মঙ্গলবার | জুলাই ১৪, ২০২০ | ২৯ আষাঢ় ১৪২৭

সিল্করুট

তুতি-ই-হিন্দ

এমএ মোমেন

মধ্যযুগের ভারতীয় বিশ্বমানব-ইউনিভার্সাল ম্যান একজনই- আবুল হাসান ইয়ামিন উদ্দিন খসরু (আমীর খসরু দেহলভি বা আমীর খসরু নামেই পরিচিত) বিশ্বজনসমাজে তখন ভারতের তোতাপাখি তুতি--হিন্দ হয়ে বিরাজ করছিলেন। ভারতীয় তো বটেই, বিশ্বসংস্কৃতির ইতিহাসেও তার মাপের আইকনিক ব্যক্তিত্ব দুর্লভ। তারিখ- ফিরোজশাহী গ্রন্থের চলয়িতা জিয়াউদ্দিন বারানি আমীর খসরু কীর্তি বিশ্লেষণ করে বলেছেন, তার মতো বহুমুখী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আগেও জন্মগ্রহণ করেননি এবং তার ভাষায় কেয়ামত পর্যন্ত জন্মগ্রহণ করার সম্ভাবনাও নেই। তার হাতেই ভারতের সংগীতের নবজাগরণ। উর্দু ভাষা সাহিত্যের তিনিই জনক। মওলানা শিবলি নোমানী লিখেছেন, তার মতো ক্ষমতাসম্পন্ন কোনো মানুষের নাম তার মনে পড়ছে না।

আমীর খসরুর জন্ম ১২৫৩ সালে ভারতের বর্তমান উত্তর প্রদেশের কাসাঞ্জ জেলার পাতিয়ালিতে, দিল্লি সুলতানাতের অধীনে। তার বাবা আমির সাইফুদ্দিন মাহমুদের জন্ম তুরস্কের মাওয়ারাউন শহর প্রদেশে। তিনি লাচিন তুর্কি সম্প্রদায়ের নেতা ছিলেন। তিনি বেড়ে ওঠেন সমরখন্দের (আজকের উজবেকিস্তান) কাছাকাছি কেশ নামের ছোট শহরে। মধ্য এশিয়ার চেঙ্গিস খানের বাহিনী যখন ভয়ংকর লুটতরাজ দুঃশাসনের উদ্দেশ্যে আক্রমণ চালায়, তখন জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্বদেশ ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দেশান্তর হয়। আমির সাইফুদ্দিনসহ একটি দল অপেক্ষারত নিরাপদ বলখ (বর্তমান আফগানিস্তান) অঞ্চলে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে তারা প্রতিনিধি পাঠিয়ে দিল্লির সুলতানের সহানুভূতি কামনা করে আশ্রয় জীবিকার প্রার্থনা জানান। তখনকার সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুতমিশ তাদের প্রার্থনা মঞ্জুর করেন। সুলতান নিজেও তুর্কি, মধ্য এশিয়ার একই অঞ্চলে তারও বেড়ে ওঠা এবং এই শরণ প্রার্থীদের মতো এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই তাকে এগোতে হয়েছে। ১২৩০ সালে পাতিয়ালিতে আমির সাইফুদ্দিনকে একটি জোতদারি প্রদান করেন।

সাইফুদ্দিন উচ্চাকাঙ্ক্ষী সুযোগ্য যুবক, ইসলামে ধর্মান্তরিত এর রাজপুত্র পরিবারে বিয়ে করেন। তার শ্বশুর ইমাদ উল মূলক সম্রাট গিয়াসউদ্দিন বলবনের রাজদরবারে সম্মানিত সভাপতি ছিলেন। আমীর খসরুর মা বিবি দৌলতনাজ চার সন্তানের জননীতিন পুত্র এক কন্যা। পুত্রদের একজন আবুল হাসান ইয়ামিন উদ্দিন খসরু যখন আট বছরে পড়লেন, তখন তার পিতার মৃত্যু হয়। খসরুদের মাতামহের পরিবারে বসবাস করতে হয়। তাদের কারণেই খসরু ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সহজে পরিচিত একাত্ম হতে পারেন। বাবার দিক থেকে তার ওপর ইসলাম সুফীবাদের প্রবল প্রভাব পরবর্তীকালে সংকট হয়ে ওঠে।

তখনকার দিল্লি ছিল বাগদাদের পরই ইসলামী সংস্কৃতি প্রভাবান্বিত দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর। সে সময় দিল্লিতে একদিকে যেমন ভারতের শ্রেষ্ঠ মানুষরা বসবাস করতেন, তেমনি বদমাশ বাটপারদের আখরাও ছিল দিল্লি। খসরু ছোটবেলা থেকে দিল্লির দুটো চেহারা দেখে বড় হয়েছেন। প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখায় খুব মনোযোগী ছিলেন। তবে শৈশবেই তিনটি ভাষা ফার্সি, তুর্কি আরবি পুরোপুরি রপ্ত করেন এবং ভারতীয় ভাষা সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচিত হয়ে ওঠেন।

প্রভাবশালী মাতামহের দৌহিত্র্য হওয়ার কারণে শুরুতে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশে তাকে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়নি। তিনি সৈনিক, লেখক, উপদেষ্টা বিভিন্ন পদে কর্মরত ছিলেন। তিনটি রাজবংশের সঙ্গে তিনি কাজ করছেন, সম্পর্ক রক্ষার কূটনীতিতে পারদর্শী ছিলেন বলে কখনো রাজসন্তুষ্টি থেকে বিচ্যুত হননি। বরং আমীর খসরুর মসনভিতে অবস্থান লাভের জন্য সুলতান তার পরিষদ তাকে তোষামোদ করতেন এবং বাড়তি নজরানা প্রদান করতেন।

মাতামহের মৃত্যুর পর ২০ বছর বয়সে তিনি গিয়াসউদ্দিন বলবনের ভ্রাতুষ্পুত্রের সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তার সহজাত কাব্য প্রতিভার খবর ছড়িয়ে পড়ে। তার আগেই ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সে লিখিত তার দিওয়ান তুইফাত-উস-সিগর ১২৭৯ সালে প্রকাশিত হয়। তার কবিতা গান শোনার জন্য সুলতান বলবনের দ্বিতীয় পুত্র বাসির উদ্দিন বুগরা খান আমন্ত্রিত হন মুগ্ধ হন। তিনি হয়ে ওঠেন তার প্রধান পৃষ্ঠপোষক। বুগরা খান ১২৭৭ সালে বাংলার শাসক হয়ে এলে খসরু ১২৭৯ সালে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। সময় তার দ্বিতীয় দিওয়ান ওয়াস্ত উল-হায়াত লিখিত হয়। সুলতানের শাসক সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের জ্যেষ্ঠপুত্র খান মোহাম্মদের আমন্ত্রণে সুলতান গমন করেন এবং এশিয়ার প্রবেশদ্বার সুলতানে বাগদাদ আরব পারস্যের মেধাবী মানুষদের সাহচর্য লাভ করেন। ১২৮৫ সালে সেখানে মোঙ্গলদের অবরোধ আগমনের শিকার হয়ে শাসক খান মোহাম্মদের মৃত্যু ঘটলে তিনি পালিয়ে অযোধ্যা চলে যান। বৃদ্ধ গিয়াসউদ্দিন বলবন দ্বিতীয় পুত্র বুগরা খানকে বাংলা থেকে দিল্লি আসার আহ্বান জানালে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। বলবনের মৃত্যুর পর বুগরা খানের পুত্র ময়েজউদ্দিন কায়কোবাদকে সম্রাট করা হয়পিতা-পুত্রের সম্পর্ক ভালো ছিল না, খসরু দুই বছর কায়কোবাদের দরবারে কাজ করেন। কায়কোবাদ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়লে তার তিন বছর বয়সী পুত্রকে সুলতান করা হয়। সময় তুর্কি-আফগান বংশোদ্ভূত জাজাল উদ্দিন ফিরোজ খলজি দিল্লি অবরোধ আগমন করে কায়কোবাদকে হত্যা করে দিল্লির মসনদ দখল করে মামলুক শাসনের অবসান ঘটান।

জালালউদ্দিন ফিরোজ খলজি কাব্য প্রেমিক ছিলেন, তিনি আমীর খসরুকে দরবারে রেখে দেন এবং প্রকৃতই আমির মর্যাদায় ভূষিত করেন।

খলজি শাসন দীর্ঘমেয়াদি হয়নি। ১৩২০ সালে সুলতান মোবারক শাহ খলজি খসরু খানের হাতে নিহত হন, খসরু খান নিজেকে সুলতান ঘোষণা করেন, অল্পদিনের মধ্যেই গিয়াসউদ্দিন তুঘলক খসরু খানকে ধরে দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন এবং তুঘলক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। আমীর খসরু তুখলক নামা রচনা করেন। ১৩২৫-এর অক্টোবরে নিজামুদ্দিন আওলিয়ার মৃত্যুর দুই মাসের মধ্যেই তিনিও মৃত্যুবরণ করলেন।

আমীর খসরুর রচনাবলির মধ্যে রয়েছে তুহফাত উস-সিগর, ওয়াস্ত উল-হায়াত, কিরান উস-মাদিয়ান, মিফতাহ উল-ফুতুহ, ঘুররাত উল-কামাল, খাজাইন উল-ফুতুহ, খামসা--খসরু, সাকিয়ানা, দুভাল রানি-খিজির খান, নুহ সিপির ইজাজে খসরুভি বাকিয়া-নাকিয়া, আফজাল উল-ফাবিদ, তুখলক নাসির, নিহায়াত উল-কামাল, আলিজকয় কিসসা চাহার দরবেশ, খালিক নারি, জোয়াহের--খুশরাভি।

ভারতীয় সংগীতের নবজাগরণ ঘটেছে আমীর খসরুর হাতে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন ভারতীয় বাদ্যযন্ত্র সেতার তবলার উদ্ভাবক তিনি। সংগীতের সুস্পষ্ট তিনটি ধারা কাওয়ালি, খেয়াল তারানা তারই সৃষ্টি। তারই উদ্ভাবন বহু ধরনের রাগ। আরবি-ফার্সি-তুর্কি সংগীতের সঙ্গে তিনি ভারতীয় সংগীতের ফিউশন ঘটিয়েছেন।

তার হাতে সমৃদ্ধ হয়েছে চিশতিয়া সুফি ঘরানা। চিশতিয়া ধারা সূচনা খ্রিস্টীয় দশম শতকে। সিরিয়ার এক নাগরিক আবু ইসহাক শবমির সঙ্গে নিঃসম্বল এক সুফির সাক্ষাৎ হয়। তিনি তাকে আফগানিস্তানের হেরাতের কাছে ছোট্ট শহর চিশতিতে নিয়ে বসবাস করার নির্দেশ দেন। তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন জনৈক খাজা আবু ইসহাক শামি চিশতি নামে। চিশতিয়া ধারার সূচনা তার মাধ্যমে। আবু ইসহাক চিশতির মৃত্যু হয় ৯৪০ সালে।

খাজা মইনউদ্দিন চিশতির উদ্যোগে ধারণাটি ভারতবর্ষেও পৌঁছায়। তিনি গরিবে নেওয়াজ বা দরিদ্রের রক্ষক হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠলেন। ধারার প্রধান প্রবক্তারা হলেন খাজা কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার, খাজা ফরিদউদ্দিন গঞ্জে-শাকার আমীর খসরুর আধ্যাত্মিক গুরু খাজা নিজামুদ্দিন আওলিয়া।

আমীর খসরুর মাতৃকুলের স্বজনরা তাকে সেখানেই ভারতীয় সংস্কৃতি বিশেষ করে সংগীত এবং অধ্যাত্মবাদের দিকে ঠেলে দিলেন। কথিত আছে আট বছরের বালক আমীর খসরুকে যখন নিজামুদ্দিন আওলিয়ার খানকা শরিফে পাঠানো হয়, তিনি ভেতরে যেতে অস্বীকার করেন। তিনি প্রবেশদ্বারের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন এবং তিনি সে অবস্থায়ই কয়েকটি পঙিক্ত রচনা করেন;

তুমি কার প্রাসাদের প্রবেশদ্বারের রাজা

যেখানে কবুতরও বাজপাখি হয়ে যায়

এক গরিব মুসাফির প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে আছে

সে কি প্রবেশ করবে না ফিরে যাবে?

খানকার ভেতরে আসীম নিজামুদ্দিন খসরুর মনের কথা জেনে গেলেন এবং কয়েকটি পঙিক্ত দিয়ে একজন বার্তাবাহককে তার কাছে পাঠালেন;

হে বাস্তবতার মানুষ তুমি ভেতরে এসো

আমার আস্থাভাজন তুমি কিছু সময়ের জন্য এসো

ভেতরে যে ঢোকে সে যদি আহাম্মক হয়

সে যা ছিল সে হিসেবেই তো ফিরে যাবে।

সময় অভিভূত হলেন এবং জেনে গেলেন যে তিনি তার আধ্যাত্মিক গুরু পেয়ে গেছেন। ক্রমেই তাদের দুজনের মধ্যে সম্পর্কের বন্ধন এত দৃঢ় হলো যে একপর্যায়ে নিজামুদ্দিন চিশতি বললেন, যদি ধর্ম অনুমোদন করত আমরা দুজন এক কবরেই সমাহিত হতাম। খসরুর গুরু ভক্তির কিছু কবিতা যথেষ্ট যৌন আবেদনময় বলেও মনে করা হয়ে থাকে। অবশ্য যুক্তি দেখানো হয় পরমানন্দের মাধ্যমেই স্রষ্টার সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপিত হয়। খসরু সুফি প্রার্থনায় ব্যবহূত শব্দ ধ্বনি পৌনঃপুনিকতাকে কাজে লাগিয়ে ধ্রুপদ সংগীত তারানা সৃষ্টি করেছেন।

নিজামুদ্দিন আওলিয়া ১৩২৫ সালে ৯৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করলেন। খসরু তখন কারো মতে বাংলায় ছিলেন। যখন গুরুর মৃত্যু সংবাদ পেলেন, ঘোষণা করলেন তারও আর বেঁচে থাকার প্রয়োজন নেই। কয়েক মাসের মধ্যে তার ইচ্ছে পূরণ হলো, তিনি মৃত্যুবরণ করলেন এবং নিজামুদ্দিন আওলিয়ার কবরের পাশেই সমাহিত হলেন।

ভারতীয় সংস্কৃতির এক সংকটময় ক্রান্তিকালে আমীর খসরুর জন্ম। বিখ্যাত সংগীত গুরু সারঙ্গদেব খসরুর জন্মের আগে বলেছিল, ভারত মাতঙ্গের সংগীত বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আমীর খসরুর সময় বোঝা গেল সারঙ্গদেবের সংগীত চিন্তা নির্দেশনা উপেক্ষিত হতে শুরু করেছে। খসরু সুরের জগতে বৈচিত্র্য এনে দিলেন, সনাতন অষ্টক ভেঙে ২২টি শ্রুতি সৃষ্টি করেনভারতীয় সংগীত নতুন করে জেগে উঠতে শুরু করল। খসরুর হাতে সৃষ্টি হলো বিচিত্র রাগ; রাগ স্মারপর্দা, শৃমন, জিলাফ, সাজগিরি। এজাজ--খসরুভি-তে তিনি উল্লেখ করেছেন হিজাজ, জাঙ্গুলা, ঘারা, মুজির, ইমান ফেরদোস্ত ওয়াগরেজ, ফারগানা, হুমাইনির কথা। আরবি, ফার্সি ভারতীয় ধারায় সংমিশ্রণে তিনি নতুন রাগ মিশ্ররাগ সৃষ্টি করেন। যেগুলের নাম মুজির, সানাম, সাজগারি, জানগুলাহ, বাখারজ, নিগার, সাহানা, বাসিখ, সুবিলা।

কাওয়ালির জনক আমীর খসরু, অবশ্য সংগীত বিশেষজ্ঞদের কারো কারো মতে খসরুর জন্মের অনেক আগে থেকে ভিন্ন ধারার কাওয়ালির অস্তিত্ব ছিল, তবে তার উদ্যোগেই আধুনিক কাওয়ালির সৃষ্টি এবং জনপ্রিয়তা লাভ। ছয় ধরনের সংগীত ধারার স্রষ্টা তিনি; কাওল, বালবানা, খেয়াল, তারানা, নকশ গুল। এগুলোর মধ্যে কাওয়ালি সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। নিজামুদ্দিন আওলিয়ার খানকায় আমীর খসরু কাওয়ালি গাইতেন।

ভারতীয় সংগীতের দুই প্রধান বাদ্যযন্ত্র সেতার তবলা যে তারই উদ্ভাবন, তা বহুজনের রচনায় প্রতিষ্ঠিত।

 

এমএ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা