বৃহস্পতিবার | অক্টোবর ২৯, ২০২০ | ১৪ কার্তিক ১৪২৭

সিল্করুট

আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে বাঁকবদলের ঐতিহাসিক স্মৃতি

হারুন রশীদ

উনিশ শতকের শেষভাগে পরিকল্পনার মাঝপথেই আটকে গিয়েছিল আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে। আসামের চায়ের বাগানের সাথে চট্টগ্রাম বন্দরকে সংযুক্ত করার জন্য আসাম-সিলেটের টিলা পাহাড় পাশ কাটিয়ে পরিকল্পনা করা হয়েছিল নতুন একটি রেলপথের। কুমিল্লা পর্যন্ত সব ঠিকঠাক ছিল। কুমিল্লা পার হয়ে লাকসাম থেকে চট্টগ্রাম পৌঁছার পথটা নোয়াখালীর ওপর দিয়ে ফেনী মুহুরী নদীর সংযোগ পার হয়ে মীরসরাইয়ের সমুদ্র উপকূল ধরে চট্টগ্রামের দিকে আসার কথা।

কিন্তু সরেজমিনে জরিপ করার পর দেখা গেল নোয়াখালীর পরের অংশে বড় ধরনের একটা ঝামেলা আছে। ফেনী মুহুরী নামের দুটো নদীর মোহনা যেখানে মিশেছে সেখানে রেললাইন বসাতে হলে কয়েকটা বিশাল আকারের সেতু তৈরি করতে হবে। গাঙ্গেয় মোহনার কাছে ভূমিরেখা বরাবরই পরিবর্তনশীল। সেখানে যথাযথ নিরাপত্তা সহকারে সেতু বাঁধ দিতে গেলে অনেক টাকার দরকার। ব্যাপারটা এত বেশি ব্যয়বহুল যে সমগ্র আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের বাজেটের চেয়ে বেশি হতে পারে। শুধু সেতু বাবদ ব্যয় করতে হবে ১০ লাখ টাকার বেশি। এছাড়া উপকূলজুড়ে পাহাড়প্রমাণ বাঁধ টেনে যেতে হবে মাইলের পর মাইল। সব মিলিয়ে খরচের ধাক্কা ৫০ লাখ টাকার কম না।

কলকাতার বদলে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কম খরচে চা রফতানির জন্য নতুন রেলপথের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু এতটা ব্যয়বহুল হবে তা বোঝা যায়নি। জরিপের মধ্যপথে থমকে গিয়েছিল পরিকল্পনাটা।

সে রকম সময়েই ১৮৯১ সালের একদিন চট্টগ্রামের কমিশনার মি. লায়েল (David Robert Lyall) কুমিল্লায় যাওয়ার পথে আটকে গেলেন ফেনী নামের অখ্যাত এক সাবডিভিশনে। সেই সাবডিভিশনের দায়িত্বে ছিলেন এক বাঙালি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি চট্টগ্রাম-ফেনী যাতায়াতে দুর্ভোগ্যের নিত্য শিকার। পথ যন্ত্রণায় বিরক্ত কমিশনার সাহেব এদিকে প্রস্তাবিত রেলপথের গুরুত্বটা হাড়ে হাড়ে অনুভব করলেন। তিনি আটকে যাওয়া রেলপথের পরিকল্পনাটিকে আবারো সরকারের কাছে তোলার সিদ্ধান্ত নেন এবং বিদ্যমান সমস্যাটি থেকে থেকে উত্তরণের জন্য ফেনীর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পরামর্শ চাইলেন। শুধু তা- নয়, তাকে বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে একটি প্রস্তাব পেশ করতে বললেন।

বাঙালি ডেপুটি মশাই অল্প সময়ের মধ্যে ব্যক্তিগত জরিপ তার আঞ্চলিক ভৌগোলিক অভিজ্ঞতা নিয়ে কমিশনারের কাছে একটা সুপারিশ পাঠান। সেই সুপারিশে তিনি লাইনটিকে পশ্চিমের সমুদ্রতীর থেকে সরিয়ে পূর্ব দিকে মীরসরাই-সীতাকুণ্ডের পাহাড় ঘেঁষে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেছিলেন। সুপারিশ গ্রহণ করলে রেল কোম্পানির বাজেট এক-চতুর্থাংশ হয়ে যাবে।

চট্টগ্রামের কমিশনার মি. লায়েল সেই সুপারিশের ভিত্তিতে বেঙ্গল গভর্নমেন্টের কাছে রিপোর্ট করেন। বেঙ্গল গভর্নমেন্ট সেই রিপোর্টটি অনুমোদনের জন্য দিল্লির বড় লাট দপ্তরে পাঠাল। দিল্লির গভর্নর জেনারেলের অফিস আগের প্রস্তাব এবং নতুন প্রস্তাবের মধ্যে তুলনা করার পর অধিকতর সাশ্রয়ী উপযুক্ততা বিবেচনা করে নতুন প্রস্তাবটিকে গ্রহণ করে। অতঃপর আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানিকে নতুন করে জরিপ কাজ শুরু করার নির্দেশ দেয়া হয়। নতুনভাবে জরিপ করে পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে সব কাজ সম্পন্ন করে কুমিল্লা চট্টগ্রামের মধ্যে প্রথম রেল যোগাযোগ চালু হয়ে যায় ১৮৯৫ সালেই।

ফেনীর সেই বাঙালি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের নাম নবীন চন্দ্র সেন। তিনি মহাকবি হিসেবে বাংলা সাহিত্যে পরিচিত হলেও পেশাগত জীবনে ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের কর্মকর্তা। তার সরস সাহিত্যিক জবানিতে শোনা যাক পুরো ব্যাপারটি

আমি ফেনী উপবিভাগের ভার গ্রহণ করিবার কয়েক বৎসর পূর্বে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের লাইন ফেনীর সাত মাইল পশ্চিম দিক দিয়া স্থির হইয়া গিয়াছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষীয়দের এই রেলওয়ে মনোনীত না হওয়াতে উহার নির্মাণ তাঁহারা একরূপ অগ্রাহ্য করিয়া রাখিয়াছিলেন। কার্যক্ষম লায়েল সাহেব কমিশনর হইয়া আসিলে আমি এই লাইনের প্রতি তাঁহার দৃষ্টি আকর্ষণ করি।

তখন সকল স্থান একপ্রকার অজ্ঞাত দেশ ছিল। গোযান অঞ্চলে একমাত্র চলাচলের ভরসা। গোযানও একপ্রকার সত্যযুগের নিদর্শন বলিলেও চলে। তাহাতে ভ্রমণ জন্মান্তরীণ কুকর্মের ফলভোগবিশেষ। আমি সেই জন্য কবিকল্পনা খাটাইয়া একখানি চাটাইয়ের পাল্কী প্রস্তুত করিয়াছিলাম। চারি দিকে চাটাইয়ের বেড়া। তাহাতে গবাক্ষ দ্বার। গবাক্ষে নীলবর্ণের নেটের পর্দা। জলপথেও চলিবার একমাত্র উপায় কোঁদা। আমি বলিতাম কুন্দনন্দিনী একটিমাত্র বৃক্ষ কুঁদিয়া এই নৌকা প্রস্তুত। তাহার উপর বাঁশের ছপ্পর উহাতে চলা একপ্রকার সিন্দুকের মধ্যে চলা। আমি তাহার জন্যও কবিকল্পনা-প্রসূত একটি স্বতন্ত্র ছপ্পর প্রস্তুত করিয়া লইয়াছিলাম। সামান্য গোশকটের, কি কোঁদার উপর এই ছপ্পর বসাইয়া বড় আরামে যাওয়া যাইত। আমি জলপথে, কি স্থলপথে, যে দিকে যাইতাম, আমার এই দুই কল্পনা-সৃষ্টি লোকের এত দৃষ্টি আকর্ষণ করিত যে, আমার এই দুই বংশনির্মিত কার্য্যের দ্বারা আমি অঞ্চলে অমরতা লাভ করিয়াছিলাম।


যাহা হউক, লায়েল সাহেব অঞ্চলবাসীদিগকে বলীবর্দভাতৃযুগলের (Bullock Brothers & Co.) এবং লগি-সঙ্কলিত কুন্দনন্দিনী মন্থর গমন হইতে উদ্ধার করিতে কৃতসংকল্প হইলেন। তিনি নিজে একবার বড়ই দুর্ভোগ ভুগিয়াছিলেন।

...সেই দিন সন্ধ্যার সময়ে তিনি বলিলেন, নবীনবাবু। বিভাগীয় কমিশনার এই ঘাট পার হইতে এই পথে চলিতে যখন এরূপ বিভ্রাট হইতেছে, তখন সাধারণ লোকের কি কষ্টই না জানি হয়। এত দিনে তোমার রেলওয়ের প্রস্তাবের প্রয়োজনীয়তা আমি বুঝিলাম। আমি আজ হইতে তাহার জন্য যুদ্ধ করিব। তুমি আমার সহায় হইবে।

লাভ হইবে না বলিয়া এই রেলওয়ে গবর্ণমেণ্ট অগ্রাহ্য করিয়া রাখিয়াছিলেন। তখন তিনি ইহার ভাবী বাণিজ্যের অঙ্ক সঙ্কলন করিতে লাগিলেন। অঞ্চলের সঙ্কলনের ভার আমার উপর পড়িল।

চট্টগ্রামের কেহ কেহ এই রেলওয়ে অসম্ভব জানিয়া, ঠাট্টা করিয়া বলিতে লাগিলেন যে, লায়েল সাহেব নবীনবাবু রেলওয়ে আনিয়া ফেলিবে। সময়ে আমি প্রস্তাবিত লাইনের নক্সা আনাইয়া দেখিলাম যে, লাইন ফেনীর সাত মাইল পশ্চিম নোয়াখালীর বিশ মাইল পূর্ব্ব দিয়া গিয়াছে, অর্থাৎ উহাতে কোন স্থানেরই সুবিধা হয় নাই। তদপেক্ষা একেবারে আকাশের উপর দিয়া লইলেই হইত।

আমি তখন বহু অন্বেষণের পর দেখিলাম, এই লাইন পূর্বে সরাইয়া চন্দ্রনাথ পর্বতশ্রেণীর পাদদেশ ফেনী দিয়া লাকসাম লইলে প্রকৃতির সৌন্দর্যের কথাই নাই, রেলওয়ে কোম্পানীর গবর্ণমেণ্টের বহু লক্ষ টাকা ব্যয় লাঘব হইবে। বর্তমান লাইন যেখানে ফেনী পার হইয়াছিল, সেই স্থান ফেনী মহুরী নদীর সঙ্গমের নিম্নে হওয়াতে স্থানটি এতাদৃশ বিস্তৃত যে, কেবল এখানে পুলের জন্য দশ লক্ষ টাকা এষ্টিমেট হইয়াছে। লাইন পূর্বদিকে সরাইয়া, ফেনী মহুরী নদীর উপর স্বতন্ত্র পুল দিলে এই দুই স্থানে নদীর এত অল্প পরিসর যে, দুই লক্ষ টাকার অধিক ব্যয় লাগিবে না। তাহার পর পর্বতপ্রান্ত দিয়া লাইন আসিলে রাস্তার ব্যয়েরও অনেক লাঘব হইবে। অনেক স্থলে কেবল পর্বতমূল সমান করিয়া দিলেই হইবে। অন্য দিকে যেখান দিয়া লাইন জরিপ হইয়া গিয়াছে, উহা চট্টগ্রাম ট্রাঙ্ক রোডের পশ্চিমে সমুদ্রের তটভূমি। সেখানে সমুদ্রতীরস্থ বাঁধের মত একটা পর্বতপরিমাণ রাস্তার প্রয়োজন হইবে।

এতাবৎ বিষয় লিখিয়া, আমি পূর্ব্ব লাইন পরিবর্তন করিয়া, এই লাইন গ্রহণ করিতে রিপোর্ট করিলাম।

তখন নিষ্কর্মা কালাচাঁদ (কালাচাঁদ বলতে চট্টগ্রামের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে বুঝিয়েছেন, নবীনচন্দ্র চট্টগ্রামে থাকাকালীন নানা কাজে পদে পদে বাধার সৃষ্টি করেছিলেন তিনি) আবার কলেক্টর হইয়া আসিয়াছেন। তাহার সংস্কৃত অভিধান সঙ্কলন ভিন্ন কর্ম নাই। তিনি এই কর্ম ফেলিয়া এক পা গৃহের কি শিবিরের বাহিরে যাইতেন না। বিশেষতঃ তাঁহার চীন আমেরিকায় নোয়াখালীর জাহাজ চালাইবার বিখ্যাত উদ্যোগ এবং ফেনী হইতে আফিস উঠাইয়া লওয়ার ব্রত নিষ্ফল হওয়াতে, তিনি এই হতভাগ্যদেশের কোনও কর্মেই আর হস্তক্ষেপ করেন না।

অতএব তিনি আমাকে বলিয়া দিলেন যে, রেলওয়ের লাইনের সঙ্গে তাহার কোনও সংস্রব নাই। তিনি তাহাতে হস্তক্ষেপ করিবেন না। তখন আমি ফেনী মুহুরীর সঙ্গমস্থলে শিবির স্থাপন করিয়া আমার ডায়ারিতে উপরোক্ত বিষয় সকল লিখিলাম। ডায়ারি কমিশনারের কাছে যায়। তাহা কালাচাঁদের চাপিয়া রাখিবার উপায় নাই। তিনি আমার চতুরতা দেখিয়া প্রস্তাবের প্রতিকূলে ডায়ারির পাশে তীব্র ভাষায় লিখিলেন যে, তাঁহার নিষেধ না মানিয়াও আমি নিজের কর্ম ফেলিয়া এই অপ্রাসঙ্গিক কার্য্যে আমার সময় নষ্ট করিতেছি।

লায়েল সাহেব উক্ত ডায়ারি পাওয়া মাত্র নাচিয়া উঠিলেন। তিনি আমাকে বহু প্রশংসা করিয়া ধন্যবাদ দিয়া, এক ডিও পত্র লিখিয়া আমার কাছে এই লাইন সম্বন্ধে একটা স্বতন্ত্র রিপোর্ট চাহিলেন। আমি ডিওর উত্তরে লিখিলাম যে কালেক্টরের কাছে আমি স্বতন্ত্র রিপোর্ট করিয়াছিলাম, তিনি উহা কমিশনারের কাছে পাঠাইতে অস্বীকার করিয়াছেন।

তখন কমিশনার আমাকে লিখিলেন, যেন আমি রিপোর্টের আরম্ভে লিখি যে, তাঁহার আদেশমতে আমি এই রিপোর্ট করিতেছি। আমি তখন আমার পূর্বরিপোর্টের আর এক নকল এই সকল ডিও পত্রসহ কলেক্টরকে উপহার পাঠাইলাম। তিনি অপমান গলাধঃকরণ করিয়া, এবার কথাটি না কহিয়া, রিপোর্ট কমিশনারকে পাঠাইলেন। তিনি এই লাইন সমর্থন করিয়া আমার রিপোর্ট বেঙ্গল গবর্ণমেণ্টে এবং বেঙ্গল গবর্ণমেণ্ট উহা ইণ্ডিয়া গবর্ণমেণ্টে পাঠাইলেন।

ইণ্ডিয়া গবর্ণমেণ্টের পূর্তসচিব একখানি নক্সাতে এই লাইনটি নীল পেন্সিলে টানিয়া দিয়া লিখিলেন তিনি যত দূর দেখিতেছেন, এই লাইনটি পূর্ব্ব লাইন অপেক্ষা সর্বোতভাবে শ্রেষ্ঠতর। তবে পথে রেলওয়ে করিতে কোনও বিঘ্ন আছে কি না, তাহা জরিপ করিয়া দেখিবার জন্য রেলওয়ে কার্য্যে অশেষ পারদর্শী সুপারিন্টেণ্ডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার মেজর ষ্টোরিকে নিয়োগ করিয়াছেন।

লায়েল সাহেব আমাকে সংবাদ দিয়া, মেজর ষ্টোরির সঙ্গে ফেনীঘাটে গিয়া নির্দিষ্ট তারিখে সাক্ষাৎ করিতে এবং আমার লাইন তাহাকে বুঝাইয়া দিতে লিখিলেন। আমাকে উক্ত ম্যাপ দেখাইয়া মেজর ষ্টোরি বলিলেন যে, চট্টগ্রাম হইতে ফেনী তীর পর্যন্ত সমস্ত স্থান তিনি মোটামুটি দেখিয়া আসিয়াছেন। তাহাতে তাহার বিশ্বাস হইয়াছে যে, পূর্ব্বের লাইন অপেক্ষা আমার প্রস্তাবিত লাইন অনেক শ্রেষ্ঠ সহজসাধ্য হইবে। অবশিষ্ট ভাগে কোনও বিঘ্ন আছে কি না, তিনি নক্সা দেখিয়া বলিতে পারিতেছেন না।

তখন আমি বলিলাম, বিঘ্নের মধ্যে ফেনী নগরের উত্তরে কালীধরের বিল এবং দক্ষিণ দিকে গুণবতীর বিল মাত্র আমার আশঙ্কার বিষয় আছে। এই দুইটি বিল বহু মাইলব্যাপী প্রকাণ্ড জলা। চৈত্র-বৈশাখেও সম্পূর্ণ শুষ্ক হয় না। তবে এই দুই স্থানে লাইন যদি বিলের এক পার্শ্ব দিয়া লওয়া যায়, তবে সম্ভবতঃ আর কোনও বাধা হইবে না।।

তিনি চট্টগ্রাম ফিরিয়া গিয়া, সেখান হইতে জরিপ করিতে করিতে কালীধরের বিল পর্যন্ত আসিয়া, তাহার শিবির সহ ফেনীতে আসিলেন। তিনি বলিলেন যে, পূর্বে তিনি যেরূপ অনুমান করিয়াছিলেন, পর্যন্ত লাইন সেরূপই পাইয়াছেন। লাইনে আমার রিপোর্টের লিখিত কারণে যথার্থই বহু লক্ষ টাকা ব্যয়ের লাঘব হইবে।

কিন্তু কালীধরের বিল ভয়ানক ব্যাপার! দেখিলাম, তিনি আবক্ষ কর্দমে নিমজ্জিত হইয়া আসিয়াছেন। তাঁহার তাহার উচ্চ ঘাটেকের কর্দমাক্ত কলেবর দেখাইয়া খুব হাসিলেন।

তাহার পর তিনি প্রায় এক পক্ষ কাল বহু পরিশ্রম করিয়া এবং প্রত্যহ প্রায় ঐরূপ অবস্থায় ফেনীস্থ শিবিরে ফিরিয়া, একদিন অপরাহ্ আমাকে আসিয়া বলিলেন যে, তাঁহার শ্রম সফল হইয়াছে, তিনি একটি কার্য্যযোগ্য লাইন পাইয়াছেন। আমার আনন্দের সীমা রহিল না।

ফেনী হইতে গুণবতী গিয়া লিখিলেন যে, সে পর্যন্ত কোনও বিঘ্ন পান নাই, কিন্তু গুণবতী পর কালীধরের বিলে অপেক্ষাও আর এক গভীরতর বৃহত্তর বিল পাইয়াছেন, এবং উহা তাহাকে বড়ই ক্লেশ দিতেছে। আমি ভাবিলাম, এখানেই বুঝি পালা শেষ হয়।

আমি লিখিলাম, আমার আশা আছে, তাঁহার ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিভা পারদর্শিতার বলে তিনি এই বিল অতিক্রম করিতে পারিবেন।

লিখিলাম বটে, লোকের মুখে এই বিলের যেরূপ বর্ণনা শুনিতে লাগিলাম, উহা অতিক্রম করা কেবল রামায়ণের মহাবীরের সাধ্য। তবে তিনি একটি ক্ষুদ্র সাগর-শাখা মাত্র লঙ্ঘন করিয়াছিলেন, আর ইনি সপ্ত সমুদ্র পার হইয়া আসিয়াছিলেন। অতএব আমি নিরাশ হইলাম না।

কিছুদিন পরে তিনি চাঁদপুরে পঁহুছিয়া আমাকে পত্র লিখিলেন, আমার কার্য্য শেষ হইয়াছে। আমি অঞ্চল হইতে চলিয়া যাইতেছি। চট্টগ্রাম হইতে লাকসাম পর্যন্ত আপনার মনোনীত লাইন পূর্বলাইন হইতে অধিকতর সুবিধার অল্পতর ব্যয়সাধ্য বলিয়া আমি গবর্ণমেণ্টে রিপোর্ট করিয়াছি, এবং লাকসাম হইতে চাঁদপুর পর্যন্ত যে লাইন পূর্বে জরিপ হইয়া রহিয়াছিল, উহা সামান্য পরিবর্তনপূর্ব্বক আমি মনোনীত করিয়াছি।

ফেনীতে আনন্দের ধ্বনি উঠিল। লায়েল সাহেবও আমাকে আনন্দ প্রকাশ করিয়া পত্র লিখিলেন।

১৮৯১ সালের সেই ঘটনাটিই ১৮৯২ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানির জন্ম হওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছিল। বর্তমানে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের রেলপথে মীরসরাই-সীতাকুণ্ড অঞ্চল পার হয়ে যাওয়ার সময় আমরা বন-পাহাড়ের যে অনুপম সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ পাই, সেটা হলো নবীনচন্দ্র সেনের সেই সুপারিশের ফসল।

কিন্তু প্রকল্পটির এমন অপরিহার্য ব্যয়সাশ্রয়ী একটি বাঁক বদলের প্রধান সূত্র হিসেবে কাজ করেও আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের ইতিহাসে তার নাম নিশানা নেই। সেই আক্ষেপ ফুটে উঠেছে স্মৃতিচারণের অন্য অংশটিতে:

ইহার তিন বৎসর পরে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে খুলিল। আমি তখন আলিপুরের ডেপুটি কলেক্টর। সেই বৎসর পূজার বন্ধে এই রেলপথে বাড়ী গিয়াছিলাম...একজন রেলওয়ে ভূমিগ্রাহক ডেপুটি কলেক্টর ফেনী ষ্টেশনে আমার গাড়ীতে উঠিয়াছিলেন।...ট্রেন খুলিলে তাহার সহিত আলাপ করিতে লাগিলাম। যখন পর্ব্বতমূল দিয়া ট্রেন ছুটিতেছিল, এবং আমি আনন্দে অধীর হইয়া গাড়ী হইতে এক দিকে চন্দ্রনাথ-পর্বতমালার অন্য দিকে সমুদ্রের শোভা দেখিতেছিলাম।

তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনার শেষ কাব্য কি?

আমি বলিলাম, আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের ফেনী হইতে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এই লাইন।

উহার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য বাস্তবিকই কবির উপযোগী। মি. ব্রাউনজার আমাকে বলিয়াছিলেন যে, এই লাইন নির্বাচন করিয়া আমি রেলওয়ের প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ টাকার ব্যয় লাঘব করিয়াছি। ইহার কিছুকাল পরেই এই কথা স্মরণ করাইয়া দিয়া এবং লায়েল সাহেবকে সাক্ষ্য মানিয়া গবর্ণমেণ্টে এক আবেদন করিয়াছিলাম। গবর্ণমেণ্ট তাহার উত্তর পর্যন্ত দিলেন না। কোনও গৌরাঙ্গ এই কার্য্য করিলে, ইংলিশম্যান, পাইওনিয়ারে দুন্দুভিধ্বনি হইত, এবং গবর্ণমেণ্ট তাহাকে লক্ষ টাকা পারিতোষিক দিতেন। একজন তৈলব্যবসায়ী বঙ্গচন্দ্র হইলেও কিঞ্চিৎ কৃপাভিক্ষা পাইত। কিন্তু আমি না গৌরাঙ্গ, না তৈলিক কৃষ্ণাঙ্গ।

১৮৯৫ সালে শুরু হওয়া আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের সেই যাত্রা পরিপূর্ণতা লাভ করেছিল ১৯০৪ সালে এসে এবং সেই অগ্রযাত্রা অব্যাহত ছিল ১৯৪২ সাল পর্যন্ত। ১৯৪২ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে যুক্ত হয়ে নতুন কোম্পানি দ্য বেঙ্গল অ্যান্ড আসাম রেলওয়ে নামে আত্মপ্রকাশ করে। উনিশ শতকের সেই আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কয়েক হাত ঘুরে এখন বাংলাদেশ রেলওয়ে ট্রেনের জানালার পাশে বসে ছুটে যাওয়া সবুজ বনানীকে দেখতে দেখতে কোনো কোনো অতীতচারী যাত্রী এখনো হয়তো চোখ বন্ধ করে ছুঁয়ে দিতে পারে ১৩০ বছর আগের এক বাঙালি কবির স্বপ্নকে।

 

[** প্রধান তথ্যসূত্র: বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ কলকাতা থেকে প্রকাশিত সজনীকান্ত দাস সম্পাদিত মহাকবি নবীন চন্দ্র সেনের আত্মজীবনী আমার জীবন (দ্বিতীয় খণ্ড)]

 

হারুন রশীদ: প্রাচীন সভ্যতা ইতিহাস অনুসন্ধানী লেখক