বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২৬, ২০২০ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

বিশেষ সংখ্যা

হারিয়ে যাওয়া মৃৎশিল্পে আধুনিকতার ছোঁয়া

সাইদ শাহীন

মৃৎশিল্পের কদরটি দেখেছি ২০১৯ সালের জাতিসংঘের একটি অধিবেশনে গিয়ে। জতিসংঘে বিভিন্ন দেশের স্মারক কিংবা বিশেষ নিদর্শন শোভা পায়। সেখানে বাংলাদেশের অন্যতম দুটি নির্দশন রয়েছে। এর মধ্যে একটি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের রেপ্লিকা এবং একটি টেরাকোটা। ময়নামতির শালবন বিহার থেকে প্রাপ্ত অষ্টম শতাব্দীর আদি টেরাকোটা উপহারটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদের ২৫তম বার্ষিকীতে বাংলাদেশের উপহার হিসেবে প্রদান করেন। সেটি জাতিসংঘের ভেতরের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানেই শোভা পাচ্ছে। বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বাহক হিসেবে বিশ্ববাসী দেখছে এ নিদর্শন।

বাঙালির সংস্কৃতির এক অবিচ্ছিন্ন অংশ মৃৎপাত্র। চলতি শতকের সত্তরের দশক পর্যন্ত কুমার আর পালদের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল মৃৎশিল্প। আর মৃৎশিল্পের ব্যবহার বলতেও বাসনকোসন, হাঁড়ি আর কলসিকেই বোঝাত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে কুমার আর পালদের গণ্ডি ডিঙিয়ে সর্বজনীন রূপ পেয়েছে মৃৎশিল্প। নতুন নতুন উদ্যোক্তারা মৃৎশিল্পে জড়িয়ে ব্যবসা শুরু করছেন। নানা নকশা আর কারুকাজে প্রসারিত হয়েছে মাটির পাত্রের ব্যবহার। মাটির তৈরি জিনিসপত্র এখন প্রধান তৈজসপত্রে ও সৌন্দর্যবর্ধনের উপকরণে পরিণত হয়েছে। এ শিল্পে এখন বাড়ছে বিনিয়োগ। দেশের অর্থনীতিতে বাড়ছে অবদান। বর্তমানে হিড হ্যান্ডিক্রাফটস, কোট দ্য জুট ওয়ার্কস, ঢাকা হ্যান্ডিক্রাফটস, আড়ংসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মৃৎপণ্য রফতানি করছে, যার যাত্রা স্বাধীনতার পর কারিকা নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।

তবে আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম, মেলামাইন ও স্টিলের জিনিসপত্র তৈরি হওয়ায় একটা সময় মাটির হাঁড়ি, কলসি ও বাসনের উপযোগিতা হারিয়ে যেতে শুরু করে। ব্যবসা কমে আসার কারণে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত পাল ও কুমাররাও বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে দিয়ে ঝুঁকেছিল বিভিন্ন পেশার দিকে। তবে আশার দিক হলো বিলুপ্তির পথে চলে যাওয়া মৃৎশিল্প আবার যেন ফিরে আসছে তাদের নিখুঁত কাজের মাধ্যমে। কিছু প্রথাগত পেশাজীবী পাল ও কুমারের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত অনেক বিনিয়োগকারী এখন মৃৎশিল্পে বিনিয়োগ করছেন। শৈল্পিক দক্ষতা ও কারুকাজ যোগ হয়েছে মৃৎপাত্রে। নকশা করা হাঁড়ি-পাতিল, চাড়ি, কলসি, বদনা, খানদা, ফুলের টব, ফুলদানি, জীবজন্তু, পাখির অবয়ব, সাজসজ্জা, অলংকারসহ বাংলার চিরাচরিত সব নিদর্শন এখন মৃৎপাত্রে ফুটে উঠছে। 

প্রথমদিকে মৃৎপণ্য কাদামাটি দিয়ে তৈরি ও কম তাপমাত্রায় ভাটির আগুন বা খোলা চুল্লির আগুনে পোড়ানো হতো। সেগুলো হাতে তৈরি করা হতো এবং নকশা করা হতো না। সেগুলো সাধারণত একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় পোড়ানো হতো। অবারিত মাটির পাত্র ছিদ্রযুক্ত হওয়ার কারণে এটির তরল সংরক্ষণের জন্য বা টেবিলের পাত্র হিসেবে ব্যবহারের উপযোগিতা সীমিত। তবে মাটির পাত্র সেই নব্য প্রস্তর যুগ থেকে এখনো বহমান। এটি বিভিন্ন ধরনের কাদামাটি দিয়ে তৈরি করা যেতে পারে, যাদের মহিষের চামড়ার আগুনে পোড়ানো হলে তা লালচে বাদামি রঙ ধারণ করে। লালচে রঙের বস্তুগুলোকে টেরাকোটা বলা হয়।

আশির দশকেও বাংলার মৃৎশিল্প ছিল মৃতপ্রায়। ১৯৮২ সালে ঢাকায় বিসিকের উদ্যোগে মৃৎশিল্প মেলার আয়োজন করা হয়। এ মেলায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দর্শকের ভিড় হয়। এটি আয়োজকদের পাশাপাশি পাল সম্প্রদায়কে উৎসাহ জোগায়। তার পর মৃৎশিল্পের নকশায় পরিবর্তন এসেছে। শুরু হয় পণ্য উন্নয়নে নানা চিন্তাভাবনা। এরই ধারাবাহিকতায় পেশাদার শিল্পীরা মৃৎপণ্যের ডিজাইন ও রঙে বৈচিত্র্য নিয়ে আসে। এ সময় থেকে বাজারে আসে বাহারি ডিজাইনের নানা পণ্য। এসব পণ্য সব শ্রেণীর ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে। বর্তমান ঢাকায় কয়েক হাজার মৃৎপণ্যের দোকান রয়েছে। সারা বছরই মাটির পণ্যের চাহিদা থাকে। ঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মনের মতো সাজাতে মৃৎপণ্যের কোনো তুলনা নেই। বর্তমানে দেশে ও দেশের বাইরে বাজার বড় হচ্ছে। সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কুমার বা পাল সম্প্রদায়ের লোকজন। তবে আধুনিকতা আর নান্দনিকতার ছোঁয়া লেগেছে কুমিল্লা, সাতক্ষীরা, শেরপুর, সাভার, রূপগঞ্জ, দিনাজপুর, নড়াইলের পালদের মধ্যে।

২০০০ সালের পর বেড়ে যায় মৃৎপণ্য রফতানি। এখন ইউরোপ-আমেরিকা ছাড়াও নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় রফতানি হচ্ছে বাংলাদেশের মৃৎপণ্য। রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে ভারত, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনাম। বিদেশে মূলত মাটির তৈরি পামিজ, ফুলের টব, বিভিন্ন ধরনের গার্ডেন প্রডাক্ট, নাইট লাইট, ডাইনিং আইটেম, ইনডোর গার্ডেন আইটেম, ফুলদানি, মাটির টব ও মাটির ব্যাংকের চাহিদা আছে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ৭ লাখ কুটির শিল্প কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মৃৎশিল্পের কারখানাও। কুটির শিল্পের এসব কারখানায় কর্মরত ১৫-২০ লাখ শ্রমশক্তি। চাহিদা বাড়ার কারণে এ পেশায় আগ্রহী হয়েছেন অনেক উচ্চশিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তা। বিশেষ করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারুকলা অনুষদের মৃৎশিল্প বিভাগ এবং অঙ্কন ও চিত্রায়ন বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে অনেক তরুণ-তরুণী এ খাতে বিনিয়োগ করছেন। একটা সময় আমরা মাটির হাঁড়িপাতিল ও কলসি ব্যবহার করতাম। কিন্তু এখন সেই দিন বদলে গেছে। মাটির সেসব জিনিসের পরিবর্তে এখন নানা ধরনের নতুন নতুন জিনিস জায়গা করে নিয়েছে। কেউ কেউ মৃৎশিল্প নিয়ে ব্যবসা শুরু করছে। এভাবে মৃৎশিল্প ক্রমেই এগিয়ে যাচ্ছে।

মৃৎশিল্প এখন শহরের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হচ্ছে। পেশার সাথে জড়িত কারিগরদেরও কদর বেড়েছে। প্রথাগত যোগ্যতার পাশাপাশি বিসিক থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা কাজ করছেন। এ পেশার একজন কারিগর এখন মাসে ২০-৩০ হাজার টাকা বেতন পেয়ে থাকেন। ট্র্যাডিশনাল কুমারদের সংখ্যা কমলেও মৃৎশিল্পের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। মৃৎশিল্পে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। এটি এখন আর হাঁড়িপাতিল বা থালাবাসনে সীমাবদ্ধ নেই। সৌখিন পণ্যে পরিণত হয়েছে গ্রামবাংলার কুমার শিল্প। বাহারি ডিজাইনের কারণে শহরের বিত্তশালী পরিবারের বসার ঘরে শোভা পাচ্ছে অত্যাধুনিক ডিজাইনে তৈরি নানা মৃৎপণ্য। এ তালিকায় রয়েছে ফুলদানি, মাটির ব্যাংক, ফুলের টব থেকে নানা নজর কাড়া শোপিছ।

গুণগত মান দিয়েই দেশের বাইরেও মৃৎপণ্যের চাহিদা আরো বৃদ্ধি করতে হবে। বাংলার মৃৎপণ্য এখন ইউরোপ-আমেরিকার ড্রয়িং রুমে কিংবা বেড রুমে শোভাবর্ধক হিসেবে ব্যবহার করতে উদ্যোগ প্রয়োজন। বাংলাদেশের টালি শিল্প ইউরোপের বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার কয়েকটি গ্রামের কয়েকশ পরিবার এ শিল্পে কাজ করছে। গ্রামীণ জীবনে কর্মচঞ্চলতা এনে দিয়েছে মৃৎশিল্প। শৌখিন মানুষ ঘর সাজাতে ব্যবহার করছে মাটির তৈরি এসব জিনিস। মাটির তৈরি জিনিসপত্র ঘরের বিভিন্ন জায়গায় সাজিয়ে ঘরের শোভা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করছে। এছাড়া বর্তমান সময়ে বিভিন্ন অফিসে এর ব্যবহার বেশ লক্ষণীয়। চাহিদার কথা বিবেচনা করে দিন দিন বেড়েই চলেছে কুমারদের তৈরি এসব জিনিসের আইটেম সংখ্যা। ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, বরিশাল, ঢাকার সাভার, কুমিল্লা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কুমারদের তৈরি জিনিস পাওয়া যাচ্ছে রাজধানীর শাহবাগ থেকে টিএসসির ফুটপাত, দোয়েল চত্বর, নিউমার্কেট, ধানমন্ডি, ফার্মগেট, কলাবাগান, মালিবাগ, মিরপুর-২ স্টেডিয়াম সংলগ্ন থেকে মিরপুর-১ ও উত্তরার ফুটপাতসহ দেশের বড় বড় শপিং কমপ্লেক্সে। এমনকি পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে মৃৎপাত্রের দোকান চোখে পড়বে। এছাড়া সাভারের নবীনগর এলাকায় মৃৎশিল্পের বাজার বেশ জনপ্রিয় কয়েক দশক ধরেই। রাজধানীর পাশাপাশি অন্যান্য বিভাগীয় শহরেও বড় বড় শো রুমে বিক্রি হচ্ছে মাটির তৈরি এসব জিনিসপত্র। এছাড়া নার্সারির সাথে যেন মৃৎশিল্পের একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে দেশের যেখানে যেখানে নার্সারি আছে তার সাথে সাথে মাটির পাত্র ও পণ্যের দোকানও রয়েছে।

দেশ ছেড়ে বিদেশেও এখন ছড়িয়ে পড়ছে কুমারদের হাতে তৈরি সুন্দর সুন্দর জিনিস। দেশের অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান মাটির তৈরি বিভিন্ন দেয়ালচিত্র, ফুলদানি, ছাইদানি বিদেশে রফতানি করছে। এসব প্রতিষ্ঠানর মধ্যে রয়েছে ইনফ্যাক্টস-ডু-ম্যান, আড়ং, ব্র্যাক, হ্যান্ডিক্রাফটস, কুমুদিনী, কারিকা, আইডিয়াসসহ অনেক প্রতিষ্ঠান। বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব কুমার দ্বারা নিত্যনতুন ডিজাইনের মাটির জিনিস তৈরি করছে। বিদেশে রফতানি করছে, যা আমাদের অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে।

বিশ্বে মৃৎশিল্পের তীর্থস্থান বলা হয় ফিলিপাইনকে। মৃৎপণ্যে তারা সারা বিশ্বের মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফিলিপাইন সরকার মৃৎশিল্পের উন্নয়নে একের পর এক পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে সবচেয়ে সাড়া জাগানো যে পদক্ষেপ নিয়েছে সেটি হলো সারা দেশের মৃৎশিল্পীদের ম্যানিলার পাশে এক বিশাল দ্বীপে নিয়ে এসেছে। আর সেখানে মৃৎপণ্যের বিশেষ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা গড়ে তোলা হয়েছে। বাজেটেও বিশেষ বরাদ্দ রেখেছে মৃৎশিল্পের উন্নয়নে। মৃৎশিল্প সম্পর্কে আমাদের ভুল ধারণা আছে। সরকারের সহযোগিতায় এ শিল্পকে আরো অনেক দূর নিয়ে যাওয়া সম্ভব। কারণ আমাদের দেশে যারা এ শিল্পের সাথে জড়িত তাদের বেশির ভাগেরই আর্থিক অবস্থা স্থবিরতায় রয়েছে। সরকারের সহযোগিতা ভালোভাবে পাওয়া গেলে এ শিল্পকে শুধু দেশেই নয় দেশের বাইরেও ভালোভাবে গ্রহণযোগ্যতা দেয়া সম্ভব।

বাংলাদেশের মাটি মৃৎপণ্য তৈরিতে বেশ উপযোগী। কিন্তু প্রতিযোগী অন্যান্য দেশের মতো সহায়তা পাচ্ছে না। ফলে মৃৎশিল্পীরা স্থানীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করছে। এজন্য বিরাট সুযোগ থাকা সত্ত্বেও গুণগত মানসম্পন্ন মৃৎপণ্য উৎপাদন করতে পারছে না। এ কারণে ২০-৩০ শতাংশ পণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু স্থানীয় শিল্পীদের প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ দিতে পারলে এ পরিমাণ পণ্য নষ্ট হতো না। নষ্ট কম হলে স্থানীয় প্রস্তুতকারকরা উৎসাহী হবে। কুমিল্লার বিজয়পুরের মতো আরো পাঁচ-ছয়টি জেলায় বিশেষ এলাকা করা প্রয়োজন। দেশের মৃৎশিল্পীরা দক্ষ ও অভিজ্ঞ হলেও তাদের রয়েছে নানা সমস্যা। এক্ষেত্রে মূলধন ও প্রযুক্তি একটি বড় সমস্যা। প্রযুক্তির উন্নয়ন বিশেষ করে জিকার মেশিনের মতো অত্যাধুনিক মেশিন আমদানি করতে হবে। এছাড়া বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে। যেখান থেকে এর সাথে সংশ্লিষ্টরা ঋণ নিতে পারে। আর বিশেষ মৃৎ প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল গড়ে তোলার ওপর সংশ্লিষ্টরা গুরুত্বারোপ করেন। দেশে ও বিদেশে মৃৎপণ্যের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু প্রযুক্তির কারণে পিছিয়ে পড়ছে খাতটি। নেই রফতানিকারকদের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা। এসব সুবিধা দেয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তির সরবরাহ করলে জেগে উঠবে দেশের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প।

তবে বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি ও উৎপাদনের মাত্রা পরিবেশের ওপর প্রভাবকে বিবেচনায় নিতে হবে। এক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য বিষয়গুলো দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত। প্রথমত, কর্মীদের ওপর প্রভাব এবং দ্বিতীয়ত, সাধারণ পরিবেশের ওপর প্রভাব। কর্মীদের ওপর প্রভাবের ক্ষেত্রে প্রধান নিয়ামক অভ্যন্তরীণ বাতাসের মান, শব্দের মাত্রা ও সম্ভাব্য অত্যুজ্জ্বলতা। সাধারণ পরিবেশের ওপর প্রভাবের ক্ষেত্রে নিয়ামকগুলো হলো জ্বালানির ব্যবহার, পানিদূষণ, বায়ুদূষণ ও বিষাক্ত পদার্থ নির্গমন। ঐতিহাসিকভাবে সিসার বিষাক্ততা এসব মৃৎশিল্পে ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকি ডেকে আনছে। সর্বপ্রথম ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রথম শনাক্ত করা হয় এবং ১৮৯৯ সালে যুক্তরাজ্য মৃৎশিল্প কর্মীদের স্বাস্থ্য রক্ষার ওপর আইন প্রণয়ন করে। যদিও বর্তমানে মৃৎশিল্প কর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা হয়েছে। তবুও এটি অগ্রাহ্য করার মতো নয়। অভ্যন্তরীণ বাতাসের কারণে কর্মীরা বায়ুুমণ্ডলীয় ধূলিকণা, কার্বন মনোক্সাইড এবং কিছু ভারী ধাতুর সংস্পর্শে আসতে পারেন। সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্য ঝুঁকি হলো দীর্ঘমেয়াদে ক্রিস্টালাইন সিলিকার সংস্পর্শে থাকার ফলে সিলিকোসিস রোগের সৃষ্টি হওয়া। যথাযথ বায়ু পরিচালন এ ঝুঁকি কমাতে পারে। বায়ু পরিচালনের জন্য ১৮৯৯ সালে যুক্তরাজ্যে সর্বপ্রথম আইন প্রণয়ন করা হয়। সম্প্রতি ওকল্যান্ডের লেনি কলেজের এক গবেষণায় বলা হয়, এসব ঝুঁকি সুপরিকল্পিত কারখানা নির্মাণের মাধ্যমে নির্মূল করা সম্ভব।

আবার কারিগরদের নিয়োজিত করতে হবে বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে। স্বল্প শিক্ষিত উদ্যাক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে বিসিক। প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন করে মৃৎশিল্পের ব্যবসা শুরু করতে পারলে প্লাস্টিক ও মেলামাইনের আগ্রাসন থেকে মুক্তি পাবে দেশের মানুষ।

সাইদ শাহীন: উপ-নগর সম্পাদক, বণিক বার্তা