বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২৬, ২০২০ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

বিশেষ সংখ্যা

প্রবৃদ্ধির গতিশীলতার তথ্যানুসন্ধান

ড. এমএ মোমেন

পাটের দাম পড়ে যাওয়ার পর অর্থনীতি বিশ্লেষক শ্রীরমণীরঞ্জন গুহ রায় ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ সংখ্যা (৯০ বছর আগে) ‘আর্থিক উন্নতি’ মাসিক পত্রে লিখলেন: “বাঙ্গালার কৃষককুল—যাহাদের অসীম ধৈর্য্যের ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে এই বিপুল পণ্যসম্ভার উৎপন্ন হইয়া দেশের আপামর সাধারণকে অর্থশালী করিতেছে—তাহাদের (১) বাসগৃহ-ভগ্ন কুটির (২) পরিধানে ছিন্ন মলিন বস্ত্র খণ্ড (৩) ক্ষুধার তাড়নায় দেহ শীর্ণ। ভূমিলক্ষ্মীর এই চির লাঞ্ছিত সন্ততিগণকে উপদেশ দেওয়া বিড়ম্বনা মাত্র। যে পাটের কাঁচা টাকার জন্য তাহারা বাসগৃহের একাংশ পর্যন্ত পাট বপনে নিয়োজিত করিয়াছে, সেই পাটই ইহাদের কাল হইয়াছে। যতদিন পর্যন্ত বাঙ্গালার বোকা চাষী এই পাটের নেশা কাটাইতে না পারিবে, ততদিন পর্যন্ত তাহাদের মাথার উপর হইতে দারিদ্র্যের বোঝা কেহ অপসারণ করিতে পারিবে না—তাহাদের এই ভীষণ ব্যাধির নিরাময় ‘শিবেরও অসাধ্য’।”

রমণীরঞ্জন বুঝেছিলেন যে গ্রামের মানুষকে পাটের নেশা থেকে মুক্ত করতে হবে। তিনি মোটেও ভুল করেননি। কারণ তিনি পাট উৎপাদনকারীর ব্যয় ও আয়ের সমীকরণটি বুঝতে এবং পাটের দাম উঠলেও যে চাষীর আয়ের সাথে এমন আহামরি কিছু যোগ হতো না তিনি তাও বুঝতেন। তার পরও অন্তত ষাট-সত্তর বছর চাষীদের দিয়ে এ ঘানিটিই টানানো হয়েছে। সোনার খনি সোনালি আঁশ এসব বিভ্রান্তিকর শব্দ প্রক্ষেপণ করা হয়েছে—অমাত্যবর্গের কেউ কেউ এখনো ভাড়াটে হাততালিওয়ালা পরিবেষ্টিত হয়ে বলে বেড়ান পাটের স্বর্ণযুগ আবার ফিরে আসছে। জলদাস সাহিত্য সেবকদের মতো স্বল্প শিক্ষিত জলদাস অর্থনীতিবিদও স্বর্ণযুগকে যৌক্তিকীকরণ করে দিচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে পাটের পেছনে লেগে থাকা এই কৃষক ও কৃষি শ্রমিককে পাটের মোহ থেকে ছাড়িয়ে আনা হতো গ্রামীণ অর্থনীতিতে যে উন্নতি নব্বইয়ের দশকে এসে দৃষ্ট হয়েছে, তা সত্তরের দশকেই হতো। প্রবৃদ্ধির এখনকার গতিশীলতা অর্জিত হতো আরো আগেই। সমাজতান্ত্রিক অবকাঠামো ও চারিত্র্যের কথা না ভেবে কেবল সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির দোহাই যারা দিয়েছেন, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ তাদের হাতেই ব্যাহত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ তার ‘রায়তের কথা’য় যা বলেছেন, নিবন্ধের শুরুতে খানিকটা উদ্ধৃত করা অসংগত হবে না:

‘‘মূল কথাটা এই—রায়তের বুদ্ধি নেই বিদ্যে নেই, শক্তি নেই, আর ধনস্থানে শনি। তারা কোনোমতে নিজেকে রক্ষা করতে জানে না। তাদের মধ্যে যারা জানে, তাদের মতো ভয়ংকর জীব আর কেউ নেই। রায়ত-খাতক রায়তের ক্ষুধা যে কত সর্বনেশে তার পরিচয় আমার জানা আছে। তারা যে প্রণালির ভেতর দিয়ে স্ফীত হতে হতে জমিদার হয়ে ওঠে, তার মধ্যে শয়তানদের সকল শ্রেণীর অনুচরেরই জটলা দেখতে পারে..... অতএব, রায়ত বুদ্ধি ও অর্থের তহবিলে সম্পন্ন না হয়ে ওঠে, ততদিন ‘উচল’ আইনও তার পক্ষে ‘অগাধ জলে’ পড়বার উপায় হবে।’’

কেবল কৃষিনির্ভরতা যে গ্রামীণ অর্থনৈতিক মুক্তি এনে দেবে না রবীন্দ্রনাথ তা বেশ ভালো বুঝেছিলেন বলেই ১৯০৮ সালে ‘পল্লী-সমাজ’ গঠনের যে উদ্দেশ্য প্রণয়ন করলেন, তাতে কৃষির আগে অকৃষিজাত পণ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্য স্থির করলেন:

স্বদেশ-শিল্পজাত দ্রব্য প্রচলন এবং তাহা সুলভ ও সহজপ্রাপ্য করিবার জন্য ব্যবস্থা এবং সাধারণ ও স্থানীয় শিল্প উন্নতির চেষ্টা করা।

গৃহস্থ স্ত্রীলোকেরা যাহাতে আপন আপন সংসারের আয় বৃদ্ধি করিতে পারেন এবং অসহায় হইলে সংসারের ভার গ্রহণ করিতে পারেন তদনুরূপ শিক্ষা দেওয়া ও তদুপযোগী উপকরণ সংগ্রহ করা।

কৃষি যথেষ্ট নয়, রবীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালে তার প্রজাদের জন্যই তাঁতকল বসিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বুঝে থাকলেও ‘সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা’ চিত্রকল্পটি বাঁচিয়ে রাখতে আমরা ইউরোপের দিকে তাকাইনি। সেখানকার গ্রাম যে কম সবুজ নয়, কম সমৃদ্ধ নয় তা তো তিনি নিজেই দেখে এসেছেন। তিনি সে ধরনের পল্লী সমাজের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ২০১৭ সালে বিশ্বব্যাংক প্রকাশ করেছে ‘ডিনামিকস অব রুরাল গ্রোথ ইন বাংলাদেশ’। এতে বিমর্ষতাবাদীদের জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা প্রদান করা হয়েছে—বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি এখন আর গত শতকের ষাট বা সত্তর কিংবা আশির দশকের অর্থনীতি নয়; এখন তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্স। ২০০০ সালের পর গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যে লক্ষণীয় পরিবর্তন ঘটেছে তার সাক্ষ্য দারিদ্র্য হ্রাস। কিন্তু সাফাল্যের এ অভূতপূর্ব গতিশীলতার যে প্রশংসা প্রাপ্য ছিল তা প্রদান করা হয়নি। এখনো তা অনেকাংশে অনাবিষ্কৃতও অদলিলীকৃত রয়ে গেছে।

গ্রামীণ প্রবৃদ্ধির গতিশীলতাকে কেবল অর্থনৈতিক সূচকে মাপলে তা খণ্ড চিত্র প্রদান করবে, একই সঙ্গে সামাজিক ও সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্রেও লক্ষণীয় পরিবর্তন ঘটেছে। একই সঙ্গে নতুন চ্যালেঞ্জ ও নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে, গ্রোথ সেন্টারের সাথে গ্রামের অধিকতর যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে; গতিশীল বাজার, বর্ধিত যোগাযোগ এবং গ্রাম শহর মিথস্ক্রিয়া ভিন্নমাত্রা লাভ করেছে।

গ্রামীণ প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির পেছনে যে বিষয়গুলোকে প্রতিবেদন চিহ্নিত করেছে তা সংক্ষেপে তুলে ধরা হচ্ছে:

১। পরিবেশগত বিপদাপন্নতা ও আঘাত মোকাবেলা করেও কৃষি খাত সাফল্য দেখাতে পেরেছে। গত দুই দশক ঊর্ধ্বমুখী প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি ৫-এ পৌঁছেছে। টিএফপি (টোটাল ফ্যাক্টর প্রডাক্টিভিটি) ২ দশমিক ৭ প্রতিবেশী সব দেশের চেয়ে বেশি, চীনের সাথে তুলনীয়।

২. কোনো কোনো সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি প্রতিকূলে থাকার পরও এ খাতের অগ্রগতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

৩. উৎপাদন পরিসংখ্যান সাক্ষ্য দেয় যে প্রবৃদ্ধি দরিদ্রবান্ধব; অকৃষি খাত কৃষি খাতের সাফল্য ও ব্যর্থতার সাথে সংশ্লিষ্ট; দৃঢ় সমুখগামী ও পশ্চাত্গামী যোগসূত্রের কারণে কৃষি খাতের ১০ ভাগ আয় বৃদ্ধি অকৃষি খাতে ৬ ভাগ আয় বৃদ্ধির প্রণোদনা জুগিয়েছে।

৪. দারিদ্র্যমুক্তির সরলরৈখিক বা পূর্বনির্ধারিত কোনো পথ নেই। দারিদ্র্য ও দারিদ্র্য থেকে উত্তোলনের গতিশলীতা জটিল। একক কোনো খাত দিয়ে বিচার করার সুযোগ নেই। অকৃষি খাতের আয় যাদের প্রধান ভরসা, তাদের বেলায় কৃষি খাত কাজ করেছে নিরাপত্তা জাল হিসেবে। অন্তত ৮৭ ভাগ গ্রামীণ খানার কমবেশি কৃষিজ উৎপাদনের সমর্থন রয়েছে। অকৃষির আয়নির্ভর হয়ে যারা দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে তাদের এক পা কৃষিতে প্রোথিত।

৫. অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও দারিদ্র্য থেকে যারা বেরিয়ে এসেছে তাদের বেলায় এর ভূমিকা অতি সামান্য। তারা নির্ভর করেছে কৃষি ও অকৃষি খাতের আয়ের ওপর। আশির দশক থেকে হয়ে আসা নীতিমালা সংস্কার অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাজারের সাথে দ্রুততর যোগাযোগ সর্বোপরি উৎপাদনশীলতার লক্ষণীয় উন্নয়ন এতে বিশেষ অবদান রেখেছে।

৬. গ্রামীণ অকৃষি আয় খাত দ্রুত বর্ধিত হচ্ছে। ২০১০-এর লেবার ফোর্স সার্ভে অনুযায়ী গ্রামীণ অকৃষি খাতের আকার শহুরে সব খাতের সমষ্টির চেয়েও ৫০ ভাগ বেশি। এ খাতের আকার ও বৈচিত্র্য বিস্তারের সুযোগ অনেক বেশি। আরেকটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে কৃষি খাত আনুভূমিক সম্প্রসারণের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত, অন্যদিকে উৎপাদনশীলতাও প্রায় শীর্ষে পৌঁছে গেছে, সেক্ষেত্রে পরবর্তী প্রধান ভরসা অকৃষি খাত।

৭. অকৃষি অর্থনীতির বিকাশে বাজার সৃষ্টির জন্য মেগাসিটি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সেকেন্ডারি সিটির দিকে মনোযোগ দেয়া জরুরি, অকৃষি উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের ভোক্তা এই শহরগুলোতে বাস করে। অকৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটি বড় দুর্বলতা প্রযুক্তিনির্ভরতা কম হওয়ায় তা পরিশীলিত হয়ে ওঠেনি। মূল্য সংযোজনের প্রশ্নে অকৃষি উৎপাদন পিছিয়ে আছে। ঋণের অপ্রতুলতা অবকাঠামো (পানি ও বিদ্যুৎ ঘাটতি বাধা হয়ে আছে) পরিবহন খরচ অনেক বেশি পড়ে যায়।

গ্রামীণ বাজার নিয়ন্ত্রিত না হওয়ায় অর্থাৎ মুক্ত হওয়ার কারণে এর সুফল উৎপাদন ও ভোক্তা উভয়েই পাচ্ছে। উৎপাদন ও জোগান দক্ষতার পরবর্তী পর্যায়ে পৌঁছাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও অর্থ জোগানের সহজ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা জরুরি। উৎপাদনের যে ধারা বর্তমান তাতে চালের সরবরাহ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার কারণ নেই, কিন্তু অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী নিয়ে দুর্ভাবনার কারণ রয়েছে। পুষ্টিহীনতা এখনো অনেক বেশি। কাজেই পুষ্টিগুণসম্পন্ন খবার সরবরাহের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বর্তমানে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে একটি সুবিধাজনক অবস্থানে আছে, একক খাতভিত্তিক কর্মকৌশল ক্ষতিকর হতে পারে, কাজেই কৃষি ও কৃষিপণ্যের মধ্যে ভারসাম্য করে এগোলে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সহজ হবে না।

২০০০-১০—এই ১০ বছরের গ্রামীণ কৃষি ও অকৃষি খাতের আয় ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ক্রমবর্ধমান অকৃষি খাতের একটি চিত্র তুলে ধরে। এ সময়ে কৃষি খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে ২১ দশমিক ৬ ভাগ আর গ্রামীণ অকৃষি খাতে তা বেড়েছে ৬৩ দশমিক ১ ভাগ। আর আয়ের হিসাবে কৃষি খাতে আয় বৃদ্ধি ঘটেছে ৪৮ দশমিক ৯৬ ভাগ আর অকৃষি খাতে ৬১ দশমিক ৭৫ ভাগ।

হিসাবটি পরিবারপ্রতি গড়। দেখা যাচ্ছে পরিবারের আকার কমে আসছে। পরিবারের আকার কমায় উপার্জনকারীও কমে আসছে। কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা পরিবারপ্রতি কমেছে ০.২৬ জন আর অকৃষি শ্রমিক বেড়েছে ০.২১ জন। ১৩ বছরে নারী কর্মীর সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। অকৃষি কর্মসংস্থান ও নারী কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি লক্ষণীয় নারী কর্মীর বৃহদংশই অকৃষিকাজে যুক্ত থাকবে।

কৃষি খামারের সাথে সম্পৃক্ত অকৃষিকাজ ১৯৯৮-৯৯ সালের ২৬ দশমিক ৫ থেকে ২০১০-১১ সালে ১৪ দশমিক ৮-এ নেমে এসেছে। সহজভাবে বলা যায় কৃষিনির্ভরতা কমেছে। কৃষি খামারের থেকে বিযুক্ত অকৃষিকাজে থাকা সময়ে ২০ দশমিক ২ থেকে বেড়ে ২৭ দশমিক শূন্যতে উত্তীর্ণ হয়েছে। কিন্তু একই সাথে অকৃষিকাজ থেকে বিযুক্ত বাড়ির সংখ্যাও ৫৩ দশমিক ২ থেকে ৫৮ দশমিক ২-এ পৌঁছেছে। 

গ্রামীণ উদ্বৃত্ত শ্রমশক্তি অনুষ্ঠানিকভাবে অকৃষি খাতে আত্তীকৃত হওয়ার আগে গ্রমাীণ অকৃষি খাত উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান জোগানোর প্রধান চিত্র।

বিআইডিএস-ইরির নমুনা খানা জরিপ থেকে উদ্ধৃত করে মাহবুব হোসেন দেখিয়েছেন, গ্রামীণ পরিবারের ১৯৮৭ সালে কৃষি থেকে সার্বিক আয় ছিল ৫৪৩ মার্কিন ডলার। ২০০০ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬৫ ডলার। অন্যদিকে একই সময়ে অকৃষি আয় ৩৮৮ থেকে ৬৬৭ ডলারে উন্নীত হয়েছে। কৃষি আয় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ৩, অকৃষি আয়ে ৪ দশমিক ২। নতুন সহস্রাব্দেও এ ধারাটি অব্যাহত রয়েছে। 

কৃষি-অকৃষি যোগসূত্রগুলো দেখতে ২০০০-০১ সালের জরিপে কয়েকটি শ্রেণীকরণ করা হয়েছিল:

কৃষি উপাদান: সেচ পাম্প, সার, খুচরা যন্ত্রাংশ, পাওয়ার টিলার, সাধারণ কৃষি খামার, হাতিয়ার, মাড়াইকল ও কীটনাশক।

কৃষি উৎপাদন: ধান ও পাটের দোকান, শাকসবজির ব্যবসা, ফল, পান-সুপারির দোকান, ধান, চাল ও গমের কল, তেল, তেলবীজের দোকান, মসলাপাতির দোকান।

পশুনির্ভর: দুধ ব্যবসা, কসাইয়ের দোকান, গরু-ছাগলের ব্যবসা, মুরগি ও ডিম, দই ও মিষ্টির দোকান (পরে পশুখাদ্য ও পশুস্বাস্থ্যের মতো বিষয় যোগ হওয়ার কথা)।

মৎস্যনির্ভর: মাছের ব্যবসা, পোনার ব্যবসা, মাছ প্রসেসিং, মাছের খাবার ইত্যাদির ব্যবসা; জাল তৈরি ও বিক্রয়।

বননির্ভর: কাঠ ও লাকড়ির ব্যবসা, বাঁশ ও হোগলার ব্যবসা, বনভূমিতে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ব্যবসা।

কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ: গুড়, চিনি, তেলকল, চিঁড়া-মুড়ি, আটার কল, করাতকল, মসলার কল, শুঁটকি, কুটির শিল্প, লবণ, আসবাব নির্মাণ।

নির্মাণসামগ্রী: হার্ডওয়্যারের দোকান, সিমেন্ট, রড, লেদ মেশিন, ইট-পাথর ও বালির ব্যবসা, বাঁশের খুঁটি, বেড়া, সেতু ও রাস্তা নির্মাণ, টিন, রড ইত্যাদির দোকান।

পরিবহন: গাড়ি, ফেরিঘাট, ফেরি, ট্রলার, রিকশা, যান ও অন্যান্য পরিবহন ব্যবসা।

খাদ্য: টি স্টল, ভ্রাম্যমাণ চায়ের দোকান, রেস্তোরাঁ।

অন্যান্য: কাপড়, তৈরি পোশাক দর্জিখানা, গার্হস্থ্য দ্রব্যাদির দোকান, ফোন ও ফ্যাক্স (এখন ফ্যাক্সের ব্যবহার কমে এসেছে), কম্পিউটার, ইলেকট্রনিকস ইত্যাদি। জীবনের তালিকাটি আরো বড় হতে পারত। গত ২০ বছরে নাগরিক জীবনের উপাদান প্রায় সবই কমবেশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঢুকে গেছে। গ্রামীণ বাজারের লক্ষণীয় বিস্তার ঘটেছে।

গ্রামীণ খাদ্যনিরাপত্তার জন্য কৃষির বিকল্প নেই, কিন্তু সমৃদ্ধির জন্য কেবল কৃষিনির্ভরতা পৃথিবীর কোনো দেশেই লক্ষণীয় সাফল্য এনে দেয়নি। ইতালি দ্রুত শিল্পায়নের দিকে যেতে পেরেছিল বলেই বহুমূল্য খামার ও খামারের সামগ্রী ফেলে কৃষি শ্রমিকরা কলকারখানার দিকে ছুটেছেন। শিল্প শ্রমিকের মজুরি কৃষি শ্রমিকের কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় তারা ভালোভাবেই পুষিয়ে নিতে পেরেছেন। বাংলাদেশের বৃহদংশ এখনো গ্রামীণ। রাষ্ট্রীয় ছত্রছায়ায় থেকেই বছরের পর বছর ধরে এখানে লুটেরা একটি ধনী সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়েছে এবং এ ধারাটি অব্যাহত আছে। রাজনীতির নিয়ন্ত্রণও তারা নিয়ে নিচ্ছে। বৃহৎ শিল্প সৃষ্টির সম্ভাবনা কমে আসছে।

এক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে দেশীয় ভোক্তা বাজারের দিকে লক্ষ রেখেই অকৃষি উৎপাদনে মনোনিবেশ অধিকতর লাভজনক প্রমাণিত হয়েছে। সাব-সাহারান আফ্রিকান দেশগুলো গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য ‘রুরাল-আরবান লিংকেজ’-এর ওপর বেশি জোর দিচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক একটি দৃশ্যপট সৃষ্টি করেছে। প্রতিবেদনে ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কৃষি ও অকৃষি উভয় ক্ষেত্রে বহুমুখীকরণ, দক্ষ ভ্যালু চেইন সৃষ্টি এবং সংযোগ স্থাপনে নিরবচ্ছিন্ন বিনিয়োগের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

ডেভিড ক্যাম্পবেল ও অন্যান্যের লিখিত ‘দ্য নিউ রুরাল ইকোনমি: চেঞ্জ, ডিনামিজম অ্যান্ড গভর্নমেন্ট পলিসি’ দেখিয়েছে নতুন সহস্রাব্দে এসে আমেরিকান গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতায় মন্দা এসে সৃষ্টিশীল ও জাদুকরী কিছু করতে না পারলে এ পরিস্থিতির সহসা উত্তরণের কোনো সম্ভাবনা নেই।

আশার কথা চাঁদাবাজি, প্রশাসনিক সমর্থনের অভাব, অনুপার্জিত অর্থের দিকে ঝোঁক প্রভৃতি বাধা ডিঙিয়ে বিশেষ করে গ্রামীণ অকৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির ত্বরণ এখনো অব্যাহত আছে।

ড. এমএ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা