বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২৬, ২০২০ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

বিশেষ সংখ্যা

হালকা প্রকৌশল: বৃহৎ শিল্পের সাফল্যের নীরব সহযোগী

মো. আব্দুর রাজ্জাক

বিশ্বব্যাপী বৃহৎ শিল্পের সাফল্যের নীরব সহযোগী হালকা প্রকৌশল বা লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাত। বিশ্ববাজারে এ খাতের আকার ৭ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এ খাত সব শিল্পের প্রাণ বললে অত্যুক্তি হবে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। উল্লিখিত খাতের স্থানীয় কারিগররা তৈরি করছেন সব শিল্প-কারখানার চালিকাশক্তি মৌলিক যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে হালকা প্রকৌশল শিল্পের কারখানা। এ খাতে এখন ১০ হাজার কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন হচ্ছে। স্থানীয় ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজার চাহিদার এক-তৃতীয়াংশের জোগান আসছে এ খাতের ছোট-বড় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে। তারা ছোটখাটো সাধারণ নাট বোল্ট থেকে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির আধুনিক যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ তৈরি করছেন। এটি আমদানি-বিকল্প এবং রফতানি সম্ভাবনাময় একটি খাত।

মূলত স্বাধীনতার পরই দেশে হালকা প্রকৌশল শিল্পের যাত্রা। প্রথমে বিভিন্ন শিল্প ও যানবাহনের কিছু কিছু যন্ত্রাংশ তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শুরু হয় পুরান ঢাকার ধোলাইখালসংলগ্ন চারপাশ এলাকার টিপু সুলতান রোড, বাংলাবাজার, বংশাল, মদন পাল লেনসহ গুটি কয়েক কারখানায়। তখন প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে অনেক দুর্বলতা ছিল এ খাতে। সব কারখানা মিলে গোটা দুয়েক মিলিং মেশিন, দু-তিনটি ক্র্যাংকশ্যাপ্ট রিগ্রাইন্ডিং, তিন-চারটি শেপিং মেশিন, ছোট-বড় মিলিয়ে ২৫-৩০টি লেদ মেশিন, ড্রিল, ওয়েল্ডিং ও টুলস গ্রাইডিংয়ের মতো কিছু সাধারণ মেশিন ছিল। ১৯৮৬ সালে শিল্প মন্ত্রণালয় কর্তৃক ধোলাইখাল-জিঞ্জিরা প্রকল্প নামে ৫ কোটি টাকা বিসিকের মাধ্যমে ঋণ বরাদ্দ দেয়ার পর এ খাত বিকশিত হতে থাকে। তখন উদ্যোক্তাদের বন্ধক ছাড়াই ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেয়া হয়। এর মধ্যে ৭ লাখ টাকার যন্ত্রপাতি এবং ৩ লাখ টাকার চলতি মূলধন। গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে সাবকন্ট্র্যাক্টিং ব্যবস্থাও চালু করা হয়। এতে দেশী কারখানাগুলোতে চাহিদার অন্তত একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে সংগ্রহের বাধ্যবাধকতা দেয়া হয়। এতে এ খাতের উদ্যোক্তারা উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ হয়ে নতুন যন্ত্রাংশ ও যন্ত্র তৈরির কাজ বাড়িয়ে দেন। পরে ধোলাইখাল-জিঞ্জিরা মডেল নামে প্রকল্পে আরো ১৫ কোটি টাকা দেশব্যাপী বরাদ্দ দেয়া হয়। তখনকার সেই উদ্যোগের সুফল মিলছে এখন। বর্তমানে এ খাতে প্রত্যক্ষভাবে ছয় লাখ দক্ষ ও প্রায় ১০ লাখ আধাদক্ষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান রয়েছে। পরোক্ষভাবে প্রায় ৬০ লাখ ব্যক্তি জীবিকা নির্বাহ করছেন এ খাতকে কেন্দ্র করে। এ খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ। এটি আরো বাড়ানো সম্ভব।

প্রথম দিকে এ খাতের কারখানাগুলো রাজধানীর ধোলাইখাল, টিপু সুলতান রোড, নারিন্দা, তাহের বাগ, বনগ্রাম, জিঞ্জিরা, কেরানীগঞ্জ ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ছিল। পরে ঢাকার বাইরে বগুড়া, সৈয়দপুর, যশোর, চট্টগ্রাম, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, পাবনা, নাটোর, রাজশাহী, নওগাঁ, কুমিল্লা, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলায় কারখানা গড়ে তুলেছেন উদ্যোক্তারা। আগে যেখানে সারা বাংলাদেশে ৫০-৬০টি কারখানা ছিল, সেখানে এখন পুরান ঢাকাসহ সারা দেশে এ শিল্পের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার কারখানায় দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ১০ শতাংশ উৎপাদনভিত্তিক কারখানা এবং বাকিগুলো সার্ভিসিং ও মেরামত খাতের কারখানা। স্ব-উদ্যোগে গড়ে ওঠা এ খাতে উৎপাদিত পণ্যের মানোন্নয়ন এখনো সেভাবে সম্ভব হয়নি। প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে থাকা এ শিল্পের উদ্যোক্তারা এখনো শতবছরের পুরনো প্রযুক্তিনির্ভর। 

এ শিল্পের বিকাশের সঙ্গে নগরায়ন ও গ্রামীণ রূপান্তরের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। নৌকায় ইঞ্জিন প্রবর্তন, গ্রামে-গঞ্জে নছিমন-করিমন-ভটভটি জাতীয় গাড়ির প্রচলন, পাওয়ার টিলার দিয়ে চাষাবাদ, সেচ পাম্পের ব্যবহার প্রভৃতি খাতটিকে আরো এগিয়ে নিয়ে গেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে যন্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়েছে, সেগুলো সচল রাখতে মেরামত ও সার্ভিসিং করার জন্য ওয়ার্কশপের প্রয়োজন। বলা চলে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে যখন যান্ত্রিকীকরণের প্রসার ঘটেছে, তখন গ্রামে-গঞ্জে শিল্পটি ছড়িয়ে পড়ছে। তবে সময়ের পরিক্রমায় যেখানে খাতটির থাকার কথা, সেখানে বর্তমানে নেই। এর কারণ এ খাতের জন্য উপযোগী শিল্প অবকাঠামো গড়ে না ওঠা, বিনিয়োগ না হওয়া ও সহায়ক নীতিমালার অভাব। এ সম্পর্কে নীতিনির্ধারক ও আমলাতন্ত্রের মধ্যে জানার একটা বিরাট গ্যাপ রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট খাতের অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা না করলে ওই খাতের প্রকৃত সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানা যায় না। সুখের বিষয় সম্প্রতি শিল্প মন্ত্রণালয় বিষয়টি অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছে এবং এরই মধ্যে কতগুলো কার্যক্রমও শুরু করেছে। শ্রমিকরা মূলত কাজ শেখার জন্য প্রথমে ঢাকায় আসেন। এরপর কাজ শিখে গ্রামে ফিরে যান। সেখানে স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী কারখানা গড়ে তোলেন। যেমন গ্রাম পর্যায়ে কৃষিকাজের যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ তৈরি, মেরামত ছাড়াও তৈরি হচ্ছে বাড়ি-ঘরের স্টিলের দরজা, জানালা, আলমারি, ফাইল ক্যাবিনেটসহ সব ধরনের আসবাব ইত্যাদি হালকা প্রকৌশল পণ্য। সর্বত্র বিদ্যুতায়ন হচ্ছে। সেখানে সুইচ-সকেট, তার, বিভিন্ন ধরনের বাল্ব, বৈদ্যুতিক পাখা, নাট বোল্ট ইত্যাদি চাহিদ তৈরি হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার ছাড়াই অনেক কঠিন কাজ এসব কারখানায় তৈরি হচ্ছে সেকেলে প্রযযুক্তি দ্বারা। এখন এর আদলটা বদলাতে হবে।

হালকা প্রকৌশল শিল্পে আমাদের বিনিয়োগ প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এখানে সরকারের কোনো বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। বিশ্ববাজারের ৭ ট্রিলিয়ন ডলারের মধ্যে আমাদের দখলে ১ শতাংশও নেই। খাতভিত্তিক বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ৯-১০ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। একসময় এটি দ্রুত বেড়েছিল। এখন সেভাবে বাড়ছে না। স্থবির অবস্থায় আছে। জিডিপিতে এর অবদান ৩ শতাংশ। বর্তমানে কমে এখন আড়াই শতাংশে নেমে এসেছে। এ খাতের অব্যাহত রফতানি ধারা ২০১৫-১৬ সালে ছিল ৫১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৬-১৭ সালে ছিল ৬৬৮ দশমিক ৮৪ মিলিয়ন ডলার। ২০১৭-১৮ সালে তা নেমে দাঁড়ায় ৩২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। ২০১৮-১৯-এ তা নেমে দাঁড়ায় ৩১৯ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এখন পতনের দিকে। এর কারণ আমাদের নীতি। আমরা প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাচ্ছি। আগে অনেক ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমাদের কারখানাগুলোয় তৈরি হতো। বর্তমানে কর-ভ্যাট আরোপের ফলে কারখানাগুলো মূলধনি যন্ত্র তৈরিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন মেশিন আমদানি বাড়ছে, অন্যদিকে দেশীয় শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে বেকার সমস্যাও বাড়ছে।

অবশ্য চলতি বছর প্রধানমন্ত্রী হালকা প্রকৌশল শিল্পের পণ্যকে বর্ষপণ্য ঘোষণা করেছেন। অর্থ মন্ত্রণালয় SEIP প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে যুগান্তকারী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। অন্যদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও শিল্প মন্ত্রণালয় কর্তৃক ভালো ভালো উদ্যোগ নেয়া হলেও কভিড-১৯-এর কারণে সেগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। এ খাতকে এগিয়ে নিতে সরকারের সহযোগিতামূলক মনোভাব লক্ষণীয়। কিন্তু জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ঘোষিত কর কাঠামো, বিশেষ করে মূল্য সংযোজন কর ও কাঁচালের ওপর আমদানি শুল্ক সরকারের শিল্পায়নের আকাঙ্ক্ষার সাথে অনেকটা বেসুরো বা বিপরিতমুখী মনে হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রয়োজনে নয়, রাষ্ট্রের প্রয়োজনে এ খাতকে এগিয়ে নেয়া এখন সময়ের দাবি। আমরা সম্ভাবনাময় এ খাতের বিকাশই দেখতে চাই।

বিশ্ববাজারের ১ শতাংশও দখল করা সম্ভব হলে ৭০ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ আমরা রফতানি বাড়াতে পারব। এ সুযোগ এখনো আছে। ২০০৫ সালে ডব্লিউটিওর হংকং ঘোষণায় ৯৭ শতাংশের অন্তর্ভুক্ত প্রণোদনার মধ্যে হালকা প্রকৌশল খাত এখনো আওতাধীন। এ সুযোগ-সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। নইলে আমাদের জন্য বড় দুর্ভাগ্য অপেক্ষা করবে। বর্তমানে দেশে জনমিতিক বোনাস বিদ্যমান। এটি বেশি দিন থাকবে না। কাজেই সময়ের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে হবে।

বিভিন্ন শিল্প-কারখানার জন্য আমরা প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার মোল্ড আমদানি করি। এর সবই স্থানীয়ভাবে তৈরি করা সম্ভব। এক্ষেত্রে কিছু আমরা তৈরি করছি বটে, কিন্তু সবটা এখনো পারছি না। হালকা প্রকৌশলের জন্য আমরা একটি নিবেদিত শিল্প পার্ক দাবি করে আসছি অনেক দিন ধরে। এখন এ ধরনের একটি পার্ক নির্মাণের কাজ প্রায় এক যুগ ধরে বাস্তবায়ন হচ্ছে। যেসব জায়গায় এ শিল্পের পণ্যের চাহিদা রয়েছে, সেখানে এ ধরনের উদ্যোগের কথা আমরা বলেছি। সরকারি কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিয়েছে। একই সঙ্গে সাবকন্ট্র্যাক্টিং পুনরায় চালুরও আশ্বাস পাওয়া গেছে। এমনটি হলে সরকারের অভ্যন্তরীণ ক্রয় প্রক্রিয়ায় আমাদের খাতের একাংশ পণ্য সংযোজন সম্ভব হবে। গয়রহভাবে আমদানি করতে হবে না। এতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। বর্তমানে একদিকে সরকারের পক্ষ থেকে অনেক সুবিধা দেয়া হচ্ছে, অন্যদিকে টেকনিক্যাল জায়গায় প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে। আশা করি এটা অচিরেই দূরীভূত হবে। সেগুলো দূর করা হলে আরো বড় মাত্রায় হালকা প্রকৌশল শিল্প অবদান রাখতে পারবে এবং কারো পেছনে রেখে নয়, সবাইকে এগিয়ে নেয়ার এসডিজিও পূরণ করতে পারব। 

হালকা প্রকৌশল শিল্পের সামনে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। ১। পুঁজি, ২। প্রযুক্তি, ৩। প্রশিক্ষণ, ৪। পরিকল্পিত শিল্পপার্ক ও ৫। পলিসি সাপোর্ট।

পুঁজি: এ খাতে ব্যাংকের বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। দেশের বড় বড় শিল্প বাণিজ্যের করপোরেট গ্রুপগুলোরও তেমন কোনো বিনিয়োগ নেই। সম্ভবত এ খাত সম্পর্কে জানা না থাকার কারণে ব্যাংকগুলো বিনিয়োগের ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী নয়। ফলে এখানে পুঁজির সমস্যা প্রকট। উচ্চসুদের ঋণ ও সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ নিয়ে ব্যবসা এগিয়ে নেয়া দুরূহ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সমমূলধন সহায়তা তহবিল (ইইএফ) থাকলেও এ সুবিধা থেকে হালকা প্রকৌশল খাত বঞ্চিত। তাই এ খাতের জন্য ১ হাজার কোটি টাকার আলাদা তহবিল গঠনের দাবি করছি আমরা। প্রকৃত অর্থে কার্যকর ভেঞ্চার ক্যাপিটালের সুবিধা প্রতবর্তন করাও প্রয়োজন, যা বাংলাদেশে অদ্যবধি আবির্ভূত হয়নি। 

প্রযুক্তি: স্বল্প পরিসরে প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানসম্মত পণ্য তৈরি হলেও দেশের চাহিদা ও বিশ্ববাজারের উপযোগী নয়। পুরনো প্রযুক্তি দিয়ে স্বল্প সময়ে ম্যানুয়াল মেশিনে বেশিসংখ্যক পণ্য তৈরিও সম্ভব নয়। এজন্য সরকারের সহায়তা পেলে কারখানাগুলোতে উন্নত প্রযুক্তি আনা সম্ভব হবে। কাজেই প্রযুক্তিগুলো হালনাগাদ করতে সরকারি সমর্থন জরুরি হয়ে পড়েছে। 

প্রশিক্ষণ: এ খাতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ জনবলের যথেষ্ট ঘাটতি আছে। এখানে উন্নতি ঘটাতে হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছয় বছর ধরে SEIP নামে একটি প্রকল্প দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য চলমান রয়েছে। তবে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ হচ্ছে সীমিত পরিসরে। এর অন্যতম কারণ দেশে উপযুক্ত প্রশিক্ষক নেই। দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বিদেশ থেকে প্রশিক্ষক আনতে হবে। অন্তত ৫০ জন প্রশিক্ষক তৈরি করা গেলে লাখো জনশক্তি দক্ষ হবে এবং এ খাতে বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটবে।

পরিকল্পিত শিল্পপার্ক: উন্নত প্রযুক্তির কারখানা স্থাপনে পরিকল্পিত শিল্প পার্কের বিকল্প নেই। যেখানে পরিবেশের ছাড়পত্র নিতে হবে না, বর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশনসহ নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের পাশাপাশি পৌর সুবিধা থাকবে বিদ্যমান। আরো থাকবে সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ সবুজায়ন, জলাধার, প্রদর্শনী কেন্দ্র, শপিং আর্কেড, হোটেল-রেস্তোরাঁ, নামাজের ব্যবস্থা ও হালকা-ভারী ট্রান্সপোর্টের পার্কিং সুবিধা ইত্যাদি। বন্ডেড ওয়্যারহাউজ ও সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টের দাপ্তরিক সুযোগ-সুবিধাসহ পুরোপুরি কমপ্লায়েন্ট শিল্পনগরী গড়ে তুলতে হবে। সরকার বেশ কয়েক বছর ধরে বিসিকের মাধ্যমে মুন্সীগঞ্জের বেতকায় ৩১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫০ একর জমিতে এ ধরনের একটি শিল্পনগরী স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ শেষে ৮০ শতাংশ ভরাট করা হয়েছে। বিসিকের সূত্রানুযায়ী ২০২২ সালের মধ্যে এ নগরীর কাজ শেষ হবে। এছাড়া সম্ভাবনাময় এলাকাগুলোয় ক্লাস্টার আকারে পার্ক গড়ে তোলার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিসিক ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, যশোর, বগুড়া, গাজীপুর ও নরসিংদীতে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প পার্ক স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিল্প পার্কগুলোতে স্থাপিত কারখানার জন্য দক্ষ জনবলের জোগান নিশ্চিত করতে বিটাকের তত্ত্বাবধানে একই সঙ্গে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্থাপন করার আশ্বাস দেয়া হয়েছে। এসব বিষয় ইতিবাচক বলেই মনে হয়।

পলিসি সাপোর্ট: অর্থাৎ নীতিসহায়তা। এক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যজনক অবস্থায় আছে হালকা প্রকৌশল খাত। কাঁচামালে শুল্ক ও করের চাপে পিষ্ট এ খাত। অথচ সম্পূর্ণ তৈরি পণ্য আমদানির শুল্ক ১ শতাংশ। এমন শুল্ক বৈষ্যমে এ খাতের এগোনো কঠিন। তবে রফতানি নীতিতে সরকার এ খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। শিল্প নীতিতেও এ খাতকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। ২০১৯ সালের এসএমই নীতিতেও হালকা প্রকৌশলকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বর্তমানে হালকা প্রকৌশল পণ্য রফতানিতে ১৫ শতাংশ নগদ সহায়তা চালু রয়েছে। এত কিছু থাকলেও অবাস্তব শুল্ক কর কাঠামো ও ট্যারিফ বিন্যাসের কারণে সবকিছু ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

ওপরের এ পাঁচটি বিষয়ে সরকার যত তাড়াতাড়ি সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে দেশের অর্থনীতির স্বার্থে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে তত দ্রুত আমরা প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত বর্ষপণ্য শুধু দেশের অভ্যন্তরে নয় বিশ্ববাজারে হালকা প্রকৌশল পণ্য ছড়িয়ে দিয়ে এর সার্থকতা নিশ্চিত করতে পারব, ইনশাআল্লাহ। এবং ২০৩০ সালের এসডিজি অর্জন ও রূপকল্প ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের মাধ্যমে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি ও স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

মো. আব্দুর রাজ্জাক: সভাপতি, বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতি (বাইশিমাস)