বৃহস্পতিবার | এপ্রিল ২২, ২০২১ | ৯ বৈশাখ ১৪২৮

সিল্করুট

মোৎসার্টের নির্বাচিত চিঠি

ফজল হাসান

ভূমিকা

কথাসাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা পত্র বা চিঠি। বিশ্বের অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তির ব্যক্তিগত অসংখ্য চিঠি কথাসাহিত্যে স্বীকৃতি পেয়েছে এবং উৎসাহী পাঠকদের মনে দারুণ সাড়া ফেলেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অগণিত চিঠি, যা পরবর্তীতে একাধিক গ্রন্থে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। সেসব চিঠিতে তিনি ব্যক্তিগত, পারিবারিক, দেশ-বিদেশের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি ছাড়াও ঈশ্বর প্রসঙ্গ এবং আধ্যাত্মিক ভাবনার কথা বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। বলা বাহুল্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠি বাংলা সাহিত্যে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে এবং সেগুলোকে অমূল্য সম্পদ হিসেবে ধরা হয়।

সুরের জগতের অনন্য এক নাম ‘ভলফগাঙ আমাডিউস মোৎসার্ট’ (Wolfgang Amadeus Mozart)। তিনি পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সংগীতের একজন অনন্য মিউজিশিয়ান এবং কম্পোজার। তবে তিনি যে শুধু একজন অসাধারণ ও প্রতিভাধর সংগীতজ্ঞ ছিলেন, তা নয়। তিনি একজন বিখ্যাত চিঠি বা পত্র লেখকও বটে। তার সেসব চিঠিতে অন্য অনেক সুরকার সম্পর্কে তিনি কী ভেবেছিলেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ তাকে নিয়ে কী ভেবেছিল, এমনকি তার সময়ের অনেক সংগীতজ্ঞ এবং গায়কদের সম্পর্কে তিনি কী ভেবেছিলেন—এমন অনেক বিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়া তিনি রাজকীয় ও অভিজাত কয়েকজনকে নিয়ে এবং তার কিছু ছাত্র সম্পর্কে বিভিন্ন বিষয় উল্লেখ করেছেন। তবে তার চিঠিতে, বিশেষ করে ভিয়েনা থাকাকালীন সময়ে, স্পষ্টভাবে তার হূদয়ের স্বাভাবিক এবং সরল বহিঃপ্রকাশ প্রকাশ পেয়েছে। বিভিন্ন চিঠিতে তার প্যারিস ভ্রমণের বিবরণ অবশ্যই নান্দনিক মূল্য দাবি করতে পারে। কারণ সেগুলো তিনি উৎসাহের সঙ্গে তার নিজস্ব বর্ণনায় লিখেছেন। অনেক চিঠিতে একই সঙ্গে তার বুদ্ধিমত্তা ও মুগ্ধতার উপস্থিতি দেখা যায় এবং সেসব চিঠি বৈশিষ্ট্যগত শক্তির দিক থেকে অনন্য। বলা হয়, মোৎসার্টের চিঠিগুলো তার অন্তর্দৃষ্টির একটি সোনার খনি। বিভিন্ন আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবকে লেখা চিঠির মাধ্যমেই তার জীবনের খুঁটিনাটি অনেক বিষয়ের হদিস পাওয়া যায়। Ludwig Nohl-এর মতে মোৎসার্টের চিঠি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং চিঠিগুলোর আবেদন সর্বজনীন, কেননা তাতে শৈল্পিকতার উপস্থিতি রয়েছে।

এ লেখার মূল উদ্দেশ্য মোৎসার্টের নির্বাচিত চিঠির সঙ্গে উত্সুক পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেয়া। তবে তার আগে তার জীবন ও বিশ্বের অন্যতম সংগীতজ্ঞ হওয়ার সংক্ষিপ্ত কাহিনী তুলে ধরা হলো।

মোৎসার্টের জীবন

মোৎসার্ট ১৭৫৬ সালের ২৭শে জানুয়ারি সলজবুর্গ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা লেওপোল্ড মোৎসার্ট (১৭১৯-১৭৮৯) ছিলেন সলজবুর্গ আর্চবিশপের সভার সংগীতজ্ঞ এবং তার মায়ের নাম আন্না মারিয়া মোৎসার্ট (প্রদত্ত নাম: পার্টল, ১৭২০-৭৮)। মোৎসার্ট ছিলেন তার পিতা-মাতার সাত সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। তিনি এবং তার বড় বোন মারিয়া আন্না মোৎসার্ট, যার ডাকনাম ছিল ‘নান্নেরল’ (১৭৫১-১৮২৯), ছাড়া তার পাঁচ ভাইবোন শিশু বয়সেই মারা যায়। জন্মের পরদিনই তাকে সলজবুর্গের সেন্ট রুপার্ট ক্যাথিড্রালে ব্যাপটাইজ করা হয় এবং নথিতে তার লাতিন নাম লেখা হয় Joannes Chrysostomus Wolfgangus Theophilus Mozart।

শৈশবে পিতা ছিলেন মোৎসার্টের একমাত্র শিক্ষক। তার পিতা ছিলেন একজন সুদক্ষ সুরকার ও অভিজ্ঞ শিক্ষক। মাত্র তিন বছর বয়সে মোৎসার্ট ক্ল্যাভিয়ার নামক বিশেষ কিবোর্ড বাজানো শিখে ফেলেন এবং পাঁচ বছর বয়সেই ভায়োলিন বাজিয়ে তার দক্ষতা দিয়ে সবাইকে অবাক করে দেন। বিখ্যাত কম্পোজিশন ‘Sonata’ লেখেন মাত্র সাত বছর বয়সে এবং জীবনের প্রথম সিম্ফনি রচনা করেন মাত্র আট বছর বয়সে। তিনি ১৪ বছর বয়সে Mitridate re di Ponto (Mithridates, King of Pontus) নামক অপেরা লিখে পুরো ইউরোপে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেন। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো পড়ালেখা বা যেকোনো শব্দ শেখার আগেই সংগীতে তার হাতেখড়ি হয়। ১৯ বছর বয়সের মধ্যেই তার জীবনে লেখা সব সিম্ফোনির মধ্যে অর্ধেকের বেশিসংখ্যক লেখা হয়ে যায়। মোৎসার্টের বিখ্যাত সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে অপেরা, কনসার্তো, সিম্ফনি ও ঐকতান। The Magic Flute, Don Giovanni ও Marriage of Figaro তার বিখ্যাত অপেরা এবং কনসার্তোর মধ্যে Piano Concerto (K. 595 in B-flat), Piano Concerto No.21 in C, K.467 Ges Clarinet Concerto K. 622 উল্লেখযোগ্য। তার শেষ সিম্ফোনির নাম ‘জুপিটার’, যা তিনি ১৭৮৮সালে রচনা করেন।

এ কথা সত্যি যে মোৎসার্টের সংগীত কম্পোজিশন ছিল বৈচিত্র্যময় ও জটিল। তিনি ৬০০-এর অধিক সুর সৃষ্টি করেন। তার মধ্যে অসংখ্য সুর সিম্ফোনিক, কনসার্টেন্ট, চেম্বার, গীতিনাট্যধর্মী ও দলীয় সংগীত। তার অনেক সুর আজও বিশ্বসংগীতে শীর্ষস্থান দখল করে আছে। তিনি ধ্রুপদী সুরকারদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত এবং দীর্ঘ সময় প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছেন। পাশ্চাত্য শৈল্পিক সংগীত জগতে তার প্রভাব অনস্বীকার্য। বিশ্ববিখ্যাত জার্মান কম্পোজার এবং পিয়ানো বাদক লুডভিগ ফান বিটোফেন (১৭৭০-১৮২৭) তার শুরুর কাজগুলো মোৎসার্টের অনুকরণে সৃষ্টি করেন। ক্ল্যাসিক্যাল সময়ের (১৭৩০-১৮০) অস্ট্রিয়ান আরেক বিখ্যাত কম্পোজার ফ্রাঞ্জ জোসেফহ্যাডিন (১৭৩২-১৮০৯) মোৎসার্টের পিতাকে এক চিঠিতে উল্লেখ করে বলেছেন, ‘আমি ঈশ্বরকে সামনে রেখে একজন সৎ মানুষ হিসেবে আপনাকে বলছি, আমার দৃষ্টিতে আপনার পুত্র সর্বশ্রেষ্ঠ সুরকার। তার রুচি আছে এবং সুর রচনায় সে পারঙ্গম।’ এছাড়া হ্যাডিন অন্যত্র স্বীকার করেছেন, ‘পরবর্তী একশ বছরেও (মোৎসার্টের মতো) এমন প্রতিভা দেখা যাবে না।’ কথিত আছে, মোৎসার্টের সংগীতের প্রভাব এবং উৎসাহ-উদ্দীপনার উৎস হিসেবে একসময় ইতালির সাবেক ফুটবল কোচ জিওভান্নি ত্রাপোত্তানি দলের খেলোয়াড়দের বলেছিলেন, ‘মোৎসার্টের সংগীত শোনো, আরো ভালো ফুটবল খেলতে পারবে।’

তবে সুনাম ও খ্যাতির পাশাপাশি মোৎসার্ট অনেকেরই ঈর্ষার পাত্র ছিলেন। তিনি যখন সংগীতজ্ঞ হিসেবে জার্মানি গিয়ে প্রথম রোমান রাজসভায় যোগদান করেন, তখন তার সংগীত প্রতিভায় সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হয়েছিলেন সেখানকার তত্কালীন প্রধান অপেরা কম্পোজার এন্তোনিও সালিয়েরি। কিন্তু মোৎসার্টের প্রতিভায় সালিয়েরি যতটা না মুগ্ধ হয়েছিলেন, তার চেয়ে বেশি হয়েছিলেন ঈর্ষান্বিত। খুব অল্প বয়সী একটি ছেলে এভাবে ঈশ্বর প্রদত্ত প্রতিভা নিয়ে সৃষ্টি করছিল একের পর এক মহাকাব্যিক অপেরা—সালিয়েরি তা সহ্য করতে পারেননি।

যা হোক, মোৎসার্ট কেন একজন বিশ্ববিখ্যাত সুরকার ও সংগীতজ্ঞ, তার ১০টি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলো হলো: (১) অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তিনি প্রতিটি সংগীতে সুরারোপ করেছেন, (২) তিনি ছিলেন নাটকীয় মুহূর্তের পারঙ্গম কুশলী, (৩) তার মধ্যে সুরের প্রতিভা ছিল প্রখর, (৪) শিশুরা যে বয়সে খেলনা খেলে, তিনি সেই বয়সে সিম্ফনি লিখেছেন, (৫) মাত্র ৩৫ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনের সংগীত জগতে তার অবদান বিস্ময়কর, (৬) তিনি কিবোর্ড ও স্ট্রিং যন্ত্রের একজন স্বনামধন্য রক তারকা ছিলেন, (৭) তিনি ভিনদেশী ও স্থানীয়, পুরনো ও নতুন এবং ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ সংগীতশৈলীর সমন্বয় করায় ছিলেন অত্যন্ত পারদর্শী, (৮) তার রসবোধ ছিল অদ্বিতীয়, (৯) তবে তিনি অত্যন্ত গম্ভীর এবং মানসিক গভীরতার কাজও রচনা করেছেন এবং (১০) তার সময়ের অন্যান্য বিখ্যাত সুরকার তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন এবং আজ পর্যন্ত অনেকের কাছে তিনি অনুপ্রেরণাদায়ী।

নিঃসঙ্গ ও হতদরিদ্র অবস্থায় মহান সংগীতজ্ঞ মোৎসার্টের মৃত্যু হয় মাত্র ৩৫ বছর বয়সে, ১৭৯১ সালে।

মোৎসার্টের নির্বাচিত চিঠি

The Letters of Wolfgang Amadeus Mozart (১৭৬৯-১৭৯১) গ্রন্থের ভূমিকায় Ludwig Nohl উল্লেখ করেছেন, ভ্রমণের সময় বাবাকে লেখা চিঠিতে মোৎসার্ট তার নিজের হূদয়ের আবেগের কথা লিখেছেন এবং সেসব চিঠিতে আরো অনেক বিষয়, বিশেষ করে দেশ ও জনগণের কথা, সূক্ষ্ম শিল্পের অগ্রগতি, থিয়েটারে এবং সংগীত বিষয়ে নানা ধরনের কথাবার্তা আছে। এছাড়া অনেক চিঠিতে তিনি কীভাবে জীবন যাপন করতেন, পরিশ্রম ও উপভোগ করতেন, এমনকি কষ্ট পেতেন, তার অনেক কিছুই বর্ণনা করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন তথ্যসূত্র থেকে জানা যায়, মোৎসার্টের অনেক চিঠির মধ্যে আপত্তিকর কিংবা অশ্লীল কৌতুকের উপস্থিতি রয়েছে। সেসব চিঠির অধিকাংশ তিনি বাবা-মা, স্ত্রী, বোন, কাজিন ও সলজবুর্গের বন্ধুসহ অন্যান্য কয়েকজন ঘনিষ্ট বন্ধুকে লিখেছেন। 

স্থান ও সময় অনুযায়ী মোৎসার্টের চিঠিগুলো The Letters of Wolfgang Amadeus Mozart (১৭৬৯-১৭৯১) [প্রথম খণ্ড] গ্রন্থে চারটি আলাদা পর্বে বিভক্ত। সেই চারটি পর্বে বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের মোট ১৪০টি চিঠি আছে। সেখান থেকে বাবা, মা, স্ত্রী, বোন ও বন্ধুকে লেখা কয়েকটি চিঠি অনুবাদ করা হলো। উল্লেখ্য, যেসব চিঠিতে কাউকে সম্বোধন করা হয়নি, সেগুলো মোৎসার্ট তার বাবাকে লিখেছেন। যা হোক, কয়েকটি চিঠির সঙ্গে ‘নোট’ জুড়ে দেয়া হয়েছে, যা একান্ত লেখকের।

পর্ব এক. ইতালি, ভিয়েনা এবং মিউনিখ : ১৭৭০ থেকে ১৭৭৬

চিঠি ১.

বোলোনা, আগস্ট ২১, ১৭৭০

আমি শুধু বেঁচে আছি না, আমার মধ্যে দারুণ উৎসাহ কাজ করছে। গাধায় চড়ার জন্য আমি একটা অভিনব কাজ করেছি, কারণ সেটাই ইতালির রীতি। তাই আমি ভেবেছিলাম, আমাকেও চেষ্টা করতে হবে। একজন নির্দিষ্ট ডোমিনিকানের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে আমরা সম্মানিত বোধ করছি। তাকে একজন অত্যন্ত ধার্মিক সাধু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু আমি তা মনে করি না। কারণ সে ক্রমাগত সকালের নাশতার জন্য এক কাপ চকোলেট নেয় এবং তার পরেই এক গ্লাস শক্তিশালী স্প্যানিশ মদিরা। ভদ্রলোক যখন ডিনারে প্রচুর পরিমানে মদ্যপান করেন, তারপর তরমুজের দুটি বড় টুকরো, কিছু পিচ ফল এবং মিষ্টান্নের জন্য নাশপাতি, পাঁচ কাপ কফি, একটি পুরো প্লেট বাদাম এবং দুই বাটি দুধ এবং লেবু পান করেন, তখন আমি তার সঙ্গে খাওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছি। এটা হয়তো তিনি সাহসিকতার সঙ্গে করতে পারেন, কিন্তু আমি তা মনে করি না—সব অনুষ্ঠানে, খাবার ও পানীয়র পরিমাণ অনেক বেশি। তিনি বিকালের নাশতার সময়ও প্রচুর খান।

চিঠি ২.

বোলোনা, ৮ সেপ্টেম্বর, ১৭৭০

আমার কর্তব্যে ব্যর্থ না হয়ে আমাকে অবশ্যই কিছু শব্দ লিখতে হবে। আমি আশা করি আপনার পরবর্তী চিঠিতে আপনি আমাকে বলে দেবেন যে আমি কোন ভ্রাতৃত্বের অধিকারী। এছাড়া আমি তাদের জন্য প্রার্থনা করতে বাধ্য কিনা তা আমাকে জানান। আমি এখন ‘টেলিমাকাস’ পড়ছি এবং এরই মধ্যে দ্বিতীয় খণ্ডে আছি। বর্তমানের জন্য বিদায়! মামণির প্রতি ভালোবাসা রইল।

চিঠি ৩.

মিলান, অক্টোবর ২০, ১৭৭০। 

আমার প্রিয় মামণি,

আমি বেশি কিছু লিখতে পারব না। কারণ অনেক বেশি লেখার কারণে আমার আঙুলে ব্যথা হচ্ছে। আমি আশা করি আপনি আমার জন্য প্রার্থনা করবেন, যেন আমার অপেরা [Mitridate Re di Ponto] ভালোভাবে অনুষ্ঠিত হতে পারে এবং শিগগিরই আমাদের আনন্দদায়ক সাক্ষাৎ হতে পারে। আমি আপনার হাতে হাজারবার চুমু খাই। আমার বোনকে অনেক কিছু বলার আছে; কিন্তু কী? তা শুধু ঈশ্বর ও আমার জানা আছে। ওহ! ঈশ্বর, আমি আশা করি শিগগিরই তা মৌখিকভাবে তার কাছে পৌঁছে দেবেন। এরই মধ্যে আমি তাকে হাজার চুমু পাঠাই। সব দয়ালু বন্ধুর প্রতি আমার অভিনন্দন। আমরা আমাদের ভালো Martherl-কে হারিয়েছি, কিন্তু আশা করি ঈশ্বরের দয়ায় তিনি এখন আশীর্বাদের মধ্যে আছেন।

চিঠি ৪.

মিলান, অক্টোবর ২৭, ১৭৭০ 

আমার সবচেয়ে প্রিয় বোন,

তুমি জানো, আমি বেশি কথা বলি। যখন আমি তোমাকে ছেড়ে চলে এসেছি, তখন আমি বেশি কথা বলার মানুষ ছিলাম। বর্তমানে আমি কথাবার্তা কমিয়ে অনেক কিছুই সাংকেতিকভাবে ব্যক্ত করি। কারণ এই পরিবারের ছেলে বধির এবং বোবা। অবশ্যই আমাকে এখন আমার অপেরায় কাজ করতে হবে। আমি খুবই দুঃখিত যে তুমি যে ধীরগতির নৃত্য চাও, তা আমি পাঠাতে পারছি না। কিন্তু ঈশ্বর সহায় হলে সম্ভবত ইস্টারের সময় তুমি সেটা এবং আমাকে—উভয়ই দেখতে পাবে। আমি আর লিখতে পারছি না। বিদায়! এবং আমার জন্য প্রার্থনা করো।

পর্ব দুই. 

মিউনিখ, অগজবার্গ ও ম্যানহেইম—সেপ্টেম্বর ১৭৭১ থেকে মার্চ ১৭৭৮

চিঠি ৫.

ম্যানহেইম, ডিসেম্বর ১৪, ১৭৭৭

আমি শুধু কয়েকটা কথা লিখতে পারি। বাড়ির এক তরুণীকে আমি সংগীত শিখিয়েছি। তাই বিকাল ৪টা পর্যন্ত বাড়ি ফিরতে পারিনি। এখন প্রায় সাড়ে ৫টা বাজে। চিঠি লেখা বন্ধ করার সময় হয়েছে। আমি মাকে কয়েকদিন আগে লিখতে বলব, যেন আমাদের সব খবর একই তারিখের না হয়। কারণ আমি সহজে সেই কাজ করতে পারি না। লেখার জন্য আমার যে সামান্য সময় আছে, তা অবশ্যই লেখা শেষ করার জন্য ব্যয় করতে হবে। আমার সামনে অনেক কাজ পড়ে আছে। আমি আপনাকে খুব তাড়াতাড়ি প্যারিস ভ্রমণের জবাব দিতে বলছি। আমি হের ওয়েন্ডলিংয়ের কাছে আমার কনসার্টের পিয়ানো বাজিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন সেটা যেন আমি প্যারিসের জন্য তুলে রাখি। তবে আমি যদি ব্যারন বাখের সঙ্গে শো করতে চাই, তাহলে তিনি আনন্দিত হবেন। আদিউ! [নোট: ইতালি ভাষায় বিদায়] 

পর্ব—তিন. 

প্যারিস, মার্চ ১৭৭৮ থেকে জানুয়ারি ১৭৭৯

চিঠি ৬. (নোট: কাজিনকে লেখা চিঠি)

সলজবুর্গ, মে ১০, ১৭৭৯

প্রিয়, সবচেয়ে মিষ্টি, সবচেয়ে সুন্দর, আকর্ষণীয় এবং সব কাজিনদের মধ্যে আকর্ষণীয়া, ভিত্তিহীন একজন অযোগ্য আত্মীয়ের আচরণ! আমাকে তোমার যুক্তিসংগত রাগ নরম ও প্রশমিত করার চেষ্টা করতে দাও। শুধু তোমার সৌন্দর্য চপ্পলের গোড়ালির মতো উঁচু! আমি আশা করি তোমাকে নরম করতে পারব। তোমাকে সন্তুষ্ট করার জন্য প্রকৃতি আমাকে প্রচুর পরিমাণে নমনীয়তার শিক্ষা দিয়েছে। লিপজিগের ব্যাপারে আমি বলতে পারব না যে আদৌ তা ফলপ্রসূ হবে কিনা। যদি তা রিং কয়েনের ব্যাগ হতো, তাহলে ভিন্ন কথা। আমি এর চেয়ে কম কিছু গ্রহণ করতে চাই না। তাই এখানেই সমাপ্তি।

আমার সবচেয়ে মিষ্টি কাজিন, এটাই জীবন! একজনের কাছে একটা পার্স আছে, কিন্তু অন্যজনের কাছে টাকা আছে কিংবা কিছুই নেই বা যৎসামান্য আছে। অন্যদিকে অনেক কিছুই আসলে কিছুই না এবং কিছু থেকে কিছু আসতে পারে না। এভাবে শুরু হয়েছে, এখনো হচ্ছে এবং আগামীতেও হবে। যেহেতু আমি এটাকে খারাপ বা ভালো করতে পারি না, তবে আমি আমার চিঠি শেষ করতে পারি। দেবতারা জানেন আমি আন্তরিক। প্রবস্ট (নোট: জার্মান ভাষায় অলৌকিক উপাধি) কীভাবে তার স্ত্রীর সঙ্গে থাকে? তারা কি সুখে আছে, নাকি ঝগড়াঝাঁটি করে? সবচেয়ে বোকা প্রশ্ন, আমার জীবনে! আদিউ, দেবদূত! আমার বাবা তোমাকে তার চাচার আশীর্বাদ পাঠিয়েছে এবং আমার বোনের কাছ থেকে হাজার হাজার চুমু রইল। এঞ্জেল, আদিউ!

পর্ব চার. মিউনিখ ও আইডোমিনেও: নভেম্বর ১৭৮০ থেকে জানুয়ারি ১৭৮১

চিঠি ৭.

মিউনিখ, জানুয়ারি ১০, ১৭৮০

আমার সবচেয়ে বড় খবর হচ্ছে যে অপেরা এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। গ্র্যান্ড রিহার্সাল ২৭ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে না—পুনশ্চ আমার জন্মদিন এবং ২৯ তারিখ অপেরা। কেন? সম্ভবত কাউন্ট সাউকে ২০০ গুলডেন (নোট: জার্মান ও ডাচ স্বর্ণমুদ্রার ঐতিহাসিক নাম) বাঁচাতে হবে। আমি সত্যিই খুব খুশি। কারণ আমরা এখন ঘন ঘন এবং আরো সাবধানে রিহার্সাল করতে পারব। যখন আমি তাদের এ খবরটা বলেছিলাম, আপনার তখন ‘রবিনিগ’-দের চেহারা দেখা উচিত ছিল। লুইসা ও সিগমুন্ড থাকতে পেরে আনন্দিত। কিন্তু সলজবুর্গের লিজের, সেই যে লুকোচুরি দুর্দশা, জিহ্বা এমন ঘৃণ্য যে আমাকে সত্যিই বিভ্রান্ত করে। তারা হয়তো এখনো আছে। আমি আশা করি লুইসার বেলায়ও তা-ই হবে। কাউন্ট সাউয়ের সঙ্গে অনেক ছোটখাটো ঝগড়া ছাড়াও পিতলের বাঁশি নিয়ে আমার কথা কাটাকাটি হয়েছে। আমি তাই মনে করি। কারণ আমি সরাসরি অভদ্র হতে বাধ্য ছিলাম, অথবা আমার যুক্তি উত্থাপন করা উচিত হয়নি। আগামী শনিবার গোপনে তিনটি কাজ অনুশীলন করা হবে। আমি আপনার অষ্টম চিঠি পেয়েছি এবং খুব আনন্দের সঙ্গে পড়েছি; তবে ব্যঙ্গাত্মক অংশটুকু আমি দারুণ পছন্দ করেছি। এ মুহূর্তে আমার লেখাকে ক্ষমা করে দিন। কেননা প্রথমত, আপনি দেখছেন আমার কলম ও কালি খারাপ এবং দ্বিতীয়ত, আমার শেষ ব্যালে লেখার জন্য এখনো কয়েকটি সুযোগ আছে। আমি আশা করি, শেষ চিঠির মতো মাত্র তিন-চারটি লাইনের চিঠি আর কখনই পাঠাবেন না।

[১০টি কারণ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে: Ten Reasons Why Mozart is the Greatest, Classical Kings FM 98.1, Posted: 14 January 2016] 


তথ্যসূত্র: 

ভূমিকা ও মোৎসার্ট সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে একাধিক সূত্র থেকে এবং নির্বাচিত চিঠিগুলো অনুবাদ করা হয়েছে The Letters of Wolfgang Amadeus Mozart (1769-1791) [Vol. 1, Translated from ‘The Collection Of Ludwig Nohl’ by Ladz Wallace, New York and Philadelphia: 1866, The Project Gutenberg EBook, Released: March 2004 [EBook #5307], Last updated: 24 June 2013] গ্রন্থ থেকে।


ফজল হাসান: লেখক ও অনুবাদক