বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২৬, ২০২০ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

বিশেষ সংখ্যা

অকৃষির মেরুদণ্ড চালকল ও কৃষি উপকরণের ব্যবসা

ড. ফা হ আনসারী

প্রাচীনকাল থেকেই কৃষি বাঙালির জীবিকার উত্স। এ উপমহাদেশের অন্যান্য অংশের অবস্থাও প্রায় অভিন্ন। গোটা বাংলা পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতসহ তিনটি প্রধান নদ-নদী পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা এবং তাদের অসংখ্য শাখা-প্রশাখা প্রসারিত পলিগঠিত সমভূমি হওয়ার কারণে প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলে কৃষিকাজ অপেক্ষাকৃত সহজ ও তুলনামূলক কম খরচের ছিল। ফলে এখানকার কৃষি ব্যবস্থাপনায় কখনো রাষ্ট্রীয় মালিকানা, কখনো ব্যক্তিমালিকানার উদ্ভব হয়েছে। মধ্যযুগ কিংবা তার পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চলের কৃষি কখনো রাষ্ট্রীয়, কখনো ব্যক্তি কিংবা দুটোর সংমিশ্রণ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়েছে। ফরিদপুরে প্রাপ্ত তিনটি তাম্রশাসনে এবং অধিকাংশ পাল ও সেন শিলালিপির তথ্য অনুসারে রাষ্ট্র ভূমির মালিক হলেও গ্রামে বসবাসরত কৃষকদের দ্বারাই কৃষি ব্যবস্থা পরিচালিত হতো এবং চাষাবাদ ছিল ব্যক্তিগত খামারভিত্তিক। কৃষিদ্রব্যে রাজার অংশভাগ ছিল রাষ্ট্রীয় আয়ের প্রধান উত্স। রাজস্ব ও অন্যান্য কর হিসেবে উৎপন্ন দ্রব্যের কতটা রাষ্ট্র আদায় করত, সে বিষয়ে জানা না গেলেও কৃষির একটি নতুন ধারা উন্মোচন হয়।

আবার সুলতানি ও মোগল আমলে বাংলার কৃষির যথেষ্ট বিকাশ ঘটেছিল। অনেক স্থানের নামের সঙ্গে ‘আবাদ’ সংযুক্তি (যেমন ফতেহাবাদ ও খালিফাবাদ) সেসব জায়গা চাষাধীনে আসার সাক্ষ্যবহ হতে পারে। তত্কালীন সরকার ভূমি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে কৃষি সম্প্রসারণে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। উদাহরণস্বরূপ বীজ ও বলদ বা কৃষি যন্ত্রপাতি ও হাতিয়ার ক্রয়ে সহায়তার জন্য সরকার কৃষকদের তাকাবি ঋণ দিত। ১৯২১ সালের মধ্যে বাংলার মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় চার-পঞ্চমাংশ প্রায় ৭৭.৩ শতাংশ কৃষিনির্ভর হয়ে পড়ে, যা সমগ্র ভারতে ছিল ৬৯.৮ শতাংশ। তবে সেই হার বাংলাদেশে এখন ৪০ শতাংশের ঘরে ওঠানামা করছে। তাহলে কি কৃষির গুরুত্ব কমছে? নাকি অকৃষি খাত এগিয়ে চলছে। গত কয়েক দশকের বিবর্তনে অকৃষি খাতের উন্মেষ সেই বিশ্লেষণের দাবি রাখছে। কেনই বা বাংলায় অকৃষি খাতের বিকাশ হলো, কীভাবে হলো। তার মূলে রয়েছে কৃষি খাতই। মূলত কৃষিকেন্দ্রিক বা কৃষি উৎপাদনকে ঘিরেই অকৃষি খাতের সম্প্রসারণটা বেশি হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষ কিছু সেবা খাত ও পরিবহন খাতের অবদান রয়েছে। তবে এ অকৃষি খাতের উন্মেষের ইতিহাসটাও কিন্তু কম সময়ের নয়।

১৭৫৬ সাল পর্যন্ত বাংলার চিনির একটি উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য চালু ছিল মাদ্রাজ, বোম্বে, মালাবার উপকূল, সুরাট, সিন্ধু, মাসকাট, মক্কা ও জেদ্দার সঙ্গে। এমনকি সতেরো শতকের মাঝামাঝিও বিপুল পরিমাণ চিনির রফতানি বাণিজ্যসহ বাংলা ছিল এ শিল্পের প্রধান কেন্দ্র। বারবোসা, বারথেমা ও বার্নিয়ার বিবরণী এবং ইংরেজ ও ওলন্দাজ নথিপত্রে এর সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এতে বোঝা যায়, ইক্ষু মধ্যযুগের বাংলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল ছিল। আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে রফতানি বাণিজ্য হ্রাস পায় এবং উৎপন্ন চিনি তখন কেবল প্রদেশের নিজস্ব চাহিদা মেটাতে পারত। চিনি উৎপাদন এবং এর বিপণন প্রক্রিয়ায় কৃষি ও অকৃষি খাতের একটি বিকাশমান ধারা চলে আসে। এর পাশাপাশি অন্যান্য কৃষিশস্য বিশেষ করে পাট ও অন্যান্য অর্থকরী শস্যকে ঘিরে অকৃষি খাতের একটি ধারা চালু হয়। দুই দশক আগেও গ্রামীণ পরিবারের আয়ের প্রধান উত্স ছিল শস্য খাত। মোট আয়ে শস্য খাতের অবদান ছিল প্রায় এক-চতুর্থাংশ। এর পরই অবস্থান ছিল ছোটখাটো ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা ক্ষুদ্র উদ্যোগ। গত কয়েক দশকের ব্যবধানে গ্রামীণ মানুষের আয়ের বড় রূপান্তর ঘটে গেছে। গ্রামীণ পরিবারের আয়ে শস্য খাত তার অবদান হারিয়েছে। কর্মসংস্থান ও পরিবারের আয়ে বড় অবদান রাখছে অকৃষি খাত। খাত হিসেবে নেতৃত্ব এখন অকৃষিজ সেবা ও রেমিট্যান্স খাত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘রিপোর্ট অন এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল স্ট্যাটিসটিকস ২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশের গ্রামীণ পরিবারের বার্ষিক আয় এখন প্রায় ২ লাখ ২ হাজার ৭২৪ টাকা বা মাসে প্রায় ১৬ হাজার ৮৯৩ টাকা। এর মধ্যে কৃষি খাত থেকে আয় ৩৮ দশমিক ২১ শতাংশ ও অকৃষি খাত থেকে প্রায় ৬১ দশমিক ৭৯ শতাংশ।

গত কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই পরিবর্তনটা সবচেয়ে বেশি হয়েছে। ২০০০ সালে গ্রামীণ পরিবারের আয়ের ক্ষেত্রে শস্য খাতের সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল, প্রায় ২৫ শতাংশ। এর পরই শস্যবহির্ভূত কৃষি খাতের অবদান ছিল প্রায় ২৩ শতাংশ। পাশাপাশি কৃষি মজুরি, ব্যবসা ও বাণিজ্য, সেবা, অকৃষিজ শ্রমিক 

ও রেমিট্যান্সের অবদান ছিল। কিন্তু প্রায় দেড় দশকের মধ্যে সেই চিত্র সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে গেছে। গ্রামীণ মানুষের আয়ের প্রধান উেস পরিণত হয়েছে রেমিট্যান্স। গ্রামীণ মানুষের মোট আয়ে রেমিট্যান্সের অবদান বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। অন্যদিকে দ্বিতীয় স্থানে চলে এসেছে শস্যবহির্ভূত কৃষি। এ খাতের মাধ্যমে আয় হচ্ছে প্রায় ২৪ শতাংশ। অন্যদিকে বিভিন্ন সেবা খাতের প্রায় ১৫ শতাংশ এবং বাণিজ্য ও ব্যবসা খাতের মাধ্যমে প্রায় ১৪ শতাংশ অবদান রাখছে একটি পরিবারের আয়ে। ফলে এ সময়ে গ্রামীণ মানুষের আয়ে অকৃষি খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবদান বৃদ্ধি পেয়েছে। সবার জন্য আয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে উন্নয়নটা হলে সেটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন হবে। অকৃষি মাধ্যমে গ্রামের ব্যাপক আকারে কর্মসংস্থান হওয়া শুরু হয়েছে। বর্তমান সময়ের অকৃষি খাতের শ্রেণিবিন্যাসের কারণে কিছু বিষয় সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। সেখানে গ্রামীণ অকৃষি খাতকে আরো স্পষ্টীকরণ করা হয়েছে। সেখানে হোটেল ব্যবসা, পাইকারি ও খুচরা দোকানদার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি নানান উদ্যোগ, বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা ও ট্রেডিং কার্যক্রম, রেমিট্যান্স, পরিবহন বিশেষ করে ভ্যান, রিকশা, ইজিবাইক, নসিমন, করিমন বা এই জাতীয় বেশকিছু পরিবহন ছাড়াও নানামুখী সেবা খাতের কর্মকাণ্ড।

গ্রামীণ অকৃষি খাতের এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে কৃষিজ উপকরণের ব্যবসা বিশেষ করে বীজ, বিভিন্ন ধরনের ফিড, সার, জ্বালানি তেল, কৃষি যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি, কীটনাশক ও বালাইনাশক এবং কৃষি ওষুধসামগ্রীর ব্যবসা। এছাড়া গত কয়েক দশকের ব্যবধানে চাল উৎপাদনের একটি বড় উল্মম্ফন হয়েছে। সেখানে চালকলগুলোর একটি বড় অবদান রয়েছে। কৃষক থেকে ভোক্তার কাছে চাল পৌঁছাতে সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর মাধ্যমে পরিণত হয়েছে চালকল। দেশের চালকলগুলোর কারণে এখন পর্যন্ত কৃষক তার ধানের দাম পাচ্ছেন, আবার ভোক্তারা সঠিক মূল্যে চাল কিনতে পারছে। তবে এটিও স্বীকার করতে হবে মাঝেমধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে চালের দাম কিছুটা বাড়ছে। চালের দাম যদি বাড়ে তাহলে কৃষক পর্যায়ে নির্দিষ্ট অনুপাতে সে দাম পৌঁছাতে সহায়তা করেন মিলাররা। কারণ মিলাররাই কৃষকের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ধান ক্রয় করেন।

দেশে এখন প্রায় ৭৫ শতাংশ জমিতে ধানের আবাদ হচ্ছে। এর মধ্যে বোরো ধানের আবাদ সবচেয়ে বেশি হয়। বোরোর আবাদ প্রায় ৫৪-৫৬ লাখ হেক্টর। অন্যদিকে আমন ধানের আবাদ ৪৪-৪৫ লাখ হেক্টর এবং আউশের আবাদ হচ্ছে ৯-১০ লাখ হেক্টরে। সব মিলিয়ে চালের উৎপাদন ছাড়িয়েছে প্রায় পৌনে চার কোটি টন। আউশ, আমন ও বোরো ধান মিলিয়ে এখন প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে ধানের আবাদ হচ্ছে। আর তিন ধরনের ধান উৎপাদনে নিয়োজিত রয়েছেন এক কোটির বেশি কৃষক। গত ২০১৮ সালে দেশে প্রায় ৩ কোটি ৭২ লাখ টন চালের উৎপাদন হয়েছে। সে হিসেবে দেশে গত অর্থবছরে ধান উৎপাদন ছাড়িয়েছে সোয়া পাঁচ কোটি টন। তবে কৃষকের দাম নিশ্চিতের পাশাপাশি চালের অপচয় রোধ করতে মিলাররা ভূমিকা নিচ্ছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যুরোর (বিবিএস) ‘রিপোর্ট অন এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল স্ট্যাটিসটিকস’ প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০১৮ সালে দেশে চালের উৎপাদন ছাড়িয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৭২ লাখ টন। তবে উৎপাদিত চালের ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ নষ্ট বা অপচয় হচ্ছে। এর মধ্যে হারভেস্টকালীন ক্ষতি ১১ লাখ ২৩ হাজার এবং পোস্ট হারভেস্টকালীন ক্ষতি ১৬ লাখ ৮৮ হাজার টন। ২০১৮ সালের জরিপ বছরে আউশের ক্ষতি হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৮২ টন। অন্যদিকে আমনে ক্ষতি হচ্ছে ১১ লাখ ৩১ হাজার ৩৯৯ টন। বোরো ধানে ক্ষতি হচ্ছে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার ৫০৬ টন। এর মধ্যে হারভেস্টকালীন ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৬৪২ টন ও পোস্ট হারভেস্টকালীন ৮ লাখ ৭৮ হাজার ৮৬৪ টন। সব মিলিয়ে দেশে হারভেস্ট ও পোস্ট হারভেস্টকালীন ক্ষতি হয়েছে ২৮ লাখ ১২ হাজার ৩৮৭ টন। 

২০১৬ সালে প্রায় ২২ হাজার চালকল ছিল। পরবর্তী বছরগুলোতে চালকলের পরিমাণ প্রায় সমান ছিল। কিন্তু কার্যত বেশকিছু চালকল অকার্যকর থাকে। এর পরের বছরে হাসকিন ও অটোরাইস মিলে চালকলের সংখ্যা ছাড়িয়েছিল সাড়ে ২২ হাজার। যার মধ্যে অটো রাইস মিল ৬৫০ ও সেমি অটো প্রায় ২ হাজার ৫০০টি। বাকিগুলো হাস্কিং চালকল। ধান ভাঙানোর প্রথাগত পদ্ধতিতে আমরা চাল নষ্ট করছি। রাবার হালার প্রযুক্তির প্রসার না হওয়ায় এখনো প্রথাগত কলেই (হাস্কিং) চাল উৎপাদন হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি মিল রয়েছে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে। প্রথাগত এসব চালকলে ১০০ কেজি ধান ভাঙানোর পর চাল পাওয়া যায় ৬৫ কেজির নিচে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এসব চালের মধ্যে দুই-তিন কেজি সামান্য ভেঙে যায়। অথচ উন্নত বিশ্বে বিশেষ করে চীন ও জাপানে ধান থেকে চালের রিকভারি রেট ৬৭.৫ শতাংশ। দেশের নতুন জাতগুলোতে রিকভারি রেট একটু কম। তাই নতুন জাত উদ্ভাবনে চালের ভালো রিকভারি রেট যেন ভালো হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। কেননা সার, বীজ, পানি, শ্রম কীটনাশক ও বালাইনাশক দিয়ে কম রিকভারি রেটের কারণে চাল খারাপ পেলাম, সেটি কখনই কাম্য হতে পারে না। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটিয়ে এসব মিলেই এক থেকে দেড় কেজি বেশি চাল পাওয়া সম্ভব। কোনো ধরনের ভাঙা চালও তাতে থাকবে না। প্রথাগত হাস্কিং মিলগুলোতেই তৈরি হচ্ছে দেশের সিংহভাগ চাল। বাংলাদেশের চালকলগুলোর দক্ষতা বাড়াতে কোরিয়ার বা উন্নত দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। উন্নত দেশের যন্ত্রপাতিতে কম খরচে অধিক ধান ভাঙানো সম্ভব। উন্নত যন্ত্র সম্প্রসারণ করা গেলে বাড়তি চাল পাওয়া যাবে।

অথচ এ ক্ষতি খুব সহজেই কমিয়ে আনা সম্ভব। ধান থেকে চাল তৈরিতে এখন সারা বিশ্বেই ব্যবহার হচ্ছে উন্নত প্রযুক্তির চালকল। কিন্তু বাংলাদেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হচ্ছে প্রথাগত চালকল। নিম্ন চালকলগুলোর যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মাড়াই চালের দুই-তিন কেজি ভেঙে যাচ্ছে। চালকলে উন্নত প্রযুক্তির অভাবেই অপচয় হচ্ছে চালের বড় একটি অংশ। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বেশকিছু করপোরেট প্রতিষ্ঠান উন্নত মানের চালকল স্থাপন করেছে। এসব প্রতিষ্ঠান এগিয়ে না এলে দেশের চালের আরো বড় একটি অংশ অপচয় হতো। ফলে সার্বিকভাবে এ ধরনের অপচয় কমাতে হলে চালকলগুলোকে আধুনিকায়ন করতে অর্থায়ন এবং সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। কেননা চালের এ ধরনের অপচয়ের কারণে দেশের অর্থ ও সম্পদের অপচয়ও হচ্ছে। আর দেশের দরিদ্রতা থেকে মানুষকে উন্নতির বা এসডিজির যে পরিকল্পনা রয়েছে সেটিও বাধাগ্রস্ত করবে। অপচয় রোধে রাষ্ট্রের উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন। ফসলোত্তর ক্ষতি কমিয়ে আনতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বিশেষ কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ আরো জোরদার করতে হবে। প্রথাগতভাবে ধান কাটা ও মাড়াই করলে সেই ধানের ১২-১৫ শতাংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মেশিনের মাধ্যমে সেই কাজটি করলে ক্ষতির পরিমাণ ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব। অপচয়ের বড় একটি অংশই শুধু মেশিনের ব্যবহার করেই কমানো যেতে পারে। আর এসব মেশিন কৃষকের কাছে পৌঁছতে সরকারকে আরো আর্থিক ও নীতিসহায়তা বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘অ্যানালিটিক্যাল রিপোর্ট অন মেথডোলজিস অব দ্য ক্রপ এস্টিমেশন অ্যান্ড ফোরকাস্ট সার্ভে অ্যান্ড প্রাইভেট স্টক অব ফুড গ্রেইন সার্ভে ২০১৬-১৭’ শীর্ষক জরিপের তথ্যমতে, চালকলগুলোতে ক্ষুদ্র, ছোট, মাঝারি থেকে বড় এ তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করে তাদের সক্ষমতাকে পরিমাপ করা হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র চালকলগুলোর মজুদক্ষমতা ২৮ লাখ ৫৭ হাজার ১৭০ টন, ছোট চালকলগুলোর ৩৭ লাখ ৩৮ হাজার ৫৫১ টন এবং মাঝারি থেকে বড় চালকলগুলোর ধারণক্ষমতা ৩০ লাখ ৭০ হাজার ৬৬৫ টন। সব মিলিয়ে চালকলগুলো তিনটি মৌসুমের প্রতিটি মৌসুমে গড়ে প্রায় ৩৪ লাখ ১৫ হাজার টন চাল বিপণন করে। সরকারের খাদ্যশস্য রাখার জন্য নিজস্ব মজুদ ব্যবস্থা রয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন খাদ্যগুদামে প্রায় ২২ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুদ রাখা সম্ভব। ফলে দেশের প্রধান শস্য চালের মজুদ ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে চালকলগুলো। যদিও চালকলগুলোতে নানান ধরনের প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করেই সরকারের পাশে থেকে কাজ করতে হচ্ছে। 

কৃষি উপকরণের ব্যবসা: কৃষিজমি আবাদে মূলত কৃষি উপকরণ হিসেবে বীজ, সেচ উপকরণ, প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক সার, ফিশ ও ক্যাটল ফিড, কীটনাশক ও বালাইনাশক ব্যবহার করা হয়। এসব কৃষি উপকরণ বাজারজাত ও ব্যবসায় নিয়োজিত রয়েছেন কয়েক লাখ ব্যবসায়ী। যারা কিনা ডিলার বা এজেন্ট নামেই পরিচিত। দেশে প্রতি বছর প্রায় ৫৫-৬০ লাখ টন সার বিপণন করা হয়। এছাড়া তিন থেকে পাঁচ লাখ টন প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক বীজ বিপণন করা হয়। যদিও বীজের কৃষক পর্যায়ে চাহিদা আরো বেশি। তবে বিপণনযোগ্য বীজের পরিমাণ এখনো বেশ কম। এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বীজের বিপণনের পরিমাণ দুই লাখ টনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সার ও বীজ বিপণনের জন্য সরকারিভাবেই ডিলার নিযুক্ত করা আছে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ডিলারদের বিবেচনায় নিলে এদের পরিমাণ লাখ ছাড়াবে। অন্যদিকে ৩০-৩৫ হাজার টন বালাইনাশক ও কীটনাশক বিপণন করা হচ্ছে। এছাড়া প্রতি দুই বছরে কয়েক লাখ ছোট-বড় কৃষিযন্ত্র বিপণন করা হয়। দেশে মাছ, পোলট্রি ও গো খাদ্যের চাহিদা প্রায় ৫০ লাখ টন। এর মধ্যে পোলট্রি ফিডের চাহিদা বছরে ১৬-১৮ লাখ টন। এছাড়া মাছ ও গো-খাদ্যের চাহিদা ২০ লাখ টনের ওপরে।

কৃষিজ উপকরণ গ্রামে বা কৃষকের কাছে পৌঁছাতে বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যবসায়ী ও ডিলাররা যুক্ত আছেন। তারাই মূলত কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছেন এসব উপকরণ। ফলে এক ধরনের দোকানদারি ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে সহায়তা করছে কৃষি উপকরণ। তাদের কাজ শুধু বেচাকেনার মধ্যেই শেষ হয়ে যায় না। প্রতিষ্ঠিত বীজ, সার, বালাইনাশক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, কৃষি উপকরণের সঠিক ব্যবহার ও সচেতনতামূলক পরামর্শও নিয়মিত দিচ্ছেন কৃষকদের। আবার বীজ কিনে রোপণে সমস্যা, সঠিক মাত্রা জানা না থাকা বা বালাইনাশকের ব্যবহার সম্পর্কে যা জানা দরকার সব পরামর্শই দিয়ে থাকেন ডিলার ও ব্যবসায়ীরা। আবার উচ্চফলনশীল শস্যের নতুন জাত ও আবাদের পদ্ধতিসম্পর্কিত সব তথ্য কৃষক পেয়ে থাকেন। প্রতিকূল পরিবেশ উপযোগী প্রযুক্তি ও উৎপাদন কৌশল, হাইব্রিড শস্যের প্রসার, পানিসাশ্রয়ী সেচ পদ্ধতি, সার ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধিতে এক ধরনের সহায়ক ভূমিকা নিচ্ছেন তারা। ফলে এসব ব্যবসায়ী ও ডিলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান বা আয়বর্ধন কাজের পাশাপাশি সরকারের নিয়োজিত সম্প্রসারণ কর্মীদের সহায়ক হিসেবে কাজ করছেন।

ড. ফা হ আনসারী: ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা—এসিআই এগ্রিবিজনেসেস

সিন্ডিকেট সদস্য—বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়