মঙ্গলবার | জুলাই ১৪, ২০২০ | ২৯ আষাঢ় ১৪২৭

সিল্করুট

ইতিহাসে অনুচ্চারিত সেই ট্রাবিয়েট রাজকুমারী

রিমি মুৎসুদ্দি

আমি মরে যাচ্ছি, তুমি যুগ যুগ বেঁচে থাকো

-শিয়রে মৃত্যুকে দাঁড় করিয়ে গুলবদন বেগম তার প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্র হিন্দুস্থানের সম্রাট আকবরকে বলেছিলেন।

মৃত্যুমুখে যে শব্দগুলো অতিকষ্টে উচ্চারিত হয়েছিল মধ্যযুগের এই মেধাবী নারীর কণ্ঠে, তা ছিল পুরুষের জন্য, সম্রাটের জন্য তার শুভকামনা। যুগ যুগ ধরে নারী পুরুষকে সম্রাটের আসনই দিয়ে এসেছে। স্ত্রী, কন্যা, মাতা এরা সবাই তাদের স্বামী, পিতা, সন্তানকে নিজেদের সম্রাটরূপেই দেখে এসেছেন। ব্যতিক্রম যদিও আছে। তবে সংখ্যায় এত কম যে কোনো হাইপোথিসিস বা অনুমান স্বতঃসিদ্ধ নয়।

এই সামান্য ভূমিকাটুকুর প্রয়োজন লেখাটির নিজস্ব তাগিদেই। মোগল ইতিহাসে নারীদের স্থানবিষয়ক একটা দীর্ঘ আলোচনা অন্য পরিসরে হতে পারে। কিন্তু যে ট্রাবিয়েট-রাজকুমারীর মেহদি রঞ্জিত হাতে আর্কুয়েট-শাহজাদার সমশেরবন্ধ্ হাত মিলেছিল, গোটা মধ্যযুগ এমন বিস্ময়কর মেলবন্ধন দেখেইনি এর আগে অথচ তার উল্লেখ ইতিহাসের পাতায় এত কম যে অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেন। অম্বররাজ ভারমলদুহিতা যোধা বাঈ কি সত্যিই ছিলেন? তিনিই কি মরিয়াম জামানী?

মোগল সম্রাট দ্য গ্রেট আকবরের রাজসভার ইতিহাসবিদ কবি আবুল ফজল তার আকবরনামা আইনি আকবরি গ্রন্থে অম্বররাজ দুহিতার সঙ্গে সম্রাটের বিয়ের কথা উল্লেখ করলেও রাজকুমারী সম্বন্ধে একটি বাক্যও ব্যবহার করেননি। এই বিবাহের জাঁকজমক বিবাহসন্ধির মধ্য দিয়ে মোগল রাজপুতদের মেলবন্ধনের ফলস্বরূপ সমগ্র হিন্দুস্থানের রাজনৈতিক চালচিত্র সমস্ত কিছুরই উল্লেখ আছে তার লেখায়। আকবরনামা পাঠক সহজেই অনুমান করতে পারবেন এই বিয়ের ফলে সম্রাট আকবরের রাজনৈতিক স্বপ্নপূরণ সম্ভব হয়েছিল। সমগ্র হিন্দুস্থানকে একচ্ছত্র শাসনের আয়ত্তে আনতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন। রাজপুত শক্তিকে পাশে পাওয়া মানে সেই সময়ে ভারতের সর্বাধিক ক্ষমতাসম্পন্ন ভারতীয় শক্তিকে নিজের মিত্রতে পরিণত করা। উল্টোদিক থেকে অম্বররাজ ভারমল একদিকে রাজপুত জ্ঞাতি শত্রুদের আক্রমণের আশঙ্কা আরেকদিকে মোগল সম্রাটের রাজপুতানায় অধিকার কায়েমের আগ্রাসী ইচ্ছে এই দুইয়ের মাঝে পড়ে মোগলদের সঙ্গে সন্ধি স্থাপনই রাজনৈতিকভাবে শ্রেয় সিদ্ধান্ত মনে করলেন।

এই বিয়ের প্রীতি উপহারস্বরূপ উপঢৌকন, পণস্বরূপ উভয় পক্ষই প্রচুর লাভবান হলো। এই এতসব নিখুঁত আয়োজন বর্ণনার মাঝে ট্রাবিয়েট রাজকুমারীর উল্লেখ করতেই ভুলে গেলেন আবুল ফজল? শুধু আবুল ফজলকে দায়ী করা সমীচীন? জাহাঙ্গীর তার জীবনী তুজুক--জাহাঙ্গাগীরী-তে ওয়াকেনবিশদের ডিকটেশন দিয়ে যে লেখা লেখাতেন সেই লেখায় নিজের মায়ের কথায় ওই মহিলা শব্দটি একবার মাত্র তার জন্মবৃত্তান্ত বলতে গিয়ে লিখেছেন। মায়ের নাম উল্লেখও করেননি সমগ্র লেখায়। এই জাহাঙ্গীরই মেহেরুন্নিসাকে ভালোবেসে মেহেরের নামে মোহর পর্যন্ত কাটিয়েছিলেন অথচ সব বঞ্চনা উপেক্ষা কি অম্বররাজদুহিতার প্রাপ্য ছিল?

ট্রাবিয়েট রাজকুমারী

আগ্রা আসার আগে রানী চন্দ্রাবতী রাজকুমারী যোধাকে বলেছিলেন,

-মনে রাখিস, তোকে তো জওহরে যেতে হচ্ছে না। এটাই তোর ভাগ্য।

প্রবল জ্বরের ধাক্কায় কাহিল যোধা বাঈয়ের গলা কাঁপছিল। হাঁপ ধরে যাচ্ছিল কান্নার দমকে। চন্দ্রাবতী কিছুই লক্ষ করছিলেন না। হয়তো খুব ভালোভাবেই লক্ষ করছিলেন আর জানতেন রাজবৈদ্যর কম্ম নয় জ্বর সারানো। তাই জ্বরের ওষুধের মন্ত্র তিনি নিজেই উচ্চারণ করছিলেন,

-তোর বাবা যা বলছেন আমাদের মেনে নিতেই হবে। তিনি যদি আমাদের জওহরে যেতে বলতেন, তাই যেতে হতো আমাদের। এইটা মনে রাখিস। রাজাসা সত্যিই খুব দয়ালু আমাদের সবার প্রতি। কচ্ছোওয়ারা বাঁচতে চান। তাই মোগল শাহির সঙ্গে দোস্তি করেছেন।

চন্দ্রাবতী বলে যান,

-কাল রাজসভায় মন্ত্রী আমত্যরা সবাই বলছিলেন, রাজা ভারমল যদি মোগলদের ঘরে মেয়ে দিতে না রাজি হতেন, তাহলে এই আমের কেল্লায়ও শিশোদিয়া রাজপুতানা দুর্গের মতো জওহর ব্রত হতো। রানী, রাজকুমারী, বাঁদী সবাইকে পুড়ে মরতে হতো।

যোধা বাঈ মায়ের কথা অবাক হয়ে শুনতে থাকে।

-শিশোদিয়া মানে মেবারের কথা বলছ মা? মেবারের রানীরা তো দেবী। রানী পদ্মাবতী, রানী কর্ণাবতী এরা তো মা অম্বেরই অংশ।

একবুক কান্না গিলে যোধা বাঈ মাকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিল।

-যবনের হাতে নিজেকে সঁপে দেয়ার থেকে জওহরই অনেক সম্মানের মা।

চন্দ্রাবতী মেয়ের কথা শুনে অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন।

-চুপ কর পোড়ামুখী। কথা মুখে উচ্চারণও করবি না।


চন্দ্রাবতীর ভেতরটা পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল এক মুহূর্তে। তার মা সতী হয়েছিলেন। এখনো তার স্পষ্ট মনে আছে সব। ভয়ে মা কাঁপছিলেন। পায়ে ধরছিলেন সবার। ওকে ছেড়ে দিতে বলছিলেন। মায়ের কান্না দেখে পণ্ডিতজি থেকে সবাই কি ধমক দিচ্ছিল তখন। সতীকুণ্ডের আয়োজন যেখানে হচ্ছিল, সেই চিতার সামনে আর ওর মায়ের চারদিকে লাঠি, বল্লম হাতে কয়েকজন পাহারা দিচ্ছিল। মা যাতে পালিয়ে না যেতে পারেন। চন্দ্রাবতী তখন খুব ছোট, এত ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন যে কাঁদতেও পারেননি। জ্ঞানও বেশিক্ষণ ছিল না ওর। কথা মনে পড়ে যেতেই গা পাক দিয়ে ওঠে রানীর। হড়হড় করে বমি করে ফেললেন। মাকে অসুস্থ হয়ে যেতে দেখে রাজকুমারী ভয় পেয়ে যান। তাড়াতাড়ি বলে ওঠেন,

-তুমি চিন্তা কোরো না মা। রাজাসা যা বলবেন আমি তাই করব। রাজাজ্ঞা পালন করা প্রজার কর্তব্য। আর পিতৃ আজ্ঞা মেনে চলা কন্যার ধর্ম। তোমার মেয়ে ধর্ম পালন করবে।

-হ্যাঁ। এটা তুই ঠিক বলেছিস। আমাদের এত ভেবে কাজ কী? মা অম্বের যা ইচ্ছে তাই হবে। মা চাইলে আমরা বেঁচে থাকব। না চাইলে আমাদের কেউই রক্ষা করতে পারবে না। আমাদের নিজেদের কোনো ইচ্ছে থাকতে নেই রে।

-হ্যাঁ। আমি আমার কন্যা ধর্ম পালন করব।

-তোর ধর্ম তুই সারা জীবন পালন করতে পারবি। বাদশাহ স্বয়ং কথা দিয়েছেন।

ফতেপুর সিক্রিতে যোধা বাঈ প্রাসাদের অন্দরসজ্জা প্রমাণ দেয় আকবর কথা রেখেছিলেন। প্রাসাদ চত্বরে একটা মণ্ডপের ওপর পূর্বমুখী মন্দির। শোনা যায়, যোধা বাঈয়ের একটা তুলসীতলাও ছিল। তাছাড়া শাহি রন্ধনশালায় যোধা বাঈয়ের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। সম্রাট এত বেশি রাজস্থানি খাবারে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন যে মাংসবিশেষ পচ্ছন্দই করতেন না।

মালোয়া থেকে ফিরে সম্রাট যাচ্ছিলেন খাজা মৈনউদ্দীন চিস্তির দরগায়। পথেই রাজপুত শক্তির একটা বিরাট অংশের প্রতিনিধি অম্বররাজ প্রস্তাব পাঠালেন, তিনি আকবরের সঙ্গে তার জ্যেষ্ঠা কন্যার বিয়ে দিতে ইচ্ছুক। তীর্থ থেকে ফেরার পথে সম্রাট অম্বরকুমারীর পাণিগ্রহণ করেন। যোধা বাঈ মোগল সম্রাটের বিয়ে হয়েছিল ১৫৬২ সালে। এর ঠিক দুই বছর পরই ১৫৬৪ সালের মার্চে আকবর জিজিয়া-কর রদ করার সিদ্ধান্ত নেন। শুধু জিজিয়া কর রদই নয়, আরো দুটো সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছিলেন, যা পরবর্তীকালে যুগ যুগ ধরে ভালোবাসা সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে রইল। এক. ২১ বছরের ঊর্ধ্বে হিন্দু যুবকদের অমুসলমান হওয়ার জন্য বিশেষ কর দিতে হতো। যুগ যুগ ধরে মুসলিম বিজয়ীরা তা প্রণয়ন করে এসেছেন এই ভারতবর্ষে। আকবর তা একেবারেই রদ করে দেন। সম্রাটের চোখে সমস্ত প্রজাই তার সন্তান। ধর্ম নির্বিশেষে সবাইকে সমান মর্যাদা দেয়ার সূচনায় শুরু হলো মধ্যযুগীয় অন্ধকার ইতিহাসে আলোর সূত্রপাত। এছাড়া যুদ্ধ বিজিত হিন্দু সেনা প্রজাদের বলপূর্বক মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত করা চলবে না, এমন শাহী ফরমানও ঘোষিত হলো ওই একই সময়। আর ইতিহাসে সেদিনই সম্রাট আকবর উপাধি পেলেন, আকবর দ্য গ্রেট ইতিহাস মনে রাখেনি সেই জ্বরের ঘোরে সমস্ত ভয় সংস্কার তুচ্ছ করে কন্যাধর্ম, রাজধর্ম পালনে ব্রতী সেই রাজপুত রমণীকে। অথচ তিনি ছিলেন। প্রবলভাবেই তার উপস্থিতি ছিল। মোগল শাহিকে সেই সময়ে তিনি প্রথম উত্তারাধিকারী উপহার দিয়েছিলেন। তার নামোল্লেখে ইতিহাস কার্পণ্য করলেও অন্তিম শয্যায় তিনি সম্রাটের সমাধিক্ষেত্রের স্বল্প দূরেই নিজের শয়নযান তৈরি করে যেতে পেরেছিলেন। সম্রাটের মৃত্যুর দুই বছরের মধ্যেই মরিয়ম জমানী, অম্বর রাজ্যের আদরিণী কন্যা যোধা বাঈ সেই সেকেন্দ্রায় আকবর সমাধির কাছেই তার নির্দিষ্ট অন্তিম শয়নস্থানে আশ্রয় পেয়েছিলেন।

 

রিমি মুৎসুদ্দি: শিক্ষিকা  গল্পকার