বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২৬, ২০২০ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

বিশেষ সংখ্যা

পল্লীফোন: ডিজিটাল বাংলাদেশের বীজ বপনের গল্প

শরীফ নজমুল

সময়টা ১৯৯৬ সাল। মোবাইল ফোন বলতে তখন শুধু একটি কোম্পানি, কল রেট ১৬ টাকা মিনিট, শুধু আউটগোয়িং নয়, কল এলেও গুনতে হতো একই পরিমাণ টাকা। নতুন সংযোগ কিনতে গেলে দিতে হতো লাখ টাকার ওপরে। তখনো ঢাকা শহরের মধ্যবিত্তরা মোবাইল ফোন কেনার স্বপ্ন দেখতেও সাহস করত না। মোবাইল ফোন ছিল উচ্চবিত্তের স্ট্যাটাস। ঢাকা-চট্টগ্রাম শহর এলাকার বাইরে মোবাইলের কাভারেজও ছিল না। শহরের ল্যান্ডফোনের অবস্থাও ছিল তথৈবচ! টেলিফোন ঘনত্ব ছিল বিশ্বের একদম নিচু সারি দেশগুলোর মধ্যে, হাজারে চারজন। একটি ল্যান্ডফোন সংযোগ পেতে হয়তো ৮-১০ বছর অপেক্ষা পর্যন্ত করতে হতো। তাও বড় বড় শহর এলাকায়। তখন অবশ্য থানা পর্যায়ে ডিজিটাল এক্সচেঞ্জ স্থাপনের লাইসেন্স দুটি কোম্পানিকে ভাগ করে দেয়া হয়েছিল। তাদের মাধ্যমে থানা শহরে অল্প কিছু ফোন সংযোগ দেয়া হচ্ছিল। তবে থানা সদরের বাইরে তথা গ্রামে ফোন দেয়া যাবে, সেটা বাণিজ্যিক কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে লাভজনক হবে তা কেউ ভাবেনি। যখন অনেক গ্রামে বিদ্যুৎ নেই, বেশির ভাগ জায়গায় টেলিভিশন পৌঁছেনি, যেখানে সাক্ষরতা ও শিক্ষার হার কম, কৃষিই প্রাধানতম অর্থনৈতিক কাজ, সেই গ্রামগুলোত ফোনের চাহিদা হবে সেটা ভাবা সত্যিই দুষ্কর ছিল। এ রকম প্রেক্ষাপটে গ্রামের জন্য একটি ফোন, তাও আবার মোবাইল ফোন এবং কলরেট ১ টাকা প্রতি মিনিট? ঠিক নিজের কাছেই বিশ্বাস হতো না। তবে পল্লীফোন ঠিকই সম্ভব হয়েছে। গ্রামীণফোনের নেটওয়ার্ক, গ্রামীণ টেলিকমের ব্যবস্থাপনা আর গ্রামীণ ব্যাংকের ফিল্ড ওয়ার্ক মিলে পল্লীফোন পৌঁছে যায় প্রত্যন্ত গ্রামে। ১৯৯৭ সালের ২৬ মার্চ গ্রামীণফোন উদ্বোধনের দিন পল্লীফোনেরও উদ্বোধন হয়। গ্রামীণ ব্যাংকের দক্ষিণ শাখার সদস্য পাতিরা গ্রামের লাইলি বেগম হন প্রথম পল্লীফোন পরিচালক।

পল্লীফোনের মূল ধারণা ছিল একটি টেলিফোনের মাধ্যমে একটি গ্রামকে বহির্বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত করা। গ্রামীণ ব্যাংকের একজন সদস্য এ ফোন কিনবেন গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে, যেটি তিনি দুই বছরের কিস্তিতে পরিশোধ করবেন। তিনি ফোনটি মানবচালিত ফোন বুথ হিসেবে চালাবেন, যেখানে গ্রামের লোকজন তাদের প্রয়োজনে নির্ধারিত হারে টাকা দিয়ে ফোন কল করতে পারেন। গ্রামের কেউ যদি বাইরে থাকেন (শহরে কিংবা বিদেশে), তারাও তাদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে পারেন। বাইরে থেকে সাধারণত কেউ ফোন করে আগে থেকে একটি সময় জানিয়ে রাখতেন, পল্লীফোন পরিচালক তার কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে খবর দিতেন। তারা নির্ধারিত সময়ে পল্লীফোন পরিচালকের বাসায় এসে অপেক্ষা করতেন। কখনো কখনো পূর্বনির্ধারিত সময়ে পল্লীফোন পরিচালক ফোন নিয়ে চলে যেতেন কোনো বাসায়, যেখানে হয়তো কারো বাইরে থেকে কথা বলার কথা। পল্লীফোনের জন্য গ্রামীণফোনের নির্ধারত কল রেট ছিল পিক সময়ে প্রতি মিনিট ২ টাকা, অফ-পিক সময়ে প্রতি মিনিট ১ টাকা, সাথে বিটিটিবির কল চার্জ যোগ হতো গন্তব্য অনুসারে। মনে করুন একজন ঢাকার পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে চট্টগ্রামের একটি বিটিটিবির নম্বরে ফোন দেবে। পল্লীফোন পরিচালকের জন্য চার্জযোগ্য বিল হচ্ছে গ্রামীণফোনের কল চার্জ+ বিটিটিবির ঢাকা-চট্টগ্রাম এনডব্লিউডি চার্জ+ ১৫% ভ্যাট+ ১৫% সার্ভিস চার্জ। এ সার্ভিস চার্জ গ্রামীণ টেলিকম ও গ্রামীণ ব্যাংক পেত, যা দিয়ে তারা তাদের অপারেশনাল খরচ চালাত। চার্জযোগ্য বিলের ওপর একটি মার্জিন যোগ করে তিনি তার গ্রাহককে চার্জ করতেন। একটি লোকাল কলের জন্য পল্লীফোনের চার্জযোগ্য বিল ছিল ২.৬০ টাকা। তিনি গ্রাহককে চার্জ করতেন ৫ টাকা প্রতি মিনিট। উল্লেখ্য, তখন গ্রামীণফোনের একজন সাধারণ গ্রাহককে কলের জন্য প্রতি মিনিট ৬ টাকা করে দিতে হতো। একজন ব্যবহারকারী পল্লীফোনের মাধ্যমে কল করলেও তাকে দিতে হতো শহরের গ্রাহকের চেয়ে কম। আবার একজন পল্লীফোন পরিচালক প্রতি মিনিট ২.৪০ টাকা আয় করতে পারত। 

গ্রামীণফোনের নেটওয়ার্ক কাভারেজ ম্যাপ নিয়ে গ্রামীণ টেলিকম বিভিন্ন গ্রামে জরিপ করত এবং কোন গ্রামে কাভারেজ আছে তা নিশ্চিত হয়ে ওই গ্রাম গ্রামীণ ব্যাংকের যে শাখার অধীন তাদের তালিকা সরবরাহ করত। গ্রামীণ ব্যাংকের স্থানীয় শাখা তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে সেই গ্রামে পল্লীফোন চালানোর জন্য একজন সদস্য বাছাই করত। গ্রামীণ টেলিকমের অফিসার সেই বাছাইকৃত সদস্যকে ফোন চালনার প্রশিক্ষণ দিতেন। সন্তোষজনকভাবে প্রশিক্ষণ শেষ হলে গ্রামীণ টেলিকম তাকে একটি নকিয়া ১৬১০ হ্যান্ডসেট (এটা ছিল শুরুর মডেল, পরে সময়ের সঙ্গে মডেল পরিবর্তন হয়েছে) গ্রামীণফোন থেকে কেনা পল্লীফোন সিমকার্ডসহ তাকে সরবরাহ করত। যেহেতু শুরুর দিকে বেজ স্টেশনগুলো শহরকেন্দ্রিক হতো, তাই বেশি দূরের গ্রাম হলে ফোনে স্বাভাবিকভাবে সিগন্যাল পাওয়া যেত না। এ রকম অনেক জায়গায় হাই গেইন অ্যান্টেনা যোগ করে তবেই কভারেজ পাওয়া যেত। বিদ্যুৎ না থাকলে অনেকেই সোলার প্যানেল লাগিয়ে নিতেন। এসব উপকরণের সঙ্গে প্রথম সংযোগের সময় পল্লীফোন পরিচালককে লিখিত ব্যবহার বিধি ও আদায়যোগ্য বিলের একটি তালিকা দিয়ে দেয়া হতো, যাতে গ্রাহকরা চার্জের স্বচ্ছতা সম্পর্কে নিশ্চিত থাকত। উপকরণ কেনার ব্যয় বাবদ অর্থ সদস্যের নামে ঋণ হিসেবে গ্রামীণ টেলিকমকে পরিশোধ করে দিত গ্রামীণ ব্যাংক। পরবর্তীতে ওই সদস্য সাপ্তাহিক কিস্তিতে দুই বছরে এ ঋণ পরিশোধ করতেন।

পল্লীফোন ছিল শহর ও গ্রামের মধ্যকার ডিজিটাল বিভাজন দূরীকরণের প্রথম ধাপ। একই সাথে এটা ছিল তথ্যপ্রযুক্তি হাইওয়েতে ওঠার চাবিকাঠি। গ্রামগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন। গ্রামের একজন যুবক হয়তো ঢাকায় এসে কাজ করে। সে তার মা-বাবার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য চিঠি অথবা নিজে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। গ্রামের যে ছেলেটি বিদেশে কাজ করে, সে হয়তো চিঠিও লিখতে পারে না। কেউ কেউ ক্যাসেটে কথা রেকর্ড করে পাঠায় ডাকে অথবা যখন কেউ দেশে আসে তার হাতে, কেউ হয়তো সুযোগের অভাবে বছরের পর বছর মা-বাবাসহ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগহীন থেকে যেত। গ্রামের ফসল উৎপাদনকারী একজন কৃষক তার পণ্য বিক্রি করে দিতেন ফড়িয়ার কাছে। ন্যায্য মূল্য পাওয়ার ব্যাপারে এই মধ্যস্বত্বভোগী দালালের দয়ার ওপর তিনি নির্ভর করতেন। তার উৎপাদিত পণ্যটি ঢাকা কিংবা পাশের শহরেও কত দামে বিক্রি হচ্ছে জানতেনও না। গ্রমের একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর শহরে তার সরবরাহকারীর সঙ্গে নিজে যাওয়া ছাড়া যোগাযোগের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। একটি মাত্র ফোন এই গ্রামের সাথে বাইরের জগতের একটি অদৃশ্য সেতু তৈরি করে দিল। লাইলী বেগমের নম্বরটি শুধু লাইলী বেগমের ফোন ছিল না, এটি ছিল পাতিরা গ্রামের ফোন নম্বর। গ্রামের যে কেউ তার যেকোনো প্রয়োজনে—হোক তা আত্মীয়র সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা শহর থেকে একটি তথ্য সংগ্রহ করা—এ ফোনটি ব্যবহার করতে পারত। শহর কিংবা বিদেশ থেকে যে কেউ চাইলে পাতিরা গ্রামের যে কারো সঙ্গে এ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারতেন। যে গ্রামে যাওয়ার রাস্তা ভাঙা কিংবা দুর্গম, যে গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছেনি, এ রকম গ্রামেও পৌঁছে গিয়েছিল পল্লীফোন। অত্যাধুনিক জিএসএম প্রযুক্তির সাথে যুক্ত হয়ে গেল একটি গ্রাম, যেটি খুলে দিল অপারসম্ভবনার দুয়ার। 

আসলে পল্লীফোনের গুরুত্ব বুঝতে তত্কালীন যোগাযোগ ব্যবস্থা, আর্থসামাজিক ব্যবস্থা মাথায় রাখতে হবে। এখনকার সময়ের টেলিফোনের প্রাচুর্য দেখলে মনে হবে গ্রামে একটা ফোন এটা কী এমন ব্যাপার। যদি আপনি সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে বিষয়টা ভাবেন, তাহলে বুঝবেন এটা এভারেস্ট জয়ের মতোই একটা ব্যাপার কিংবা তার চেয়েও বড় কিছু। এটির প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। গ্রামে একজন মানুষ ফোন দিয়ে কী করবে? একজন দরিদ্র নারী যিনি গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ছোট কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড করে সংসার চালান, তিনি কীভাবে ফোনের বিল দেবেন? একজন নারী যিনি হয়তো শিক্ষিত নন, তিনি কীভাব একটি ফোন চালাবেন? যেখানে গ্রামে বিদ্যুৎ নেই কিংবা সংযোগ থাকলেও লম্বা সময় লোডশেডিং হয়, সেখানে ফোন চলবে কীভাবে? এ কর্মসূচি চালুর আগে এ রকম অসংখ্য প্রশ্নের মুখোমুখি হতাম আমরা। একটা গ্রাম বাছাই করে একটি পল্লীফোন চালু, মাস শেষে সেটার ১০-১২ হাজার টাকার বিল সব প্রশ্নের জবাব দিয়ে দিত। কোনো কোনো ফোনের বিল মাসে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠত। পল্লীফোন চালুর মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে, বাংলাদেশের গ্রামের মানুষ একটা নতুন প্রযুক্তি কত দ্রুত আয়ত্ত করতে পারে। এটা ফোন কোম্পানিকে আশ্বস্ত করেছে, গ্রামের বিপুল জনসংখ্যা মোবাইল ফোনের জন্য কত বড় সম্ভাব্য বাজার। তারা নির্দ্বিধায় বড় অংকের বিনিয়োগ করে গেছে, যার সুফল আজ পাচ্ছে এ দেশের মানুষ, এ দেশের অর্থনীতি।

দেখা গেছে, একটি পল্লীফোন গ্রামের মানুষের জন্য বিভিন্ন রকম অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে। একজন পল্লীফোন পরিচালক স্থানভেদে ৮-১০ হাজার টাকা মাসে আয় করতে পারত তার ফোন বিল দেয়ার পর। এ আয় নির্ভর করত সেই এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বিদেশে কী পরিমাণ লোক থাকে তার ওপর। এ আয় এ এলাকার তারই মতো একজন সামাজিক অবস্থানের ব্যক্তি বা পরিবারের জন্য তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। দেখা গেল, এই পল্লীফোন পরিচলক তার আয় ও বাড়তি আত্মবিশ্বাস ব্যবহার করে অন্য কিছুতে বিনিয়োগ করছেন। একজন ব্যবহারকারীর জন্য একটি কলের কনজিউমার সারপ্লাস ছিল প্রায় ৮০ টাকা। সেটিও তার পরিবারের মাসিক আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংক। বিদেশে অবস্থানরতদের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ ওই এলাকার রেমিট্যান্সেও প্রভাব ফেলেছিল। মানুষ বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করতে পেরেছিল, যেটি হয়তো ফোন না থাকলে সম্ভব হতো না।

আজকের সময়ে ফোন এত বেশি সহজলভ্য যে আমরা এর গুরুত্ব নিয়ে আলাদা করে ভাবি না। কিন্তু সেদিনের সেই পল্লীফোন যদি সফল না হতো, হয়তো বাংলাদেশের গ্রামগুলো আজও কাভারেজের আওতার বাইরে থাকত। অন্তত এটুকু নির্দ্বিধায় বলা যায়, যে সময়ে গ্রামগুলোতে মোবাইল নেটওয়ার্ক কাভারেজ গিয়েছে, হয়তো আরো অনেক দেরি হতো। পল্লীফোনের রেভিনিউ ও সাফল্য আসতে থাকায় গ্রামীণফোন শহরের সাথে সাথে গ্রামের দিকে পরিকল্পিত কাভারেজ বাড়াতে থাকে। সেটি মোবাইল অপারেটরের জন্য পল্লীফোনের সাথে অন্য গ্রাহক যোগ করতে থাকে। ব্যবসায়িক সাফল্য বাড়তে থাকে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রমাণিত ব্যবসায়িক সাফল্যের কারণে প্রতিদ্বন্দ্বী ফোন অপারেটররাও গ্রামে কাভারেজ দেয়া শুরু করে। ফোন সংযোগের ক্ষেত্রে শুরু হয় এক বিপ্লব। আগে যেমন কার ফোন আছে সেটা খুঁজতে হতো, আজ খুজতে হয় কার এখনো ফোন নেই। আর এই সাফল্যের মূলে কাজ করেছে একসময়ের ক্ষ্যাপাটে স্বপ্ন পল্লীফোন। হাজার মাইলের যাত্রার শুরু যেমন একটি পদক্ষেপ দিয়ে, তেমনি আজকের ফোরজি ডাটা দিয়ে বিশ্বের সাথে সংযুক্ত বাংলাদেশের গ্রামগুলোর এ পথের যাত্রা হয়েছিল পল্লীফোনের মাধ্যমে।

শরীফ নজমুল: ১৯৯৭-২০০১ সময়ে গ্রামীণ টেলিকমে কর্মরত ছিলেন