বৃহস্পতিবার | অক্টোবর ২৯, ২০২০ | ১৪ কার্তিক ১৪২৭

সিল্করুট

চা পরিবহন থেকে চট্টগ্রাম বন্দর আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে

এম এ মোমেন

শুরুটা আসামের এবং আরো এগিয়ে শ্রীহট্টের সুস্বাদু চা গোরাদের এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে বিলেতে চায়ের বাজার গরম করতে তাদের প্রচারণাই যথেষ্ট ছিল। মূলত চা পরিবহন রফতানির লক্ষ্য নিয়ে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের যাত্রা। এই চা একবার চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলে তা তুলে নেয়ার জন্য জাহাজের প্রতীক্ষায় থাকতে হবে না। এমনিতেই চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর ইংলিশ, ডাচ, ফ্রেঞ্চ পর্তুগিজ বণিকদের নজর পড়েছিল। আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের ওয়াগনে প্রথম চায়ের চালান যখন চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছল, ধরা যেতে পারে তখন থেকেই শুরু হলো আধুনিক চট্টগ্রাম বন্দরের বিকাশ। আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের অধিক্ষেত্র অনুন্নত ভূখণ্ড। পুরোটাই মিটার গেজ রেলওয়ে। শুধু চা নয়, কয়লা পরিবহনেও এই রেলওয়ের স্মরণীয় ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশে যমুনার পূর্বাঞ্চলে রেলওয়ে স্টেশনভিত্তিক ছোট ছোট নগরী ব্যবসা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় এই রেলওয়ের অবদান অনস্বীকার্য।

বুলক ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি’—ডেভিড রবার্ট লায়ালের এই রসাত্মক বর্ণনা তুলে ধরেছেন ডেপুটি কালেক্টর লেখক নবীন চন্দ্র। চট্টগ্রামের কমিশনার লায়াল সাহেব দুষ্টু বলদে টানা গাড়িকে এভাবইে ব্যাখ্যা করেছিলেনএই অবস্থা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে স্কটিশ। এই আমলা চট্টগ্রামেই হয় আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের হেড কোয়ার্টার্স। এই নিবন্ধে আসাম বেঙ্গল রেলওয়েকে কেন্দ্র করে তখনকার রেলওয়ের কিছু খণ্ড চিত্র তুলে ধরা হবে।

আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি লিমিটেড

১৮৬২ সালের কোম্পানি আইন ১৮৯০ সালের সংশোধিত আইনে গঠিত কোম্পনির রেজিস্টার্ড অফিস ইংল্যান্ডে। এর মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন অনুযায়ী প্রতিটি শেয়ারের মূল্য ১০ পাউন্ড স্টার্লিং। মোট লাখ ৫০ হাজার শেয়ারের মাধ্যমে মূলধনের পরিমাণ ১৫ লাখ পাউন্ড স্টার্লিং। কোম্পানির কার্যপরিধি বহুল বিস্তৃত, তাতে অন্য কোম্পনি অধিগ্রহণ করার কথাও আছে। রেলওয়ের সাথে খনি, খনিজ দ্রব্য, ডক, জেটি, গ্যাস ইত্যাদি অধিগ্রহণ নির্মাণের ক্ষমতাও কোম্পানির রয়েছে।

কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশনে যাদের স্বাক্ষর রয়েছে তারা হচ্ছেন:

রিচার্ড স্ট্যাচি

    ৬৯ ল্যাঙ্কাস্টার গেট লন্ডন

. লেফটেন্যান্ট জেনারেল ক্যাভেন হিলস্লে ডিকেন্স

    ৭৬ লেক্সাহাম গার্ডেন, কেমসিংটন, লন্ডন

. লেফটেন্যান্ট জেনারেল জেমস মেডোস রেন্ডেল (অব.)

    টন্ডোন বিল্ডিং, লিঙ্কনস ইন, লন্ডন

.     ব্যারিস্টার উইলিয়াম লিভিংস্টোন ওয়াটসন

    ১০ ওয়েদারবাই প্লেস, সাউথ কেমসিংটন, লন্ডন

. স্যামুয়েল গার্নি শেপার্ড

    ৫৭ ওল্ড বন্ড স্ট্রিট, লন্ডন

.    হোয়াই এমহাস্ট ইউভুওয়ার্স স্কুট

    ৫৭ ওল্ড বন্ড স্ট্রিট, লন্ডন

. ম্যন্টেগু ক্লে উইকিলসন

    ৭২ গ্লস্টার টেরাস, হাইড পার্ক, লন্ডন।

মেমোরেন্ডাম স্বাক্ষরের তারিখ ১৮ মার্চ ১৮৯২

কেবল আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে নয়, বাংলায় রেলওয়ের উদ্ভব বিকাশ সম্পর্কে অবগত হওয়ার জন্য দিনাক সোহানী কবিরের অভিসন্দর্ভ পূর্ব বাংলার রেলওয়ের ইতিহাস ১৮৬২-১৯৪৭ আগ্রহী পাঠকের হাতের কাছে রাখার মতো একটি গ্রন্থ। রাধারমণ মিত্রের কলিকাতা দর্পণ গ্রন্থের যোগাযোগ ব্যবস্থা: রেলপথ অধ্যায়টি সার্বিকভাবে বৃহৎ বাংলার রেলওয়ে পরিবহন ব্যবস্থা সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়।

১৯৪২ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের সাথে একীভূত হয়ে যায়, তখন নাম হয় বেঙ্গল অ্যান্ড আসাম রেলওয়ে। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর পূর্ব বাংলার অংশের নাম হয় ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ে। ১৯৬১ সালে নামায়ন হয় পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়ে। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

ইন্ডিয়া গেজেটে প্রকাশিত রেলওয়ে বিজ্ঞপ্তি (অনূদিত) ১৪ আগস্ট ১৮৫৪

ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ে

অত্র আগস্ট মাসের ১৫ দিবস মঙ্গলবার হইতে ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ের ট্রেন যথাক্রমে হাওড়া হুগলি হইতে নিম্নবর্ণিত সময়ে যাত্রা করিবে:

হাওড়া হইতে সকাল ১০.৩০ ঘটিকা, অপরাহ্ন .৩০ ঘটিকা হুগলি হইতে সকাল .২৩ ঘটিকা, অপরাহ্ন .৩৮ ঘটিকা ট্রেন বালী, শ্রীরামপুর চন্দননগর স্টেশনে থামিবে।

১লা সেপ্টেম্বর হইতে ট্রেন হাওড়া পাণ্ডুয়ার মধ্যে চলাচল করিবে, সকল স্টেশনে থামিবে।

যে সকল যাত্রী কম ভাড়ায় মাসিক টিকেট চাহেন তাহাদের প্রতি অনুরোধ রহিল তাহারা যেন একটি রেলওয়ে স্টেশনে ফর্ম চাহিয়া দরখাস্ত করেন এবং ফর্ম পূরণ করিয়া যত শীঘ্র সম্ভব ম্যানেজিং ডিরেক্টর এজেন্ট বরাবর পাঠাইয়া দেন। মাসিক টিকেটের দর পরবর্তীকালে নির্ধারণ করা হইবে। উল্লেখ রহিল ১লা জানুয়ারির পূর্বে কাহাকেও মাসিক টিকেট দেওয়া হইবে না।

১২ আগস্ট ১৮৫৪ ইং

আর ম্যাকডোনাল্ড স্টিভেনসন

২৯ থিয়েটার রোড

কলকাতা।

নারীর জন্য স্বতন্ত্র বগির দাবি

১৫১ বছর আগে ঢাকা প্রকাশ এতাদশীর স্ত্রীদিগের নিমিত্ত স্বতন্ত্র রেলওয়ে শকট দাবি করেছে। যদি প্রথম দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণী করে এবং শ্রেণী বিভেদভিত্তিক ভাড়া নির্ধারণ করা হয়, তাতেও আপত্তি নেই। কিন্তু স্ত্রী শকট মাত্রেই এমন বন্দোবস্ত রাখতে হবে যাতে স্ত্রী শকটের সহিত পুরুষদিগের কোনোরূপ সংস্রব না থাকে...স্ত্রী শকটের রক্ষণাবেক্ষণাদির জন্য স্ত্রীলোক গার্ড রাখিতে হইবে। দুর্বৃত্তেরা স্ত্রীবেশ ধারণ করিয়া স্ত্রী শকটে প্রবেশপূর্ব্বক অত্যাচারাদি করিতে না পারে জন্য প্রত্যেক স্ত্রী শকট রক্ষিকাদিগের এই কর্তব্য হইবে, তাহারা স্ত্রীলোকদিগকে এক-দুই করিয়া দেখিয়া শকটাভ্যন্তরে প্রবেশ করিতে দেয়। পাছে তাহারা কোনো দুর্বৃত্তের অর্থ প্রলোভনে মুগ্ধ হইয়া তাহাকে স্ত্রীবেশে শকটাভ্যন্তরে প্রবেশপূর্ব্বক দুরভিসন্ধি সাধন করিতে দেয়, এই নিমিত্ত স্ত্রী রক্ষিকাদিগের প্রতি সবিশেষ শাসন রাখিতে হইবে। তাহারা ভ্রমক্রমে কোন স্ত্রীবেশধারী পুরুষকে শকটে প্রবেশ করিতে দিলেও গুরুতর দণ্ডে দণ্ডিতা হইবে এইরূপ নিয়ম থাকিবে। সাধারণ শকটের সহিত স্ত্রী শকটের এরূপ স্বাতন্ত্র্য বিধান করিতে হইবে যেন চলিষ্ণু শকটের পুরুষ গার্ডগণও বহিঃপার্শ্ব দিয়া স্ত্রী শকট পর্যন্ত যাতায়ত করিতে না পারে।

(২৩ মে ১৮৬৯ ঢাকা প্রকাশে মুদ্রিত দাবির একাংশ মুনতাসির মামুন সম্পাদিত ঊনিশ শতকে বাংলাদেশের সংবাদ সাময়িক পত্র থেকে উদ্ধৃত। এতে স্ত্রী শকটে টয়লেট স্থাপনসহ স্ত্রীলোকের ঘনিষ্ঠ পুরুষ আত্মীয়স্বজনের ব্যাপারে কী করণীয়, স্টেশনে ট্রেন থামার পর স্ত্রী যাত্রী যদি তার পুরুষ সঙ্গীকে খুঁজে না পান সেক্ষেত্রে কী করতে হবে তার বিবরণ দেয়া হয়েছে।)

শতবর্ষ আগে বাংলার রেলওয়ে

১৯১৭ থেকে ১৯২২ বাংলা সরকার এই পাঁচ বছরের জন্য যে সংক্ষিপ্ত রেলওয়ে প্রতিবেদন করেছে তাতে ইস্টার্ন রেলওয়ে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে অবিচ্ছিন্নভাবে বিবেচিত হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে কিছু হালকা রেলওয়ে ছাড়া বাংলার রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার পুরোটাই সরকারের নিয়ন্ত্রণে। সময়ের নেটওয়ার্ক বিস্তৃতির প্রধান দুটি কাজ হচ্ছে ময়মনসিংহের সাথে নেত্রোকোনা কিশোরগঞ্জের সাথে ভৈরব বাজারের সংযোগ সাধন। ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা ১৯১৭ সালে কিশোরগঞ্জ-ভৈরববাজার ১৯১৮ সালে পুরোদমে চালু হয়েছে।

পূর্ব বাংলার জনগণের চাওয়া ঢাকা-কলকাতা ঢাকা-বরিশালের মধ্যে নদীপথ এড়িয়ে রেল যোগাযোগ স্থাপন করা। দুটোই খুব বড় চ্যালঞ্জ। কারণ এতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদীপ্রবাহ অতিক্রম করতে হবে। নদীপ্রবাহে বাধা অধিকতর ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। একই কারণে ফরিদপুর-যশোর রেল যোগাযোগ পরিকল্পনা ত্যাগ করতে হয়েছে। তবে যশোর-বরিশালের মধ্যে সংযোজনক সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রাথমিক জরিপ সম্পন্ন করা হয়েছে। পদ্মা ধলেশ্বরীর মধ্যবর্তী ভূখণ্ডে ঢাকা-গোয়ালন্দ রুটে সময় দূরত্ব কমানোর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে ১৯২০ সালে একটি কমিটিকে পরীক্ষা করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। কমিটির কিছু কিছু সুপারিশ বাস্তবায়ন সরকারের বিবেচনাধীন। গভর্নর লর্ড রোনাল্ডশের মূল উদ্বেগ দার্জিলিং হিমালয় রেলওয়েসহ সব রুটে বাহনে যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তিন ভয়ংকর ঝুঁকিবহুল লেভেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা কমিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছেন। একটি বিদেশী বিশেষজ্ঞ দল কলকাতার অবস্থা জরিপ করে টিউব রেলওয়ে চালুর বিষয়ে প্রস্তাব উত্থাপন করেছে।

আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে: স্টেশনে ট্র্যাজেডি

বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলনের প্রথম গৌরব বাংলাদেশেই, কিন্তু বিসর্জন বেশি দিয়েছে আসাম। সম্ভবত ভাষার জন্য পৃথিবীতে সর্বাধিক বাঙালিদের ওপর অহমিয়া ভাষা চাপিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে কাছাড় জেলা সদরের শিলচর স্টেশনে পিকেটিংয়ে গ্রেফতারের প্রতিবাদ সভায় ১৯ মে ১৯৬১ পুলিশি হামলা গুলিবর্ষণ চলে। সভাটি ছিল স্টেশনসংলগ্ন খোলা মাঠে। গুলিতে নিহত হন কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, হিতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্রকুমার দেব, কুমুদরঞ্জন দাস, সুনীল সরকার, তরণী দেবনাথ, শচীন্দ্র চন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সুকোমল পুরকায়স্থ এবং একমাত্র নারী কমলা ভট্টাচার্য্য। শিলচর স্টেশনের নাম বদলে এই স্টেশনের নাম ভাষা শহীদ স্টেশন করার প্রস্তাব কেন্দ্রীয় সরকার অনুমোদন করেনি।

বাংলার প্রথম ট্রেন

রেল কোম্পানির মালিক ভারত সরকার, বিলেতের সরকারও না। মালিক ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানি। প্রথম বাণিজ্যিক যাত্রা ১৫ আগস্ট ১৮৫৪ (ব্যাপারটা কাকতালীয়, ৯৩ বছর পর এমন ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হয়) হাওড়া থেকে কলকাতা। হাওড়া থেকে হুগলি প্রথম শ্রেণীর ভাড়া টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণীর টাকা আনা আর তৃতীয় শ্রেণীর আনা।

প্রথম দিনের ট্রেনের যাত্রী রূপচাঁদ ঘোষ এত অল্প সময়ে হুগলি পৌঁছে বিস্মিত আতঙ্কিত হয়ে রামনাম জপতে শুরু করেন। এটি শয়তানের কোনো লীলাখেলা হতে পারে এবং ইঞ্জিনের কয়লার আগুন তার জীবন থেকে আয়ু কেটে নিতে পারে এই ভয়ে তিনি আর ট্রেনে ফিরে যাননি।

সম্বাদ ভাস্বর খবর ছেপেছে:

লৌহবস্তু দিয়া বাষ্পীয় শকট চলিতেছে। ইহাতে প্রতিদিবসে ছাবড়া, শ্রীরামপুর, ফরাসডাঙ্গা, হুগলি এই চারিস্থানে লোকারণ্য হইতেছে। লোকদের ভীড়ে টিকীট বিক্রয় গৃহে ক্রেতারা প্রবেশ করিতে পারেন না, যাহারা ঠেলাঠেলী করিয়া অতিকষ্টে অগ্রে যান তাহারাই টিকীট প্রাপ্ত হন।

রবীন্দ্রনাথের রেলওয়ে

১৮৭৩-এর ১৪ ফেব্রুয়ারি তখনো ১২ বছর পূর্ণ হওয়া বালকের বাবা আইন মেনে যথারীতি হাফ টিকেট কিনলেন, কিন্তু টিকেট চেকার তার বয়স মানতে রাজি নন। কথা সে কথার পর যখন স্টেশন মাস্টারও এসে বললেন, দেখে তো ১২ মনে হয় না। বাবা পুরো টিকিটের জন্যই টাকা দিলেন। দাম কেটে অবশিষ্ট টাকা যখন বাবার হাতে ফিরিয়ে দিলেন, তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বাকি যা ছিল সব প্লাটফর্মে ছুড়ে ফেললেন। তিনি ছেলের জন্য মিথ্যে বলে টাকা বাঁচানোর মানুষ নন। তিনি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর আর ১২ বছর হতে মাস বাকি থাকা বালকটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এটা তার প্রথম ট্রেন ভ্রমণ, দ্বিতীয়বার দাদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে পশ্চিমে। শুধু যাত্রীবাহী ট্রেন নয়, একবার মালগাড়িতে তাকে যেতে হয়েছে। প্যাসেঞ্জার ট্রেন নেই, কিন্তু তাকে অসুস্থ ছেলে শমীন্দ্রের কাছে পৌঁছতেই হবে। অগত্যা রেল বিভাগ তাকে মালগাড়িতেই উঠিয়ে নিল। মৃত্যুর চারদিন আগে রবীন্দ্রনাথ ট্রেনের সেলুন কারে শুয়ে শুয়ে (উঠে দাঁড়ানোর শক্তি তখন রহিত) বোলপুর থেকে কলকাতা ফিরছিলেন। তার একটি প্রেমের কবিতার রেলের বগি স্মৃতিময় হয়ে আছে: রেলগাড়ির দরজায় হঠাৎ দেখা/ ভাবিনি সম্ভব হবে কোনদিন/ ...সবাই নেমে গেল পরের স্টেশনে/ আমি চললেম একা।

রেলওয়ে রবীন্দ্রনাথকে অমর্যাদা করেনি। ১৩ নভেম্বর ২০১১ চালু হয়েছে কবিগুরু এক্সপ্রেস ইস্টার্ন রেলওয়ের ট্রেনটি ব্রড গজ লাইনের ওপর দিয়ে হাওড়া জংশন স্টেশন থেকে বোলপুর পর্যন্ত যাওয়া-আসা করে। পথের দূরত্ব ১৫৯ কিলোমিটার। হাওড়া থেকে ছাড়ার পর তিনটি স্টেশনে যাত্রী ওঠানামার বিরতি থাকে: ব্যান্ডেল, বর্ধমান। সময় মাত্র ঘণ্টা মিনিট।

প্রাপ্য হাফ টিকেটে বালক রবীন্দ্রনাথ ভ্রমণ করতে পারেননি। রেলের টিটি আর স্টেশন মাস্টারের জানার কথা নয় যে রবীন্দ্রনাথের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ১৮৪২ সালে কালাপানি পাড়ি দিয়ে যখন বিলেত গেলেন তখন রেলগাড়িতে চড়েছেন, মুগ্ধ হয়েছেন এর বিশালতা গতিতে। সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ভারতেও রেলগাড়ি চলবে। উদ্যোগ তাকেই মানায়। দেশে ফিরে নিজের কোম্পানি কার ট্যাগোর অ্যাণ্ড কোম্পানি গঠন করলেন। পরিকল্পনা করলেন রানিগঞ্জ, হাওড়া রাজমহলের মধ্যে রেল চালাবেন। কিন্তু ততদিনে রেল ইঞ্জিনের আবিষ্কারক স্টিভেনসনের ভ্রাতুষ্পুত্র ম্যাগডোনাল্ড স্টিভেনসন কোম্পানি খুলে ফেলেছেন: ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানি। প্রিন্স দ্বারকানাথ আবার বিলেত ছুটলেন, স্টিভেনসনকে রাজি করাবেন যেন তার পরিকল্পনায় দ্বারকানাথের রুটও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তিনি সম্মত হলেন না, এমনকি দ্বারকানাথের এক-তৃতীয়াংশ মূলধন জোগানের প্রস্তাবও খারিজ করে নিলেন। ব্যথিত হলেও উদ্দেশ্য বিসর্জন দেননি। খুললেন গ্রেট ওয়েস্টার্ন বেঙ্গল রেল কোম্পানি। এবার কাজ করতে ব্রিটিশ সরকারের অনুমতি গ্রহণ করতে ১৮৪৫-এর মার্চে আবারো বিলেত যান, কিন্তু ধরনের বড় কাজের দায়িত্ব তারা ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানি ছাড়া অন্য কাউকে দিতে নারাজ। ফিরে এলেন, আগস্টের প্রথম দিন তার মৃত্যু হলো।

লাইন ছাড়া চলে না রেলগাড়ি

উক্তি সুরের সাথে আমাদের পরিচিতি অনেক দিনের। বাংলার বাউল সাধক দুর্বিন শাহ সিলেটের তার স্মৃতির রেলগাড়ি অবশ্যই আসাম বাংলা রেলওয়ের। কিন্তু তার কল্পলোকের ট্রেন আন্ডারগ্রাউন্ডের সেই ট্রেনে দেহতত্ত্ব দর্শনের প্রকাশ।

 

এম মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা