বৃহস্পতিবার | এপ্রিল ২২, ২০২১ | ৯ বৈশাখ ১৪২৮

সিল্করুট

মোৎসার্ট ও তার অপেরা

মুহিত হাসান

ভলফগাং আমাডিউস মোৎসার্ট সংগীতের আর কোনো শাখার চাইতে অপেরা নির্মাণের ক্ষেত্রেই যে অধিকতর স্বচ্ছন্দ ছিলেন—তা কেবল সংগীত বিশেষজ্ঞদের কথা নয়। স্বয়ং মোৎসার্ট নিজেই তার লেখা একাধিক চিঠিপত্রে এ কথা কবুল করেছেন। ১১ অক্টোবর ১৭৭৭ সংগীত শিক্ষক পিতা লিওপোল্ড মোৎসার্টকে লেখা এক চিঠিতে তিনি জানাচ্ছেন: ‘আরেকটা অপেরা লেখার অদম্য আকাঙ্ক্ষা আমার রয়েছে। ...আমি কি শুধু অপেরা নিয়ে আলোচনা শুনেই যাব, আর কোনো থিয়েটারে গিয়ে বসে অর্কেস্ট্রাকে তাদের বাদ্যযন্ত্র ঝালিয়ে নিতেই শুনব নিছক— ওহ, আমি কী আর তখন আমার নিজের মধ্যে থাকি!’ মোৎসার্ট এই চিঠি যখন লিখছেন, তখন তিনি এরই মধ্যে নয়টি অপেরা এককভাবে কম্পোজ করে ফেলেছিলেন। কিন্তু একটি মনমতো অপেরা-সংগীত নির্মাণের বেলায় তার মন তখনো অতৃপ্ত। উল্লেখ্য, পূর্বোক্ত পত্র-রচনাকালে মোৎসার্টের বয়স পড়েছে ২১-এ। আরো আশ্চর্যের বিষয়, তিনি প্রথমবারের একটি সার্থক অপেরা রচনা করেছিলেন ১৭৬৭ সালে, তখন তার বয়স মাত্র ১১!

‘অ্যাপোলো ও হায়াসিনথ’ নামের ওই অপেরাটি ছিল রোমান কবি ওভিদের ‘মেটামরফোসিস’ কাব্যের ওপর ভিত্তি করে রচিত। এর সংলাপ-অংশ বা ‘লিব্রেটো’ রচিত হয়েছিল লাতিন ভাষায়। অস্ট্রিয়ার সলজবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে লিওপোল্ডের বিশেষ পরিচিতি ছিল, সেখানকার শিক্ষক-ছাত্ররা সেই সূত্রে বালক মোৎসার্টের সাংগীতিক প্রতিভা ও দক্ষতা সম্পর্কেও অবগত ছিলেন। মুখ্যত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুরোধেই মোৎসার্টের ওই অপেরার সংগীতাংশ রচনায় হাত দেয়া। সলজবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ওই বছরেই অপেরাটি মঞ্চস্থ হলেও দুঃখের বিষয় এই যে তা মোৎসার্টের জীবদ্দশায় দ্বিতীয়বার মঞ্চে ওঠার সুযোগ পায়নি। নিতান্ত বালক বয়সেই জীবনের প্রথম অপেরা-সংগীত রচনায় সাফল্য পাওয়ার পর মোৎসার্টের ওপর ভার পড়ে আরেকটি অপেরা রচনার। ১৭৬৮ সালে ভিয়েনার খ্যাতনামা চিকিৎসক ফ্রানজ মেসমারের নির্দেশনা ও পৃষ্ঠপোষকতায় মোৎসার্ট তৈরি করেন ‘বাস্টিয়েন অ্যান্ড বাস্টিয়েন্নি’ নামের একটি লঘু চালের অপেরা। কিন্তু তা আদৌ তখন মঞ্চস্থ হয়েছিল কিনা, তা নিয়ে সঠিক তথ্য মেলে না। তবে যাই হোক, কিশোর মোৎসার্টের অপেরা-সংগীতের নির্মাতা হিসেবে খ্যাতি তখন একটু একটু ছড়িয়ে পড়ছিল ইউরোপজুড়েই। পিতার সঙ্গে মহাদেশের নানা প্রান্তে ভ্রাম্যমাণ জীবন কাটানোটাও এক্ষেত্রে যেন আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার জন্য। এরপর তার ডাক পড়ল তত্কালীন রোমান সাম্রাজ্যের শাসক দ্বিতীয় জোসেফের কাছ থেকে। ‘লা ফিনতা সিমপ্লেস’ বা ‘এক নকল নির্দোষ ব্যক্তি’ শিরোনামে লাতিনে রচিত তিন অংকে বিভক্ত ওই অপেরাটির স্বরলিপি ও নানা খুঁটিনাটি নিয়ে যে পাণ্ডুলিপি মোৎসার্ট তৈরি করেছিলেন, তা আকারে ছিল ৫০০ পৃষ্ঠারও অধিক। কিন্তু রাজানুগ্রহে রচিত হলেও অপেরাটি নিয়ে একটি দুঃখজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়। ভিয়েনার অনেক ঈর্ষাকাতর সংগীতজ্ঞ বলতে থাকেন, অপেরাটি আদতে ১২ বছরের মোৎসার্ট নিজে লেখেনি—লিখেছে তার বাবা, কিন্তু স্রেফ ভবিষ্যতে খেয়েপরে বাঁচার আশায় নিজের ছেলের নামে চালিয়ে দিচ্ছেন। এমনকি অপেরাটির প্রথম মঞ্চায়নের দিন তা পণ্ড করে দেয়ার হুমকিও দেয়া হয়! এহেন কুকথায় প্রচণ্ড আহত হয়ে লিওপোল্ড নিজেই অপেরাটির মঞ্চায়ন বন্ধ করে দেন এবং তা পরে ভিয়েনার কোনো মঞ্চেও আর ওঠেনি। ১৭৬৯ সালে তা প্রথমবারের মতো সলজবুর্গের একটি থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয়। এরপর মোৎসার্ট আরো কয়েকটি অপেরা রচনা করেন। এর মধ্যে মিলানে বসে রচনা করেন তিনটি, মিউনিখে একটি। সলজবুর্গে বসে দুটি এক অংকের অপেরাও তিনি নির্মাণ করেছিলেন।

কিন্তু মনে মনে মোৎসার্ট চাইছিলেন আরো বড় কিছু করতে। অপেরার সংগীত-নির্মাণে এরই মধ্যে তার হাত পাকা, এখন তিনি সীমাবদ্ধ কম্পোজিশনের পথ ছেড়ে দিয়ে অন্তরের নিখাদ শৈল্পিক তাড়নাকে সুর-ধ্বনিতে বিস্তৃত আকারে রূপ দিতে চান। ‘আইডোমিনিউস’ নামের অপেরাটি তার সেই আকাঙ্ক্ষার বাস্তব রূপায়ন হিসেবে হাজির হয়েছিল। নিজের সন্তানকে বলি দিয়েছিলেন যিনি, সেই ট্রয়ের যুদ্ধে গ্রিকপক্ষ অবলম্বনকারী ক্রিটবাসী বীর আইডোমিনিউসের ট্র্যাজিক পুরাণের ওপর নির্ভর করে রচিত অপেরাটি যেন মোৎসার্টের সাংগীতিক জীবনের মোড়ই ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ১৭৭৯ সালে নির্মিত এ অপেরার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এমন এক তীব্র আবেগ-উচ্ছল আবহের নির্মাণ করেছিলেন তিনি, যা কিনা তার অন্য কোনো অপেরাতেও (‘দন জিওভান্নি’ বাদে) দৃষ্ট হয় না। এক্ষেত্রে তাকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন কার্ল থিওদর— জার্মানির বাভারিয়ার তত্কালীন শাসক। একটি রাজকীয় উৎসবে অপেরাটি মঞ্চায়নের জন্য তিনি মোৎসার্টের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। ‘আইডোমিনিউস’ মুখ্যত রচিত হয়েছিল ফরাসি নাট্যকার আন্তোনিও ডানচেটের গ্রিকপুরাণ নির্ভর একটি নাটকের ওপর ভিত্তি করে। ওই বিশেষ কাহিনীটি বেছে নেয়ার নেপথ্যেও মোৎসার্টের সিদ্ধান্ত কাজ করেছিল। অর্থাৎ অপেরার সংগীতাংশে যেমন তিনিই সর্বেসর্বা, তেমনি ‘লিব্রেটো’-র কাহিনী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছেন। মিউনিখে ১৭৮১ সালে প্রথমবার মঞ্চস্থ হওয়ার পরই যেন চারিদিকে মোৎসার্টের নামে জয়জয়কার। তবে মঞ্চায়নের সময় একাধিক গায়ক ও বাদ্যকর এ অপেরার মধ্যেকার পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে সহজভাবে নিতে পারেননি। কেউ কেউ তো শেষমেশ অংশগ্রহণ করতে অস্বীকৃতি বা নিদেনপক্ষে অস্বস্তির কথা জানান। তা সত্ত্বেও মোৎসার্ট তার এই প্রথম বৃহৎ সাংগীতিক পরীক্ষায় ঠিকঠাকভাবেই উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।

‘দন জিওভান্নি’ রচনার মাধ্যমে মোৎসার্ট অপেরা রচনার ক্ষেত্রে নিজের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপটি নেন। ‘আইডোমিনিউস’ রচনার পর তিনি আরো অন্তত তিনটি বৃহৎ অপেরা (জার্মানে ‘সেরাগ্লিও থেকে অপহরণ’ আর ‘ইম্প্রেসারিও’ বা ‘জলসা পরিচালক’ ও ইতালীয়তে ‘ফিরাগোর বিবাহ’। এছাড়া ‘বিভ্রান্ত বর’ এবং ‘কায়রোর রাজহাঁস’ নামে দুটি অসম্পূর্ণ অপেরাও ইতালীয়তে লেখা হয়েছিল) রচনা করেছেন। তা সত্ত্বেও আরো বড় কোনো বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য তার মন যেন উতলা হচ্ছিল। ১৭৮৭ সালে প্রাগে অপেরা মঞ্চায়ন করে মোৎসার্ট সবাইকে মুগ্ধ করেছিলেন। সম্ভবত প্রাগ শহর থেকেই স্পেনীয় কিংবদন্তি প্রেমিক পুরুষ ডন জুয়ানের আখ্যান নিয়ে একটি অপেরা নির্মাণের প্রস্তাব আসে। প্রাগে এ বিষয় নিয়ে একাধিক অপেরা তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিল এর আগেই। সম্ভবত ওই পরম্পরা থেকে আসা প্রস্তাব মারফতই ‘দন জিওভান্নি’ রচনার প্রেরণা পান মোৎসার্ট। এক্ষেত্রে তার জন্য সহায় হয়ে এল ডন জুয়ানের কাহিনী নিয়ে ষোড়শ শতকের স্পেনের নাট্যকার তিরসো দে মলিনা রচিত একটি নাটক। এর ওপর ভিত্তি করে তিনি অপেরার সংগীত বোনা শুরু করলেন। অপেরার কাঠামো ও সহায়সূত্র হিসেবে ওই নাটকটি বেছে নেয়া হয়েছিল মোৎসার্টের সিদ্ধান্তেই। কারণ তিনি মনে করতেন, ইউরোপীয় ঐতিহ্যে অপেরা নির্মাণের ক্ষেত্রে ক্ল্যাসিক্যাল বা কিংবদন্তি আখ্যানের এ ধরনের ‘আধুনিক’ এডাপটেশনের সাহায্য নেয়ার বিকল্প নেই। কারণ এগুলো সবই চিরায়ত এবং একই সঙ্গে তরতাজা সাম্প্রতিক। এমন সমন্বয় অন্য কোনো টেক্সটে লভ্য নয়। ২৯ অক্টোবর ১৭৮৭ সালে প্রাগে প্রথমবার মঞ্চায়িত হলো ‘দন জিওভান্নি’। সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে অবিলম্বে এমন কথাও শোনা গেল, ‘এ হলো সব অপেরার সেরা অপেরা’। এমন প্রশংসা বাণীর পরও ভিয়েনায় অপেরাটি মঞ্চায়নের সময় মোৎসার্ট কম্পোজিশনে অনেক সূক্ষ্ম মেরামতির পথে গেলেন। এ তো শিল্পীর নিজেকে নিখুঁত করে তোলার অন্তহীন চিরন্তন তৃষ্ণা।

মোৎসার্টের ‘সোয়ান সং’ বলা যায় তার রচিত শেষ অপেরা ‘দ্য ম্যাজিক ফ্লুট’-কে। ‘দন জিওভান্নি’র পর তিনি ইতালীয়তে আরো দুটি অপেরা— ‘সব নারীরাই তাই করে’ ও ‘টাইটাসের পবিত্রতা’ রচনা করেছেন। কিন্তু সেগুলো যেন মোৎসার্ট-সুলভ উচ্চতা ছুঁতে পারছিল না। ‘আইডোমিনিউস’ ও ‘দন জিওভান্নি’র পর তিনি নিজের সাংগীতিক প্রতিভা-পাণ্ডিত্যের সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটালেন এই ‘দ্য ম্যাজিক ফ্লুট’-এ। উল্লেখযোগ্যভাবে, ‘দ্য ম্যাজিক ফ্লুট’-এর কাহিনীটি কোনো পূর্বতন নাট্যকার বা কবির রচনা থেকে নেয়া নয়। রূপকথার আঙ্গিকে লেখা এ কাহিনীতে তামিনো নামের এক রাজপুরুষ কী করে সারাস্ত্রো নামের এক খল স্বভাবের ও অন্ধকারের দেবীর আশীর্বাদপুষ্ট যাজকের কাছ থেকে নিজের কন্যা পামিনাকে বাঁচায় সেই ঘটনাবলি মূলত বিবৃত। ভিয়েনায় তা প্রথমবারের মতো মঞ্চায়িত হলো ৩০ সেপ্টেম্বর ১৭৯১। এর দুই মাস পর, ৫ ডিসেম্বর মৃত্যু হলো মোৎসার্টের। তার শেষ সৃষ্টি ‘দ্য ম্যাজিক ফ্লুট’ কতটা জনপ্রিয় হয়েছিল, এক কথায় তার খতিয়ান দেয়া মুশকিল। শুধু বিকল্প হিসেবে একটা ছোট্ট তথ্য দেয়া যাক। প্রথমবার মঞ্চায়নের এক বছরের মাথায় ১৭৯২-এর নভেম্বরে এর শততম প্রদর্শনীটি অনুষ্ঠিত হয়।


মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক