সোমবার | আগস্ট ১০, ২০২০ | ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

সিল্করুট

গালেনের চোখে রোমের আন্তোনাইন প্লেগ

শাকের আনোয়ার

মহামারীর সঙ্গে জড়িয়ে যে রোমান চিকিৎসক

আনুমানিক ১৬৫ সালের দিকে প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যে যে ভয়ানক প্লেগ মহামারী শুরু হয়, তার সঙ্গে দুই ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের নাম নানা কারণেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে। তাদের একজন হলেন তখনকার রোমান সম্রাট মার্কাস অরিলিয়াসযার পারিবারিক পদবিআন্তোনিয়াসথেকেই ওই মহামারীর নাম হয়েছিল আন্তোনাইন প্লেগ; আরেকজন ওই সময়ের প্রখ্যাত চিকিৎসক-দার্শনিক ক্লডিয়াস গালেনাসগালেন নামেই তিনি সমধিক পরিচিত, যিনি কিনা নিজের চিকিৎসা-দক্ষতার কারণে রোমান সাম্রাজ্যে রাজানুগ্রহ বরাবরই পেয়ে এসেছিলেন। ১৬৫ থেকে খ্রিস্টাব্দ ১৮০ সময়খণ্ডে রোমান সাম্রাজ্যে যখন আন্তোনাইন প্লেগ মহামারী চলছিল, তার পুরো ঘটনাপ্রবাহ জুড়েই গালেন যেন ছিলেন এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। কারণে আন্তোনাইন প্লেগকে কখনো কখনোপ্লেগ অব গালেননামেও কোনো কোনো ঐতিহাসিক চিহ্নিত করে থাকেন। কারণ রোমান সাম্রাজ্যের চরমতম দুঃসময়ে গালেনের স্বনির্মিত চিকিৎসা পদ্ধতি বহু মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছিল। আবার চিকিৎসক হিসেবে গালেনের এক বিশেষ অগ্নিপরীক্ষাও যেন ছিল এই প্লেগ মহামারী।

গালেনের জন্ম হয়েছিল রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম সমৃদ্ধ শহর পেরাগমনে (হালে এলাকাটি তুরস্কের মধ্যে পড়েছে) তার পিতা আলেয়স নিকন তত্কালীন প্রশাসনের ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের অন্যতম দক্ষ স্থপতি ছিলেন। দর্শন, বিজ্ঞান থেকে শুরু করে সাহিত্য অবধি ছিল তার জানাশোনার পরিধি। গালেনের বয়স যখন মাত্র ১৯, তখন নিকনের মৃত্যু হয়। কিন্তু পিতার প্রতিভা জ্ঞানের সবটুকুই যেন তিনি পেয়েছিলেন। সেই বিদ্যা সম্বল করেই আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত চিকিৎসা বিদ্যালয়সহ বহু জায়গায় তিনি স্বাস্থ্য-শরীর বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। পড়া শেষে গ্ল্যাডিয়েটরদের চিকিৎসক হিসেবেও কাজ করেছিলেন। ১৬১ খ্রিস্টাব্দে রোমে ঠাঁই গাড়েন গালেন। সেখানেও তিনি সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হন। কিন্তু শহরের পুরনো বহু রক্ষণশীল ডাক্তার, যাদের দক্ষতা বিশেষ ছিল না, তারা গালেনের বিরুদ্ধে প্রায় উঠেপড়ে লাগে। প্রতিদ্বন্দ্বী অসূয়াপ্রবণ চিকিৎসকেরা তাকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলতে পারে বা শহর থেকে নির্বাসিত করতে পারে, ভয়ে তিনি রোমের বাইরে গিয়েও কয়েকবার থেকেছিলেন।

অভিজ্ঞ বদ্যির চোখে রোগের কী লক্ষণ

রোমান সাম্রাজ্যে যখন প্রথম প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, তখন ঘটনাক্রমে গালেন খোদ রোম শহরেই ছিলেন। পরে অবশ্য তিনি রোমের বাইরে চলে যান। পরে ১৬৮ সালের দিকে যখন প্লেগ পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করে আরো ভয়াবহরূপে ছড়িয়ে পড়ে, সে সময় তিনি ছিলেন একুইলিয়া শহরে। শরত্কালে ওই শহরে জমায়েত হওয়া রোমান সৈন্যদলের মধ্যে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে শীতকাল আসার পর। সম্রাট মার্কাস অরিলিয়াসও তখন দলবলসমেত সেখানে। বিষয়ে গালেনের নিজের বয়ান এমন: ‘একুইলিয়ায় আমার আগমনের পর প্লেগ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক ভয়ংকর আক্রমণ করল। কারণে দ্রুততার সঙ্গে ছোট্ট একটি সৈন্যদল সঙ্গে নিয়ে রোমে ফিরে গেলেন। আমরা যারা থেকে গেলাম, তাদের জন্য বেঁচে থাকাটা দীর্ঘ সময়ের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছিল। আর অনেকেই শেষমেশ মারা গিয়েছিল। এমনটা স্রেফ প্লেগের জন্যই ঘটেনি, সবকিছুই যে শীতকালের মাঝামাঝি সময়ে হচ্ছিল, সেটাও একটা কারণ বটে।

মার্কাস অরিলিয়াসের অনুরোধে ফের গালেন রোমে আসেন। মার্কাস অরিলিয়াস সম্ভবত প্লেগের হাত থেকে নিজে বাঁচার রোগটি থেকে স্থায়ীভাবে পরিত্রাণ পাওয়ার উদ্দেশ্যেই অভিজ্ঞ চিকিৎসককে গালেনের ওপর নির্ভর করতে চেয়েছিলেন। অদ্ভুত কাণ্ড এই, গালেনের যেসব পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করা গেছে, তাতে অন্য সব রোগের প্রকৃতি-আকৃতি উপশমের নিদান সবিস্তারে মিললেও প্লেগের অনুপুঙ্খ বিবরণ তার লেখায় লভ্য নয়। উল্টো যেটুকু মেলে, তা বড়ই সংক্ষিপ্ত আবছা। গবেষকদের কেউ কেউ মনে করেন যে গালেন আদতে প্লেগের বর্ণনা লিখে রাখার বদলে রোগটি মানবদেহে কী কী কুপ্রভাব ফেলে কেমন করে এর চিকিৎসা করতে হয়, তা জানতেই অধিকতর আগ্রহী ছিলেন। গালেন তারমেথোডুস মেডেন্ডিপাণ্ডুলিপিতে জানিয়েছেন, প্লেগের লক্ষণগুলো রোগীর শরীরে দৃশ্যমান হয় আক্রান্ত হওয়ার নয়দিনের মাথায়। অবস্থা গুরুতর না হলে তরুণ রোগীরা সাধারণত লক্ষণ দেখা দেয়ার পরের তিনদিনেই সেরে উঠে রোগশয্যা ত্যাগ করতে পারেন। অর্থাৎ আক্রান্ত হওয়ার ১২ দিনের মাথায়। গালেন মহামারীর সময় প্লেগে আক্রান্ত তরুণের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে: ‘...এক তরুণের শরীর ক্ষতে ভরে গেল, যারা বেঁচে গিয়েছে তাদের প্রায় প্রত্যেকেরই যেমনটা হয়েছে। তার পুরো শরীরে দেয়া হলো ক্ষত শুকানোর ওষুধ। দ্বাদশতম দিনে সে বিছানা থেকে উঠতে সক্ষম হলো।...’ ওই পাণ্ডুলিপিতে আন্তোনাইন প্লেগে আক্রান্ত রোগীদের বিষয়ে লিখতে গিয়ে গালেন আরো যা যা জানিয়েছেন, তার সারমর্ম নিম্নরূপ: যারা বেঁচে গেছে তাদের অধিকাংশই উদরাময়ে ভুগছে, একটা কালো ক্ষত শরীরজুড়ে দেখা দিচ্ছে। এই ক্ষত খুবই বীভৎস শুষ্ক (কোনো তরল থেকে নিঃসৃত হচ্ছে না) বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই। আবার অল্প কিছু ক্ষেত্রে উদরাময়ের লক্ষণ নেই, তাও পুরো শরীর কালো ক্ষতে ভর্তি হয়ে যাচ্ছে। যখন ওই ঘা শুকিয়ে জীর্ণ হয়ে আসে, তখন তা একটু একটু করে শরীর থেকে উবেও যাচ্ছে কখনো কখনো কিন্তু রোগ থেকে সেরে ওঠার মাসখানেক পরই এমনটি ঘটছে, দ্রুতই ক্ষতচিহ্ন উধাও হচ্ছে না। গালেনের ধারণা ছিল, এই ক্ষত তৈরি হচ্ছে মলের মাধ্যমে বেরিয়ে যাওয়া দূষিত রক্তের অবশিষ্টাংশ থেকে। যেন অনেকটা ছাইয়ের মতো। যেসব রোগী প্লেগে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের শরীরে ন্যূনতম উষ্ণতার দেখা মেলে না। আবার তাদের শরীর জ্বরে পুড়েও যায় না। সম্ভবত জ্বর তাদের শরীরের ভেতরেই চাপা অবস্থায় থেকে যায়। রোগে আক্রান্ত প্রত্যেকেরই মল ক্রমান্বয়ে কালো হয়ে যাচ্ছে। প্রথমে লালচে বাদামি, পরে হলদে লাল, সবশেষে কালো। সম্ভবত মলের সঙ্গে দূষিত রক্ত যাওয়ার কারণে এমনটি ঘটছে। যারা সুস্থ হয়ে উঠেছে, তাদের মলের রঙ খুব একটা পাল্টাচ্ছে না। তাদের মল দিয়ে চরম দুর্গন্ধও আসছে। আর প্রচণ্ড ঘন কালো মল যাদের হচ্ছে, তারা কেউই বাঁচছে না। রোগীদের কেউ কেউ বমি করছে, তবে সবারই পেট নামছে। কারো কারো নিঃশ্বাস পূতিগন্ধময় হয়ে উঠছে এবং চোখের পাতায় পিঁচুটি জমে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

কোনো কোনো রোগীর বেলায় আবার আজব কিছু লক্ষণ দেখতে পেয়েছিলেন গালেন। প্লেগে আক্রান্ত হওয়ার পরপর শুধু অল্প কাশি হলেও কিছুদিন গেলে সারা শরীরে প্লেগের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ক্ষত দেখা দেয়ার ঘটনাটি যেমন। বিষয়ে গালেন লিখেছেনআক্রান্ত হওয়ার পর এক তরুণের সামান্য কাশি দেখা দিয়েছিল। ঠিক এর পরদিনই তার কাশি বেড়ে গেল তা সঙ্গে করে নিয়ে এল ক্ষত এবং অন্য আরেক তরুণের গলা দিয়ে কাশির সঙ্গে প্রথমে সামান্য শ্লেষ্মা এলেও পরে কাশির সঙ্গে উঠে আসছিল রক্ত। কয়েকদিন পর কাশির সঙ্গে পেটের ভেতরকার ছোটখাটো নাড়িভুঁড়িও উঠে আসতে থাকে! আরেক তরুণ গলায় সামান্য কাশি নিয়ে এসেছিল। পরে পরীক্ষা করে বোঝা যায়, তার শ্বাসনালির মধ্যে ঘা দেখা দিয়েছে। যদিও তার মুখ বা গলার বাইরের অংশে কোনো ঘা দেখা দেয়নি। কিছুদিন পর তার স্বরযন্ত্র চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো। তার গলা অনেকটাই শক্তিহীন হয়ে পড়েছিল। উল্লেখ্য, গালেনের এসব বিবরণ দেখে হাল আমলের একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ইদানীং মনে করছেন যে প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যে দেখা দেয়া ওই মহামারীটি আদৌ প্লেগ নয়। তা আদতে ছিল ভয়ানক রকমের এক গুটিবসন্ত।

ব্যক্তিগত জীবনে প্লেগের আঘাত

গালেনের চিকিৎসক-জীবনে যেমন আন্তোনাইন প্লেগ মহামারীর সময়টুকু ছিল চরম চ্যালেঞ্জ নতুন নতুন সমস্যার আবির্ভাব ঘটিয়েছিল, তেমনি তার ব্যক্তিগত পরিসরেও মহামারী অভিঘাত ফেলতে ছাড়েনি। রোমে গালেনের অধীন সব দাসই প্লেগের প্রথম ঝটকার সময়েই রোগে ভুগে মারা যায়। এছাড়া একুইলিয়ায় নিজের চোখের সামনে বহু সৈন্যকে প্লেগের কারণে মরতে দেখে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। গালেনের যেন মনে হচ্ছিল, এটা তারই দায়। পরে রোমে প্লেগের পুনরায় প্রাদুর্ভাবের সময় তিনি ঘটনাক্রমে নিজের তৈরি করা বেশ কিছু ওষুধের ফর্মুলা চিকিৎসার প্রক্রিয়াঋদ্ধ পাণ্ডুলিপি হারিয়ে ফেলেন। গালেনের ভাষায়, ওই ফর্মুলা কৌশলগুলো তিনি ব্যাপক পরিশ্রম ভাগ্যের জোরে উদ্ভাবন করতে পেরেছিলেন। ওষুধের ফর্মুলা চিকিৎসার কৌশলগুলো লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে চিকিৎসা ওষুধবিদ্যা বিষয়ক একটি চমত্কার পাণ্ডুলিপিই গালেন নির্মাণ করে ফেলেছিলেন। রোম ছাড়ার আগে গালেন পাণ্ডুলিপিটি সংরক্ষণ করতে দিয়ে গিয়েছিলেন ছাত্র তিউথ্রাসকে। কিন্তু একুইলিয়া থেকে রোমে যখন তিনি ফিরে এলেন, তখন জানতে পারলেন যে প্লেগের প্রকোপে তিউথ্রাসও মারা গেছেন। এবং ওই পাণ্ডুলিপিটির খোঁজও পাওয়া যাচ্ছে না। প্রিয় শিষ্যের প্রয়াণ বহু পরিশ্রমের পাণ্ডুলিপি কারণে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ায় গালেনের মনে তৈরি হয় ভয়ানক শোক। প্লেগ থেমে যাওয়ার পরও গালেনের দুর্দশা কাটেনি। এর বছর খানেক বাদেই তার রোমের বাড়িটিও এক অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত হয়।

গালেন কেন গুরুত্বপূর্ণ

অসম্পূর্ণতা বা বিতর্ক থাকলেও গালেনের লিপিবদ্ধ করে যাওয়া প্লেগসংক্রান্ত বিবরণ বর্তমানের চিকিৎসক গবেষকদের কাজে এসেছে বৈকি। প্লেগ মহামারীর প্রাচীনতম বিবরণগুলোর মধ্যে চিকিৎসক হিসেবে গালেনের রেখে যাওয়া বয়ান নিঃসন্দেহে এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। একালের অত্যাধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান হয়তো গালেনের বহু মন্তব্য কি পর্যবেক্ষণকে যুক্তি-প্রমাণ দিয়েই নস্যাৎ করে দিতে পারবে। কিন্তু রোমান ইতিহাস আদিকালের মহামারী নিয়ে যারা আগ্রহীগবেষক বা আমপাঠকতাদের কাছে গালেনের বয়ানের মূল্য অপরিসীম। আর সেই প্রাচীন যুগে রেখে যাওয়া তার পর্যবেক্ষণ তো যুগের প্লেগ চিকিৎসার ভিত গড়ে দিতেও সাহায্য করেছে, তাই নয় কি?

 

তথ্যসূত্র:

. গালেন অ্যান্ড দ্য প্লেগরেবেকা ফ্লেমিং

. গালেন অ্যান্ড দি অ্যান্টোনিন প্লেগআর জে লিটম্যান ওএম এল লিটম্যান।

 

শাকের আনোয়ার: প্রাবন্ধিক