মঙ্গলবার | সেপ্টেম্বর ২২, ২০২০ | ৭ আশ্বিন ১৪২৭

সিল্করুট

উত্তরাধিকার এবং...

জয়িতা দাস

চিঠি লিখছেন ঔরঙ্গজেব। লিখছেন তার কনিষ্ঠ পুত্রকে। কামবক্সকে। উদিপুরি মহলের পুত্র এই কামবক্স। উদিপুরি বাদশার মুৎআ বেগম। মুৎআ বেগমদের সন্তানধারণের অনুমতি নেই। উদিপুরি অবশ্য সব নিয়মের ঊর্ধ্বে। বাদশা সোহাগী সে। যাবতীয় নিয়মনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখাতে একমাত্র সেই পারে! মুৎআ বেগম হওয়া সত্ত্বেও। সম্ভব হলে বাদশা তাকে নিকাই করতেন। কিন্তু সে যে অজ্ঞাতকুলশীল। খানদানের কৌলিন্য নেই। এদিকে নবাবজাদাদের সম্ভ্রান্ত বংশে নিকা হওয়াই দস্তুর। তাছাড়া নিকা করা যায় মাত্র চারটি। বাদশাজাদারা অবশ্য নিয়মের থোড়াই পরোয়া করেন! খানদানি পরিবার দেখে চারটি নিকা তাদের হয় ঠিকই, তবে নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী হাজার সঙ্গিনী বেছে নিতেও আপত্তি নেই।

এদিকে বিবাহিত স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো নারীর সঙ্গ ইসলাম অনুমোদন করে না। তাই মুৎআ। মুৎআ বা মুৎআই হচ্ছে অস্থায়ী বিয়ে। নিকার মতো আইনানুগ নয়, কিন্তু বিয়ে তো বটে। তা তুমি যত খুশি মুৎআ করো, কেউ কিচ্ছুটি বলতে আসবে না। এক মুৎআ বেগমের ওপর থেকে বাদশার দিল উঠে গেল তো তার বদলে নতুন কোনো হাসিন মুৎআ বেগমের আবির্ভাব হয় শাহি হারেমে। তবে নবাবরা বেরহম নন। বেগম মহল থেকে তাড়িয়ে দেয়ার আগে সেই পরীদের হাতে ধরিয়ে দেয়া হয় উপচে পড়া মোহরের থলি।

আরবি মুৎআ শব্দের অর্থই হচ্ছে আনন্দ। ফূর্তির জন্য এই বিয়ে। সেই কবে থেকে নবাবদের মধ্যে মুৎআ প্রথা চলে আসছে। অবশ্য মুৎআর নিয়মনীতি মূলত শিয়াদের মধ্যেই প্রচলিত ছিল। মোগলরা যদিও সুন্নি তবে চারের অধিক বেগম ছিল তাদেরও। সেই বাবরের আমল থেকেই। বাবরের বেগমের সংখ্যা ১০। এদের মধ্যে ছয়জনই ছিলেন মুৎআ বেগম। হুমায়ুনের নিকা আর মুৎআ মিলিয়ে বেগম সংখ্যা নয়। আকবরের আট।

এই মুৎআ বেগমদের অবশ্য বেগম না বলে মহল বলাই ভালো। নবাব আর শাহজাদাদের প্রথম চার বিবিই শুধু বেগম। বাকিরা মহল। বেগমদের জোর তাদের খানদান, মুৎআ বেগমদের সম্বল তাদের রূপ। তা উদিপুরির রূপ ছিল এবং অদাও। দিয়েই সে চুরি করেছিল বাদশার দিল। ঔরঙ্গজেব উদিপুরি অন্তঃপ্রাণ। যে অপরাধ করলে অন্য লোকের গর্দান যায়, বেগম দুষ্টুমি করে সেই কাজ করেন বাদশার সামনেই। আলমগিরের চোখে প্রশ্রয়। সুরা নিষিদ্ধ করেছিলেন ঔরঙ্গজেব। প্রিয় বেগম উদিপুরির আবার দিন-রাত সিরাজিতে ডুবে থাকা চাই। বাদশা দেখেও নজর আন্দাজ করেন। উদিপুরি যখন দারার উপপত্নী, তখন থেকেই মেয়েটির প্রতি তার দুর্বলতা। লোকে বলে, উদিপুরিও ভালোবেসেছিল তাকে। দারার চিরশত্রুকে। দারা বেঁচে থাকতেই। সেই ভালোবাসায় কোনো খাদ ছিল না।

জর্জিয়ার মেয়ে ছিল সে। এই উদিপুরি। ছিল বাঁদি। পরে দারার উপপত্নী। দারার মৃত্যুর পর ঔরঙ্গজেবের মুৎআ বেগম। তবে মুৎআ বেগম হলেও সাম্রাজ্যের আসলি সম্রাজ্ঞী ছিল সেই। ঔরঙ্গজেবের নয়নের মণি। তাই সন্তানধারণের অনুমতি পেয়েছিল। মুৎআ বেগম হওয়া সত্ত্বেও। কামবক্স, উদিপুরির সেই পুত্রের নাম। কামবক্সের যখন জন্ম, উদিপুরির বয়স তখন পঁচিশ কি ছাব্বিশ আর বাদশা পঞ্চাশ। সেই কামবক্সকে চিঠি লিখছেন বাদশা। লিখছেন, তোমার অসুস্থ আম্মিজান আমার মৃত্যুর পর সানন্দে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে রাজি।

আলমগিরের চিঠির এই বক্তব্য উসকে দিয়েছে বিতর্ক। সত্যিই কি সতী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন উদিপুরি! অনেকেই দাবি করেন, উদিপুরি মোটেই জর্জিয়ার মেয়ে নয়। দেশেই, যোধপুরের নিসোদিয় রাজপুত বংশে তার জন্ম। মেজর টড আর গ্রান্ট ডাফ তো তাকে যোধপুরি বলেই অভিহিত করেছেন। ঔরঙ্গজেবের চিঠি দেখেই কি সিদ্ধান্ত! তাই এমন দাবি! অসম্ভব নয়। ইসলাম ধর্মে এমন কোনো প্রথা নেই। তবে সওহরের মৃত্যুর পর অনেক বেগমই শত্রুর হাতে লাঞ্ছনার ভয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। আত্মহত্যা করেছিলেন বাজবাহাদুরের বেগমও। আত্মহত্যা করেছিলেন দারা শিকোর পত্নী নাদিরা। উদিপুরির লাঞ্ছনার ভয় ছিল না। সম্ভবত কোনো ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে ঔরঙ্গজেবের কাছে সহমৃতা হওয়ার বাসনা প্রকাশ করেছিল সে।

ঔরঙ্গজেব, যাকে অনেক ঐতিহাসিকই হিন্দুবিদ্বেষীর তকমা দিয়েছেন, সেই ঔরঙ্গজেবের মনে কি স্বামীর চিতায় সহমৃতা হওয়ার এই যে হিন্দু রেওয়াজ, এর প্রতি কোনো দুর্বলতা ছিল! বলা মুশকিল। কারণ কামবক্সকে লেখা এই এক চিঠি ছাড়া আর কোথাও এর কোনো উল্লেখ নেই। প্রশ্ন জাগে, উদিপুরি এমন ইচ্ছের কথা প্রকাশ করলে বাদশা কি তাকে বোঝানোর কোনো চেষ্টা করেননি! নাকি উদিপুরির সহমৃতা হওয়ার ইচ্ছে আসলে তাকে তৃপ্ত করেছিল! সেই তৃপ্তি ভালোবাসার তৃপ্তি। সেই তৃপ্তির সঙ্গে মিশে ছিল অহংকারও। উদিপুরির ভালোবাসার প্রতি অগাধ আস্থা ছিল ঔরঙ্গজেবের। উদিপুরি এমন কিছু করতে পারেন, সেটাই যেন স্বাভাবিক। তাই বিশ্বাস আর অহংকারের সঙ্গে উদিপুরির গর্ভজাত নিজের এই সন্তানের কাছে গোপনে সেই সত্য উন্মোচন করেন। শেষ অবধি অবশ্য তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর ঠিক চার মাস পর মৃত্যু হয় উদিপুরির। সেই মৃত্যু ছিল স্বাভাবিক।

ঔরঙ্গজেবের পূর্বজরা ধর্ম নিয়ে তেমন কোনো সংকীর্ণতা দেখাননি। আকবরের হিন্দু প্রেম তো বিখ্যাত। তার দরবারে পারসি-মোগল-রাজপুত, প্রত্যেকের সমান মর্যাদা। তবে নির্ভরতা ছিল বেশি রাজপুতদের ওপরই। কারণও ছিল। দরবারের আমির-ওমরাহদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন পারসি। পারস্য সম্রাটের প্রতি তাদের একটা দুর্বলতা ছিল। এদিকে মোগল আমিরদের মধ্যেও অনেকেই বাবর হুমায়ুনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। সেই ইতিহাস যে পুনরাবৃত্ত হবে না, কে বলতে পারে! তেমন হলে অন্যান্য প্রভাবশালী পারসি মোগল আমিররা সেই ষড়যন্ত্রে যোগ দিতে কতক্ষণ! অন্যদিকে রাজপুতদের নিয়ে সে ভয় নেই। তারা বিশ্বাসী। বীর এবং প্রভুভক্ত। যুদ্ধেও ওস্তাদ। আর যদি তারা ষড়যন্ত্র করেও ইসলাম ধর্মাবলম্বী আমিরদের সমর্থন আদায় করা তাদের পক্ষে অসম্ভব। সতর্ক আকবর তাই সেনাবাহিনীর উঁচু পদে অনেক রাজপুতকে নিয়োগ করেছিলেন। মোগল সেনাবাহিনীতে রাজপুতদের দাপট দীর্ঘদিন বজায় ছিল।

রাজপুতদের প্রতি আকবরের এই যে দুর্বলতা, এর পেছনে কি যোধা বাঈয়ের কোনো প্রভাব ছিল! যোধা বাঈ। মোগল হারেমের প্রথম রাজপুত বেগম। বাদশার ওপর ছিল তার মস্ত প্রভাব। মোগল হারেমে হিন্দু আদব-কায়দা আর সংস্কৃতির শুরুয়াত তার হাত ধরেই। পরবর্তী সময়ে রাজপুত বেগমদের সংখ্যা যত বেড়েছে, সংস্কৃতির মিশ্রণও ততই বেড়েছে। দেশীয় হিন্দু রাজাদের সঙ্গে সখ্যতার সময় সন্ধিপত্রে আকবর প্রথমেই যে শর্ত জুড়ে দিতেন তা হলো, রাজপুত রাজকন্যাদের ডোলি পাঠাতে হবে মোগল হারেমে। বিজিতপক্ষের সেই সাহস কোথায় যে আকবরের শর্ত অমান্য করে! অতএব আকবরের হারেমে তখন অগুনতি রাজপুত বেগম। ইসলামী রীতি মেনে কলমা পড়ে তিনি যেমন এদের নিকা করেছেন, তেমনি হিন্দু রীতি-রেওয়াজ মেনে সপ্ত-প্রদক্ষিণ কিংবা যাগযজ্ঞকিছুই বাদ যায়নি।

তা এই রাজপুত বেগমদের মহলে পা রাখলে বোঝার কোনো উপায় নেই যে মোগল হারেমেরই অংশ তা। পুজোপাঠ থেকে পোশাক-আশাক, খ্যাদ্যাভ্যাস তাদের সবকিছুতেই হিঁদুয়ানি বড় প্রবল। রাজপুত বেগম মহলে জাঁকজমকের সঙ্গে হোলির উৎসব হয় এবং আলোর উৎসবও। বাদশারা সানন্দে যোগ দিতেন সেই উৎসবে। মোগল মিনিয়েচার ছবিগুলো সে কথাই বলে।

শাহি পরিবারের রেওয়াজ, নববধূকে সেখানে নতুন খেতাব দেয়া হয়। মরিয়ম-উজ-জামানি খেতাব দেয়া হয়েছিল যোধা বাঈকে। তা সেসব খেতাব তোলা থাকত কাগজপত্রেই। হারেমে তাদের পরিচয় একটাই বাঈ পরিচয়েই রাজপুত কন্যারা স্বচ্ছন্দ। যোধা বাঈ, মান বাঈ মোগল হারেমে বাঈদের অস্তিত্ব যেন স্বতন্ত্র। তারা বেগমখানার বেগম কিংবা মহলদের ভিড়ে হারিয়ে যেতে রাজি নন। এতে সম্মান বা মর্যাদার ক্ষেত্রে কিন্তু কোনো হেরফের হয়নি।

পরিবেশেই ঔরঙ্গজেবের বড় হওয়া। রাজপুত ঐতিহ্যের গল্প তার অজানা নয়। এর কি কোনো প্রভাবই তার ওপর পড়েনি! নিশ্চয়ই পড়েছিল। তাই তো উদিপুরি সহমৃতা হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করলে বড় ভালোবাসায়, গোপনে বেগমের ইচ্ছেটি আমৃত্যু লালন করেছেন মনে। আর আকবর! মৃত্যুর আগে যমুনা তীরে এক বিশাল মহল তৈরি করেছিলেন। তার বেগমদের জন্য। মোগল হারেম আসলে অনেকটাই আকবরের হাতে তৈরি। রাজনৈতিক কারণে বাবর কিংবা হুমায়ুনের বেগমদের যাযাবরের মতো এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াতে হয়েছে। ফলে তাদের ঠিক হারেম সুন্দরী বলা যায় না। এই বেগমরা যথেষ্ট স্বাধীনতা উপভোগ করেছেন। বাবরের প্রথম বেগম তো তাকে তালাকই দিয়েছিলেন। আর হুমায়ুন পত্নী হামিদা বানু! তিনি প্রথমে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছিলেন হুমায়ুনের বিয়ের প্রস্তাব। বাবরের বোন খানজাদা বেগমের নিকা হয়েছিল তিনবার। আকবর নিজে বিয়ে করেছিলেন বৈরাম খানের বিধবা সলিমা সুলতান বেগমকে। সওহরের মৃত্যুর পর পুনরায় বিয়ে করা ইসলাম ধর্মে অন্যায় নয়।

আকবর কিন্তু তার হারেমের মহিলাদের সেই স্বাধীনতা দেননি। যমুনা তীরে উদ্যানঘেরা এক অনিন্দ্যসুন্দর মহল তৈরি করেছিলেন তিনি। নাম রেখেছিলেন সোহাগপুরা। স্বামী-সোহাগের স্মৃতি আঁকড়ে তার বিধবা বেগম উপপত্নীরা শেষ জীবন কাটাবে এই মহলে, হয়তো তাই এমন নাম। জাহাঙ্গির-মাতা মরিয়ম-উজ-জামানি ছাড়া বাকিরা আকবরের মৃত্যুর পর ছিলেন এই সোহাগপুরাতেই। মরিয়ম-উজ-জামানি যোধা বাঈ অবশ্য ছিলেন পুত্রের শাহি হারেমে, জাহাঙ্গিরের সঙ্গে। তালাকের ঘোর বিরোধী ছিলেন আকবর। তার মৃত্যুর পর তার হারেম সুন্দরীরা অন্য পুরুষের বাহুলগ্না হবে, সম্ভবত হিন্দুদের মতো ব্যাপারেও তীব্র আপত্তি ছিল তার।

আকবরের আমলেই প্রথম রাজপুত রমণীদের মোগল হারেমে প্রবেশ। পিতৃ সংস্কৃতির অনুকরণে তাদের মনে কি কখনো স্বামীর মৃত্যুর পর সহমৃতা হওয়ার সাধ জাগেনি মনে! ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে বাদশার কাছে কেউ কি এমন বাসনা কখনো প্রকাশ করেননি! ইসলাম ধর্মাবলম্বী আকবরের চিতায় অবশ্য আত্মাহুতি দেয়ার সুযোগ ছিল না। তবে চাইলে কি আর মৃত্যুকে বরণ করে নেয়া যেত না! নাকি এতে আকবরের নিষেধ ছিল! তাই সোহাগপুরা। যাতে তার রাজপুত বেগমরা নিশ্চিন্তে সেখানে হিন্দু বিধবাদের মতো সাত্ত্বিক জীবন কাটাতে পারেন! যদিও এর একটি অংশে মোগল বেগম উপপত্নীদের থাকার ব্যবস্থাও ছিল। আবার এমনও হতে পারে, তিনি নিজেই চেয়েছিলেন তার হারেম সুন্দরীদের বাকি জীবনটা হিন্দু বিধবাদের মতো মৃত স্বামীর স্মৃতি-চিন্তনেই কেটে যাক। আকবরের পর অবশ্য এই নিয়ম আর বজায় থাকেনি। জাহাঙ্গির আকবর-পুত্র দানিয়েলের মৃত্যুর পর তার হারেমের মেয়েদের বিয়ের অনুমতি দিয়েছিলেন। দারার উপপত্নী উদিপুরিকে বিয়ে করেছিলেন ঔরঙ্গজেব।


প্রশ্ন হলো তালাক কিংবা বেগমদের পুনর্বিবাহে কেন আকবরের আপত্তি! হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাবে! আশ্চর্যের কিছু নয়। হিন্দু ধর্ম-সংস্কৃতির প্রতি বরাবর একটা কৌতূহল ছিল তার মনে। সেই কৌতূহল থেকেই রামায়ণ-মহাভারত অনুবাদের হুকুম দিয়েছিলেন। আগ্রহ ছিল সংস্কৃত ভাষার প্রতিও। মূল সংস্কৃত থেকে রামায়ণ অনুবাদের হুকুম দিয়েছিলেন তিনি বাদাউনিকে। সময় লেগেছিল চার বছর। আর নকিব খাঁ করেছিলেন মহাভারতের অনুবাদ। সাহায্য করেছিলেন বাদাউনিও এবং কয়েকজন হিন্দু পণ্ডিত। এর শুরু সেই ১৫৮২ সালে। এর আগে বাদাউনি ফার্সি ভাষায় গদ্যে-পদ্যে অনুবাদ করে ফেলেছেন সংস্কৃত গ্রন্থ বত্রিশ সিংহাসন অবশ্যই বাদশার হুকুমে। শ্লোকের দুরূহ অর্থ বুঝতে যাতে অসুবিধে না হয়, তাই সাহায্যের জন্য হিন্দু পণ্ডিতও নিয়োগ করা হয়েছিল। ১৫৮১ সালে বইটির অনুবাদ শেষ হয়। নাম রাখা হয় খিবদ্-আফজা

শুধু কি আর ধর্মীয় সাহিত্য কিংবা সংস্কৃত ভাষা! হিন্দু সংস্কৃতিও যে সমানভাবে প্রভাবিত করেছিল তাকে। ওজন পরবের কথাই ধরা যাক। পারসিদের অনুকরণে আকবর প্রচলন করেছিলেন নওরোজ উৎসবের। নতুন বছরকে আহ্বান জানানোর উৎসব নওরোজ। পাশাপাশি চালু করেছিলেন ওজন পরবও। হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাবে অবশ্যই। হিন্দুদের পৌরাণিক আখ্যানে রয়েছে তুলাব্রতের গল্প। সত্যভামা, শ্রীকৃষ্ণের প্রিয়তমা মহিষী একবার তুলাদণ্ড বা দাঁড়িপাল্লায় সোনা-রুপো দিয়ে ওজন করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণকে। স্বামীর সম ওজনের সেই সোনা-রুপো তিনি দান করে দেন ব্রাহ্মণদের।

সম্ভবত সেই প্রথম শাস্ত্রে তুলাব্রতের উল্লেখ পাওয়া যায়। হিন্দু রাজা-মহারাজা মহলে জনপ্রিয় ছিল এই তুলাদান প্রথা। রাজা মানসিংহ এই তুলাব্রত নিয়ে একটি বইও লিখেছিলেন। নাম, তুলাপুরুষ দানপ্রমাণ বইয়ের সূত্রেই হয়তো আকবরের সঙ্গে অনুষ্ঠানের প্রথম পরিচয়। বিষয়টা মনে ধরেছিল তার। ব্যস, মোগল প্রাসাদে চালু হয়ে গেল এই পরব।

মোগল বাদশা শাহজাদাদের জন্মদিনের উৎসবের মূল আকর্ষণই ছিল এই ওজন পরব। বাদশাকে সেদিন সোনার দাঁড়িপাল্লায় বসিয়ে ওজন নেয়া হতো। কোনো বছর যদি আগের বছরের তুলনায় ওজন বেশি হতো, তবে আমির-ওমরাহদের সে কি উল্লাস! আইন--আকবরি-তে আবুল ফজল লিখেছেন, আনুকূল্য গরিবদের উপহার দেয়ার একটা সুযোগ করে দেয়ার জন্য বাদশা বছরে দুবার নিজেকে ওজন করাতেন। প্রথমবার ওজন নেয়া হতো পারসি আবান মাসের প্রথম তারিখে (১৫ অক্টোবর) বাদশার সৌরবার্ষিক জন্মোৎসবের দিন ছিল সেটি। সোনা, পারদ, রেশম, সুগন্ধিদ্রব্য, তামা, রাহ--তুতিয়া, ওষুধ, ঘি, লোহা, পায়েস, সাত রকমের শস্যদানা আর লবণএগুলো তুলাদণ্ডের একদিকে রেখে অন্য পাশে বসতেন বাদশা। এভাবে ১২ বার ওজন নেয়া হতো। দ্বিতীয় যেদিন বাদশার ওজন নেয়ার প্রথা ছিল, সেটা ছিল আকবরের চান্দ্র বার্ষিক জন্মদিন। তারিখ রজব। সেবার আটটি জিনিস দিয়ে পাঁচবার বাদশার ওজন নেয়া হতো। সেগুলো হলো রুপো, টিন, কাপড়, সিসা, বিভিন্ন ফল, সর্ষের তেল শাকসবজি। প্রতিবারই ওজন শেষে সমস্ত জিনিস বিলি করে দেয়া হতো ফকিরদের মধ্যে।

ওজন পরব হতো শাহজাদাদেরও। তাদের সালগিরাতে। তবে তাদের জন্মদিন পালন হতো বছরে একবারইসৌরমাসে। বাদশার মতো সেদিন একইভাবে তাদের বেশ কয়েকবার ওজন নেয়া হতো এবং একইভাবে তা বিলিয়ে দেয়া হতো। মোগলদের বিশ্বাস, সমস্ত বালাই দূর করে এই তুলাদান। শুধু যে বাদশার সমপরিমাণ ওজনের জিনিস দান করা হতো এমন নয়এর পাশাপাশি বাদশার বয়স যত, ঠিক সেই সংখ্যার গরুও সেদিন হিন্দু ব্রাহ্মণদের মধ্যে দান করার রেওয়াজ ছিল। অন্যান্য জাতির লোকদের দেয়া হতো মহিষ, ভেড়া, ছাগল মুরগি। পশুগুলো বধ্য নয়। পাছে গো হত্যা হয়, তাই শুধু ব্রাহ্মণদেরই গোদান করা হতো। সংবাদ দিয়ে গেছেন খোদ আবুল ফজল।

হিন্দুরা তুলাব্রত পালন করতেন নতুন বছরে। অর্থাৎ বৈশাখ মাসে। এজন্য নওরোজের সময়ও ওজন পরব অনুষ্ঠিত হতো মোগল প্রাসাদে। তবে পারসি ক্যাল্লোর অনুযায়ী বৈশাখ মাস নয়, নতুন বছর শুরু হয় ২১ মার্চ। মোগলরা নওরোজ পালন করতেন সেই সময়েই। পরবের তৃতীয় দিনে বাদশার ওজন নেয়ার রেওয়াজ ছিল। সেবার আট রকম জিনিস দিয়ে ওজন নেয়া হতো। জাহাঙ্গির আর শাজাহানের আমলেও নিয়ম বহাল ছিল। তবে জাহাঙ্গির গোদান তুলে দিয়েছিলেন।

ঔরঙ্গজেবের জমানায় নিষিদ্ধ হলো নওরোজ উৎসব। বিভিন্ন কারণে। নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল ঝরোখা দর্শনেও। কিন্তু তুলাদান বা ওজন পরব আজীবন পালন করেছেন তিনি। এমনকি প্রিয় পৌত্র বিদার বখ্ত যখন অসুস্থ, তখন রোগ থেকে মুক্তি পেতে তাকে চিঠি লিখে উপদেশ দিলেন ওজন পরব পালন করতে। চিঠিতে লিখেছেন তিনি, একজন লোকের সম্পূর্ণ দেহ সোনা, রুপো, তামা, তেল অন্যান্য জিনিস দিয়ে ওজন করা আমাদের পূর্বপুরুষদের দেশের এবং এই দেশেরও (ভারতবর্ষের) রীতি। মুসলমানদের প্রথা না হলেও প্রথার দ্বারা অনেক দুস্থ দরিদ্র লোকের উপকার হয় (সুতরাং আমাদেরও প্রথা পালন করা উচিত) মহামান্য সম্রাটও তার পবিত্র দেহ বছরে দুবার নিজের দেহের সমপরিমাণ ওজনের সোনা-রুপো দিয়ে ওজন করাতেন এবং পরে তা গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। তোমাকেও তাই করতে বলছি। বিভিন্ন দ্রব্য দিয়ে তুমি তোমার দেহ বছরে ১৪ বার ওজন করাও। আমার বিশ্বাস, এতে মানসিক শারীরিক দুঃখকষ্ট নিশ্চয়ই কাটিয়ে উঠবে।

ঔরঙ্গজেবের হিন্দুবিদ্বেষ নিয়ে অনেক কথা শোনা যায়। মোগল প্রাসাদের অভ্যন্তরে তিন পুরুষ ধরে হিন্দু সংস্কৃতির একটি ধারা ফল্গুধারার মতো বহমান ছিল। ঔরঙ্গজেব কি সেই ধারাকে মনে-প্রাণে অগ্রাহ্য করতে পেরেছিলেন! সম্ভবত না। একটা দুর্বলতা তার ছিলই। তাই তো আবেগের মুহূর্তে উদিপুরি যে ইচ্ছে প্রকাশ করেন, সেই ইচ্ছেকে গোপন মনের ভেতর লালন করেন তিনি। মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন তুলাদানের যৌক্তিকতাকে। এর উেসর ইতিহাস জানা সত্ত্বেও। বিচ্ছিন্ন এমন অনেক ঘটনার কথা এখানে উল্লেখ করা যায়, যা হয়তো ঔরঙ্গজেবের প্রচলিত ভাবমূর্তির বিপ্রতীপে তার এক নতুন পরিচয় তুলে ধরবে। আকবর যে সম্প্রীতির বাঁধনে বাঁধতে চেয়েছিলেন সবাইকে, সেই বাঁধন পরবর্তী সমেয় কিছুটা আলগা হলেও পুরোপুরি সেই বাঁধন কেটে যে মোগলরা বেরিয়ে আসতে পারেননি, বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো এরই ইঙ্গিত দেয়।

 

জয়িতা দাস: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা  নন-ফিকশন লেখিকা