বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২৬, ২০২০ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

সিল্করুট

বঙ্গোপসাগরের জলদস্যু

অনন্ত কার্তিকেয়ান। অনুবাদ: গাজী রাকিব

এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বাংলার বিশাল অঞ্চলজুড়ে আক্রমণ করে লুটতরাজ ধ্বংসযজ্ঞ চালাত জলদস্যুরা। তারা হাজারো মানুষকে বন্দি করে ক্রীতদাস হিসেবে প্রেরণ করত। জলদস্যুরা যুদ্ধজাহাজ আর নদীতে চলার মতো দ্রুতগতির নৌকা নিয়ে উপকূলীয় শহর গ্রামে এবং গঙ্গাবিধৌত বদ্বীপের আরো অনেক শহরে অতর্কিতে হামলা করত। জলদস্যুরা ছিল পর্তুগিজ আর ম্রাউক-ইউ রাজ্যের মগ জাতিগোষ্ঠী। ম্রাউক-ইউ রাজ্যটি বর্তমানে রাখাইনের উপকূলীয় অঞ্চল। এখানে বৌদ্ধ মুসলিম উভয় জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করত এবং রক্তক্ষয়ী ইতিহাস বিপজ্জনক অবস্থানের কারণে রাজ্যটি ছিল কিছুটা ভৌতিক রণলিপ্সু। অবশেষে দক্ষ মোগল সরকার বিশেষ কৌশল আর সামরিক অভিযানের মাধ্যমে হুমকি দমন করে।

ক্রীতদাস সংগ্রহের উদ্দেশে হামলার পেছনে অবশ্য সুনির্দিষ্ট কারণও ছিল। শাসকরা বুঝতে পারছিল, অর্থনীতিকে যথেষ্ট আকর্ষণীয় করে তুলতে হলে স্থানীয় আদিবাসী ক্রীতদাসের চেয়ে বিদেশী ক্রীতদাসই বেশি প্রয়োজন। এছাড়া নতুন অধিকৃত অনগ্রসর অঞ্চলের জন্য অর্ধ কিংবা পুরোপুরি দক্ষ ক্রীতদাসের প্রয়োজন। ক্রমবর্ধিষ্ণু ডাচ সাম্রাজ্যে মসলার আবাদ কিংবা খনির কাজে প্রচুর ক্রীতদাসের প্রয়োজন দেখা দেয়। সুমাত্রার আচেহ সালতানাতেও আবাদ কিংবা টিনের খনির জন্য অনেক দাসের প্রয়োজন ছিল। ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর মতো যথেষ্ট অগ্রসরমান নাগরিক ছিল বাংলায়। এছাড়া কারুশিল্প কাপড় তৈরির কাজেও ভারতীয় দাসদের দক্ষতার অনেক বেশি মূল্য ছিল। কারণেই তাদের অনেককে সুদূর আফ্রিকার উপনিবেশ অঞ্চলেও প্রেরণ করা হতো।

অঞ্চলে পর্তুগিজদের অভিযান পরিচালনার স্পর্শকাতর কেন্দ্র বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় নতুন উপনিবেশকে সাহায্য করতে দাস সংগ্রহের অভিযান তাদের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বিশেষ করে হুগলি থেকে সম্রাট শাহজাহান তাদের বহিষ্কার করার পর এটি আরো প্রকট হয়। এমনকি তাদের অবস্থা যখন তুঙ্গে তখনো অনেক সাহসী পর্তুগিজ নাগরিক জলদস্যুতা আর দাস ব্যবসায় প্রবেশ করে। কিন্তু এক শতকের মধ্যেই ডাচদের কাছে পর্তুগিজদের কর্তৃত্ব খর্ব হয়ে যায়। তখন পর্তুগিজরা রাখাইন রাজ্যের কাছে সাহায্যের মিনতি করে। যদিও অতীতে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে দুই পক্ষ। মোগল সাম্রাজ্য আর বার্মিজ রাজ্যের মধ্যে স্যান্ডউইচ হয়ে পড়া মগ জাতি বুঝতে পারল, আক্রমণই হতে পারে সর্বোত্তম প্রতিরক্ষা। তাদের কৌশলে পর্তুগিজ নৌবাহিনী হতে পারে বিশেষ গুরুত্ববহ এক হাতিয়ার। এছাড়া অভিযান কিংবা দাস ব্যবসাটা হতে পারত আয়ের দারুণ এক উৎসও। অভিযানের শুরু হয় ১৬১০ সালের দিকে: পর্তুগিজ মগদের নিয়ে গঠিত রণতরীর বিশাল বহর বাংলায় আক্রমণ চালাত। তাদের ধ্বংসযজ্ঞ ছিল ভয়ানক এবং কারণেই হার্মাদ (আরমাডা থেকে আসা) শব্দটি অভিধানে যুক্ত হয়, যার অর্থ ঘৃণ্য অপরাধ। মগরা ছিল দক্ষ নাবিক এবং দ্রুতগতির রণতরী জেলিয়াস নিয়ে বদ্বীপে হামলা করত। আতঙ্কে বহু শহর গ্রাম জনশূন্য হয়ে পড়ত কিংবা অভিযানে খালি হয়ে যেত। মোগলদের প্রথমদিকের প্রতিরোধ ছিল কার্যত ব্যর্থ: তুলনামূলকভাবে তাদের নৌবাহিনী ছিল দুর্বল রাখাইন ছিল এমন লুণ্ঠনকারী অভিযানের জন্য কার্যকর এক ভূখণ্ড।


১৬৬৩ সালে সংকটে পড়ে যায় বাংলা। সাম্প্রতিক ধারাবাহিক যুদ্ধগুলো সমগ্র মোগল সাম্রাজ্যের কাজেও বিঘ্ন ঘটায়। পর্তুগিজ মগদের আক্রমণে প্রদেশের অনেক ক্ষতিসাধন হয়। আহোম-দের সঙ্গে যুদ্ধে বিপর্যয় ঘটার পর মারা যান আগের প্রাদেশিক গভর্নর মীর জুমলা। নতুন গভর্নর শায়েস্তা খান ছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেবের মামা। শায়েস্তা খানের রেকর্ড বেশ প্রশংসনীয় হলেও মারাঠার অধিপতি ছত্রপতী শিবাজির কাছে আশ্চর্যজনভাবে পরাজিত হলে তাকে নির্বাসন হিসেবে বাংলার গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেন ক্ষুব্ধ সম্রাট।

শায়েস্তা খান দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই জলদস্যুদের হুমকি মোকাবেলাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেন। এখানে প্রতিশোধস্পৃহার একটা বিষয়ও ছিল: যুদ্ধে ভাই আওরঙ্গজেবের কাছে পরাজিত হওয়ার পর যুবরাজ সুজা সপরিবারে রাখাইন রাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভ করেছিলেন। বর্ণনা থেকে জানা যায়, রাখাইন রাজা বিশ্বাসঘাতকতা করে সুজা তার সন্তানদের হত্যা করে এবং সুজার মেয়েকে বলাত্কার করে, যে পরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এই রক্তের বদলা নিতে সুজার পরিবারের কেউ জীবিত আছে কিনা তা খুঁজে বের করার মিশনে নামেন শায়েস্তা খান।

শায়েস্তা খান দ্রুতই রাজকীয় অবকাঠামো উন্নত করতে থাকেন: দুর্গ অন্যান্য সরকারি নির্মাণকাজ জোরেশোরে চলছিল। নৌ সেনাবাহিনীতে সৈন্যসংখ্যা বাড়ানো হয়। ১৬৬৫ সালে ডাচ সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আরাকানদের কাছ থেকে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ সন্দ্বীপ দখল করে মোগলরা। চট্টগ্রামে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা শায়েস্তা খানের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং সময় তিনি রাখাইনদের সঙ্গে পর্তুগিজদের দ্বন্দ্বের সুযোগটি নেন। অপেক্ষাকৃত স্থিরীকৃত ব্যবসাবান্ধব মোগলদের সঙ্গে জোট বাঁধার প্রস্তাবে রাজি হয় পর্তুগিজরা। এজন্য বড় অংকের ঘুষও দিতে হয়েছিল তাদের। পর্তুগিজ বাহিনী সদলবলে ঢাকায় জড়ো হয়। রাখাইন সৈন্যবাহিনীও চট্টগ্রামে জড়ো হতে থাকে। শায়েস্তা খান সড়কপথে সৈন্যদের একটি দল পাঠান আর নৌপথে চট্টগ্রামের পথে ছুটে আসে মোগল-পর্তুগিজ সম্মিলিত বাহিনী। সাগরে এবং পরবর্তী সময়ে কর্ণফুলী নদীতে প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়, যাতে রাখাইন বাহিনী ধ্বংস হয়।

শায়েস্তা খানের বিজয়ের পরও বঙ্গোপসাগর থেকে দস্যুতা নির্মূল হয়নি, এমনকি আজকের একুশ শতকের সময়ে এসেও রোহিঙ্গা নৌকা কিংবা বাংলাদেশী জেলেদের নৌকায় হানা দেয় জলদস্যুরা। অধিকন্তু চট্টগ্রাম হারানো আর মোগলদের প্রতি পর্তুগিজদের সহযোগিতা রাখাইন রাজ্যের জন্য ছিল বিরাট আঘাত। মগরা আসলে জানত না কীভাবে বড় যুদ্ধজাহাজ তৈরি পরিচালনা করতে হয়, তাই যুদ্ধে তারা ধরাশায়ী হয়। এরপর শায়েস্তা খান শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তোলেন। তাই অতীতের মতো আর লুটচরাজ চালাতে পারত না রাখাইনরা। লেজহীন সাম্রাজ্য খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে লাগল আর অভ্যন্তরীণ কোন্দল সৃষ্টি হওয়ায় ১৭৮৪ সালে বার্মা কর্তৃক অধিকৃত হওয়ার আগ পর্যন্ত এর কর্তৃত্ব ছিল ভাড়াটে সৈনিকদের হাতে। এদিকে শায়েস্তা খানের দীর্ঘ বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলায় বেশ উন্নতি সাধিত হয়।