রেমে সফলতার সুযোগ সামান্যই, যে কটা চকোলেট খেলে সেটাই লাভ।

***

স্বর্গ নরকের ধারণা মানুষের মনে দৃঢ়ীকৃত হওয়ার অনেক আগেই অন্তত ১০ হাজার বছর আগে চকোলেটের গাছ আরণ্যক দক্ষিণ আমেরিকায় বিরাজ করছিল। খ্রিস্ট জন্মের দেড় হাজার থেকে তিনশত বছর আগেকার ওলমেক সভ্যতার মানুষের হাতে গাছগুলো ডমিস্টিকেটেড হয়পরিবারে অঙ্গীভূত হয়ে মানুষের সেবা করে মানুষের প্রয়োজনেই লালিত হতে থাকে; গাছের বীজ-এর নামই কোকাও বা কোকো। কোকো গুঁড়ো করে যে তিক্ত পানীয় তৈরি করা হতো তা ঈশ্বরিক পানীয় হিসেবে বিবেচিত হতো; মায়া সমাজের কেবল এলিটরাই তা পান করার অধিকারী ছিলেন।

ওলমেকদের নিবাস ছিল মেক্সিকো উপসাগরের তীরের সমতলে। তাদের সভ্যতার বিলয় ঘটে খ্রিস্ট জন্মের আগেই। ২৫০ থেকে ৯০০ সালএই সময়টা মায়া সভ্যতার। মায়া সভ্যতাও বিলীন হয়ে গেছে কিন্তু সভ্যতার সৃষ্ট অন্য একটি অধ্যায় চকোলেট সভ্যতা এখনো দাপটে রাজত্ব করে যাচ্ছে; বাজার বাড়াচ্ছে, রাজ্যের সব রেসিপিতে যোগ হচ্ছে এবং এমনকি বিংশ শতকের শেষ প্রান্তে হঠাৎ উদ্ভূত ভায়াগ্রা সভ্যতাকেও চ্যালেঞ্জ করছে চকোলেট সভ্যতা। ভায়াগ্রা আকস্মিক রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে দিয়ে অনেক মৃত্যু ডেকে এনেছে কিন্তু দুই হাজার বছর ধরে কোকো বিন আর ব্ল্যাক চকোলেট নিরাসক্ত মানুষের জীবনে আফ্রোডিসিয়াকের ভূমিকা পালন করে আসছে নীরবে, মৃত্যুর ডঙ্কা কখনো বাজেনি। অ্যাজটেক শাসক দ্বিতীয় মন্টেজুমা তার যৌনশক্তি বাড়াতে প্রতিদিন সোনার গবলেটে ৫০ কাপ চকোলেট পানীয় পান করতেন।

মায়া সভ্যতা কোকো চাষে সমৃদ্ধি আনে, কোকো বীজ থেকে কেবল মানুষের পানীয় খাদ্য তৈরি করে থেমে থাকেনি, ঈশ্বরের  অর্চনায় নৈবেদ্য হিসেবে প্রদান করেছেসেই থেকে চকোলেট হচ্ছে ঈশ্বরের খাবার অধিক পরিমাণ জমিতে অধিক পরিমাণ কোকো লাভের আশায় মায়া জনবসতি খরা অঞ্চল থেকে সরে বৃষ্টিবহুল অঞ্চলের দিকে ঘনীভূত হয়। মেক্সিকোর চিয়াপাস অঞ্চলের উপকূলে পলিমাখা জমিতে সবচেয়ে ভালো ফসল হতো। সে সময়ই আক্ষরিক অর্থে টাকা গাছে ধরত। অ্যাজটেকদের বাণিজ্য যুদ্ধ কোকো জমি বাণিজ্য দখল নিয়েই মায়া সাম্রাজ্য অধিকার। স্প্যানিয়ার্ডদের মাধ্যমেই ইউরোপ কোকো চকোলেটের সঙ্গে পরিচিত হয়। ১৮২৮ সালে কোকো গুঁড়ো করার মেশিন আবিষ্কারই কোকো বাণিজ্যে বিপ্লব এনে দেয় এবং কোকোর মণ্ড থেকে বিভিন্ন আহার্য উৎপাদনের পথ সহজ হয়ে আসে। ব্রিটিশরা চকোলেটকে গণমানুষের ভোগ্য খাবারে পরিণত করে।

সপ্তদশ অষ্টাদশ শতকের একটি প্রচলিত ধারণা ছিল: অ্যালকোহল পান করবে সাধারণ মানুষপ্রলেতারিয়েত; কফি খাবে উত্তরাঞ্চলের মানুষ, যারা প্রোটেস্ট্যান্ট এবং মধ্যবিত্ত, আর চকোলেট ড্রিংক খাবে দক্ষিণের মানুষ যারা ক্যাথলিক অভিজাত।

কিন্তু ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯-৯৯) এবং নেপোলিয়নিক যুদ্ধ (১৮০৪-১৫) ক্যাথলিক চার্চ, অভিজাত শ্রেণী এবং বিভিন্ন ধরনের এলিটদের ক্ষমতা কমিয়ে দিল, ফলে চকোলেটের ওপর তাদের আধিপত্যও কমল এবং ধীরে ধীরে প্রলেতারিয়েতও চকোলেটের দিকে হাত বাড়াতে সাহসী হয়ে ওঠেন। শিল্প বিপ্লব একদা যা অভিজাতের ভোগ্য ছিল তা গণমানুষের ভোগ্যে পরিণত করল। মূলত বিপুল উৎপাদনের কারণে দাম কমে যাওয়ায়, চকোলেট প্রলেতারিয়েতের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে এসে গেল। ঊনবিংশ শতকে কোকোর তিনটি দ্রব্য বাজার ছেয়ে ফেললকোকো পাউডার, ডার্ক চকোলেট মিল্ক চকোলেট। ১৯০০ সালে যেখানে কোকোর বিশ্ব উৎপাদন ছিল ৫৩ হাজার টন, ১৯৪০ সালে তা প্রায় সাড়ে লাখ টনে পৌঁছল। ১৯৯০ দশক থেকে চকোলেট সাম্রাজ্যের বড় ধরনের বিস্তৃতি ঘটল। পৃথিবীর এমন কোনো প্রান্ত নেই যেখানে চকোলেট পৌঁছেনি। আমিষ, শর্করা, শ্বেতসারএমন কোনো খাদ্য নেই যার সঙ্গে চকোলেটের মিশেল দিয়ে অধিকতর উপাদেয় খাবার তৈরি করা হয় নাইউরোপ আমেরিকায় চকোলেটস ওনলি রেস্তোরাঁ স্থাপিত হয়েছে।

বলা আবশ্যক চকোলেট উদ্ভাবনের দিনগুলোতে চকোলেটকে দাঁতে কামড়ে খাবার কোনো উপাদান মনে করা হয়নিএটা ছিল সম্পূর্ণ পানীয়, আর চকোলেটের সঙ্গে মিষ্টত্বের কোনো সম্পর্কই ছিল না। খাবারও নয় মিষ্টিও নয়, খানিকটা তিতকুটে পানীয়।

চিত্রশিল্পী জেইন সিব্রুককে আশ্বস্ত করা যায়চিন্তা করবেন না সুযোগ এলে চোখ বন্ধ করে স্বর্গে ঢুকে পড়ুন। ওখানে চকোলেট পাবেন। কারণ চকোলেটই ঈশ্বরের খাবার। জেনে রাখুন চকোলেট গাছকোকো বৃক্ষের বৈজ্ঞানিক নাম থিওব্রোমা কোকাও’—মানে ঈশ্বরের খাবার।

কলম্বাস চকোলেট

ক্রিস্টোফার কলম্বাস তখন তার চতুর্থ শেষ সমুদ্র অভিযানে (১৫০২-১৫০৪) ১৫ আগস্ট হন্ডুরাস উপসাগরের উপকূল থেকে একশ মাইল দূরে গুয়ানাজা দ্বীপে (মেক্সিকো) জাহাজে অবস্থানকালে দেখতে পেলেন একটি নৌকাভর্তি কোকো নিয়ে মাঝিরা তাদের দিকে আসছে। নৌকা মায়া সংস্কৃতির অংশ। তাদের ভাষা কলম্বাসের সাথীদের অজ্ঞাত। তাদের নৌকার বীজগুলোকে কলম্বাস ধরে নিলেন এক ধরনের আখরোট। বীজ কোন কাজে লাগতে পারে কোনো ধারণা তার নেই। তিনি লক্ষ করলেন যেন দ্বীপবাসীরা অত্যন্ত মূল্যবান কিছু বহন করছে এমনভাবে কোকো বীজ জাহাজে নিয়ে এল। তারা অঞ্চলে এত বড় নৌকাও দেখেনি। কলম্বাস আখরোট এবং অন্যান্য সামগ্রী বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে গ্রহণ করলেন এবং তাদের দলনেতাকে গাইড হিসেবে জাহাজে তুলে নিলেন।

কলম্বাসের বিবাহবহির্ভূত পুত্র ফার্দিনান্দ সফরে বাবার সফরসঙ্গী ছিলেন। ফার্দিনান্দ পরে লিখেছেন, নেটিভ আমেরিকানরা বীজের এত বেশি দাম বলেছে যে তিনি বিস্মিত হন। মনে হয়েছে অনেক বেশি দাম পাওয়ার জন্য তারা আখরোটগুলো ধরে রেখেছেতারা যখন অন্য মালামালের সঙ্গে এগুলো জাহাজে এনেছে, আমি লক্ষ করছি এগুলোর কোনো একটি আখরোট নিচে পড়ে গেলে তা তুলতে সবাই দাঁড়িয়ে গেছে, যেন তাদের একটি চোখ পড়ে গেছে।

কলম্বাস তার অভিযাত্রী সঙ্গীরা তখন কেউই জানত না তাদের দেখা আখরোট প্রকৃতপক্ষে কোকো বীজ এবং তা মুদ্রা হিসেবে ব্যবহূত হয়। শুধু অঞ্চলেই নয়, মধ্য আমেরিকার অনেক দেশেই এটাই ছিল বিনিময় মুদ্রা। কোকো বীজের ওপর চোখ পড়েছে এমন প্রথম ইউরোপীয় হচ্ছেন ক্রিস্টোফার কলম্বাস, তবে আসলে বীজের আহার্য ভূমিকা কী তা তিনি জেনে যেতে পারেননি। চতুর্থ অভিযান শেষে ফিরে আসার দুই বছরের মধ্যেই ১৫০৬ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

কলম্বাস মায়া অ্যাজটেক সভ্যতার অনেক চোরাই নিদর্শনের সঙ্গে কিছু পরিমাণ কোকো বীজও স্পেনিয় রাজদরবারে দাখিল করেন। কিন্তু রাজসভা মূল্যবান স্বর্ণ, রুপা আবিষ্কৃত নতুন পৃথিবীর সম্পদ ছাড়া অন্যকিছুর দিকে দৃষ্টি দেয়নি।


ডন হার্নান্দেজ কর্তেজ ১৫২৮ সালে স্পেনে কোকো বীজ আনেন চকোলেট ড্রিংক চালু হতে আরো অনেক সময় গড়িয়ে যায়।

১৫৪৪ সালে নতুন পৃথিবী মায়া প্রতিনিধি দল যখন কোকো থেকে চকোলেট তৈরি করে খাওয়াল তখন ইউরোপের সংবিৎ ফিরল। চকোলেট জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। তখন স্পেনের রাজা ফার্দিনান্দ রানি ইসাবেলার পুরোহিত এবং পরবর্তী সময়ে ঐতিহাসিক ইতালির পিটার মার্টার দ্য অ্যাঙ্গিরা চকোলেট পছন্দ করতেন। তিনি লেখেন বীজের তৈরি পানীয় রাজসভায়ও বিলাসিতা বলে বিবেচিত হতো আর তা ছিল রাজার উপযুক্ত মদের মতো বিস্ময়কর এক পানীয়।

১৫৯১ সালে মেক্সিকো অঞ্চল থেকে আসা জাহাজভর্তি কোকো এত সুখ্যাত হয়ে উঠল আর তার চাহিদা এত বাড়ল যে অনুকূল বাতাসে মেক্সিকো থেকে ইউরোপে আসা জাহাজ চকোলেট উইন্ড পেয়েছে বলা হতো।

ক্রিস্টোফার কলম্বাস নতুন পৃথিবীতে গিয়ে চকোলেট ড্রিংক খেয়ে মুগ্ধ হয়ে কোকো বীজ স্পেনে নিয়ে এসে চকোলেটের শুভ সূচনা করেছেন বলে কোনো কোনো লেখক উল্লেখ করেছেনএটা বাস্তবতাবর্জিত। বেঁচে থাকতে এটা যে কী বস্তু তিনি তা নিশ্চিত হতে পারেননি।

টাকা যখন গাছে ধরে

কোনো প্রতীকী অর্থে নয়, এমনকি ঘোরপ্যাঁচের কোনো অর্থে নয় বরং টাকা বাস্তবিকই গাছে ধরত। সেই গাছ ছিল কোকো, কোকাও কিংবা কোকো গাছ। গাছের বীজ বিনিময় যোগ্য মুদ্রা হিসেবে ব্যবহূত হতো, যদিও বীজের গাছে চাহিবামাত্র ইহার বাহককে দিতে বাধ্য থাকিব- কথা লেখা থাকত না। মায়া অ্যাজটেক সভ্যতায় এটাই বিনিময় মাধ্যম টাকা হিসেবে ব্যবহূত হতো। বাংলাদেশেও একসময় মধ্যবিত্তের বাড়ি বাড়ি ম্যানি প্ল্যান্ট গাছ দেখা যেত। এখনো আছে। তবে এটা কোকো বীজের মতো নয়। গায়না চেস্টনাট ট্রি টাকার গাছ হিসেবে পরিচিত হলেও এর মর্যাদা বাস্তবে তেমন নেই।

অ্যাজটেক আমলে নির্ধারিত সংখ্যক কোকো বীজ সৈনিকদের বেতন হিসেবে দেয়া হতো। আমলে সম্রাট সম্ভ্রান্তদের সঙ্গে সৈনিকদেরও কোকো পানীয় পানের অনুমতি দেয়া হয়। তারা মনে করত সৈনিকদের স্বাস্থ্যবান তাদের বলবান করতে তাদের অধিক পরিমাণ কোকো খাবার গ্রহণ করতে হবে, সেজন্য রেশন হিসেবে দেয়া হতো। ষোড়শ শতকে অ্যাজটেকরা ১০০টি কোকো বীজ দিয়ে একটি টার্কি মুরগি এবং তিনটি দিয়ে একটি ডিম কিনতে পারত। তখন নিকারাগুয়াতে ৫০ কোকোতে একটি খরগোস, ১০০ কোকোতে একটি ভালো ক্রীতদাস পাওয়া যেত। ৩০ কোকোতে একজন যৌনকর্মীর সেবা মিলত। কোকোকে এখন বলা হয় ব্ল্যাক গোল্ড

শ্রেষ্ঠ উপহার চকোলেট বার

বাবা জন ফ্রাই ইংরেজ কবি ছেলে জোসেফ ফ্রাই (১৭৬৭-১৮৩৫) খ্যাতনামা টাইপ ফাউন্ডার এবং আধুনিক চকোলেটের আবিষ্কারকযে চকোলেট শত বছর ধরে পৃথিবীর জনপ্রিয় শ্রেষ্ঠ উপহার হিসেবে আদৃত। জোসেফ ফ্রাই প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি ১৮৪৭ সালেই চকোলেট ক্রিম বার হিসেবে বাজারজাত করে। ১৮৬৬ সালে ইংল্যান্ডের কোম্পানির নাম জে-এস ফ্রাই অ্যান্ড কোম্পানি। প্রাচীন কোম্পানি এখন ক্যাডবারির মালিকানায়। ১৮৭৫ সালে সুইজারল্যান্ড নেসলের মিল্ক চকোলেট। মিল্ক চকোলেটের মূল আবিষ্কারক ড্যানিয়েল পিটার নেসলের সঙ্গে মিলে এটিকে পৃথিবীর একসময়ের সবচেয়ে আদৃত চকোলেটে পরিণত করেন। প্রাচীনত্বের দিক থেকে তৃতীয় স্থানে সুইজারল্যান্ডের লিন্ড চকোলেট বার। লিন্ড উদ্ভাবিত একটি পদ্ধতির নাম কোঞ্চিং, যা মুখে গলে যাওয়া চকোলেট তৈরিতে এখনো ব্যবহূত হয়। চতুর্থ প্রাচীনতম হার্শের মিল্ক চকোলেট বার ১৯০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া থেকে বাজারে আসে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এতটাই দখল করে নেয় যে নেসলে সেখানে সুবিধে করতে পারেনি। বিপুল জনপ্রিয় ক্যাডবেরি ইংল্যান্ডের চকোলেট ১৯০৫ সালে বাজারে আসে। ক্যাডবেরি তার চকোলেটে ফল, বাদাম, কিশমিশ ঢুকিয়ে দেয় এবং জনপ্রিয় করে তোলে। ষষ্ঠ স্থানে আছে ১৯০৮ সালের সুইজ চকোলেট টবলারোল, ত্রিভুজাকৃতির লম্বা বার এখনো খুব জনপ্রিয়। সপ্তম অবস্থানে ইংল্যান্ডের ফ্রাইস টার্কিশ ডিলাইট ১৯১৪ সালে আসে। এটিও প্রথমবার নির্মাতা জোসেফ ফ্রাইয়ের কোম্পানির সৃষ্টি, কোম্পানিটি পরে ক্যাডবেরি কিনে নেয়। অষ্টম স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লার্ক বার ১৯১৭-তে বাজারে আসে। নবম স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের উইলিয়ামসন ক্যান্ডি কোম্পানি ওহ হেনরি বার ১৯২০ সালের; কোম্পানিটি নেসলে কিনে নিয়েছে। দশম স্থানে ১৯২৮ সালের রিসে পিনাট বাটার কাপ। রিসে ক্যান্ডি কোম্পানি এখন হার্শে কোম্পানিতে মিলিয়ে গেছে।

২০১৯ সালের হিসাবে সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রের মার্স রিগলি কনফেকশনারি১৮ বিলিয়ন ডলার; দ্বিতীয় স্থানে ইতালি লুক্সেমবার্গের ফেয়ারো গ্রুপ১৩ বিলিয়ন ডলার; তৃতীয় স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের মন্ডেলেজ ইন্টারন্যাশনাল১১. বিলিয়ন ডলার। মার্স রিগলি কোম্পানি বিশ্ববাজারে ১৪. ভাগ দখলে রেখেছে। ২০১৯-এর হিসাবে চকোলেট বাজারের আকার ১৩০.৫৬ বিলিয়ন ডলার। ২০২৭ নাগাদ তা ১৯০ বিলিয়ন ডলার স্পর্শ করবে।

একালে কোকোর উৎস অনেকটাই বদলে গেছে। সবচেয়ে বেশি প্রায় দেড় মিলিয়ন টন উত্পন্ন হয় আইভরিকোস্টে। সবচেয়ে বেশি কোকো আমদানি করে নেদারল্যান্ডস।

চকোলেট শব্দ

বিমূর্ত ব্যবহার থাকা সাধারণ খাদ্যশস্যের আগে বা পরে চকোলেট বসিয়ে ভিন্ন স্বাদের শত শত খাবারের নামের উদাহরণ দেয়া যায়। যেমন চকোলেট ক্যান্ডি কিংবা জিঞ্জার চকোলেট। এমন আরো কিছু শব্দ তুলে ধরছি আগে বা পরে সুবিধামতো চকোলেট বসিয়ে দেবেন। ভ্যানিলা, কোকো, কুকি, ক্রিম, বিস্কিট, স্ট্রবেরি, ডেজার্ট, অ্যালমন্ড, রেইজন, সিনামন, পিনাট, পেস্ট্রি, রাস্পবেরি, ফ্লেবার, বাটার, মিল্ক, সিরাপ, স্ন্যাক, পুডিং, ওয়েফার, পাইনাপল, ক্র্যাকার, কফি, চিজ, বানানা, বেভারেজ, মিন্ট, সস, চিপস, জেলি, ক্রাঞ্চ, কোলা, সোডা, লেমন, স্যান্ডউইচ, ফ্লেইক, গাম, সসেজ, চেরি, কোটিং, পাই, ব্যারোট, ব্রেড, ফ্রুট জ্যাম, বান, চাঙ্ক, পটেটো, স্যুপ, পিত্জা, হানি, জুস, মেন্ট, পেপার, পিচ, এগ, পাফ, বিফ, টমেটো, অরেঞ্জ, ওট, টেস্টি, অনিয়ন, অ্যাপল, টুনা, লোফ, বেকন, বার্গার, শ্যাম্পেন, ভিনেগার, সালাদ, সাইডার, স্পঞ্জ, মাশরুম, সিসেম, সল্ট ইত্যাদি।

চকোলেট খুনি

চকোলেট ক্রিম কিলার নামেই খ্যাত হয়েছে ক্রিস্টিনা এডমন্ডস। তার মৃত্যুদণ্ডের আদেশই হয়েছিল কিন্তু তার মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। ১৯০৭ সালে ৮১ বছর বয়সে ব্রডমুর ক্রিমিনাল লুনাটিক অ্যাসাইলামে তার মৃত্যু হয়।

ধনী এক স্থপতি পিতার কন্যা ব্রাইটনের প্রাইভেট স্কুলে পড়া মেয়ে ক্রিস্টিনা ১৮৬০ দশকে স্থানীয় চিকিৎসক চার্লস বেয়ার্ডের সঙ্গে প্রেম করতে শুরু করে, বিবাহিত ডাক্তার বেয়ার্ড শপথ নিয়ে বলেছেন তার সঙ্গে চিঠি চালাচালি করেছেন কিন্তু কখনো তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি। ক্রিস্টিনা ডাক্তার বেয়ার্ডের বাড়িতে কেক পাঠালে সেই কেক খেয়ে তার স্ত্রী মৃত্যুশয্যায় কোনোভাবে প্রাণে বাঁচলেন। কেক জন মেনার্ডের কনফেকশনারি থেকে কেনা। অল্পদিনের মধ্যেই জন মেনার্ডের কেক খেয়ে আরো বহুসংখ্যক মানুষ মরণাপন্ন হলো এবং একজন মৃত্যুবরণ করল।

একপর্যায়ে ডাক্তার বেয়ার্ড পুলিশের শরণাপন্ন হয়ে জানালেন তার সন্দেহ এর সঙ্গে ক্রিস্টিনা জড়িত। তার স্ত্রীর এবং এখনকার রোগীদের লক্ষণ একই। কিন্তু তিনি নিজের স্ত্রীর সময় কেন জানালেন না, প্রশ্নের জবাবে বললেন শুরুতে সন্দেহ করেননি, তাছাড়া তাকে নিয়ে মানুষের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হোক এটাও চাননি।

এর মধ্যে ক্রিস্টিনাও পুলিশকে জানাল কেউ তার বাড়িতে বিষাক্ত কেক পাঠিয়েছে। সবার কেকেই পাওয়া গেল কীটনাশক ওষুধ স্ট্রিকনিন, যা বেশি মাত্রায় খেলে মানুষও মরতে পারে।

দীর্ঘ তদন্তের পর বেরিয়ে এল জন মেনার্ডের বেকারির কেক চকোলেট ক্রিম দিয়ে সাজায় ক্রিস্টিনা। মানুষ মারার জন্যই সে চকোলেট ক্রিমের সঙ্গে স্ট্রিকনিন মেশাত। নিজেকে সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখার জন্য ডাকযোগে একটা কেক নিজের ঠিকানায়ও পাঠায়।

১৮৭২ সালের ট্রায়ালে ক্রিস্টিনার মা সাক্ষ্য দেয় যে বাবার মার উভয় দিকেই মানসিক রোগী রয়েছে। বিচারকরা তা আমলে নিয়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে পরে দণ্ড হ্রাস করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়।

একসময় কেক দিলে জিজ্ঞেস করা হতো তাতে ক্রিস্টিনার হাতের চকোলেট ক্রিম নেই তো?

সপ্তদশ শতকেও চকোলেট মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

স্পেনের একজন ধর্মযাজক চার্চ সার্ভিসের সময় চকোলেট খাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। ক্ষিপ্ত একজন সার্ভিসের বাইরে কোনো এক সময় তাকে চকোলেট খাওয়ায়, তাতে বিশপের মৃত্যু হয়। পরে ধরা পড়ে চকোলেটে ইনজেকশন দিয়ে বিষ ঢোকানো হয়েছিল।

চকোলেট পেলেই গপাগপ খেতে শুরু করবেন নাএটি ক্রিস্টিনারও হতে পারে!!

 

এম মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা