রবিবার | জানুয়ারি ২৪, ২০২১ | ১১ মাঘ ১৪২৭

সিল্করুট

বাইজেন্টিয়াম কনস্ট্যান্টিনোপল ইস্তানবুল

এম এ মোমেন

বাইজেন্টিয়াম শহরের চারদিকে ২৭টি টাওয়ার। প্রতিটি টাওয়ারে অসামান্য শক্তির গুলতি এবং শত্রুর বাহিনী গুঁড়িয়ে দেয়ার মতো পাথর প্রস্তুত। তারা গ্রিকভাষা ব্যবহার করে, কিন্তু রোমান সাম্রাজ্যের অংশ বলে তারা শত বছর ধরে নিজেদের পরিচিতিতে গর্ব করেই রোমান বলছে। এমন সুরক্ষিত নগর তখনকার পৃথিবীতে তেমন বেশি ছিল না, কিন্তু এক সময় এ দুর্ভেদ্য দুর্গনগরেরও পতন ঘটে।

খ্রিস্টজন্মের ৬৫৭ বছর আগে বাইজেন্টিয়াম নগরের পত্তন ঘটে। পাশের সমমানের নগরাঞ্চলের লোকসংখ্যা ছিল আনুমানিক ১৫ হাজার এবং নগরসংলগ্ন গ্রামীণ এলাকায় আরো ১৫ হাজার। গ্রিক পুরানের রাজা বাইজাসের জন্ম থেকে বাইজেন্টিয়াম উদ্ভূত বলে কোনো কোনো ঐতিহাসিক মনে করেন। এটি ইস্টার্ন রোমান এম্পায়ার হিসেবেও পরিচিত ছিল। তবে এটাই যে শহরের নাম ছিল তাও জানা যায় পতিত এ শহরের শেষে ধ্বংসাবশেষ নিশ্চিহ্ন হওয়ার শতবর্ষ পরে, ১৫৫৫ সালে ঐতিহাসিক হাইরোনিমাস উলফের লেখায়। কাছাকাছি নামের আরো দুটো শহরের সন্ধান মেলে, একটি লিবিয়ার বাইজেনশন এবং অন্যটি সিসিলিয়ায়। বলা হয়ে থাকে বাইজাস ছিলেন এথেন্সের কাছাকাছি নগর রাষ্ট্র মেগারার প্রতিষ্ঠাতা। তিনি আরো একটি কলোনি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ডেলফির মন্দিরে অ্যাপোলোর দৈববাণী প্রার্থনা জানালেন। দৈববাণীতে বলা হলো অনুদের দেশের উল্টোদিকে নগর পত্তন করতে হবে। তিনি গোল্ডেন হর্ন প্রাকৃতিক বন্দরের কাছাকাছি যেখানে বসফরাস ও মারমারা সাগর মিলিত হয়েছে, এমন জায়গা পছন্দ করলেন। জায়গাটা ক্যালসিডোনিয়ান উপনিবেশের উল্টোদিকে। তাদেরই অন্ধ বলা হয়েছে, কারণ তারা এশীয় প্রান্তের অন্যপারে ইউরোপীয় অংশের গুরুত্ব অনুধাবন করেনি। প্রতীকী অর্থে তারা অন্ধ। কৃষ্ণসাগরের নৈকট্যের কারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসাকেন্দ্রে পরিণত হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ক্যালসিডোনিয়ানরাই বাইজেন্টিয়ামের এশীয় অংশ দখল করে নেয়।

পারস্য সম্রাট প্রথম দারিউস (দারিউস দ্য গ্রেট নামে অধিক খ্যাত) সাম্রাজ্য বিস্তারের অভিযানে বের হন এবং অভিযানের এক পর্যায়ে খ্রিস্টপূর্ব ৫১৩ অব্দে বাইজেন্টিয়াম দখল করে নেন এবং পারস্যের অন্তর্ভুক্ত করেন, কিন্তু তারপর কয়েক দফা হাত বদল হয়। ৩২৪ খ্রিস্টাব্দে রোমানের দখলে আসার পর সম্রাট কনস্ট্যান্টিন দ্য গ্রেট অত্যন্ত দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী বাইজেন্টিয়ামে স্থানান্তর করেন এবং তার নামেই নতুন রাজধানীর নাম হয় কনস্ট্যান্টিনোপল। ১১ মে ৩৩০ খ্রিস্টাব্দে নতুন নামকরণসহ রাজধানী সম্রাটের নামে উৎসর্গীকৃত হয়। তিনি ৩০৬-৩৩৭ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যু পর্যন্ত রোমান সম্রাট ছিলেন।

নতুন রাজধানীকে তখন বলা হতো নোভা রোমা—নতুন রোম, কেউ কেউ এ শহরকে ইস্টার্ন রোম বা সেকেন্ড রোমও বলেছেন। রোমান সম্রাজ্যের আওতায় আসা পশ্চিমের অন্যান্য শহর হাতছাড়া হয়ে যায়। কনস্ট্যান্টিনোপল চতুর্থ থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত স্থিতিশীল শাসনাধীনে থেকে তখনকার পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ও সংস্কৃতবান শহরে পরিণত হয়। মেগাপোলিস শব্দের প্রথম যথার্থ প্রয়োগ হয় এ শহরের ওপরই।

কনস্ট্যান্টিনোপল নামকরণ থাকাকালীন এ শহরের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কালানুক্রমিকভাবে উল্লেখ করা হচ্ছে:

৩৩২ খ্রিস্টাব্দে মে মাসে খাদ্যঘাটতি মেটাতে প্রতিদিন আশি  হাজার খাদ্য রেশন প্রদান করা হয়।

৩৭৮ খ্রিস্টাব্দে কনস্ট্যান্টিনোপল যুদ্ধ, শহরের ওপর গোথিক আক্রমণ প্রতিহিত করা হয়।

৩৮২ সালে খরা এবং ৩৯৫, ৪০৩, ৪০৭, ৪৪৭, ৪৭৮ সালে ভূমিকম্প এবং ৪৬২ ও ৪৭৩ সালে অগ্নিকাণ্ডে শহরটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৪৭৩ সালে কনস্ট্যান্টিনোপল ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি ভস্মীভূত হয়ে যায়।

৫২৭ সালে ক্ষমতা গ্রহণ করেন সম্রাট জাস্টিনিয়ান, ৫৬৪ পর্যন্ত তিনি ক্ষমতাসীন ছিলেন। আইন ও প্রশাসনিক সংস্কারে জাস্টিনিয়ান এখন পর্যন্ত পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদ্যোক্তা এবং বাস্তবায়নকারী হিসেবে বিবেচিত। এ সময়ে কয়েকবার প্লেগের প্রাদুর্ভাব হয় এবং তা জাস্টিনিয়ান প্লেগ নামেই পরিচিত হয়।

৫৩৭ সালে হায়া সোফিয়া নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়।

৫৬৫-৭১৭ সাল—এ সময়ে কনস্ট্যান্টিনোপল বারবার আক্রান্ত হয়। দুর্ভিক্ষ ও প্লেগ দেখা দেয়, অগ্নিকাণ্ড ঘটে। বালগার, বলকান, পার্শি, সাসানীয় এবং আরবরা অবরোধ ও আক্রমণ অব্যাহত রাখে। পার্সিয়ানরা আনাতোলিয়ার গভীরে পৌঁছে যায়। হেরাক্লিয়াস রাজনৈতিক ডামাডোলে ক্ষমতা দখল করেন। সামরিক পরিস্থিতি এত খারাপ ছিল যে তিনি সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্ট্যান্টিনোপল থেকে কার্থেজে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে সেখানকার জনগণের কাতর প্রার্থনায় সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। ৬৭৪-৬৭৮ এবং পুনরায় ৭১৭-৭১৮-এ শহর আরব শাসনাধীনে ছিল। গ্রিক নৌবাহিনী ও বুলগারিয়ান সামরিক সহায়তায় আরবদের বিতাড়িত করা হয়। ১৫০ বছরেরও বেশি এ সময়কে বলা হয় বাইজেন্টাইন ডার্ক এজ।

৭১৭-১০২৫ সাল ৩০৮ বছরের এ সময়কাল মেসিডোনিয়ান রেনেসাঁর। ধর্মীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব থাকলেও এ সময় খ্রিস্টধর্মের যথেষ্ট বিকাশ ঘটে, চার্চ সংস্কার হয়, নতুন নতুন চার্চ প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মধ্যে বিরোধও প্রবল হয়ে ওঠে, দাঙ্গার রূপও নেয়।

১০২৫-১২৫৩ পর্যন্ত কনস্ট্যান্টিনোপল দু-একটি যুদ্ধ বিজয় ছাড়া অধিকাংশ রণাঙ্গনে মার খেতে থাকে। শুরুতেই ম্যাজিকার্ট যুদ্ধে সেলজুক সুলতানের বাহিনীর কাছে বাইজেন্টাইন সম্রাট রোমানস চতুর্থ ডায়োজোন্সের বাহিনীর লজ্জাজনক পরাজয় ঘটে এবং সম্রাট বন্দি হন। বিদ্ধস্ত ও আহত সম্রাটকে যখন সুলতানের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে পৃথিবীর অন্যতম ক্ষমতাধর একজন মানুষের এ পরিণতি হতে পারে। ১০৭১ সালের আগস্ট যুদ্ধের ফলাফল তুর্কিদের বুঝিয়ে দেয় বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে কাজেই তারা এগোতে পারে।

এমন কাহিনী উদ্ধৃত হয়েছে যখন পর্যুদস্ত সম্রাট রোমানসকে সুলতান আলপ আর্সলান বিলতে পারলেন তিনি তার ঘাড়ের ওপর বুট চেপে ধরে মাটি চুম্বন করতে বাধ্য করেন। সে সময়কার একটি বিখ্যাত কথোপকথন বহুল উদ্ধৃত। 

সুলতান: বন্দি হিসেবে আমাকে যদি সামনে নেয়া হতো তা হলে আপনি কী করতেন?

সম্রাট: সম্ভবত আমি আপনাকে হত্যা করে আপনার মরদেহ কনস্ট্যান্টিনোপলের রাস্তায় জনগণের প্রদর্শনের জন্য পাঠিয়ে দিতাম।

সুলতান: আমার শাস্তি তার চেয়ে ভয়ংকর। আমি আপনাকে ক্ষমা করে মুক্তি দেব।

সুলতান আলপ আর্সলানের বীরত্ব ও মহত্বের খ্যাতি এতটাই ছড়িয়ে পড়ল যে বাইজেন্টাইন বাহিনী তাকে আর ঘাটাতে সহসী হলো না। তিনি সম্রাটকে মুক্তি দিয়ে সাতদিন অতিথি হিসেবে তার সঙ্গে রাখলেন, এক টেবিলে তাকে নিয়ে খেলেন। তিনি সম্রাটের কাছ থেকে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অ্যান্টিওক, এডেসা, হিরাপোলিস এবং ম্যানজিকার্ট তার অনুকূলে আত্মসমর্পণ করিয়ে নেন। সম্রাটের মুক্তির বিনিময়ে ১ কোটি স্বর্ণমুদ্রা পণ দাবি করেন কিন্তু একসঙ্গে এত প্রদান সম্ভব হবে না বলে শুরুতে ১৫ লাখ প্রদান ও তারপর প্রতি বছর ৩ লাখ ৬০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা পরিশোধের অঙ্গীকার করেন এবং সুলতানের পুত্রের কাছে তার কন্যাকে বিয়ে দিতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন। সুলতান তার দুজন উজির এবং কিছুসংখ্যক মামলুক পরিষদ দিয়ে সম্রাটকে কনস্ট্যান্টিনোপল পাঠালেন। সম্রাট পৌঁছে দেখলেন নুতন সম্রাট সিংহাসনে বসেছেন, তিনি ক্ষমতাচ্যুত। এ ধরনের ঘটনা আরো ঘটতে থাকে।

একাদশ শতকে সম্রাট প্রথম আলেক্সিয়াস কনস্ট্যান্টিনোপলের হারানো সম্মান ও জৌলুস অনেকটাই উদ্ধার করেন। ১৪৫৩-র ৬ এপ্রিল ওসমানিয়া শাসক ও তাদের বাহিনীর হাতে কনস্ট্যান্টিনোপল অবরুদ্ধ হয়। ৫৩ দিন পর ২৯ মে ১৪৫৩ কনস্ট্যান্টিনোপলের পতন ঘটে। এ অবরোধ যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন ২১ বছর বয়সী দ্বিতীয় সুলতান মাহমুদ। আর বাইজেন্টাইন সেনাদলের নেতৃত্ব দেন সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন পালাইয়োলোগোস।

বিজয়ী সুলতান উসমানিয়া রাজত্বের রাজধানী আদ্রিয়ানোপোল থেকে কনস্ট্যান্টিনোপলে স্থানান্তর করেন। এ পতনের সঙ্গে সঙ্গে বাইজেন্টাইন সম্রাজ্যের পতন ঘটল। কার্যত এ পতনই নিশ্চিত করে খ্রিস্টজন্মের ২৭ বছর আগে ক্ষমতায় আসা রোমান সম্রাটদের দেড় হাজার বছরের রাজত্বের অবসান। কনস্ট্যান্টিনোপল এশিয়া মাইনর ও ইউরোপের মধ্যে বিভাজক। এ বিজয় উসমানীয়দের প্রকৃত শাসনদণ্ড হাতে নিয়ে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশের পথ সুগম করে দিল। বলকান উপসাগরীয় অঞ্চল তাদের অধিকারে চলে এল।

ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ মনে করেন উসমানীয়দের হাতে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতন এবং কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়ের সঙ্গে প্রকৃতপক্ষে মধ্যযুগের অবসান ঘটল।

বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের চার্চের বিরোধে ১১৮২ সালে গ্রিকরা লাতিনদের নির্বিচারে হত্যা করেছে। ১২০৪ সালে লাতিনরা কনস্ট্যান্টিনোপল লুট করেছে। এ বিরোধ আরো রক্তক্ষয়ী হয়ে উঠতে থাকে। ইস্টার্ন চার্চের উত্থানের দায় বাইজেন্টাইন সম্রাটকেই বহন করতে হয়। উসমানীয় সুলতানের উদ্দেশ্য যখন সম্রাটের কাছে স্পষ্ট হলো তিনি সহায়তা লাভের জন্য পশ্চিমের দিকে হাত বাড়িয়েছেন, পোপকে অনুরোধ করেছেন। তিনি সাড়া পাননি। এমনকি সাড়া পেলেও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য রক্ষায় সফলতা পাওয়ার সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ হয়ে এসেছিল। কনস্ট্যান্টিনোপলের অভ্যন্তরেই খ্রিস্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে সহিংস বৈরিতা ছিল, আবার উসমানীয় সৈন্যবাহিনীতেও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য বিরোধী প্রচুর খ্রিস্টান সৈন্য ছিল। নগর অবরোধ চলাকালে সশস্ত্র আক্রমণ প্রথম খ্রিস্টান ব্রিগেডকে দিয়েই করানো হয়। কোনো চাতুরীর যুদ্ধে নয় সুলতান মাহমুদের বিশাল বাহিনীর সামনে টিকে থাকার মতো জন ও অস্ত্রশক্তি বাইজেন্টাইনদের ছিল না।

যুদ্ধ বিজয়ের পর প্রথম তিনদিন সুলতানের সম্মতিতেই লুটপাট ও হত্যাযজ্ঞ চলে। নগরের ঐতিহাসিক ও অমূল্য বহু স্থাপনা ধূলিসাৎ করে দেয়া হয়। তারপর সুলতান খুবই প্রশংসিত হন, তিনি রাশ টেনে ধরলে আরো ভয়ংকর ক্ষতি হতো, প্রত্যক্ষদর্শী গ্রিক ঐতিহাসিক তার সন্তুষ্টি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেছেন, মাত্র চার হাজার গ্রিক নিহত হয়েছে।

আর শহরের নাম থেকে সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন দ্য গ্রেটের নাম অপসৃত হলো। নতুন নাম রাখা হলো। ব্যাখ্যা করা হয়ে যাকে গ্রিক শব্দ তিমবুলিন (টু দ্য সিটি) সংযুক্ত হয়ে নাম হয়েছে ইস্তানবুল। তবে উসমানীয় বিজয়ের আগে থেকেই শহরটিকে মুসলিম ইস্তানবুল পরিচয়ে চিহ্নিত করে যাবে। সুলতান মাহমুদ নিজের আগ্রহে শহরের নাম বদলে ইস্তানবুল করার কথা বলেন।

শাসন ব্যবস্থায় ইসলামীকরণ স্পষ্ট করে তুলে ধরার জন্য উসমানীয়রা সুলতান, রাজা কিংবা সম্রাট হতে চাননি। তার খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনকাল অনুসরণে নিজেদের খলিফা নামে অধিষ্ঠিত করেন।

শহরের একটি পরিবর্তনের কথা বললেই আর কী কী ঘটেছে তা অনুমান করা সহজ হবে। হায়া সোফিয়ার গ্রিক চার্চ অংশ রেখে বাকিটা মসজিদে রূপান্তর করা হয়। একটি কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হচ্ছে নাম বদলে ৪২২ বছর পার হয়ে যায়। ৪২৩ বর্ষে নজরে আসে যে ইস্তানবুল নামটির আনুষ্ঠানিক কোনো অনুমোদন নেই। কামাল আতাতুর্কের সংস্কার কর্মসূচি চলাকালে তুর্কি ডাক আইন সংশোধন করার সময় ইস্তানবুল নামটিকে আইনি বৈধতা দেয়া হয়।

১৪৫৩ থেকে এ পর্যন্ত ইস্তানবুল নামই চলে আসছে। এর মধ্যে প্রবল শক্তিধর উসমানিয়া সাম্রাজ্য বাইজেন্টাইনদের মতোই দুর্বল হতে থাকে। অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ শুরু হয়। প্রথম মহাযুদ্ধের আগেই ইতালিয়ানদের সঙ্গে একদিকে, অন্যদিকে বলকানদের সঙ্গে জড়িয়ে সাম্রাজ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ হারায় এবং যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে গিয়ে দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়। ইউরোপ তুরস্ককে ডাকতে থাকে ‘দ্য সিক ম্যান অব ইউরোপ’।

১৯১৩ সালের অভ্যুত্থানে উসমানিয়া খেলাফতের পতন চূড়ান্ত হয়। তারপর তিনজন পাশার শাসনকাল। প্রথম মহাযুদ্ধের সময় উসমানীয় শাসকদের বৃহৎ সাম্রাজ্য ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি, গ্রিস, আমেরিকা ও জাপানিদের দখলে চলে যায়। কামাল পাশার নেতৃত্বে শুরু হয় স্বাধীনতা আন্দোলন। ৬ অক্টোবর ১৯২৩ সাম্রাজ্যের অনেক অংশ খুইয়ে তুরস্ক স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করে; ১৩ অক্টোবর ১৯২৩ কামাল পাশা আঙ্কারাকে রাজধানী ঘোষণা করেন। ফিলিপ ম্যানজেস লিখেছেন, মোস্তফা কামাল পাশা তার তুরস্ককে উসমানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় পরিচিতি থেকে বেরিয়ে একটি সেকুলার পরিচিতি প্রতিষ্ঠা করতেই আঙ্কারাকে বেছে নেন। তবে শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে ইস্তানবুল যেভাবে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছে, তার সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারা অসম্ভবই হবে।


এমএ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা