রবিবার | জানুয়ারি ২৪, ২০২১ | ১১ মাঘ ১৪২৭

সিল্করুট

ইতিহাসে ইস্তানবুল

মাহমুদুর রহমান

প্রায় দুই মাস ধরে কামানের কান ফাটানো আওয়াজ আর নগরের দেয়ালের ওপর আছড়ে পড়া গোলার ভোঁতা শব্দের সঙ্গে ভেসে আসছিল নিজেদের এবং শত্রু সৈন্যদের কাতরানি। উপদ্বীপের আশপাশের সমুদ্রে পাল তুলে ঘুরে বেড়ানো যুদ্ধজাহাজ থেকে হয়তো সৈন্যদের চিত্কার, যুদ্ধের আয়োজনের শব্দও শহরবাসীর কানে এসেছিল। ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দের মে মাসটা এমনই এক চাপা আতঙ্কের মধ্যে কেটেছিল কনস্ট্যান্টিনোপল অধিবাসীদের সময়, কেননা শহরের বাইরে তখন অপেক্ষা করছিলেন অটোমান সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদ। তাঁর হাতে শহরের পতন হওয়া তখন কেবল সময়ের ব্যাপার। পূর্ব-পশ্চিমের সেতু-রূপ যে শহরের পত্তন হয়েছিল তখন থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগে।

মানুষ যখন দলবদ্ধ হয়ে একটি ভূখণ্ডে তাদের বসতি স্থাপন করে এবং বসবাসের নানা প্রয়োজন মেটাতে ভূমির উপরিভাগকে সাজিয়ে তোলে তখন সেই ভূখণ্ডটি জনপদে পরিণত হয়। মানুষই নিজের প্রয়োজনে ভূখণ্ডকে বাসযোগ্য করে, সাজিয়ে তুলে একটা নাম দেয়। কিন্তু মানুষের ইতিহাসে প্রায় প্রত্যেক ভূখণ্ডের মালিকানা বদল হয়েছে বারবার। আর মালিকানা বদল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে ভূখণ্ডের নাম বদলে যায়। বদলে যায় এর সজ্জা। এর মধ্যে কিছু অঞ্চল নানা কারণে মানুষের ইতিহাসের শুরু থেকেই এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে সেসব ভূখণ্ড এক একটা জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে আছে। বসফরাসের পশ্চিম তীরে অবস্থিত তেমনই এক কিংবদন্তি শহরের নাম কনস্ট্যান্টিনোপল—যার নাম এবং সজ্জা বদলেছে বহুবার।

মেহমেদ যখন কনস্ট্যান্টিনোপলের বাইরে দাঁড়িয়ে, সুলতানের একবার হলেও মনে হয়েছিল তিনি এখানে দাঁড়ানোর আগেও এ শহর নিজের দখলে এনেছিলেন আরো অনেকে। যদিও মেহমেদ হয়তো তখন জানতেন না ইতিহাসে এ শহরের সঙ্গে তার নাম উচ্চারিত হবে অনেকবার। যদিও মেহমেদের সময়ের দুই হাজার বছর আগে যখন এ উপদ্বীপে প্রথম জনপদ স্থাপিত হয়, তখনকার কোনো নায়কের নাম নির্দিষ্ট করে খুঁজে পাওয়া যায় না। কনস্ট্যান্টিনোপলের আদি ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে আমরা দেখি সেখানে বসতি স্থাপিত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে। এ সময়ে মেগারা থেকে কিছু মানুষ সরে এসে এখানে বসতি স্থাপন করে। 

মেগারিয়ানরা বসফরাসের অবস্থান দেখে এর আশপাশে তাদের বসতির স্থান নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমত, তাদের মনে হয় এ অঞ্চলে বসবাসের ক্ষেত্রে সমুদ্রের হাওয়া সহায়ক হবে। দ্বিতীয়ত, বসফরাসের তীরে বসবাস মানে এখানকার চলাচলের ওপর কিছুটা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ থাকবে। কিন্তু তার পরও একটা প্রশ্ন থেকে যায়, তারা বসফরাসের কোন তীরে বসবাস করবে? শেষ পর্যন্ত তারা পূর্ব তীরের আনাতোলিয়াকেই তাদের বসবাসের স্থান হিসেবে নির্বাচিত করে এর নাম দেয় ক্যালসেডন। মজার ব্যাপার মেগারিয়ানদের পাশাপাশি এখানে এ সময় থেকেই থ্রেসের লোকজন আসা শুরু করে, যদিও সংখ্যায় তা অল্প।

মেগারিয়ানরা নিজেদের সুবিধামতো বসতি তৈরি করে নিয়েছিল। ৬৫৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মেগারিয়ানদের আরো একটি দল বসফরাসের কাছাকাছি বসতি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। এ সময়ে পূর্ববর্তী বসতি স্থাপনকারীদের সিদ্ধান্ত দেখে ক্যালসেডনকে তারা ‘অন্ধের শহর’ নাম দেয়, কেননা এ দ্বিতীয় দলটি মনে করে বসফরাসের অন্য তীরই বসতি স্থাপনে অধিক উপযোগী। এ কথা সত্য যে থ্রেসের দিকের অংশে বাতাসের দাপট বেশি থাকলেও তা নানা কারণে সুবিধাজনক ছিল। দ্বিতীয়ত ক্যালসেডনের বন্দরের চেয়ে এ অংশের খাঁড়ি থেকে বসফরাস প্রণালিতে খুব স্বল্প সময়ে ঢুকে পড়া যায়। ফলে সামরিক ও বাণিজ্যিক সুবিধার ক্ষেত্রে আনাতোলিয়ার বিপরীত অংশই এগিয়ে থাকার কারণে এর নাম হয়ে পড়ে ‘দ্য গোল্ডেন হর্ন’—গুরুত্বের জন্য সোনালি ও শিংসদৃশ আকৃতি মিলিয়ে এ নাম দেয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে অধিবাসীরা এখানে বসতি তৈরি করা নিয়েই ব্যস্ত রইল। বসতির পাশাপাশি তারা শহর রক্ষা দেয়ালও তৈরি করেছিল। কিন্তু গোল্ডেন হর্নের পেছনে গড়ে ওঠা শহরে নতুন মানুষদের কখনো অভাব হয়নি। পুরনো থ্রেসের অধিবাসীরা দেয়াল টপকে শহরে প্রবেশ করত এবং এ কাজে তাদের জুড়ি মেলা ভার। ফলে এখনকার অধিবাসীরা থ্রেসের লোকদের সঙ্গে একটি চুক্তি করল। চুক্তি হলো অধিবাসী গ্রিকরা গোল্ডেন হর্নের পেছনে একটি সুন্দর শহর তৈরি করবে এবং এর প্রশাসনিক কাজে থ্রেসের অধিবাসীদের স্বাগত জানানো হবে। শহরের নামকরণ হবে এমন একজনের নামে যে থ্রেস ও গ্রিক উভয়ের কাছেই পরিচিত।

ইতিহাসের অন্য বয়ানে পাওয়া যায় যে খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে তত্কালীন গ্রিক নগর-রাজ্যগুলো নিজেদের উপনিবেশ স্থাপনের চেষ্টা করছিল। এ সময়ে ডেলফির দৈববাণী শুনে রাজা নিকোসের পুত্র বাইজাসকে বসফরাস অঞ্চলে প্রেরণ করা হয়। বাইজাসই সেখানে পৌঁছে দেখতে পান ওই অঞ্চলে এরই মধ্যে বসতি স্থাপিত হয়েছে এবং তিনিই ক্যালসেডনকে ‘অন্ধের শহর’ বলেন। ক্যালসেডনের অন্যদিকে বসফরাসের তীরে আরেকটি শহরের স্থাপনা তিনিই করেন এবং তাঁর নামে শহরের নাম হয় ‘বাইজেন্টিয়াম’।

বাইজেন্টিয়ামের সংস্কৃতি ছিল মূলত গ্রিক। কিন্তু গ্রিক দর্শন, শিল্প, সংগীত প্রায় কোনো কিছুই এখানে উত্পন্ন হয়নি বা এ অঞ্চল ধারণ করে না। যদিও শহর তৈরি হয়েছিল যথেষ্ট সুচারুরূপে কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক পর্যন্ত সুগঠিত, নিরাপদ শহর ব্যতীত বাইজেন্টিয়ামের আর কোনো গুণ খুঁজে পাওয়া যায় না। আর এ সময়ের পরেই বাইজেন্টিয়ামের দিকে দৃষ্টি পড়ে পারস্যের। রাজা প্রথম দারিয়ুস তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্তৃত ও শক্তিশালী সাম্রাজ্যের অধিকারী। এ সময়ে দারিয়ুস ক্যালসেডন ও বাইজেন্টিয়াম আক্রমণ করেন।

দারিয়ুসের আক্রমণের সময় শহরের অধিবাসীরা সবাই পালিয়ে গিয়েছিল এবং বলা হয় শহরের দেয়াল বাদে আর কিছুই ছিল না। সত্যি বলতে বাইজেন্টিয়ামের এ সময়ের ইতিহাস নিয়ে তেমন কিছু বলার নেই। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতক অবধি প্রায় আটশ বছরের বাইজেন্টিয়ামের ঐতিহাসিক গুরুত্ব প্রায় শূন্যের কোঠায়। এ সময়ের মধ্যে কখনো সে রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল, কখনো স্পার্টা তার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। কেল্টরাও এ শহরের ওপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। বাইজেন্টিয়ামের অবস্থা এমন হয়েছিল যে ৭৩ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টিয়ামের অধিবাসীদের সম্পর্কে রোমান সম্রাট ভেস্পানিয়ান বলেন, ‘এরা স্বাধীনতার কথাই বিস্মৃত হয়েছে।’ লেখক ডেভিড জ্যাকবের ভাষায়, প্রথম খ্রিস্টীয় শতাব্দীতে শহরটির ‘দেউলিয়া’ অবস্থা ছিল। বাইজেন্টিয়ামের সেই দেউলিয়া অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে গিয়ে এর সমৃদ্ধির সূচনা হয় খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে।

রোমান সম্রাট প্রথম কনস্ট্যান্টাইন যিনি আজও ইতিহাসে এক নামে পরিচিত। বলা যায় তিনিই বসফরাসের তীরে এ শহরকে নিয়ে প্রথম পরিকল্পনা করেছিলেন এবং শহরকে দিয়েছিলেন এর উপযুক্ত মর্যাদা। বাইজেন্টিয়াম পর্যন্ত পৌঁছতে কনস্ট্যান্টাইনকে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়। ম্যাক্সেন্টিয়াসের পর লিনিসিয়াসের বিদ্রোহ দমন করে তিনি বাইজেন্টিয়ামের দখল নেন। কনস্ট্যান্টাইন ছিলেন খ্রিস্টের একনিষ্ঠ ভক্ত। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে বলা যায় খ্রিস্টধর্ম তখন নবীন ও যথেষ্ট প্রভাবশালী। যদিও রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিস্ট ধর্মের কিছু ভাগ, শাখা তৈরি হয়েছিল কিন্তু সে সময়েই কনস্ট্যান্টাইন সিদ্ধান্ত নেন সদ্য বিজিত শহরটিকে তিনি খ্রিস্ট ধর্মের কেন্দ্র করে তুলবেন। পুরনো বাইজেন্টিয়ামকে তিনি নিজের নামে নামকরণ করেন। এ শহর তখন থেকেই ‘কনস্ট্যান্টিনোপল’ তথা ‘কনস্ট্যান্টাইনের শহর’ নামে পরিচিত হয়।

প্রায় ছয় বছর সময় নিয়ে কনস্ট্যান্টিনোপল তৈরি হয় এবং ৩৩০ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে এই শহরের অভিষেক হয়। শহর স্থাপন করে একেও রোমের মতো চৌদ্দ অংশে ভাগ করা হয়। শহরের মাঝে একটি চত্বর তৈরি হয়, কনস্ট্যান্টাইন যার নাম দেন অগাস্টিয়াম। এর পূর্ব পাশে একটি রাজপ্রাসাদে নতুন সিনেট হাউজ তৈরি হয়। চত্বরের দক্ষিণে মূল প্রাসাদ তৈরি হয় যা ‘ড্যাফনের প্রাসাদ’ নামে পরিচিত। এ চত্বর থেকেই একটি প্রশস্ত রাস্তা বেরিয়ে আসে, যা আশপাশে ছড়িয়ে যায় পুরো শহরে। কনস্ট্যান্টাইন এ শহরকে খ্রিস্টান-রোমের মূল নগরে পরিণত করতে চেয়েছিলেন কিন্তু বলা চলে তাঁর জীবদ্দশায় তা সম্ভব হয়নি। কনস্ট্যান্টাইন মূলত ওই গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডের সত্যিকার মূল্য বুঝেছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে অন্যান্য শাসনামলে বিকশিত হয়েছে। কনস্ট্যান্টিনোপলের মূল সমৃদ্ধি কনস্ট্যান্টাইনের সময় থেকে আরো দুই শ বছর পরে সম্রাট জাস্টিনিয়ানের সময়।

কনস্ট্যান্টাইনের সাম্রাজ্যের সমাপ্তি আর জাস্টিনিয়ানের সাম্রাজ্য শুরু হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে কনস্ট্যান্টিনোপলের উন্নতি থমকে ছিল বললে ভুল হবে না। মধ্যবর্তী এ সময়ের শাসকরা কখনো এখানে স্থায়ী হননি। কিন্তু এ সময়ের মধ্যেই কনস্ট্যান্টিনোপলের গুরুত্ব ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। মাঝে মাঝেই পশ্চিমা ‘বর্বর’রা এ অঞ্চল আক্রমণ করতে শুরু করে। মধ্যবর্তী এই সময় এমন অনেক ছোট ছোট বিদ্রোহ এবং আক্রমণের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর পশ্চিমে রোমের টালমাটাল অবস্থার কারণে মোটামুটি এ সময়ে অর্থাৎ ষষ্ঠ শতাব্দীতে কনস্ট্যান্টিনোপলই রোমের রাজধানীতে পরিণত হয়। ৫২৭ খ্রিস্টাব্দে প্রথম জাস্টিনিয়ান ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ শহরের ভাগ্য বদলে গিয়েছিল।

জাস্টিনিয়ান তাঁর যুদ্ধবিদ্যার পাশাপাশি প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের জন্যও প্রশংসিত। ক্ষমতায় আসার পর তিনি কনস্ট্যান্টিনোপলের উন্নতির দিকে মনোযোগ দেন। জাস্টিনিয়ানের নানা কাজের মধ্যে নতুন করে স্থাপিত ‘হায়া সোফিয়া’ আজ পর্যন্ত সগৌরবে টিকে আছে। তিনি জেরুজালেমের পুরনো মন্দিরের ভগ্নাবশেষ আনয়ন করেন, কনস্ট্যান্টাইনের পুরনো ভস্মীভূত গির্জার স্থলে একটি উপাসনালয় তৈরি করেন, যা ‘হায়া সোফিয়া’ নামে পরিচিত হয়। কনস্ট্যান্টিনোপলের মতোই হায়া সোফিয়াও বহুবার তার নাম এবং রূপ বদলেছে কিন্তু হায়া সোফিয়া স্থাপনের পেছনে জাস্টিনিয়ানের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল কনস্ট্যান্টিনোপলকে খ্রিস্টীয় সাম্রাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহরে পরিণত করা।

আমরা যদি এ শহরের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করি তাহলে দেখা যায় শহরটা মূলত পূর্ব ও পশ্চিমের মিলনস্থলে অবস্থিত। ফলে যদিও খ্রিস্টপূর্ব সময়ে এ শহরের গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়নি কিন্তু সময় যতই পেরিয়েছে এর গুরুত্ব মানুষের কাছে একটু একটু করে স্পষ্ট হয়েছে। আগেও যে একেবারেই হয়নি এমন নয়। হয়েছিল বলেই আনাতোলিয়ান অংশে বসতি স্থাপনকারীদের ‘অন্ধ’ বলে অভিহিত করেছিল সেকালের মানুষেরা। আর মানুষ যত আধুনিক হতে শুরু করল, তার সাম্রাজ্য ও বাণিজ্যের বিস্তার শুরু হলো, বসফরাসের তীরের এ শহর হয়ে উঠল তার মনোযোগের অন্যতম কেন্দ্র।

জাস্টিনিয়ানের মতো দক্ষ শাসকের কাছেও কনস্ট্যান্টিনোপলের সে গুরুত্ব স্পষ্ট ধরা দিয়েছিল। তার শাসনামলে তিনি এ শহরকে যতখানি সম্ভব গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু জাস্টিনিয়ানের পরবর্তী সময়ে আবার এ শহরের কপালে নেমে আসে দুর্দশা। জাস্টিনিয়ান পরবর্তী প্রায় দেড়শ বছরকে (৫৬৫-৭১৭) কনস্ট্যান্টিনোপলের অন্ধকার সময় বলা হয়। পরবর্তী সময়েও এ শহর নানা শাসনের অধীনে ছিল। অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দী (৭১৭-১০২৫) পর্যন্ত মেসিডোনিয়ান রেনেসাঁ, ক্রুসেড ইত্যাদির মধ্যে শহরটা টিকে থাকে এবং একটু একটু করে সমৃদ্ধও হতে থাকে। সেই সমৃদ্ধি কেবল দালানকোঠা আর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নয়, শহরের প্রতিটি অংশ সময় পরিবর্তনের এক একটা ছাপ ধরে রাখে। জাস্টিনিয়ান থেকে সুলতান মেহমেদের বিজয় পর্যন্ত সময়ের ইতিহাস বিস্তৃত কিন্তু ‘ইতিহাস-খ্যাত’ ঘটনা কম। বহু জাতি লুট করেছে, ক্রুসেডাররা এসেছে, শহর আবার তার ক্ষতি পুষিয়ে নিয়েছে। এ সময়ের অবস্থা সম্পর্কে এবং কনস্ট্যান্টিনোপলের একটি চিত্র জানা যাবে স্যার স্টিভেন রুচিম্যানের বয়ানে। তিনি লিখেছেন,

‘নয় শতাব্দী যাবৎ শহরটি খ্রিস্টীয় সভ্যতার রাজধানী ছিল। প্রাচীন গ্রিসের শিল্প ও শহরের নিজস্ব কারিগরদের অসামান্য সব সৃষ্টি এ শহরে সংরক্ষিত ছিল। ভেনেশিয়রা এ শহর আক্রমণ করে এর সম্পদ তাদের শহরে নিয়ে গেছে। আর ধ্বংস করার কাজটা ফ্রেঞ্চ ও ফ্লেমিংদের খুব পছন্দনীয় ছিল। তারা শহর আক্রমণ করে লুণ্ঠন, ধর্ষণে মেতে উঠত। এমনকি হায়া সোফিয়ায় নজর দিলেও দেখা যেত মাতাল সৈন্যরা সেটা তছনছ করছে।’

ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে এ শহর ল্যাটিন সভ্যতার মূল শহরে পরিণত হয়। এ সময়ে কনস্ট্যান্টিনোপলের জনসংখ্যা ও জৌলুস, উভয়ই ক্ষয় হয়েছিল। ১২৬১ খ্রিস্টাব্দে অষ্টম মাইকেল প্যালিওলোগস শহরের দখল নিতে সক্ষম হন এবং মেহমেদের বিজয় অবধি প্রায় ২০০ বছর এ শহর প্যালিওলোগসদের অধীনেই ছিল। কিন্তু ততদিনে শহরের অর্থনৈতিক অবনতি হয়েছিল অনেক। কনস্ট্যান্টিনোপল এমন এক শহর যেখান থেকে মুনাফা আদায় করাই অনেকের লক্ষ্য। তাই ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে মেহমেদ যখন শহর দখলের জন্য এগিয়ে আসছিলেন তার এক বছর আগেই সম্রাট একাদশ কনস্ট্যান্টাইন পশ্চিমের সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন। কিন্তু তখন খ্রিস্টীয় স্বার্থ নানাভাবে সেখানে এসে জড়ো হয় এবং বাধ্য হয়ে কনস্ট্যান্টিনোপলের শাসক গ্রিক অর্থোডক্স চার্চ এবং রোমান ক্যাথলিক চার্চকে একীভূত করতে বাধ্য হন।

বর্তমান সময়ে এ শহর মূলত বাণিজ্য ও কূটনৈতিক রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও মধ্যযুগে তা ধর্মের জন্য হয়েছিল। খ্রিস্টানরা যখন দুই চার্চ মিলিয়ে খ্রিস্ট ধর্মকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার মানসিকতা ধারণ করেছিলেন তখন পূর্বাংশে অটোমানরা যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয় করেছে। মুসলিম শক্তির এ উত্থানের সময় দুই চার্চ মিলেও কনস্ট্যান্টিনোপলের পতন ঠেকানো তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে কনস্ট্যান্টাইন যে খ্রিস্টান রাজধানী স্থাপন করেছিলেন বসফরাসের তীরে, নয়শ বছর পর সেই মে মাসেই কনস্ট্যান্টাইন শহর মুসলিম সুলতান কর্তৃক বিজিত হয় এবং ক্রমেই তা ইসলামী খেলাফতের কেন্দ্রে পরিণত হয়। গির্জা থেকে ‘হায়া সোফিয়া’ পরিণত হয় মসজিদে।

ইতিহাসে মেহমেদ ও কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয় নিয়ে আলোচনা সবচেয়ে বেশি হয়। কেননা অটোমানদের এ বিজয়ের পরই এ উপদ্বীপের উন্নতি সবচেয়ে বেশি হয়েছে। বাইজাস, কনস্ট্যান্টাইন, জাস্টিনিয়ানদের শহর গড়ে তোলার পর তা আবার বহুদিন ‘পতিত জমি’র মতো পড়ে থেকেছে। কিন্তু অটোমান বিজয়ের পরে এ শহরই হয়ে ওঠে তাদের সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র। মেহমেদ অস্থিরচিত্ত ছিলেন, তিনি বিজেতা হিসেবে অধিক পরিচিত। কিন্তু এ মেহমেদই শহর জয় করার পর এখানে নতুন করে বসতি স্থাপনের ব্যবস্থা করেন। ক্রমে তৈরি হয় তোপকাপি প্রাসাদ। মেহমেদের পর সুলেমান এবং অন্যান্য সুলতানের সময় শহরটা ছিল সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র। মাদ্রাসা, বাজার, বসতি কোনো কিছুই বাদ যায়নি এবং ধীরে ধীরে তুর্কি সাম্রাজ্যের এ শহর প্রাচীন বাগদাদের মতো হয়ে উঠেছিল।

মেহমেদের বিজয় থেকে শুরু করে ১৯২২ সালে তুরস্কে বিপ্লবের সময় পর্যন্ত অটোমান-তুরস্কের অধীনে কনস্ট্যান্টিনোপলের সমৃদ্ধি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এ সময়ের মধ্যে পৃথিবী বদলে গেছে। সাম্রাজ্যবাদ থেকে পৃথিবী গণতন্ত্রের দিকে হেঁটেছে, পালের জাহাজ কলের জাহাজে পরিণত হয়েছে এবং সেই সঙ্গে বদলে গেছে তুরস্ক ও কনস্ট্যান্টিনোপল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মোস্তফা কামাল পাশার আধুনিক তুরস্কে বাইজাসের সেই বাইজেন্টিয়াম নতুন নাম প্রাপ্ত হয়—ইস্তানবুল।

আধুনিক ইস্তানবুলের বয়সও প্রায় শত বছর স্পর্শ করতে চলেছে। এ সময়ের মধ্যে ইস্তানবুলও নানাভাবে বদলে গেছে। পূর্ব আর পশ্চিমের সীমান্তে অবস্থিত বসফরাসের কারণে বাণিজ্যিকভাবে বিশ্বের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এ শহরের প্রতি এখনো যে অনেক দেশ ও জাতির ‘লোভ’ আছে তা কেউ সরাসরি প্রকাশ না করলেও গোপন নয়। পাশাপাশি তুরস্কের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও প্রশাসনিক নীতির কারণেও ইস্তানবুলের নানা পরিবর্তন হয়ে চলেছে। এর মধ্যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এরদোয়ানের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে ‘হায়া সোফিয়া’ পুনরায় মসজিদে রূপান্তরিত হওয়া অন্যতম। উল্লেখ্য, খেলাফত উঠে যাওয়ার পর হায়া সোফিয়াকে জাদুঘরে পরিণত করা হয়েছিল।

বারবার রূপ বদল করা শহর ইস্তানবুল। তার ইতিহাসের মধ্যে আছে তার মানুষ, শাসক এমনকি ইমারত। প্রতিটি বিষয় ইতিহাসে আলোচিত হয়। কিন্তু যা আলোচিত হয় না, তা হলো ‘বিষাদ’। দীর্ঘ ইতিহাস ধারণ করে এমন সব শহরের হাওয়ায় এক বিষাদ থাকে। কখনো কখনো সাহিত্যিকের কলমে বিষাদের কথা উঠে আসে। সে বিষাদের কথা লিখেছেন ঔপন্যাসিক ওরহান পামুক। তাঁর বিখ্যাত বই ‘ইস্তানবুল’-এর দশতম অধ্যায় ‘হুজুন’ যার অর্থ ‘মিষ্টি বিষাদ’। পামুকের ভাষায়, ‘হারিয়ে যাওয়া সবকিছু থেকে যে কষ্ট অনুভূত হয় সেখান থেকেই হুজুনের সৃষ্টি। কিন্তু এখান থেকেই পরাজয় পেরিয়ে তারা নিজেকে নতুন করে গড়তে শেখে।’

ইস্তানবুল শহরের ভাঙাগড়া আর টিকে থাকা যেন পামুকের লেখা ‘হুজুন’-এর মূর্ত রূপ। 


মাহমুদুর রহমান: লেখক