সোমবার | আগস্ট ১০, ২০২০ | ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

সিল্করুট

রোমান সাম্রাজ্যের পতনে মহামারী

হারুন রশীদ

খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে মারকোম্যানিক যুদ্ধের সময় হঠাৎ করে দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হলেন ৩৮ বছর বয়সী তরুণ রোমান সম্রাট লুসিয়াস ভেরাস। রাজচিকিৎসকদের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তলব করা হলো সেই সময় রোমে অবস্থানরত গ্রিক চিকিৎসক গালেনকে। তিনি রাজপ্রাসাদে উপস্থিত হয়ে লক্ষণ বিচার করে বুঝতে পারলেন, সম্রাট অনিরাময়যোগ্য কোনো রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। তবু তিনি নানা পথ্য দিয়ে সাধ্যমতো চেষ্টা করলেন সম্রাটকে সারিয়ে তোলার জন্য। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে ১৬৯ সালের ২৩ জানুয়ারি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন সম্রাট।

এর কয়েক বছর আগে মেসোপটেমিয়ান শহর সেল্যুশিয়া অবরোধের সময় প্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল রোমান সৈন্যবাহিনীতে। যুদ্ধ শেষে রোমে ফিরে আসার সময় সেই রোগ বহন করে এনেছিল সৈন্যদের কেউ কেউ। তাদের মাধ্যমে হয়তো রাজপ্রাসাদেও ঢুকে পড়ে সেই ব্যাধি এবং সম্রাটের দেহে আক্রমণ করে। ১৮৯ সালে সেই রোগটি এতই ভয়ানক হয়ে উঠেছিল যে শুধু রোম নগরীতেই দৈনিক সর্বোচ্চ দুই হাজার লোকের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল।

পরবর্তী যুগের গবেষকরা সেই মহামারীকে আন্তোনাইন প্লেগ নামে চিহ্নিত করলেও ঐতিহাসিক উইলিয়াম ম্যাকনিল বলছেন, সেই মহামারীর জন্য দায়ী ছিল হাম গুটিবসন্ত। তার মতে, Antonine Plague and the later Plague of Cyprian (251–ca. 270) were outbreaks of two different diseases, one of smallpox and one of measles but not necessarily in that order. The severe devastation to the European population from the two plagues may indicate that people had no previous exposure to either disease, which brought immunity to survivors. Other historians believe that both outbreaks involved smallpox. The latter view is bolstered by molecular estimates that place the evolution of measles sometime after 1000 AD.

উইলিয়াম ম্যাকনিলের সিদ্ধান্তের পেছনে অসুস্থ সম্রাটের চিকিৎসক গালেন বর্ণিত রোগের লক্ষণগুলো প্রভাব বিস্তার করেছিল তাতে সন্দেহ নেই। গালেন রোমান সম্রাটের রোগটা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বিবরণে বলেছিলেন, ‘এটা খুব বড় ধরনের প্লেগ এবং দীর্ঘ সময় ধরে ভোগায়। এতে জ্বর, ডায়রিয়ার সঙ্গে গলায় তীব্র প্রদাহ হয় এবং অসুস্থ হওয়ার নয়দিনের মাথায় চামড়ায় পুঁজওয়ালা গুটি দেখা যায়।

প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানুষ অতিক্ষুদ্র জীবাণুর আক্রমণের শিকার হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছে সেই জীবাণুর হাতে। কিন্তু সেসব প্রাণহানির কারণ বুঝতে পারেনি হাজার হাজার বছর পরও। অনুবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কারের পর এসব ক্ষুদে ভয়ংকর রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু সম্পর্কে মানুষ জানতে শুরু করে। সেও ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রায় শেষদিকে। কয়েকশ বছর আগেও এই মহামারীগুলোর কারণ হিসেবে অণুজীবকে কল্পনা করা অসম্ভব ছিল, বরং আধিভৌতিক কারণকে দোষী সব্যস্ত করা হতো।  কিংবা মানুষের পাপের জন্য বিধাতা নির্ধারিত শাস্তি হিসেবে কল্পনা করা হতো।

মানুষের যত বিভ্রান্তিকর ধারণাই হোক না কেন, ইতিহাসে এই ক্ষুদে অণুজীবের মহামারীতে অনেক সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে। অনেক সমাজের রীতিনীতি বদলে গেছে। মহামারীর ইতিহাস মানুষের তৈরি সভ্যতায় তার প্রভাব নিয়ে চিন্তাভাবনা অভিনব কিংবা নবীন কোনোটাই নয়। প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগের এক মহামারীতে চীনের Hamin Mangha নামে একটি প্রাচীন গ্রাম সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। মাত্র ২৯টি পরিবারের বসবাস ছিল সেই গ্রামে। ধরে নেয়া হয় যে প্রায় সব অধিবাসীই মৃত্যুবরণ করেছিল সেই মহামারীতে। কেউ রেহাই পায়নি, বাড়ির ভেতরে কিশোর, যুবক মধ্যবয়স্ক মিলে ১০০টি মানুষের কঙ্কাল একসঙ্গে পাওয়া গিয়েছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটটিকে এখন Hamin Mangha নামে চিহ্নিত করা হয়। এটি উত্তর-পূর্ব চীনের অন্যতম সেরা সংরক্ষিত প্রাগৈতিহাসিক স্থান। প্রত্নতাত্ত্বিক নৃতাত্ত্বিক অধ্যয়ন ইঙ্গিত দেয় যে মহামারীটি এত দ্রুত আঘাত করেছিল যে যথাযথভাবে সত্কারের কোনো সময় ছিল না। পরবর্তীকালে সেই গ্রামে আর বাস করেনি কেউ।

হামিন মাঙ্গার সন্ধান লাভের আগে উত্তর-পূর্ব চিনের মিয়াওজিগৌ নামে একটি স্থানে পাওয়া গিয়েছিল প্রায় একই সময়ের আরেকটি প্রাগৈতিহাসিক গণসমাধি। একসঙ্গে আবিষ্কারগুলো প্রমাণ করে যে একটি মহামারী পুরো অঞ্চলকে ধ্বংস করে দিয়েছে। গবেষকরা এটা মনে করছেন যে লিখিত ইতিহাসের আগের যুগে ওই সভ্যতার পতনের সঙ্গে সঙ্গে ৪০০ বছরের পৃথিবীর উষ্ণ জলবায়ুর সমাপ্তিকাল ঘোষিত হয়।

চীনের ঘটনার পর জানা যায় যে এথেন্স স্পার্টার মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুকাল পরই, প্রায় ৪৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, একটি পাঁচ বছরব্যাপী মহামারী এথেন্সের মানুষকে বিধ্বস্ত করেছিল। কারো কারো অনুমান, মৃতের সংখ্যা এক লাখও হতে পারে। পরবর্তীকালে যে রোমান সাম্রাজ্যের সূর্য কখনো অস্তমিত হতো না, সেখানেও দেখা গেল মহামারীর থাবা। রোমান সৈন্যরা যখন যুদ্ধ শেষে সাম্রাজ্যে ফিরে আসে, তারা বিজয়ের লুণ্ঠনের সঙ্গে যেটা নিয়ে এল সেটা হলো রোগ। ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রোমান ইতিহাসের সিনিয়র গবেষক এপ্রিল পুডসে লিখেছিলেন, আন্তোনাইন প্লেগ সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করেছিল এবং রোমান সাম্রাজ্যের ৫০ লাখের বেশি লোককে হত্যা করেছিল।

মহামারীটি রোমান সাম্রাজ্যজুড়ে মারাত্মক সামাজিক রাজনৈতিক প্রভাব ফেলেছিল। এই মহামারীর ফলে রোমান সাম্রাজ্যের সামরিক শক্তি কমে যায়, কৃষি নগর অর্থনীতি ভেঙে পড়ে এবং রাজ্যের অর্থভাণ্ডার প্রায় শূন্য হয়ে পড়ে। আন্তোনাইন প্লেগ প্রাচীন রোমান ঐতিহ্যগুলোকে প্রভাবিত করেছিল। এছাড়া রোমানদের শৈল্পিক প্রকাশের ওপর একটি গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল; আধ্যাত্মিকতা ধর্মীয় ভাবনাকে নবজীবন দান করেছিল। ঘটনার প্রভাবে খ্রিস্টধর্মের মতো একেশ্বরবাদী ধর্মের প্রসারের ক্ষেত্র তৈরি করেছিল। সময়ে স্বাস্থ্য, সামাজিক অর্থনৈতিক সংকটের ফলে পার্শ্ববর্তী বর্বর উপজাতির সাম্রাজ্যে অনুপ্রবেশ ঘটে এবং রোমান সেনাবাহিনীতে বর্বর সৈন্যদের নিয়োগের পথ সুগম করে; ঘটনাগুলো বিশেষত ওই জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক বৃদ্ধির পক্ষে কাজ করে। সেই হিসেবে অনুমান করা হয়, আন্তোনাইন প্লেগ রোম সাম্রাজ্যের পতনের ক্ষেত্র তৈরি করেছিল।

আন্তোনাইন প্লেগের কয়েক শতাব্দী পর আরেকটি মহামারী আঘাত হেনেছিল রোমান সাম্রাজ্যজুড়ে। প্লেগটির নাম বাইজেন্টাইন সম্রাট প্রথম জাস্টিনিয়ানের (৫২৭-৫৬৫ খ্রিস্টাব্দ) নামানুসারে করা হয়েছে। তার শাসনামলে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য সর্বাধিক সীমায় পৌঁছেছিল। মিসর হয়ে ফিলিস্তিন বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এই মহামারী। পরে পুরো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এই প্লেগ তাণ্ডব চালায়। সম্রাট জাস্টিনিয়ান ওই সময় রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে বাইজেন্টাইনকে একীভূত করার পরিকল্পনা করছিলেন। মহামারীতে সব ভেস্তে যায়। শুরু হয় অর্থনৈতিক সংকট। হাজার হাজার যুবকের মৃত্যু সাম্রাজ্যের সামরিক শক্তি হ্রাস করে, হাজার হাজার কৃষকের মৃত্যু শস্য উৎপাদনে হ্রাস ঘটায়। পরবর্তী সময়ে দুর্ভিক্ষ ডেকে আনে, ধ্বংস করে সাম্রাজ্যের কাঠামো। এই রোগ-পরবর্তী আরো দুই শতাব্দী ধরে বিভিন্ন সময়ে মহামারী আকার নিয়েছিল। মারা গিয়েছিল প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ। তখনকার হিসাবে এটি ছিল পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ২৬ শতাংশ। সম্রাট প্রথম জাস্টিনিয়ানও প্লেগের সঙ্গে অসুস্থ হয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন। তবে মহামারীটি আঘাত হানার পর ধীরে ধীরে তার সাম্রাজ্য ভূখণ্ড হারাতে থাকে।

বিখ্যাত ঐতিহাসিক এডওয়ার্ড গিবন তার Decline and Fall of the Roman Empire লেখার পর যে প্রশ্নে জর্জরিত হয়েছিলেন বহুবার তা হলো শক্তিশালী রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছিল কীভাবেতিনি জবাবে বলতেন যে তৃতীয় থেকে সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে রোমান সাম্রাজ্যের যে পতন ঘটেছে, তার চেয়ে আমাদের গুরুত্ব দেয়া উচিত এটা কত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে ছিল পৃথিবীতে। এখনো অনেক ঐতিহাসিক রোমান সাম্রাজ্যের পতন নিয়ে ভাবতে পছন্দ করেন। পতনের কারণ হিসেবে নানা মুনির নানা মত হলেও একটি দল ভিন্ন রকমের মত দিয়েছিল। তাদের মতে, রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটেনি কখনইভ ওটা কেবল বিবর্তিত হয়ে নতুন শক্তিতে মিশে গেছে, যা আলাদা করে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব নয়। বিবর্তনতত্ত্বের বিপক্ষে যারা অবস্থান নিয়েছিলেন, তাদের মতে সন্ত্রাস, মহামারী অর্থনৈতিক বিপর্যয়ই রোমান সাম্রাজ্যের পতন ডেকে এনেছে। এসব মতামতের মধ্যে সবচেয়ে উপরে অবস্থান করছে ২০০৫ সালে  Bryan Ward-Perkins লিখিত পুস্তকThe Fall of Rome and the End of Civilization

যদিও আমরা হয়তো রোমান সাম্রাজ্যের পতনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো একটি কারণকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হব না, তবু ঐতিহাসিকরা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে সেই সময়ের পৃথিবীতে মানুষের জীবনে যত রকমের সমস্যা হতে পারত, তার সব খুঁটিয়ে দেখে বোঝার চেষ্টা করেছেন, কোন কারণটি এর জন্য দায়ী। এর মধ্যে দুটো অভিনব তত্ত্ব জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তত্ত্ব দুটো প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অব রোমান আর্কিওলজির সাম্প্রতিক সংখ্যায়। প্রথমটি লিখেছেন ওকলাহোমা  ইউনিভার্সিটির ঐতিহাসিক Kzle Harper, যিনি  তৃতীয় শতাব্দীর সাইপ্রিয়ান প্লেগ মহামারীকে দায়ী করেছেন রোমান সাম্রাজ্যের পতনের জন্য। অন্যটি লিখেছেন হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির মধ্যযুগের ঐতিহাসিক Michael McCormick, তিনি দায়ী করেছেন ষষ্ঠ শতাব্দীর জাস্টিনিয়ান প্লেগকে।


নিবিড় গবেষণার মাধ্যমে  ডিএনএ বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ব্ল্যাক ডেথের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়াই সুদূর অতীতে জাস্টিনিয়ান প্লেগের সৃষ্টি করেছিল। প্রাচীন সূত্রগুলো থেকে জানা যাচ্ছে যে জাস্টিনিয়ান প্লেগ রোমান সাম্রাজ্যে ভয়াবহ মহামারী সৃষ্টি করেছিল। মহামারীতে এত বিপুল পরিমাণ লোক মারা গিয়েছিল যে বাইজেন্টাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ানকে শহরের রাস্তা থেকে মরদেহ সরানোর জন্য একজন বিশেষ কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হয়েছিল। থিওডোর নামের সেই দুর্ভাগা কর্মকর্তাকে গরুর গাড়িতে করে শত শত মরদেহ বহন করে নিয়ে যেতে হয়েছিল শহরের বাইরে সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে। সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ মেলে প্রাচীন গ্রিসের এফিসাস নগরীর জন নামক জনৈক বাসিন্দার বিবরণ থেকে:

থিওডোরকে এত বিশাল এক গণকবর খনন করতে হয়েছিল, যার ভেতর কমপক্ষে ৭০ হাজার মরদেহ সমাহিত করা হয়েছিল। তাকে প্রচুর লোক নিয়োগ করতে হয়েছিল, যারা মরদেহ বহন করে নিয়ে যেত সেখানে। খড়ের গাদায় যেভাবে খড় স্তূপ করা হয়, সেভাবে একের পর এক মরদেহ স্তূপ করে রাখা হয়েছিল কবরে। তারপর চাপ দিয়ে তাদের যথাসম্ভব ঠেসে দেয়া হয়েছিল। নারী-পুরুষ নির্বিশেষ সবার মরদেহ একত্রে পুঁতে ফেলা হয়েছিল পচা আঙুরের মতো।

ঐতিহাসিক প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে এত বিপুল পরিমাণ মরদেহ কবরস্থ করার বিবরণ পেলেও বাস্তবে সেই কবরের সন্ধান মেলেনি এখনো, যেখানে ৭০ হাজার কঙ্কাল জমা আছে। তবে ইস্তাম্বুলের কাছে ভূমধ্যসাগরের তীরে কোথাও তাদের অবস্থান হতে পারে। কিছু ঐতিহাসিক ওই ৭০ হাজার মরদেহের প্রমাণিত তথ্যের ব্যাপারে খুঁতখুঁত করলেও এটা সত্য যে জাস্টিনিয়ান প্লেগের সময় অসংখ্য মানুষ মারা গিয়েছিল।

কথা হলো, এতগুলো মরদেহ কোথায় গায়েব হয়ে গেল? পরবর্তীকালে কোথাও তার কোনো চিহ্ন আবিষ্কার করা যায়নি। ব্যাপারে ম্যাককরমিক অসম্পূর্ণ ভূতাত্ত্বিক খননকে দায়ী করেছেন। বিশেষ করে সেই সব শহরে যেখানে আধুনিক দালানকোঠা উঠে গেছে, যেখানে খনন করার জন্য যথেষ্ট জায়গা নেই, খননকাজের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি মিলবে না। এটা ঠিক যে নবনির্মিত স্থাপত্যকর্ম দালানকোঠা বাড়িঘর ভেঙেচুরে কোনো সরকারই এসব খননকাজে অনুমতি দিতে পারে না। এসব কারণে তলিয়ে গেছে জাস্টিনিয়ান প্লেগে নিহত হাজার হাজার মরদেহের অস্তিত্ব। এর মধ্যে একমাত্র জেরুজালেমে ষষ্ঠ শতাব্দীর কিছু গণকবরের অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেখানে শতাধিক কঙ্কাল খুঁজে পাওয়া গেছে একই কবরে। কিন্তু সে রকম গণকবর পাওয়া গেলেও জাস্টিনিয়ান প্লেগের সম্পূর্ণ চিত্র তাতে মিলবে না। যেসব শহরে রকম গণকবর আছে, তাদের কর্তৃপক্ষ প্রভাব বিস্তার করবে সঠিক তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে। প্রত্যেক শহর নিজেকে প্রাচীন ঐতিহ্যে গৌরবান্বিত ভাবতে চায়।

লন্ডনের ব্ল্যাক ডেথে মৃত্যু সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রজন্মের ভূতাত্ত্বিক তথ্য থেকে জানা যায়, ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটার পর প্রথম দিকে মরদেহগুলো বিভিন্ন কমিউনিটিতে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নিয়মিত কবরখানায় জায়গা না হওয়ার কারণে গণকবরের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল।

অন্যদিকে হারপার বর্ণিত তৃতীয় শতাব্দীর সাইপ্রিয়ান মহামারীর প্রকৃত আসামী সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি এখনো। সম্প্রতি মিসর রোম থেকে সংগৃহিত কঙ্কালের টিস্যু থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ম্যাককরমিকের গবেষণার তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করার জন্য যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, সাইপ্রিয়ান প্লেগের তথ্য বিশ্লেষণে সেই পদ্ধতি কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। তবে হারপার জোর দিয়ে বলছেন যে ওটা ইয়েলো ফিভার কিংবা ইবোলার মতো ভাইরাসবাহিত জ্বর হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। ব্যাপারে যেসব প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষ্য পাওয়া যায়, যেমন কার্থাজিনিয়ান বিশপ এবং অন্যান্য যারা ওই প্লেগ সম্পর্কে সাক্ষ্য দিয়েছেন তার সাথে পশ্চিম আফ্রিকার ইবোলা সংক্রমণের সাক্ষ্যের বেশ মিল পাওয়া যায়।

As the strength of the bodz is dissolved, the bowels dissipate in a flow; a fire that begins in the inmost depths burns up into wounds in the throat... the intestines are shaken with continuous vomiting ... the eyes are set on fire from the force of the blood ... as weakness prevails through the failures and losses of the bodies, the gait is crippled or the hearing is blocked or the vision is blinded ...

সব মিলিয়ে বলা চলে, কয়েক শতাব্দী ধরে একের পর এক মহামারীর আক্রমণে রোমান সাম্রাজ্য বিপুল পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল, যা তার মেরুদণ্ডে আঘাত করেছিল। এককালে রোমান সেনাবাহিনী ছিল প্রতিপক্ষের কাছে একই সাথে ঈর্ষা আতঙ্কের সংমিশ্রণে গঠিত একটি নাম। কিন্তু কালক্রমে অতীতের ঐতিহ্য শৌর্য-বীর্য হারিয়ে ফেলে রোমান বাহিনী। তাদের সৈন্য নিয়োগ পরিচালনা প্রক্রিয়ায়ও আসে বিস্তর পরিবর্তন। রোমান জনগণ একসময় তাদের সেনাবাহিনীতে যোগদানের ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করতে আরম্ভ করে। ফলে ডায়োক্লেটিয়ান কনস্টান্টিনের মতো সম্রাটরা বাধ্য হয়েই বিদেশী ভাড়াটে লোকদের তাদের সেনাবাহিনী ভর্তি করতে বাধ্য হন। তখন সেনাবাহিনীতে প্রচুর গথ অন্যান্য বর্বর গোত্রের সৈন্যদের নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। বিদেশী সৈন্যদের সাথে নানা রোগ-জীবাণুও রোমান বাহিনীতে অনুপ্রবেশ করতে পারে বলে ধারণা করা হয়। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পেছনে আরো বহুবিধ কারণ অবশ্যই ছিল, যার মধ্যে অর্থনৈতিক দৈন্য, সিনেট সম্রাটের দ্বন্দ্ব, নৈতিক অবক্ষয়, দক্ষ শ্রমিকের অভাব, পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের উত্থান, অতিকায় সাম্রাজ্য বৃহদাকার সেনাবাহিনী, দুর্নীতি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, হানদের আক্রমণ বর্বর গোত্রগুলোর রোমে আগমন ইত্যাদি কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে সাম্রাজ্য। এসব বহুমাত্রিক কারণের সাথে মহামারীর আক্রমণ যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি খারাপের দিকে নিয়ে গিয়েছিল, যা মহাশক্তিশালী রোমান সাম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। সপ্তম শতাব্দীতেই রোমান সাম্রাজ্যের সব ধরনের প্রভাব-প্রতিপত্তির অবসান ঘটলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে যবনিকা নামে পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে এসে।

 

তথ্যসূত্র:

.    The Plagues That Might Have Brought Down the Roman Empire By Caroline Wazer

.   Disease and History, Frederick F Cartwright

.   The Death Toll of Justinian’s Plague and Its Effects on the Byzantine Empire- Joshua North

.   Plague and the End of Antiquity: The Pandemic of 541–750- Little, Lester K., ed. (2006).

.   Epidemic Diseases and their Effects on History -Christian W. McMillen

. মহামারী মানবসভ্যতামনোজ কুমার

 

হারুন রশীদ: প্রাচীন সভ্যতা ইতিহাস অনুসন্ধানী লেখক