রবিবার | জানুয়ারি ২৪, ২০২১ | ১১ মাঘ ১৪২৭

সিল্করুট

বিষণ্নতার আশ্রয়ের শহর

মুহিত হাসান

ওরহান পামুক তার এখন প্রায় ক্ল্যাসিক বলে পরিগণিত হওয়া স্মৃতিকথা ‘ইস্তানবুল’-এর একটি গোটা অধ্যায় উৎসর্গই করেছেন বিষণ্নতার উদ্দেশ্যে। ‘হুজুন’ (তুর্কিতে বিষণ্নতা বা ‘মেলানকোলি’) শিরোনামের ওই অধ্যায়ে অবশ্য তিনি এ কথাও উল্লেখ করেছেন যে ইস্তানবুল শহরের ‘হুজুন’ আমাদের চেনাজানা বিষণ্নতা আদপে নয়। বিষণ্নতা আক্রান্ত করে ব্যক্তিবিশেষে—অন্যপক্ষে এই ‘হুজুন’ এক বিশেষ আবহ, যা কিনা সম্পূর্ণ একটি শহর বা সেই শহরের পুরো জনগোষ্ঠীকেই আচ্ছন্ন করে রাখে। সবাই তা ভাগ করে নিতে যেন বাধ্য। ‘হুজুনের মধ্য দিয়ে আমরা নিজেদের প্রতিচ্ছবিই দেখতে পাই—আমরা গর্বের সঙ্গে একে আত্মীভূত করি এবং গোষ্ঠী হিসেবে একে পরস্পরের মাঝে ভাগ করে নিই। এ হুজুনকে অনুভব করতে দৃশ্যাবলির মুখোমুখি হতে হবে, স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলতে হবে—যার মারফত এ শহর নিজেই হয়ে ওঠে হুজুনের যথার্থতম চিত্রায়ণ, সর্বোত্তম সারাংশ’—ইস্তানবুলকে ঘিরে ওঠা তার নিজস্ব বিষণ্নতাকে এভাবেই বর্ণনা করেন পামুক। ইস্তানবুলের এ ‘হুজুন’ কারো কাছে বোঝা, কারো কাছে ভালোবাসার, আবার কারো কাছে আশ্রয়ের নামান্তর।

ইস্তানবুলের বিষণ্নতার বয়ান সম্ভবত আধুনিক তুর্কি সাহিত্যের এক অপরিহার্য অংশই হয়ে ওঠে, যা কিনা পামুককেও তাড়িত করে চলেছে। তার অন্যতম প্রিয় স্বদেশী লেখক আহমেত হামদি তানপিনারের বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় লেখা মিনারসদৃশ দুই উপন্যাস ‘আ মাইন্ড অ্যাট পিস’ ও ‘দ্য টাইম রেগুলেশন ইনস্টিউট’-এর আবহজুড়েই থাকে নানা কালখণ্ডে রাজনৈতিক-সামাজিক ঝড়ের মুখে পড়া ইস্তানবুলের অন্তহীন বিষণ্নতার কথা। ‘আ মাইন্ড অ্যাট পিস’-এর চতুর্থ ভাগের মূল চরিত্র মুমতাজ যেমন অটোমান সাম্রাজ্য হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ার সময়পর্বে ইস্তানবুলের পথে নেমে দেখতে পায় ক্ষয়িষ্ণু আবহ আর সর্বগ্রাসী বিষণ্নতার দাপট: “মুমতাজ রাস্তার পুরোটা এবার দেখল অসংখ্য পুরনো জিনিস, ভাঙাচোরা বিছানা, ছেঁড়া-ভাঙাচোরা আসবাব, ছেঁড়া পর্দা ব্রেসিয়ার রাস্তার দুই পাশে পরতে পরতে স্তূপ করে রাখা। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা তোশক আর বালিশগুলোর। এরা যে এখানে পড়ে আছে সেটাই একটা ট্র্যাজেডি। বালিশ-তোশক যার মধ্যে ঢুকে আছে অসংখ্য স্বপ্ন ও ঘুমের স্মৃতি। ফক্সট্রট স্ক্রুর মতো খুলে পড়ে আর তার জায়গা দখল করে নেয় পুরনো তুর্কি গান, যে গান কেবল এমন পরিবেশেই শোনা সম্ভব। ‘কামলিকার বাগানে’... মুমতাজ এটুকু শুনেই গানের গায়ককে চিনে ফেলে—মেমো। সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিতের শাসনকালের শেষ দিনগুলোর তীব্র বিষণ্নতার সব স্মৃতি জড়িয়ে আছে এ গানের গায়কের সঙ্গে, যিনি ডুবে মারা গেছেন গোল্ডেন হর্ন মোহনায়।” (ইয়ান অ্যালমন্ডের ‘নীরদ সি চৌধুরীর মন’ গ্রন্থে উদ্ধৃত)

আবার এই একই ধরনের বিষণ্নতার আবহ বিপ্লবী কবি নাজিম হিকমতকেও প্রবাহিত করতে ছাড়েনি। ‘যে ছোঁবে আমার দুই হাত, সে তো মারা যাবে,/এক লহমায় নয়, তিলে তিলে মৃত্যু তাকে নেবে,/ঘায়ে-দাগে কৃষ্ণকায় হয়ে উঠবে মাংস তার.../ যে ছোঁবে আমার দুই হাত সে তো মারা যাবে।/ ক্ষমা কোরো, বাদামি চোখের প্রেয়সী আমার, আমাদের জাহাজ আদতে এক শীতল কফিন,/পাটাতনে উঠেছিল যারা, প্রত্যেকেই হলো লাশ.../ মেঘ সরে যেতে যেতে জানিয়েছে এই ভাগ্যলিপি।’ কবিতাটির নাম ‘জাপানি জেলেবহর’ হলেও ধারণা করি এ যেন বসফরাসের তীরের বিষণ্নতার আবহে কোনো জেলেবহরকে দেখেই লেখা। আবার ‘আমাকে ইস্তানবুলের কথা বলো’ কবিতায় নির্বাসিত নাজিম হিকমতের কাছে সে শহর বিষণ্নতামাখা প্রেয়সীর চেহারার মতো বটে, কিন্তু একই সঙ্গে তা তার আকুল প্রত্যাবর্তনের অনিবার্য গন্তব্যও: ‘কফির জন্য জল গরম কোরো না, থামো!/ আমাকে ইস্তানবুলের কথা বলো, কেমন দেখেছ তাকে?/ আমাকে বসফরাসের কথা বলো, কেমন দেখেছো তাকে?.../বলো মানুষ সেখানে হাসছে,/ট্রেনে, বাসে, ফেরিতে।/ মিথ্যে হলেও এ কথা আমার লাগে ভালো, বলো বলো।/ কেবলই যন্ত্রণা, কেবলই যাতনা... যথেষ্ট হয়েছে।.../তোমার শরীরের ঘ্রাণ যে ইস্তানবুলের, আর তোমার চোখগুলো ইস্তানবুলের রাত্রি।/এবার এসো, আলিঙ্গন করো আমায়...।’

এই ‘হুজুন’ বা বিষণ্নতা শুধু তুর্কি লেখকদেরই আচ্ছন্ন-প্রভাবিত করেছে এমনটা বলা যায় না। ইস্তানবুলে ভিনদেশের যেসব লেখক নানা দরকারে বা নিছক নিষ্কৃতি পেতে পা দিয়েছিলেন, তাদের মনেও এর ঝাপটা এসে পড়েছে। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের কথাই প্রথমে বলা যাক। ১৯২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি ‘টরেন্টো স্টার’ পত্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে গ্রিক-তুরস্ক যুদ্ধের সমাপ্তি পর্বের সংবাদভাষ্য তুলে ধরার জন্য প্রথমবার তিনি ইস্তানবুলে আসেন। ইস্তানবুল থেকে পাঠানো তার দ্বিতীয় প্রতিবেদনের শিরোনামেই ধস্ত শহরের বিষণ্নতার আবহ স্পষ্ট: ‘কনস্ট্যান্টিনোপল: ফ্যাকাসে সাদা, মলিন ও দুর্ভাগা’। আর ওই প্রতিবেদনের শুরুর অংশটি এমন: ‘কনস্ট্যান্টিনোপল কোনো সিনেমার মতো দেখতে নয়, এটা কোনো ফটোগ্রাফ বা চিত্রকর্মের মতো বা কোনো কিছুর মতোই দেখতে নয়।.. গোল্ডেন হর্ন মোহনাটিও মোটেও স্বর্ণাভ নয়।... এ শহরের সব সাদা রঙই আদতে বিবর্ণ সাদা। ১২ ঘণ্টায় এখানে একটি সাদা শার্টের কী দশা হয় তা দেখলে ৪০০ বছর পার করা একটি সাদা মিনারের চেহারাকেই অধিকতর উত্তম বলে মনে হবে।’ হেমিংওয়ের ইস্তানবুল-দর্শনের প্রায় ৬০ বছর পর রুশ-মার্কিন লেখক জোসেফ ব্রডস্কি এসেছিলেন সেখানে। তখন তার বয়স ৪৪, আর সেটাও তার প্রথমবার ইস্তানবুল দেখা। সে অভিজ্ঞতার কথা লিখতে গিয়ে তার কলমেও কখনো ঝরল উইটঋদ্ধ হতাশা, কখনো দীর্ঘশ্বাস। ব্রডস্কির চোখে এ শহরের সমভূমিগুলো ‘উঁচু উঁচু কবরের রঙের’। আর বসফরাসের তীরের নীল-সবুজ আভার মধ্যে যেন ‘শুধু গোঁফ ছাড়া আর কিছুই ফলবে না।’ আর ইস্তানবুলে তেমন বলার মতো কখনো কিছু হবেও না বলে তার ভবিষ্যদ্বাণী, ‘কেবল কখনো যদি রাস্তায় হাঙামা ঘটে বা কোনো ভূমিকম্প আসে, তা বাদে’।

কিন্তু বিষণ্নতা কি সবার জন্যই শুধু বিমর্ষতা বা বিদ্রূপের আবহ বয়ে আনে? শুরুতেই বলছিলাম, কারো কারো জন্য তা দিতে পারে হয়তো মুক্তির আস্বাদও। ইস্তানবুলের বিষণ্নতা সম্ভবত কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন লেখক জেমস বাল্ডউইনকে দিয়েছিল ঠিক তাই। তিনি যে শহরে আশ্রয়ের খোঁজে ঠাঁই গাড়লেন, তা প্যারিস নয়—ইস্তানবুল। সময়টা ষাটের দশক। ইস্তানবুলে বন্ধু তুর্কি সাহিত্যিক ইয়াসের কামালকে বললেন, ‘দোস্ত, আমি ভেঙে পড়েছি, আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছি। তোমার সাহায্য চাই।’ এরপর তার সহজ স্বীকারোক্তি: ‘ইস্তানবুলে আমি নিজেকে মুক্ত অনুভব করি’। এ কথা শুনে অবশ্য ইয়াসের একমত হতে পারেননি। তার এ ব্যাপারে মন্তব্য ছিল, ‘তুমি মার্কিনি তাই এমনটা মনে হচ্ছে’। কিন্তু বাল্ডউইন সত্যি সত্যিই শহরটাকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন। অতি দ্রুতই তার রোজকার গন্তব্য হয়ে উঠল শহরের পুরনো বইয়ের দোকানগুলো। দেখা গেল কোনো মসজিদের ধারে বসে তিনি টিউলিপের আদলে তৈরি কাপে করে চা খাচ্ছেন। কিংবা বসফরাসের তীরে পর্যবেক্ষণ করছেন জেলেদের কাঠের নৌকাগুলো। ইস্তানবুলের সবকিছুই যেন তখন বাল্ডউইনের ভালো লাগছিল—রাস্তার ফেরিওয়ালাদের গাড়িভর্তি পেঁয়াজ কী তরমুজ, ভরপুর রাস্তায় মাতালদের গড়াগড়ি বা পথের মধ্যে বোর্ড পেতে পাশা খেলা। বাল্ডউইন তার ইস্তানবুল-বাসের কালে মোটমাট দুটি বাড়িতে ছিলেন। দুটিই বসফরাসের তীরে। সেখানে বন্ধুরাও আসতেন। হইহল্লা-আড্ডা হতো। এসবের পালা সাঙ্গ হলে রাতের বেলা নিজের লেখার টেবিলে একা বসে বসফরাসের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেতেন মাঝেমধ্যেই—মার্কিন নৌবাহিনীর কোনো জাহাজ জলপ্রণালি ভেদ করে কোথায় যেন যাচ্ছে। তখন তার মনে হতো, ‘মার্কিনি শক্তি সর্বত্রই নজর রাখে!’ ইস্তানবুলের জীবন তার কাছে আমেরিকার চেয়ে অধিকতর স্বস্তির মনে হয়েছিল, কারণ ‘এখানে কালো মানুষ হিসেবে জীবনধারণ করতে কোনো সমস্যায় পড়তে হয় না’। বস্তুত, ষাটের দশকের ইস্তানবুলের সমন্বয়বাদী উদার চরিত্র (যা আজ বিলীন হওয়ার পথে) বাল্ডউইনকে প্রেরণা জোগাত। এক শহরেই তুর্কি, আর্মেনীয়, গ্রিকদের সহাবস্থান-বন্ধুত্ব তো তখন ছিল, ফলে তার কাছে ইস্তানবুল বর্ণবাদে বিভক্ত আমেরিকার সমাজের চেয়ে এক অধিকতর বাসযোগ্য ভূমি বলে গণ্য হয়েছিল। কিন্তু এখনকার দ্বন্দ্বমুখর ইস্তানবুল দেখে কী প্রতিক্রিয়া হতো বাল্ডউইনের, তা তো আর জানার উপায় নেই।


মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক