বৃহস্পতিবার | মার্চ ০৪, ২০২১ | ২০ ফাল্গুন ১৪২৭

সিল্করুট

কোম্পানির হাতে দিল্লি

মাহমুদুর রহমান

ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস আলোচনায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্য একদম আলাদা কয়েকটি পর্ব রাখতে হবে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্থান, বিস্তার, বাণিজ্য, রাজনীতি, ক্ষয় ইত্যাদি প্রতিটি বিষয় নিয়ে আবার কয়েকটি খণ্ড হয়। যেমন কোম্পানির উত্থান নিয়েই যদি কথা বলতে হয় সেখানে বাংলা, দাক্ষিণাত্য, মারাঠা অধ্যায়, দিল্লি নিয়ে আলোচনা করতে হবে। ইতিহাসের জনপ্রিয় ধারায় মোটামুটি প্রচলিত কথাটুকু এমনপলাশীর যুদ্ধে সিরাজদ্দৌলার পরাজয়ের পরে ব্রিটিশরা যথাক্রমে মীর জাফর এবং মীর কাসিমকে বাংলার সিংহাসনে বসিয়ে নিজেরা কলকাঠি নাড়ত এবং একসময় তারা প্রায় সমস্ত ভারতের শাসকে পরিণত হয়। কিন্তু এতসব একদিনে হয়নি। কেননা তখনো মোগল সম্রাট বর্তমান। এছাড়া ছিল মারাঠা শক্তি এবং দাক্ষিণাত্যে একাধিক স্বাধীন রাজ্য।

পলাশীর প্রান্তরে ক্লাইভের বাহিনীর হাতে সিরাজের পরাজয়ের সময়েও ভারতের রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল দিল্লি। মূলত ৩০০ বছর ধরেই দিল্লি ছিল উপমহাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্র। সুলতানি, লোদি শাসনের পর মোগল শাসনেরও কেন্দ্র হয় দিল্লি। আওরঙ্গজেব পরবর্তী সময়ে মোগলদের পড়তি দশায় যখন মারাঠারা শক্তি বৃদ্ধি করে চলেছে, সে সময়ে তারাও বারবার দিল্লির দিকে নজর দিয়েছে। এমনকি নাদির শাহ্ আহমদ শাহ্ আবদালীর আক্রমণও হয়েছিল মোগল রাজধানী দিল্লিতে। খুশবন্ত সিংয়ের মতো করে বললে, দীর্ঘদিন ধরে জঘন্য গোঁয়ার মানুষের হাতে দলিত মথিত হয়ে অবসাদে আচ্ছন্ন অবস্থা দিল্লির। কিন্তু তখনো দিল্লির লুণ্ঠিত হওয়া বাকি, কারণ ব্রিটিশ কোম্পানি ততদিনে কেবল বাংলা-বিহার অঞ্চলেই থানা গাড়তে সক্ষম হয়েছে। ইতিহাসের বাঁক, বাংলা থেকেই পরিবর্তিত হচ্ছিল, কেননা মোগল সম্রাট শাহ্ আলম তখন দিল্লি থেকে দূরে, এলাহাবাদে।

প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে জর্জরিত হয়ে দ্বিতীয় আলমগীরের পুত্র শাহজাদা আলী গওহর দিল্লি ত্যাগে বাধ্য হন। তিনি পালিয়ে পূর্ব দিকে গিয়ে একটি সৈন্যদল গড়তে সচেষ্ট হয়েছিলেন। সে সময়েই দিল্লিতে আহমদ শাহ্ আবদালীর সঙ্গে মারাঠাদের যুদ্ধ হয়। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে আহমদ শাহ্ আবদালীর জয় হলে তিনি আলী গওহরকে পরবর্তী সম্রাট মনোনীত করে, তার অনুপস্থিতিতে নাজিব-উদ-দৌলাকে দিল্লির দায়িত্ব প্রদান করে আফগানিস্তানে ফেরত যান। আলী গওহর দিল্লি থেকে দূরে বসেই নিজেকে সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করে দ্বিতীয় শাহ্ আলম নাম গ্রহণ করেন। অবস্থা এমন ছিল যে তিনি নিজেও জানতেন, দিল্লি অধিকার সহজ হবে না, তাই বাংলাতেই নিজের শক্তি বৃদ্ধির চেষ্টা করেছিলেন।

শাহ্ আলম কতটা সক্ষম হয়েছিলেন, সে পরীক্ষা আসতেই কোম্পানির ভাগ্য খুলে যায়। স্বাধীনচেতা মীর কাসিম যখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরোধিতা শুরু করেন, কোম্পানির সঙ্গে তার সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে এবং একসময় যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়। ঘোষিত মোগল সম্রাট যেহেতু তখন নিকটেই বর্তমান, মীর কাসিম তার সাহায্য কামনা করেন। মজার ব্যাপার সম্রাট তখন নিজেই অয্যোধ্যার নবাব শুজা-উদ-দৌলার আশ্রিত। তবুও মীর কাসিমের আহ্বানে সম্রাট এবং শুজা-উদ-দৌলা সাড়া দিলেন। সেখানেও বিধি বাম। ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে বক্সারের যুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে যৌথ বাহিনী পরাজিত হয়। পরাজয়ের পরবর্তী সময় কোম্পানির সঙ্গে সম্রাট শাহ্ আলম এলাহাবাদের চুক্তি করেন।

কাগজে-কলমে শাহ্ আলম তখনো মোগল সম্রাট এবং বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা তার শাসনাধীন। অবস্থায় যুদ্ধে কোম্পানির কাছে পরাজয়ের পর তিনি কোম্পানিকে বাংলার১ দেওয়ানি (রাজস্ব আদায়ের অধিকার) দান করেন। এর বদলে কোম্পানি তাকে বাৎসরিক ২৬ লাখ রুপি প্রদান করবে বলে স্বীকৃত হয়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জয়যাত্রা মূলত এখান থেকেই শুরু হয়, কেননা সময় থেকে তারা সম্রাটের স্বীকৃত দেওয়ান আর একটি রাজ্যের রাজস্ব আদায়ের অধিকার মানে সে রাজ্যের অর্থনীতি তাদেরই অধীন। যদিও কোম্পানি তখনো দিল্লির রাজনীতিতে পুরোপুরি প্রবেশ করেনি। কিন্তু অচিরেই তারা রাজনীতিতেও প্রবেশ করল, যখন শাহ্ আলম দিল্লি ফিরতে চাইলেন।

আহমদ শাহ্ আবদালী ফিরে যাওয়ার পরও শাহ্ আলম দিল্লি ফিরতে পারেননি। বক্সারের যুদ্ধের পর ব্রিটিশরা তাকে রাজকীয় মর্যাদায় রাখলেও মূলত তিনি ছিলেন নজরবন্দি। দিল্লিতে নিজের অধিকার ফিরে পেতে মরিয়া শাহ্ আলম বারবার দিল্লি প্রত্যাবর্তন করতে চাইলে কোম্পানি নানা টালবাহানা করে তাকে আটকে রাখে। আহমদ শাহ্ আবদালী শাহ্ আলমকে মনোনীত করেছিলেন, কিন্তু পানিপথের যুদ্ধে মারাঠাদের শোচনীয় পরাজয়ের পর উত্তর ভারতে আফগানরাবিশেষত রোহিলা আফগান শক্তিশালী হয়ে ওঠে। নাজিব-উদ-দৌলাও খানিক স্বেচ্ছাচারী হয়ে পড়েন। ফলে নানা বাধা পেরিয়ে দিল্লি অধিকার করতে হলে সম্রাটের প্রয়োজন ছিল প্রচুর অর্থ এবং সেনা সহায়তা। সম্রাটের একটি সেনাবাহিনী গড়ে উঠলেও ব্রিটিশ সাহায্য তার প্রয়োজন। কিন্তু কোম্পানি সে সাহায্যে গড়িমসি করলে সম্রাট গোপনে মারাঠাদের সঙ্গে আপস করার চেষ্টা করেন।

বক্সারের যুদ্ধে জয়ের পর কোম্পানির আয়, শক্তি, সেনাবলের সঙ্গে সমানতালে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের অহংকার বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী সাত বছরে সম্রাটকে সম্মান করার বিষয়টিই তাদের মধ্য থেকে উঠে যায়। মোগল রীতি অনুসারে সম্রাটের বাসস্থানের কাছাকাছি স্থানে নহবত বাজানো হতো। ১৭৭১ খ্রিস্টাব্দের কোনো একসময় একদিন ব্রিগেডিয়ার স্মিথ তার ঘুমের ব্যাঘাতের কথা জানিয়ে বাজনা বন্ধ করতে বলেন। সম্রাটের খিদমতগারকে পিটুনি দেয়ার ঘটনাও সময় ঘটে। এমনকি গত বছরগুলোয় এলাহাবাদ চুক্তি ২৬ লাখ রুপিও সম্রাটকে দেয়া হয়নি। ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা থেকে কোম্পানির কর্তারা সম্রাটকে দিল্লি অধিকারে সাহায্য করার প্রশ্নে আপত্তি জানায়। পরে দিল্লি ফেরার পরও সম্রাট তার প্রাপ্য অর্থ দাবি করলে কলকাতা থেকে ওয়ারেন হেস্টিংস সরাসরি কোম্পানির কোর্ট অব ডিরেক্টরসকে লেখেন, মারাঠাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করা অবস্থায় সম্রাটকে কোনো অর্থ প্রদান করা হবে না।

অবস্থায় সম্রাট গোপনে মারাঠাদের সঙ্গে বার্তা চালাচালির মাধ্যমে সাহায্য নিশ্চিত করেন। সম্রাটকে সময় সাহায্য করার নিশ্চয়তা দেন মারাঠা সেনাপতি মাহাদজি সিন্ধিয়া। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাত্মক আহত ব্যক্তি পরে মারাঠা সেনাবাহিনী এবং রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন। গত ১০ বছরে মারাঠারা তাদের ক্ষতি পুষিয়ে আবার প্রায় ৭৫ হাজার সেনা তৈরি করেছিল। মাহাদজি সিন্ধিয়া এদের কিছু সৈন্য নিয়ে সম্রাটকে সহায়তার আশ্বাস দেন। সম্রাট যখন যাত্রা করতে প্রস্তুত, কোম্পানির পক্ষ থেকে জেনারেল বার্কার চিঠির মাধ্যমে সম্রাটকে বলেন, মারাঠাদের সঙ্গে চুক্তি করা কখনই উচিত হবে না। এমনকি শেষ পর্যন্ত এলাহাবাদে সশরীরে এসেও বলেন, সম্রাট যখন মনঃস্থ করেছেন, কোম্পানি আপনাকে বাধা দেবে না। আবার কোনো সহায়তাও করবে না।

কোম্পানির সহায়তা ছাড়াই শাহ্ আলম দিল্লি অধিকার করতে সক্ষম হন। নাজিব-উদ-দৌলা ততদিনে মৃত। তার পুত্র জাবিতা খানের হাত থেকে মোগল-মারাঠা বাহিনী পাথরগড় দখল করে নেয়। কিন্তু দুর্গ দখল করার পর মারাঠা সৈন্যরা লাগামহীন লুঠপাট, ধর্ষণ হত্যাযজ্ঞ চালায়। পানিপথের যুদ্ধের প্রতিশোধ হিসেবে রোহিলাদের ওপর তাদের ক্রোধ মেটানোর এই ছিল সুযোগ। কিন্তু সম্রাট শাহ্ আলম নিজে উদ্যোগী হয়ে জাবিতা খানের পরিবার এবং নারীদের রক্ষার দায়িত্ব নেন এবং জাবিতার পুত্র গোলাম কাদিরকে পালকপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন।

পাথরগড় জয় এবং দিল্লিতে প্রবেশে সহায়তার জন্য মারাঠারা ৪০ লাখ রুপি দাবি করেছিল। পাশাপাশি মাহাদজি ইচ্ছা ছিল সম্রাটকে পুতুল সাজিয়ে নিজে সাম্রাজ্য চালানো। কিন্তু সময়ে মারাঠা পেশোয়ার মৃত্যু হলে মাহাদজি পুনার দিকে রওনা হন। শাহ্ আলম ফিরে পান তার সিংহাসননিষ্কণ্টক। কেবল তা- নয়। মীর্জা নাজাফ খানের মতো একজন সেনাপতি তার ছিল। ভাঙাচোরা দিল্লিতে তখন প্রায় কিছুই ছিল না। সে অবস্থার মধ্যেও নাজাফের সহায়তায় তিনি একটি কার্যকর সেনাবাহিনী গঠন করেন এবং মোটামুটি দিল্লির আশপাশের অঞ্চলে ফের মোগল শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। শাহ্ আলমকে এজন্য কৃতিত্ব দিতেই হয়।

আবদালীর প্রত্যাবর্তনের পর দিল্লি রীতিমতো ভগ্নদশায় ছিল। সেসব মেরামতের ইচ্ছা বা ক্ষমতা রোহিলাদের ছিল না। কিংবদন্তি উর্দু কবি মীর সে সময় নির্বাসন থেকে দিল্লিতে ফিরে দিল্লির দুর্দশা দেখে লিখেছিলেন,

এখানে, এখন ধুলো ময়লার ওপরে কেবল কাঁটার স্তূপ

আমার চোখ সেখানে বসন্তে ফুলে ভরা বাগান দেখেছিল।

যেন গতকালই আমি এখানে সুরম্য অট্টালিকা দেখেছিলাম

আজ কেবল দেখি ভাঙা দেয়াল, ভাঙা কিছু দরজা-জানালা।

অবস্থা থেকে দিল্লিকে কিছুদিনের জন্য হলেও উদ্ধার করেছিলেন শাহ্ আলম। কিন্তু সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাজ থেমে থাকেনি। কলকাতায় ক্রমেই শক্তিশালী ইংরেজ কোম্পানি তখন ইউরোপেও ফরাসিদের সঙ্গে লড়ে চলছিল। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভারতে ব্রিটিশ কোম্পানির ভাগ্য ভারতের মাটিতেই কেবল লেখা হয়নি। লেখা হয়েছিল ইউরোপেও।

ভারতে ব্রিটিশ কোম্পানির পাশাপাশি বাণিজ্য করত ফরাসি, ডাচ পর্তুগিজরা। এদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় হেরে অনেক আগেই পর্তুগিজ ডাচরা সরে গিয়েছিল। টিকে ছিল কেবল ফরাসিরা। বাণিজ্যে পরাজিত হয়ে তারা গিয়ে জুটেছিল হায়দরাবাদের নিযাম এবং মহীশুরে হায়দার আলীর (পরবর্তী সময় টিপু সুলতানের) সঙ্গে। ব্রিটিশরা সবকিছুই অবগত ছিল। তাদের অবগতি জরুরি ছিল, কেননা ভারতীয় রাজ্যের সৈন্যবাহিনীতে ফরাসি সৈন্য থাকা মানে ইউরোপীয় যুদ্ধ কৌশল তাদেরও জানা। ফলে তাদের জন্য ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অনেক সহজ হয়ে যায়। হায়দরাবাদের নিযাম এবং মহীশুর তাই চেয়েছিল। এদিকে দিনে দিনে মারাঠারাও শত্রু হয়ে উঠছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির।

কিন্তু মোগল সম্রাট তখন গোলাম কাদিরকে নিয়ে ব্যস্ত। মীর্জা নাজাফ খান যখন পশ্চিমে শিখদের সঙ্গে লড়ছেন কিংবা ডেগের জাঠ রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন, শাহ্ আলম তখন গোলাম কাদিরের লালনপালনে ব্যস্ত। শাহ্ আলম নিজে একজন কবি ছিলেন। আফতাব ছদ্মনামে তিনি কবিতা লিখতেন। তার কবিতায় গোলাম কাদির সম্পর্কে এসেছে, সে আমার বিশেষ ভালোবাসার পুত্র সময়ের মোটামুটি ১৪ বছরের মধ্যে দক্ষিণে ধীরে ধীরে ব্রিটিশ প্রভাব বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং মোগল মহলে পালিত গোলাম কাদির তার পিতৃপুরুষের বদলা নিতে সম্রাট এবং সম্রাটের পরিবারকে কয়েদ করে দিল্লিতে ফের নরক নামিয়ে আনে।

শাহ্ আলম সম্পর্কে সবচেয়ে প্রচলিত কথাটি হলো, সালতানাত--শাহ্ আলম, দিল্লি সে পালাম পালাম মূলত দিল্লিরই একটি উপশহর। কথাটি দ্বারা শাহ্ আলমের সীমিত ক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়া হয় যে তার সাম্রাজ্য কেবল দিল্লিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কথাটি ঐতিহাসিক চেহারাতেও সত্য, তবে নাজাফ খান জীবিত থাকা অবস্থায় অর্থাৎ ১৭৭২-৮২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ১০ বছরে দিল্লির আশপাশের অনেক অঞ্চলই মোগল শাসনাধীনে ফেরত আনা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু ১৭৮২ সালে নাজাফ খানের মৃত্যু হলে সাম্রাজ্যের (কিংবা দিল্লির) প্রতিরোধ ক্ষমতা আবার ভেঙে পড়ে এবং সুযোগে ১৭৮৮ খ্রিস্টাব্দের জুলাইয়ের শেষে শিখদের সহায়তায় গোলাম কাদির সিংহাসনের দখল নেয়।

কথিত আছে, গোলাম কাদিরকে দত্তক নেয়ার পর কোনো কারণে তাকে খোঁজা করা হয়। সে কথা সত্যি হোক বা না হোক, গোলাম কাদির তার পিতা জাবিতা খানের অপমানের প্রতিশোধ নিতে এবং মোগল মহলে জমা সম্পদের খোঁজে সম্রাটকে কয়েদ করে। কাদির এবং তার মিলিত বাহিনী সম্রাট তার পরিবারের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালায়। শাহজাদাদের বিবস্ত্র করে নাচতে বাধ্য করার পাশাপাশি হারেমের নারীদের ধর্ষণ করা হয়। এমনকি গোলাম কাদির নিজ হাতে সম্রাট শাহ্ আলমের চোখ তুলে নেয়। সম্রাট কেবল বলেছিলেন, যে চোখ পবিত্র কোরআন পাঠ করে তুমি সেই চোখ অন্ধ করতে চাও?

সময়ে গোলাম কাদিরের বিরুদ্ধে কিংবা সম্রাটকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কোনো ভূমিকা পাওয়া যায় না। তারা অবশ্য দূর থেকে সব খোঁজই রেখেছিল। দিল্লি তথা সম্রাটকে রক্ষা করতে মাহাদজি সিন্ধিয়া তার মারাঠা সৈন্য নিয়ে এগিয়ে এলে অনুপ গোঁসাই তার সঙ্গে যোগ দেন। বেগম সমরুও সৈন্যসহ সম্রাটের সহায়তায় এগিয়ে এলেন। ক্রমে গোলাম কাদির পরাজিত হয়। তার মাথা কেটে অন্ধ সম্রাটের কাছে পাঠানো হয় কিন্তু সম্রাট তখন সব অনুভূতির ঊর্ধ্বে। বেগম সমরু তার সঙ্গে দেখা করতে এলে সম্রাট নিজের কবিতা থেকে আবৃত্তি করেছিলেন,

সাম্রাজ্যের সূর্য৩ একবার আসমানকে পর্যন্ত আলোকিত করেছিল

এখন সন্ধ্যার আঁধারে আমরা নিজেদের পরাজয় নিয়ে বিলাপ করি

বিপথগামী এক আফগান সন্তান আমাদের রাজকীয় সম্মান নষ্ট করেছে

এখন এক সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কে আর আমাদের বন্ধু আছে?

সম্রাট দিল্লির দুরবস্থার মধ্যে পরবর্তী সময়ে মাহাদজি হয়ে উঠেছিলেন সর্বময় কর্তা। মোগলদের দশা তখন অনেকটা হতদরিদ্রের মতো। গোলাম কাদির শাহজাহানবাদের লালকেল্লার সিলিং থেকে সোনার কাজ করা নকশা পর্যন্ত তুলে নিয়েছিল। মোগল শাসন ছিলেন কেবল কাগজে-কলমে। তখনো হায়দরাবাদ এবং মহীশুর টিকে ছিল নিজেদের মতো করে। কিন্তু উপকূল থেকে ব্রিটিশ কোম্পানি তখন ডাঙায় উঠে এসেছে। নীলনদের যুদ্ধে ফরাসিদের পরাজয় হলে সেই ধাক্কায় ভারতের ফরাসিরাও দুর্বল হয়ে পড়ে। নিযামের সঙ্গে ব্রিটিশদের চুক্তি হলে ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দেই লর্ড ওয়েলেসলি টিপু সুলতানকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করেন। টিপু সুলতান হার মানতে রাজি হননি। কিন্তু হার তাকে মানতে হয়েছিল। চতুর্থ অ্যাংলো-মহীশুর যুদ্ধে ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে টিপু কেবল রাজ্যই নয়, প্রাণও হারান।

মোগল ভারতের ইতিহাসের দিকে লক্ষ্য করলে আমরা দেখি বরাবরই ক্ষমতা দখলের জন্য দিল্লি দখল প্রয়োজনীয় ছিল। ব্রিটিশ কোম্পানি সে চেষ্টা করবে এটিই ছিল স্বাভাবিক। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এক্ষেত্রে এগিয়েছিল খুব ধীরে, কৌশলে। এক এক করে শত্রু নিধন করে তারা দিল্লির দিকে এগিয়েছিল এবং শেষ শত্রু ছিল মারাঠা। কেননা অন্ধ মোগল সম্রাট এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া দিল্লির তখন প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই।

দিল্লি তথা মোগল সম্রাটকে নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব নিয়েছিল মারাঠারা, বিশেষত মাহাদজি সিন্ধিয়া। কিন্তু সিন্ধিয়া এবং হোলকারদের অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে যখনই কোম্পানি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, সফল হয়েছে। এছাড়া পেশওয়ার গদি নিয়েও মারাঠাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। ইংরেজরা বুঝেছিল মোগলদের চেয়ে মুহূর্তে মারাঠাদের কব্জা করা জরুরি। তাই পুনায় দ্বিতীয় বাজি রাওকে প্রতিষ্ঠিত করতে তারা সাহায্য করেছিল। পূর্ব (বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা) এবং দক্ষিণে (হায়দরাবাদ, মহীশুর) কোম্পানির ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করে মারাঠাদের একটা অংশকে দুর্বল করে এবার কোম্পানি মাহাদজিকে নর্মদার উত্তর অংশও ছেড়ে দিতে বলে।

মারাঠারা তাদের একাংশের সৈন্য এবং সঙ্গে কিছু ফরাসি সাহায্য নিয়ে দিল্লি ঘিরে রেখেছিল। সম্রাট শাহ্ আলম তখন কেবলই দর্শক। তিনি নিজেও জানেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার শক্তি নেই, কিন্তু মাহাদজি এবং ফরাসি জোটের বিরুদ্ধে কথা বলাও সম্ভব না। ওয়েলেসলির অধীনে লর্ড লেক বিশাল সেনা সমাবেশ করে ১৮০৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় অ্যাংলো-মারাঠা যুদ্ধে দিল্লির লড়াই- জয়লাভ করেন। উইলিয়াম ড্যালরিম্পলের মতে, এই তুমুল যুদ্ধটি ছিল বহুদিনের ইংরেজ-ফরাসি দ্বৈরথের ফল। ১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির লড়াইয়ে শেষবার তারা মুখোমুখি হয়েছিল।

কথিত আছে, সম্রাট তার কেল্লা থেকে যুদ্ধ দেখছিলেন। লর্ড লেকের বিশাল বাহিনী মারাঠা জোটকে পিঁপড়ের মতো পিষে মারার পর যারা অবশিষ্ট ছিল তাদেরও ধাওয়া করছিল আর সম্রাট তার মুক্তিদাতাদের (ইংরেজরা মুক্তিদাতা কেননা মারাঠারা সম্রাটকে কয়েদ করেছিল) আমন্ত্রণ জানাতে অপেক্ষা করছিলেন। মূলত শাহ্ আলম তখন ভঙ্গুর দিল্লির এক অতীত সম্রাট বৈ কিছু নন। মজার ব্যপার, তবু প্রথাগত সম্মান হিসেবে লর্ড লেক সম্রাটের সামনে মাথা ঝুঁকিয়েছিলেন, যা কিনা সম্রাটের ক্ষমতার পরিচয় কিন্তু আসলে এর পর থেকেই সম্রাট কোম্পানির হাতে চালিত পুতুল হয়ে ওঠেন। ১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে প্রাণহীন শহর দিল্লিতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পরোক্ষ শাসন শুরু হয় এবং পরবর্তী ৫০ বছরের ভাগ্য লেখা হয়ে যায় এখানেই।

 

নোট:

.   এক্ষেত্রে বিহার উড়িষ্যাও যুক্ত ছিল এবং দেওয়ানী লাভের অর্থ কেবলই রাজস্ব আদায়ের অধিকার।

. মূলত সানাই, তবে কখনো কখনো অন্য বাদ্যযন্ত্র যুক্ত হয়ে বিশেষ বাজনা বাজানো হয়।

. সূর্য হিসেবে সম্রাট নিজেকে বুঝিয়েছেন।

 

তথ্যসূত্র :

.   The Anarchy, William Dalrymple, Bloomsbury Publishing, 2019

The Honorable Company, John Keay, Harper Collins, 1993

মোগলনামা (দ্বিতীয় খণ্ড), মাহমুদুর রহমান, আহমদ পাবলিশিং হাউজ, ২০২০

 

মাহমুদুর রহমান: লেখক