বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২৬, ২০২০ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

বিশেষ সংখ্যা

রেমিট্যান্স ও আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি

ড. সায়মা হক বিদিশা

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আমাদের প্রবৃদ্ধির অন্যতম নিয়ামক হিসেবে প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থকে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। দেশীয় শ্রমবাজারে শ্রমশক্তির চাহিদা ও জোগানের সমন্বয়হীনতার কারণে প্রবাসের শ্রমবাজার আমাদের শ্রমশক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রস্থল হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। তবে শুধু প্রবাসী শ্রমিকরাই নয়, অভ্যন্তরীণ শহরবাসী আভিবাসীদের আয়ও গ্রামীণ অর্থনীতির চাকাকে সচল করতে সাহায্য করে আসছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে একদিকে যেমন প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স সামষ্টিক অর্থনীতির ভিতকে শক্তিশালী করছে, তেমনি অভ্যন্তরীণ ও প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্যনিরাপত্তা, শিশুর পুষ্টি ও শিক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে কভিড-১৯-এর অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবেলার ক্ষেত্রেও রেমিট্যান্সের অবদান রয়েছে। 

সামষ্টিক অর্থনীতির সাপেক্ষে রেমিট্যান্সের অবদান জাতীয় আয়ের ৬ শতাংশেরও বেশি (২০২০ সালের সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ছিল ২১৫১.০৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)। গত কয়েক দশকে বৈদেশিক রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা যায়। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ ২৩.৭১ মিলিয়ন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে প্রবাসী আয় ২০০০-এ ১৯৫৪.৯৫ ডলারে উন্নীত হয়, যা সাম্প্রতিক সময়ে (২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ী) ১৮৩৫৪.৯৪ ডলারে পৌঁছেছে। শুরু থেকেই সৌদি আরব প্রবাসীদের অন্যতম প্রধান গন্তব্যস্থল হলেও সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ওমান, কাতার ও আরব আমিরাত রেমিট্যান্সের গুরুত্বপূর্ণ উত্সস্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে শুধু প্রবাসীদের পাঠানো অর্থই নয়, গত কয়েক দশকে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ার ফলে ও শহরাঞ্চলে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ার কারণে গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসনও বেড়েছে কয়েক গুণ হারে। শহরাঞ্চলের এ অভিবাসীদের পাঠানো অর্থ নিঃসন্দেহে গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তবে সংখ্যার হিসাবে প্রবাসী অভিবাসীদের তুলনায় অভ্যন্তরীণ অভিবাসীদের সংখ্যা বেশ কম। ২০১৬ সালের খানা জরিপের তথ্য অনুযায়ী ২.৯৫ শতাংশ খানায় অভ্যন্তরীণ অভিবাসী রয়েছে, যেখানে ৮.২৭ শতাংশ খানার অন্তত একজন সদস্য প্রবাসী অভিবাসী। স্বাভাবিকভাবেই শহরের তুলনায় গ্রামে উভয় প্রকার অভিবাসনের হারই বেশি যথাক্রমে ৩.৫৯ ও ৯.৩৯ শতাংশ (বিবিএস, ২০১৯)। প্রবাসীদের (গ্রামে) পাঠানো রেমিট্যান্সের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ৬৮.৪৪ শতাংশ অর্থই ব্যয় হয়ে থাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার ক্ষেত্রে। এছাড়া ২৭.৯৮ শতাংশ রেমিট্যান্স ব্যবহার হয় বিভিন্ন বিনিয়োগে, ২.১৩ শতাংশ বিভিন্ন টেকসই দ্রব্যের বিনিয়োগে এবং বাকি অংশ সঞ্চয়ে (বিবিএস, ২০১৯)। তুলনামূলকভাবে দেখা গেছে, অভিবাসী আছে গ্রামের এমন খানাগুলোতে দারিদ্র্য হার কম এবং খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত খরচের পরিমাণ বেশি। যেসব খানায় অভিবাসী নেই সেসব খানায় মাসিক ভোগ ব্যয় গড়ে ৩২০৯ টাকা (খাদ্য ব্যয় ১৬৮০ টাকা) অন্যপক্ষে যেসব খানায় অভ্যন্তরীণ অভিবাসী রয়েছে তাদের মাসিক ভোগ ব্যয় ৩৯৮১ টাকা (খাদ্য ব্যয় ১৮৩৩ টাকা) এবং যেসব খানায় প্রবাসী অভিবাসী রয়েছে তাদের মাসিক ভোগ ব্যয় ৫৪০৩ টাকা (খাদ্য ব্যয় ২৩৪৫ টাকা)। তাই দারিদ্র্য বিমোচন ও খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনের ক্ষেত্রে অভিবাসীদের পাঠানো অর্থের ভূমিকা অপরিসীম। অভিবাসীদের পাঠানো অর্থ শুধু তাদের নিজস্ব খানার আর্থসামাজিক অবস্থানের উন্নয়ন ছাড়াও গুণিতক প্রভাবের (মাল্টিপ্লায়ার এফেক্ট) কারণে সার্বিকভাবে সমগ্র গ্রামীণ অর্থনীতিতে সঞ্চালিত হচ্ছে ও গ্রামীণ অর্থনীতির চাকাকে বেগবান করতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়াও শিক্ষা কিংবা স্বাস্থ্যে অভিবাসী পরিবারগুলো অধিক বিনিয়োগ করে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা, দক্ষতা ও সর্বোপরি মানবসম্পদ উন্নয়নে রেমিট্যান্সের ভূমিকা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, ২০১৬-এর খানা জরিপের তথ্য অনুযায়ী যেখানে অভিবাসী খানায় শিক্ষাক্ষেত্রে বার্ষিক গড় ব্যয় ২৫,৭৯৭ টাকা। এ সংখ্যা অন্যান্য খানায় (যেখানে কোনো অভিবাসী সদস্য নেই) ১৬,২২২ টাকা মাত্র।

কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতির ক্ষেত্রে শ্রমশক্তি তুলনামূলকভাবে স্বল্প আয় ও স্বল্প উৎপাদক কৃষিতে নিয়োজিত থাকায় গত কয়েক দশকের কাঠামোগত রূপান্তরের সুফল সেভাবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হয়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের গ্রামের আর্থিক অবকাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। আশির দশকের মাঝামাঝি গ্রামের দারিদ্র্যের হার যেখানে ছিল ৫৩.৮ শতাংশ, তা নব্বইয়ের দশকে কিছুটা বাড়লেও (১৯৯৫/৯৬-তে গ্রামীণ দারিদ্র্যের হার ছিল ৫৬.৭ শতাংশ) ২০০০ সালে এ হার কমে দাঁড়ায় ৫৩.১ শতাংশে, যা বর্তমানে নেমে এসেছে ২৬.৪ শতাংশে। সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন আঙ্গিকে সহায়তা ও ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচির সফলতা ছাড়াও এ সাফল্যের ক্ষেত্রে রেমিট্যান্সের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়েও দৃশ্যমান। গ্রামীণ দারিদ্র্যের ক্ষেত্রে রেমিট্যান্স প্রাপ্ত খানার ক্ষেত্রে যেখানে অতিদরিদ্রের হার ৫.১৬ শতাংশ, অন্যান্য খানায় সে হার প্রায় তিন গুণ বেশি (১৫.৯৬ শতাংশ)। এছাড়া কভিড-১৯-এর অভিঘাত থেকে অর্থনীতিকে রক্ষা করতে বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতেও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বিশেষভাবে কাজ করছে। মার্চ-এপ্রিল ২০২০ সময়ে রেমিট্যান্সের প্রবাহে নেতিবাচক গতি থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে আমরা রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্সের প্রবাহ দেখছি, যা কভিড-১৯-এর কারণে অভ্যন্তরীণ রেমিট্যান্সের নেতিবাচক প্রবাহ সত্ত্বেও গ্রামীণ অর্থনীতিকে কিছুটা হলেও সচল রাখতে সহায়তা করেছে। তবে জ্বালানি তেলের দরপতন ও বৈশ্বিক মন্দার কারণে রেমিট্যান্সের প্রবাহের ক্ষেত্রে এক ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে কয়েকটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ও প্রবাসীরা অপেক্ষাকৃত কম দক্ষতাসম্পন্ন হওয়ার কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহে অনিশ্চয়তা সবসময়ই রয়ে গেছে। এক্ষেত্রে রেমিট্যান্সের নতুন নতুন উত্স খুঁজে বের করার পাশাপাশি বিদেশে গমনেচ্ছুদের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। অবৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ করবার জন্যও পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। অভ্যন্তরীণ অভিবাসীদের অনেকেই শহরে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত থাকার কারণে যেকোনো অর্থনৈতিক ঝুঁকি (যেমন কভিড-১৯) তাদের আয়ের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। শহরাঞ্চলে প্রাতিষ্ঠানিক ও চুক্তিভিত্তিক কাজের পরিসর বৃদ্ধির মাধ্যমে এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবেলা করা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ব্যাপক পরিবর্তনের আশা করা যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শহরাঞ্চলের দারিদ্র্য ও বৈষম্যের বিবেচনায় মেগা শহরগুলোর পাশাপাশি বিকেন্দ্রীকায়নের মাধ্যমে জেলা ও মহকুমা শহরগুলোর অবকাঠামোকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন এবং এর মাধ্যমে অঞ্চলভিত্তিক কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

ড. সায়মা হক বিদিশা: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়