বৃহস্পতিবার | অক্টোবর ২৯, ২০২০ | ১৪ কার্তিক ১৪২৭

সিল্করুট

আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের পূর্বাপর

মুহিত হাসান

সরকারের তরফ থেকে সলতে পাকানো: ১৮৬৮-১৮৮৭

কীভাবে চট্টগ্রাম-সিলেট হয়ে আসামের ডিব্রুগড় পর্যন্ত রেললাইনের বিস্তার ঘটিয়ে দখলীকৃত ভারতীয় সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলের এই বিস্তীর্ণ অংশকে সহজ যোগাযোগ-জালের মধ্যে আনা যায়, ১৮৫৪ সালে ইংরেজ কোম্পানি অধীনস্থ হাওড়া-হুগলি রেললাইন চালু এবং প্রধানত ১৮৫৭ সালে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তা গোরা শাসকদের বিশেষ বিবেচনায় ছিল। তবে কাজটা খুব সহজ ছিল না। কারণ বৃহত্তর চট্টগ্রাম আসাম-সিলেট এলাকা এমনিতেই পাহাড়-জলাশয়-জঙ্গলে ঘেরা দুর্গম এক ভূমি, সেখানে রেলপথ স্থাপন বাড়তি ঝক্কির কাজ। উপরন্তু সেখানকার আদি নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা রেলপথ বসানোটা কেমন চোখে দেখবে, তা- জানা নেই।

যাহোক, আসাম-সিলেট-চট্টগ্রাম অঞ্চলে রেলপথ বসানো কঠিন জেনেও কাজটা শেষমেশ সমাধা করতেই হবে, এমন জেদ সাহেবসুবোদের ছিল। কারণ ওই এলাকা চা-বাগান, কাঠ, কয়লা অন্য আরো ব্যবসায়িকভাবে লাভজনক জিনিসের উৎপাদনস্থল। সহজে চা-কাঠসহ পণ্যদ্রব্য পরিবহনের জন্য বা সর্বোপরি সাহেবদের বাণিজ্যের স্বার্থে ওই এলাকায় রেলযোগাযোগ স্থাপন করাটা রীতিমতো আবশ্যিক হয়ে পড়ে। তা সত্ত্বেও নানা জটিলতায় রুটে রেলপথের কাজ তেমন একটা গতি পাচ্ছিল না। ১৮৬৮-৭৩ সাল পর্যন্ত বাংলা আসামের গভর্নরদের মধ্যে বিষয়ে একাধিক চিঠি চালাচালি হলেও কোনো ফল হয়নি। অবশেষে মহাপরাক্রমশালী রাজশাসনের গোড়ার দিকে, ১৮৭৮ সালে ভারপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট গভর্নর আসামের প্রধান কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়ে স্টুয়ার্ট বেইলি পূর্ববঙ্গ থেকে আসামে রেলওয়ে স্থাপনের ব্যাপারে প্রথম আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ প্রস্তাবনা পেশ করেন। ইংরেজ সরকারের কাছে পাঠানো প্রস্তাবে তিনি লেখেন, বাণিজ্যের মসৃণ বিস্তারের জন্য আসামের ডিব্রুগড় থেকে একটি মেট্রোগেজ রেললাইন স্থাপন করা জরুরি। পরে মূলত বেইলির উদ্যোগেই লন্ডনে আসাম রেলওয়ে কোম্পানি নামের একটি রেলকোম্পানি গঠনের লক্ষ্যে শেয়ার বিক্রয়ের আবেদনপত্র ছাড়া হয়। দুর্ভাগ্যক্রমে, ইংরেজ সরকার লাখ টাকা ভর্তুকি দেয়া সত্ত্বেও খুব অল্প শেয়ার বিক্রি হওয়াতে ওই রেলওয়ে কোম্পানি গঠনের উদ্যোগ মাঠে মারা যায়।

এর তিন বছর পর আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে গঠনের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ ঘটনা বড় ব্রেক-থ্রু এনে দিয়েছিল। তা হলো ১৮৮১ সালে আসামের তত্কালীন লক্ষ্মীপুর জেলার সিভিল সার্জন জন বেরি হোয়াইটের উদ্যোগে ডিব্রুগড় থেকে সাদিয়া পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ। হোয়াইট সাহেব প্রায় একক উদ্যোগে আসাম রেলওয়েস অ্যান্ড ট্রেডিং নামের এক কোম্পানি খুলে ডিব্রুগড়-সাদিয়া রেলপথ বসানোর জন্য ইংল্যান্ড থেকে যন্ত্রপাতি আনার ব্যবস্থা করেন। ডিব্রুগড়ে তৈরি হয় রেলওয়ে স্টেশন ইয়ার্ড। আকৃতিতে বড় না হলেও মাত্র ১৫ মাইল দৈর্ঘ্যের রেলপথ আসামের বাণিজ্যে অল্প সময়েই নতুন গতি সঞ্চার করতে পেরেছিল। কাকতালীয়ভাবে ঠিক ওই সময়খণ্ডেই একজন ইংরেজ প্রকৌশলী একটু ভিন্নভাবে আসাম-বাংলা রেলপথ চালুর ভাবনা মাথায় নিয়ে ঘুরছেন। ১৮৮১ সালে সরেজমিন ময়মনসিংহের গারো পাহাড় ঘিরে রেলপথের স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে গিয়ে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের চিফ ইঞ্জিনিয়ার জেডব্লিউ বার্য়াসের ধারণা হয়, যে গারো পাহাড় দিয়ে একটা লাইন তৈরি করে ঢাকা কী ময়মনসিংহ থেকে আসামের গৌহাটি পর্যন্ত রেলযোগাযোগ নির্মাণ করা সম্ভব। এছাড়া চট্টগ্রাম হয়ে সিলেট-কাছাড়ের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা দিয়েও আসামের সঙ্গে রেলসংযোগ স্থাপনের কথা ভাবা যেতে পারে। শেষমেশ সম্ভাব্য খরচ কম হওয়াতে চট্টগ্রাম বন্দরকে যুক্ত করার কথা বিবেচনা করে ইংরেজ প্রশাসন চট্টগ্রাম-আসাম রুটকেই প্রাথমিক পছন্দ হিসেবে বেছে নিলেন। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম-দাউদকান্দি রুটে একটি লাইন স্থাপনের কথাও ভাবা হচ্ছিল, তাই চট্টগ্রামকে যুক্ত করার বিষয়টি অধিকতর গুরত্ব পায়। সেই মোতাবেক ১৮৮১-৮৭ অব্দি মাঠপর্যায়ে জরিপ-নিরীক্ষা চলল।

এর মাঝেই ১৮৮৪ সালে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে নামে রেললাইন স্থাপনে সরকার চূড়ান্ত অনুমতি দেয়। রেললাইন নিয়ে সরকারি জরিপ উদ্যোগের ভালোমন্দ নিয়ে একটা মজার বিবরণ পাওয়া যায় ওই সময়ের ফেনী মহকুমার তত্কালীন ডেপুটি কালেক্টর কবি নবীনচন্দ্র সেনের আত্মজীবনী আমার জীবন-এ। ১৮৮৪ সালে ফেনীতে বদলি হয়ে আসার পর তিনি জানতে পারেন, বছর কয়েক আগেই ফেনীতে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের লাইন বসবে এমন কথা হচ্ছিল। কিন্তু বর্তমানে তাতে সরকারের খুব একটা মন নেই। নবীনচন্দ্র সিদ্ধান্ত নেন, তিনি চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার ডিআর লায়েল সাহেবকে বুঝিয়ে বলে ফেনীতে রেললাইন আনার ব্যবস্থা করবেন। তবে মুখের কথায় বোঝানোর কাজটি বেশি করতে হয়নি। একবার লায়েল সাহেব গরুর গাড়িতে ফেনী হয়ে কুমিল্লা যেতে গিয়ে মহামুসিবতে পড়েন। পরে ফেনী ছাড়ার আগে তিনি নবীনচন্দ্রকে ডেকে বলেন, বিভাগীয় কমিশনার আমার এই ঘাট পার হইতে পথে চলিতে যখন এরূপ বিভ্রাট ঘটিতেছে, তখন সাধারণ লোকের কি কষ্টই না জানি হয়। এতদিনে তোমার রেলওয়ের প্রস্তাবের প্রয়োজনীয়তা আমি বুঝিলাম। আমি আজ হইতে তাহার জন্য যুদ্ধ করিব। তুমি আমার সহায় হইবে। অতএব নবীনচন্দ্রের ওপর পড়ল ফেনীর ঠিক কোনখান দিয়ে লাইন গেলে লাভ-ক্ষতি কত তা হিসাব করার ভার। সেই হিসাব করতে গিয়ে নবীনচন্দ্র রেললাইনের নকশায় চোখ বুলিয়ে দেখলেন সরকারি রেলবিভাগ এখানে একেবারে হাস্যকর কাণ্ড করে বসেছে। প্রস্তাবিত নকশায় আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের লাইন ফেনী থেকে সাত মাইল পশ্চিমে নোয়াখালী থেকে ২০ মাইল পূর্বে বসেছে, অর্থাৎ উহাতে কোনো স্থানেরই সুবিধা হয় নাই...তদপেক্ষা একেবারে আকাশের ওপর দিয়া লইলেই হইত। পরে তিনি প্রস্তাব করেন, রেললাইন পূর্বে সরিয়ে চন্দ্রনাথ পর্বতশ্রেণীর পাদদেশ ফেনী দিয়ে লাকসামে নিয়ে গেলে প্রচুর পয়সা কম খরচ হয়। কারণ, তাতে জলপথ নিতাস্তই কমঅল্প দৈর্ঘ্যের সেতুই যথেষ্ট। আর পাহাড় যা আছে তা সমান করে দিলেই হবে, লাইন বসাতে বিশেষ বেগ পেতে হবে না। রাজ-সরকারের পূর্ত সচিবের কাছেই এই প্রস্তাব পাঠালে তিনি তা পয়লা দেখাতেই পছন্দ করেন। পরে অভিজ্ঞ রেলওয়ে তত্ত্বাবধায়ক মেজর স্টোরিও নবীনচন্দ্রের প্রস্তাবিত রেল-নকশার প্রশংসা করে বলেছিলেন, চট্টগ্রাম হইতে লাকসাম পর্যন্ত আপনার মনোনীত লাইন পূর্ব-লাইন হইতে অধিকতর সুবিধার অল্পতর ব্যয়সাধ্য বলিয়া আমি গভর্নমেন্টে রিপোর্ট করিয়াছি। উল্লেখ্য, আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে উদ্বোধন হওয়ার পর এর ফেনী অংশের প্রকৌশলী ব্রাউনজারও নবীনচন্দ্রের প্রস্তাবনা মঞ্জুর হওয়ার কারণে প্রায় ৫০ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে বলে মন্তব্য করেছিলেন।

কিন্তু নানা কারণে অর্থব্যয়ের বেলায় কৃপণতা দেখানো ইংরেজ সরকার আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের কাজে পুরোদমে হাত দিতে সংকোচ করছিল। ১৮৮১ সালের মে মাসে সরকার জানায়, তারা আপাতত নিজেদের মালিকানা-ব্যবস্থাপনায় চট্টগ্রাম থেকে ফেনী পর্যন্ত রেললাইন বসানোর কথা ভাবছে। চট্টগ্রাম থেকে লাইন বসানোরও কাজ ঢিমেতালে শুরু হয়ে যায়। কিন্তু আসাম পর্যন্ত লাইন যাবে না জানতে পেরে সাধারণ যাত্রী ব্যবসায়ীরা অসন্তুষ্ট হন।

বেসরকারি উদ্যোগে আরম্ভ বিস্তার: ১৮৯২-১৯৪১

১৮৯২ সালে বেসরকারি উদ্যোগে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি তৈরির একটা প্রচেষ্টা নেয়া হলো। মূল উদ্যোক্তা দুজনএকজন জেমস মিডো রেন্ডেল, আরেকজন লে. কর্নেল জর্জ হ্যাডলস্টন। এরা দুজন পরে যথাক্রমে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানির সভাপতি ব্যবস্থাপনা পরিচালক হন। ওই বছরের ১৮ মার্চ লন্ডনে কোম্পানির নিবন্ধন সম্পন্ন হলো। দেড় লাখ পাউন্ডে কোম্পানির তহবিল গঠিত হয়। ইংরেজ সরকারের সঙ্গে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে একটি চুক্তিও সম্পন্ন করে। সেই চুক্তিতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তের কথা বলা হয় . তহবিল থেকে সরকারকে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি শতাংশ সুদ দেবে; . এর বিনিময়ে সরকার তাদের বিনা মূল্যে জমি অধিগ্রহণ করিয়ে দেবে সার্বিক প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করবে।

আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করার পর প্রথম দফায় চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত ৯৩ দশমিক ১৪ মাইলের মিটারগেজ রেলপথ বসানো হয়। ১৮৯৫ সালের জুলাই রেলপথ উদ্বোধন করা হয়। পরে যথাক্রমে কুমিল্লা-আখাউড়া-কুলাউড়া-বদরপুর পর্যন্ত ৩০৩ মাইলের রেলপথ পোঁতা হয় ১৮৯৬-৯৮ সালের মধ্যে। কিন্তু বদরপুর থেকে লুমডিং পর্যন্ত আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের দ্বিতীয় সেকশন নির্মাণ ছিল ভয়ানক ঝক্কি ঝুঁকির কাজ। এবড়ো-খেবড়ো পাহাড়ি পথে রেললাইন স্থাপন করতে গিয়ে শ্রমিক প্রকৌশলীদের ভারি বেগ পেতে হয়েছিল। উপরন্তু ছিল বন্য জন্তুর উপদ্রব। মোটমাট ১১ বছর লাগিয়ে ১৯০৪ সালে ১১৫ মাইলের বদরপুর-লুমডিং সেকশন নির্মাণ শেষ হয়। পরে তা আসাম রেলওয়েস অ্যান্ড ট্রেডিং কোম্পানির তৈরি করা ডিব্রুগড়-সাদিয়া গৌহাটি-লুমডিং রেলওয়ের লাইনের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে মাকুম পর্যন্ত বিস্তার ঘটিয়ে সাড়ে ৩২১ মাইলের লুমডিং-মাকুম সেকশন গঠন করা হয়। প্রায় ২৫ বছর ধরে চলা কর্মযজ্ঞে অংশ নিয়েছিলেন আনুমানিক ৪০ হাজার শ্রমিক। অতঃপর ১৯০৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম শহরে বড়লাট লর্ড কার্জন আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের উদ্বোধন করলেন। ১৯০৫ সালে রেলওয়ের মোট লাইনের দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় প্রায় ৭৭৫ মাইল।

শুরু থেকেই আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে ব্যবসায়ী সাধারণ যাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। নতুন রেলগাড়ি শক্তিশালী ইঞ্জিন কেনা আর নতুন নতুন এলাকায় রেলপথ বিস্তার কি স্টেশন স্থাপনে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে বরাবরই উৎসাহী ছিল। বাংলা আসাম প্রদেশের ১১টি জেলাকে সংযুক্ত করার কারণে নানা এলাকা থেকেই যাতায়াত বা পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে রেলওয়ে অনেকেরই যেন প্রথম পছন্দ তখন। ১৯৪০ সাল পর্যন্ত এর অনেক শাখা লাইনও খোলা হয়। এগুলোর মধ্যে আখাউড়া-আশুগঞ্জ, ভৈরববাজার-টঙ্গী, ময়মনসিংহ-ভৈরববাজার চাপারমুখ-শিলঘাট সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। আসাম-সিলেট-চট্টগ্রাম থেকে টঙ্গী ভৈরববাজার হয়ে সেকালের ঢাকা বা এমনকি কলকাতা যাওয়ার ক্ষেত্রেও শাখা লাইনগুলো স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছিল। ভারত সাম্রাজ্যের দুর্গম পশ্চিমাংশের সঙ্গে অধিকতর উন্নত ঢাকা-কলকাতা শহরের সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের নাম তাই স্মর্তব্য। ১৯৩৭ সালে আশুগঞ্জ-আখাউড়া শাখা লাইনে মেঘনা নদীর ওপর ৫৬ লাখ টাকা খরচ করে ষষ্ঠ জর্জ রেলসেতু স্থাপনের পর অঞ্চলে বিস্তৃত যোগাযোগের দ্বার খুলে যায়। রেলগাড়ি সরাসরি চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ যাওয়া-আসা শুরু করে। চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ হয়ে দ্রুততম সময়ে কলকাতা যাওয়া তখন ছিল আকাশকুসুম কল্পনা, কিন্তু আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে সেই কল্পনাকে আনন্দময় বাস্তবে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়েছিল।

আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে আসামের চা-বাগান বিবিধ শিল্প এবং চট্টগ্রাম বন্দরকে ভিত্তি করে অঞ্চলের ব্যবসার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা প্রদানের পাশাপাশি পর্যটনেও ভূমিকা রেখেছিল। ১৯১৯ সালে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও সিলেটে এসেছিলেন রেলগাড়ি চড়ে, অর্থাৎ আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে দিয়েই। এর চট্টগ্রাম-দোহাজারি শাখা লাইনকে ভিত্তি করে এমন পরিকল্পনাও ছিল যে দোহাজারি স্টেশনের পর দুর্গম পথে রেললাইন বসিয়ে ব্রহ্মদেশ বা বর্তমান মিয়ানমারের আকিয়াব হয়ে রেঙ্গুন পর্যন্ত রেলপথের বিস্তার ঘটানো হবেসোজা কলকাতা বা ঢাকা থেকে রেঙ্গুন যেতেও আর বাধা থাকবে না এমন আশাই যেন করা হয়েছিল।

জাতীয়করণ এবং করুণ বিলুপ্তি: ১৯৪২

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজার পর থেকেই ব্রিটিশ সরকার ভারতে থাকা বেসরকারি রেলওয়ে কোম্পানিগুলো অধিগ্রহণের কথা ভাবতে থাকে, আসাম-বেঙ্গল রেলওয়েও এর বাইরে ছিল না। ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরেই আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের বিলুপ্তি ঘটিয়ে তাকে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের সঙ্গে একীভূতকরণ একীভূত হওয়ার পরমুহূর্তেই কোম্পানিটিকে (পরে যা বেঙ্গল অ্যান্ড আসাম রেলওয়ে নামে পরিচিত হবে) রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেয়ার লক্ষ্যে চিঠিপত্র চালাচালি শুরু হয়। পরে ১৯৪২ সালের পয়লা জানুয়ারি সরকার আসাম-বেঙ্গল রেলওয়েকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে। রেলপথ-বিশারদ ক্রিস্টিয়ান উলমার মনে করেন, আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নানা দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিরুদ্ধ প্রকৃতির কারণে যেখানে সড়কপথের বেহাল, সেই এলাকায় সৈন্যসামন্ত-অস্ত্রশস্ত্র পরিবহন কিংবা ত্রাণ বয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এর জুড়ি ছিল না। কারণেই এতটা তড়িঘড়ি করে সরকার রেলওয়ে কোম্পানিকে নিজেদের অধীনে নিয়ে আসতে চেয়েছিল। আবার জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ কোনো কোনো বাঙালি ইতিহাসবিদ মনে করেন ১৯২১ সালে চাঁদপুর স্টেশনে আসামের চা-শ্রমিকদের ওপর গুলি চালনার প্রতিবাদে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের শ্রমিক-কর্মচারীদের টানা তেজী ধর্মঘট ইংরেজ সরকারকে বিচলিত-বিব্রত-ক্ষুব্ধ করেছিল। তাই যুদ্ধের অজুহাতে বেয়াড়া-বিদ্রোহী শ্রমিকদের এক হাত নেয়ার উদ্দেশ্যেই দ্রুততার সঙ্গে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের বিলুপ্তি পরে জাতীয়করণের নাটক সামনে আনা হয়। যাতে তখন বিলুপ্তির জুজু দেখিয়ে বহু শ্রমিককে ছাঁটাই করে অতীতের বিদ্রোহের প্রতিশোধ নেয়া যায়। সিদ্ধান্তের স্বপক্ষে শক্ত যুক্তিও অবশ্য একটা আছে, তা হলো ১৯২১ সালের রেলশ্রমিক ধর্মঘটের পরই১৯২৩ সালেই রেলওয়ে জাতীয়করণের উদ্যোগ নিতে ব্রিটিশরাজ তত্পরতা শুরু করে (কিন্তু নানা কারণে ওই মুহূর্তেই তা করতে পারেনি)

অতঃপর, বিলুপ্তি ঘটল ভারতের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় রেলপথেও, যা কিনা পর্যটন, প্রকৃতি-দর্শন ব্যবসাদারীর ক্ষেত্রে আক্ষরিক অর্থেই অঞ্চলের জনগণের কাছে নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছিল। অবশ্য উল্টো বয়ানও লভ্য। কেউ কেউ বলেন, এলাকায় রেলওয়ে করা হয়েছিল স্রেফ গোরা সাহেবদের বাণিজ্য বিস্তারের স্বার্থে। আসাম-চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাধারণ স্থানীয়জনদের উন্নতির কথা ভেবে নয়। যাহোক, এক বিলুপ্ত রেলওয়ে কোম্পানি তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিপুল কর্মযজ্ঞ, বিরল ভ্রমণসুখ আর গতিশীল ব্যবসাকে কোন দৃষ্টিতে ভবিষ্যতে দেখা হবে, তা ইতিহাসই নির্ধারণ করে দেবে নির্ঘাত।

 

তথ্যসূত্র:

আসাম ইন দ্য নাইন্টিন্থ সেঞ্চুরিপ্রিয়ম গোস্বামী

পূর্ববঙ্গের রেলওয়ের ইতিহাসদিনাক সোহানী কবির

সমাজচিত্রে ভারতীয় রেলপ্রদোষ চৌধুরী

রেলওয়েজ অ্যান্ড দ্য রাজক্রিস্টিয়ান উলমার

আমার জীবন (৫ম পর্ব)নবীনচন্দ্র সেন

বাংলায় ভ্রমণ (২য় খণ্ড)পূর্ববঙ্গ রেলওয়ে প্রচার বিভাগ

আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে’—বাংলাপিডিয়ায় হেনা মুখার্জি রচিত ভুক্তি

 

মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক