রবিবার | জানুয়ারি ২৪, ২০২১ | ১১ মাঘ ১৪২৭

সিল্করুট

মোৎসার্ট: একটি প্রস্তাবনা

সল বেলো, ভাষান্তর: শানজিদ অর্ণব

আমি লেখাটি তৈরি গিয়ে আবিষ্কার করি যে বোধ হয় একটি উপন্যাসের চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য মোৎসার্টকে মাপছি। লেখার শুরুতে আমি এটা একেবারেই ধরতে পারিনি। আধাআধি লেখার পর বিষয়টা আমার সামনে পরিষ্কার হয়ে ওঠে।

সংগীতের জ্ঞানশূন্যরাও সহজে মোৎসার্ট শুনতে পারেন। অন্যদের অবশ্যই প্রস্তুতি লাগে। আনাড়িরা মোৎসার্টকে স্বাভাবিক ও মুক্তমনে ভালোবাসতে পারেন। একজন আনাড়ি হিসেবে আমাকে এখানে মোৎসার্টকে নিয়ে কথা বলার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এখানে আমি যা বলব সেটা আমার আনাড়ি অবস্থান থেকেই। মোৎসার্টকে নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞদের যেসব বিষয় বিরক্ত করেছে বা যেগুলো নিয়ে তারা কৌতূহলী হয়েছেন সেগুলো এড়িয়ে গিয়েছি। সবকিছু নিজের মতো করেই বলার চেষ্টা করেছি। 

আমি শুরুতেই বলতে চাই আমার অস্তিত্বের কিছু কোণ রয়েছে, যেগুলো মোৎসার্টের সুর দিয়ে পূর্ণ। আমার মনে হয় না আর কোনো সংগীত তার জায়গা দখল করতে পারবে। আমার এক বড় বোন ছিলেন—আমার থেকে বেশ অনেকটা বড়—তিনি পিয়ানো বাজাতেন। খুব ভালো বাজাতেন না। কিন্তু তিনি আমাকে মোৎসার্টের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।

মোৎসার্টকে নিয়ে আমার অনেক ধারণা মুখ্যত অবৈজ্ঞানিক। আমি মাঝে মাঝেই তার প্রতিভা নিয়ে বিস্মিত হই। কী করে মানুষের প্রতিভা এত অল্প বয়সে এবং দ্রুত বিকশিত হয়? এটা কি তার বাবা শিক্ষাবিদ ছিলেন সে প্রতিভার ফল? যদিও লিওপোল্ডের (মোৎসার্টের পিতা) মধ্যে কেউ কখনো কোনো বিশেষ প্রতিভার লক্ষণ দেখেননি। তার মায়ের শিক্ষা কিংবা জেনেটিক পরম্পরাও মোৎসার্টের জীবনীকারদের কাছে বিশেষ আগ্রহের মনে হয়নি। মোৎসার্ট অনেকটা উইলিয়াম ব্লেকের মতো, যে জমিতে এরই মধ্যে কোদাল চালানো হয়েছে, বীজ পোঁতা হয়ে গেছে। সহজ কথায় বলা যায়, মনে হয় যে তিনি সবকিছু জন্মের সময় সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। এরপর আমার ভাবনায় আসে বিখ্যাত গণিতজ্ঞ বা সংগীতজ্ঞদের ঘরে জন্ম নেয়া প্রতিভাবানরা। মোৎসার্টের মতো দুর্লভ প্রতিভাদের ক্ষেত্রে তাদের পরিবেশ বা ঐতিহাসিক তত্ত্ব কাজে আসে না। তাদের জীবনে থাকে অদৃশ্য অভিপ্রায়ের হস্তক্ষেপ।

আলফ্রেড আইনস্টাইন লিখেছেন, ‘কিছু মাত্রায় এটা সত্য যে মোৎসার্ট এ দুনিয়ায় কেবল একজন অতিথি ছিলেন। তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন যার সত্যিকার অর্থে কোনো ঘর নেই: সলজবুর্গে নয়, যেখানে তিনি জন্মেছিলেন; ভিয়েনায়ও নয়, যেখানে তার মৃত্যু।’

বিশ শতকের শেষভাগে এসে মোৎসার্টের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। তার রোমান্টিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ৫০-৬০ বছর আগে যত বড় মনে হতো এখন আর তা মনে হচ্ছে না। সমকালীন গুরুত্বপূর্ণ সংগীত ঐতিহাসিক যেমন ভলফগাং হিলডেশেইমার মনে করেন, মোৎসার্ট আমাদের খুব পরিচিত মানুষ। পিটার পোর্টার কিছুদিন আগে তার প্রবন্ধ এনকাউন্টারে (জুন ১৯৮৩) মোৎসার্টকে নিয়ে লিখেছেন যে তিনি একজন আধুনিক মানুষ, আমাদের কাছে বাখের তুলনায় বেশি কাছের; মোৎসার্ট আমাদের দৃষ্টিসীমার মধ্যে, আমাদের অনুভূতিতে বোধগম্য। তিনি আরো লিখেছেন, ‘যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে এটা ভাবার যে মোৎসার্টের জীবনে অনেক বেদনা ছিল। তার জীবন কোনো জয়ের নয়।...বিটোফেন থেকে তার জীবন ভিন্ন রকমের, তিনিও টাইটান তবে অন্য রকমের।’

আধুনিক হতে হলে ভ্রাম্যমাণ হতে হবে, সবসময় চলমান, কোনো স্থানে আসন গেড়ে বসা নয়, বরং চিরকালই গন্তব্যের পথে থাকা, কসমোপলিটান, অস্থায়ী আবাসে আউটসাইডার হিসেবে অস্বস্তি বোধ করা যাবে না। মোৎসার্ট তার চলার পথেই মাথার মধ্যে কম্পোজ করতে থাকতেন। মেজাজে তিনি সবসময়ই ভ্রাম্যমাণ ছিলেন। মোৎসার্টের প্রথম জীবনীকারদের একজন নিশেন। মোৎসার্টের শ্যালিকার উদ্ধৃতি দিয়ে নিশেন জানিয়েছেন যে জীবনের শেষ বছরগুলোতে ‘তিনি সবকিছুর দিকে অন্তরভেদী দৃষ্টিতে তাকাতেন। সবকিছুর উত্তর দিতেন ভারসাম্য রেখে; খুশি কিংবা বেজার যেমনই থাকুন সবসময়ই তিনি একেবারে ভিন্ন কিছু নিয়ে ভাবনায় নিমগ্ন থাকতেন। মনে হতো হারিয়ে গেছেন অন্য কোনো দুনিয়ায়। এমনকি সকালে যখন মুখ ধুতেন তখনও স্থির থাকতে পারতেন না। এদিক-ওদিন হাঁটতেন, এক পায়ের গোড়ালি দিয়ে অন্য পায়ে ঠুকতেন এবং সবসময়ই ছিলেন রিফ্লেক্টিভ...নতুন নতুন বিনোদনের মাধ্যম নিয়ে তিনি সবসময় উৎসাহী ছিলেন—উদাহরণস্বরূপ বলা যায়: ঘোড়ায় চড়া কিংবা বিলিয়ার্ড...তিনি সবসময় তার হাত-পা নাড়াতেন; সবসময় কিছু না কিছু নিয়ে খেলতেন—হ্যাট, পকেট, ঘড়ির চেইন, টেবিল-চেয়ার আর পিয়ানো হাতের নাগালে থাকলে তো কথাই নেই...।’

স্থায়ী বলতে যা বোঝায় তা তিনি সবসময় সঙ্গে বয়ে নিয়ে চলতেন। ১৭৮৮ সালে তিনি ভিয়েনা থেকে লিখেছেন: ‘আমাদের নতুন কোয়ার্টারে প্রথমবারের মতো আমরা ঘুমাচ্ছি, এখানে আমরা গ্রীষ্ম ও শীতকালটা কাটাব। এসব পরিবর্তন আমার কাছে একই রকম। সত্যি বলতে এটা আমি পছন্দ করি...আমার হাতে কাজের জন্য আরো বেশি সময় থাকবে।’

আইনস্টাইন আমাদের জানিয়েছেন, মোৎসার্ট ও তার স্ত্রী ভিয়েনায় ১০ বছরে তাদের বাড়ি বদল করেছিলেন ১১ বার। অনেক সময় তিন মাস পরই তারা একটি বাসা বদল করেছেন। তাদের জীবন ছিল চিরকালের ভ্রমণ, এক হোটেল রুম থেকে অন্য হোটেল রুমে এবং রুমগুলোকে তারা শিগগিরই ভুলে যেতেন।...তিনি সবসময় ভিয়েনা ছেড়ে অন্য কোনো শহরে কিংবা অস্ট্রিয়ার পরিবর্তে অন্য কোনো দেশে স্থানান্তর হতে প্রস্তুত ছিলেন।

শিল্প তার জন্য কোনো ‘প্রকল্প’ ছিল না, যেমনটা উনিশ শতকের অন্যদের কাছে ছিল। তিনি কখনো ভাবেননি যে তার প্রতিভা তাকে রক্ষা করবে। তিনি জীবন কাটিয়েছেন কত কী ঝেড়ে ফেলা যায় সে হিসাব করে এবং তিনি এটা করেছেন আত্মবিশ্বাস আর নিঃশঙ্কচিত্তে। এটা তার খাঁটি ও নিখুঁত স্বাধীনচিত্তের প্রকাশক। একজন মডার্নিস্টের কাছে রোমান্টিক জিনিয়াসদের তোষামুদে চরিত্র ঘৃণার বস্তু। মোৎসার্ট রাজনীতিকে পাত্তা দিতেন না। ক্ল্যাসিক মডার্ন অর্থে ‘ক্ষমতা’ তার কাছে কোনো আকর্ষণ বহন করত না। ফন্দি আঁটা তার চরিত্রে ছিল না। বাস্তব জীবনে তিনি ছিলেন একেবারে দূরদৃষ্টিহীন। তার অধুনা জীবনীকাররা নিশ্চিত করেছেন যে ব্যক্তিগত বিষয়াদি ব্যবস্থাপনায় মোৎসার্টের দক্ষতা ছিল শূন্যের ঘরে। 

আমার কাছে মোৎসার্টের ব্যক্তিত্ব ও জীবনকে বেশ আনন্দময় মনে হয়। তার মেজাজ খুব বেশি সমকালীন। কিন্তু তার পরও এ যুগে আমরা নিজেদের না বুঝে তাকে অনুভব করতে পারব না। মোৎসার্টকে নিয়ে হিলডেশেইমার যে গবেষণা করেছেন তাতে তিনি মত দিয়েছেন যে তার চরিত্রের ধাঁধা সমাধান করা আমাদের যুগের সাধ্যের অতীত। এটা তার সংগীতের পেছনে আড়াল হয়ে আছে, যা কখনো প্রকাশ্যে আসে না। যখন তাকে আধুনিক বলি তখন সম্ভবত এটা বোঝাই যে আমরা তার সংগীতে এনলাইটমেন্ট, রিজন ও ইউনিভার্সালিজমের স্বাক্ষর দেখতে পাই। একই সঙ্গে পাই এনলাইটমেন্টের সীমাবদ্ধতাও। আমরা ইতিহাস থেকে শিখেছি এনলাইটমেন্ট, মুক্তি আর তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা পরস্পরের হাতে হাত রেখে এগোতে পারে। মুক্তি যদি একটা পথ খুলে দেয়, তাহলে আবার দুটো বন্ধও করে দেয়। দিনের আলোয় উদ্ভাসিত মোৎসার্টের সেকুলার জীবনের পাশাপাশি ছিল ভিন্ন এক আঁধারঘেরা দুনিয়া। যে স্বাধীনতা আমরা তার জীবনে দেখি তা কিন্তু কখনো দুঃখবোধ, বেদনার কাছে নিজেকে গভীর সমর্পণ ব্যতীত অস্তিত্বমান হয়নি।

হিলডেশেইমার মেনে নিয়েছেন যে মোৎসার্ট ও বিটোফেন তাদের সঙ্গে ‘আ মেটাফিজিক্যাল অরা’ (অধ্যাত্মিক বাতাবরণ) বয়ে বেড়াতেন। বিটোভেন এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন এবং তিনি বিষয়টিকে সচেতনভাবে কাজে লাগিয়েছেন। কিন্তু মোৎসার্ট কখনো তার এ বৈশিষ্ট্য টের পাননি। আর তাতে তিনি তার বৈষয়িক উপস্থিতিকে নানা কৌশলে অতিরঞ্জিত করেছেন, এটা তার রুটিনে পরিণত হয়েছি। তিনি ছিলেন এক অজ্ঞ দানব। তিনি ছিলেন এক ‘আগন্তুক’, কিন্তু কখনো তার মধ্যে থাকা ‘অপরিচিত’ প্রকৃতিকে বুঝতে পারেননি। বিটোফেন তার শ্রেষ্ঠত্বকে জাহির করেছেন, কিন্তু মোৎসার্ট তা কখনো করেননি। মোৎসার্ট নিজেকে নিয়ে ভাবিত ছিলেন না, বরং সবসময় ব্যস্ত ছিলেন তিনি যে কাজের জন্য জন্মেছিলেন সেটাই ঠিকভাবে করার জন্য। তার মধ্যে সামান্য আত্মগর্ব ছিল, তবে সেটা মোটেই জাঁকালো দেখনদারির মতো কিছু ছিল না।

মোৎসার্টের ব্যাপারে কথা বলতে গেলে বিস্মিত সুরে বলতেই হয়, ‘এত সব সৃষ্টি কোত্থেকে এল’। এরপর কিছু ‘চিরকালীন,’ ‘রহস্যময়’ প্রশ্নকে উত্থাপন না করে পারা যায় না। অনেকে যুক্তি দিয়ে বলেন, তিনি ‘আধুনিক’ (আমাদের একজন), এবং তার পরও আধুনিকের সার হচ্ছে ডিমিস্টিফাই করা। আমাদের আধুনিক মোৎসার্টের উচিত রহস্যকে জমিয়ে তোলা—ব্যাপারটা কেমন হয়?

মোৎসার্টের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়টি হচ্ছে যে তিনি একজন ব্যক্তি। তিনি নিজেই খুঁজে নিয়েছেন হতাশা, ধোঁকা, যন্ত্রণা, দুর্বলতা, বোকামি, রক্ত-মাংসের মানুষের অহংকার, এমনকি অবিশ্বাসের শূন্যতার অভিজ্ঞতাকে। তার মধ্যে আমরা এমন একজন মানুষকে দেখতে পাই, যার নির্ভর করার মতো আর কেউ ছিল না, স্বয়ং নিজেকে ছাড়া। কিন্তু এ নিঃসঙ্গ ব্যক্তিসত্তাটি কী ছিল, কী অবিশ্বাস্য শিল্প সে সৃষ্টি করে গেছে! কত গভীরভাবে তিনি শব্দ ছাড়াই আমাদের মানবচরিত্রে সাধারণ রহস্যগুলো নিয়ে বলেছেন এবং তার সৃষ্টির মাহাত্ম্য কত স্বতঃস্ফূর্ত এবং সহজ।


[সল বেলো (১৯১৫-২০০৫) নোবেলজয়ী সাহিত্যিক। মোৎসার্টের মৃত্যুর ২০০ বছর উপলক্ষে ইতালির ফ্লোরেন্সে মোৎসার্টকে নিয়ে তিনি এ ভাষণ দিয়েছিলেন ১৯৯১ সালের ৫ ডিসেম্বর। পরে ১৯৯২ সালে এটি বোস্তোনিয়া ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। এখানে রচনাটির নির্বাচিত অংশ ভাষান্তরিত হয়েছে]