মঙ্গলবার | জুন ০২, ২০২০ | ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সিল্করুট

বাঙালি সাহিত্যিকের কলমে ওলাওঠা

শাকের আনোয়ার

কলেরা ঢাকার বটতলার কবি

বাংলা অঞ্চল যেমন প্রকৃতির উদারহস্ত আশীর্বাদের ফলে ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা, তেমনি আবার নানা প্রাকৃতিক-সামাজিক কারণে এখানে রোগবালাইয়ের আবির্ভাবও কম ঘটেনি। কলেরার মতো ভয়াল রোগ মহামারীরূপে বাংলায় দেখা তো দিয়েছে, এমনকি সাধারণ জ্বরজারির প্রকোপে গণমৃত্যুর ঘটনা এককালে দুর্লভ ছিল না। কলেরা বা জনমানসে ওলাওঠা বলে পরিচিত রোগের অভিঘাত পড়েছিল ব্যাপক আকারে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, নিয়ে বাংলা ভাষায় বড় উপন্যাস বা মহাকাব্য কখনো লেখা হয়নি। তবে খুব বড় আকারে না হলেও কলেরায় গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যাওয়ার সংবেদনশীল (যদিও সংক্ষিপ্ত) বিবরণ কিছু লেখক ধরে রেখেছিলেন তাদের কলমে। ঢাকা গবেষক মুনতাসীর মামুনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে মহামারী নিয়ে এসব রচনার কথা। কবিতা লিখেছেন উনিশ শতকের ঢাকার এক বটতলার কবি কুশাই সরকারের কথা। ১৮৯২ সালে কলেরা বা লোকমুখে প্রচলিত বুলিতে ওলাওঠার মহামারী নিয়ে তার লেখা একটি কবিতা ওলাওঠা পুরোটাই এখানে উদ্ধৃত করা গেল:

আমার সময়ে একবার দেখা দেও হে নারায়ণ

আমার হৈতেছে ভেদবমী অবশ্য মরণ।

১২৯৭ সনে অর্দ্ধ উদয় গঙ্গাস্থানে কত

লোক মৈরেছে প্রাণে না যায় গপন।

ওলাওঠা হৈলে পর প্রথম জীবে বমী কৈরে,

তত্পরেতেমার্গ ঝরে হয় প্রসাব বন্ধন।

তত্পরে হয় শরীর জ্বালা, সর্ব্ব অঙ্গ ব্যাপিত কালা,

ভাই বন্ধুকে ডেকে বলা কর কষ্টের আয়োজন।

জন্ম, মরণ, দেখ বিয়া, তিন থাকলো নিবন্ধ নিয়া,

আমার বুঝি আয়ু খুইয়া হইয়াছে মরণ।

এইটা কেবল মনের ভ্রান্তি, রোগের নাকো যে শান্তি

কোটীতে গুটীকো বাঁচে কেবল দুই একজন

 

রবীন্দ্রনাথ শরত্চন্দ্রের কথাসাহিত্যে কলেরা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওলাউঠার বিস্তার নামে কলেরা নিয়ে জনপ্রিয় বিজ্ঞান ঘরানার নিবন্ধ লিখেছিলেন ১২০ বছর আগে, কিন্তু এককভাবে কলেরা-ওলাওঠার মহামারী তার কোনো গল্প বা উপন্যাসের কাহিনীর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, এমনটা নজরে আসে না। টুকরো টুকরো আকারে কলেরার কথা অবশ্য মেলে। যেমন গোরা উপন্যাসের অন্যতম ইন্টারেস্টিং স্ববিরোধী চরিত্র হরিমোহিনীর বয়ানে আছে ওলাওঠার প্রকোপে স্বামী-সন্তান হারানোর বেদনার কথা: কলেরা হইয়া চারি দিনের ব্যবধানে আমার ছেলে স্বামী মারা গেলেন। যে দুঃখ কল্পনা করিলেও অসহ্য বোধ হয় তাহাও যে মানুষের সয় ইহাই জানাইবার জন্য ঈশ্বর আমাকে বাঁচাইয়া রাখিলেন। রবীন্দ্রনাথের দুুর্বুদ্ধি ছোটগল্পের মূল চরিত্র পাড়াগেঁয়ে নেটিভ ডাক্তার-এর মাতৃহীন একমাত্র কন্যাসন্তান শশী তার গায়ে হলুদের দিনই কলেরায় ভুগে মারা যায়। আর এর জন্য ডাক্তারবাবু নিজের কৃতকর্মকেই দায়ী করেন। দিদি ছোটগল্পে আবার রবীন্দ্রনাথ শশী নামের আরেক নারী চরিত্রের কলেরায় ভুগে মারা যাওয়ার পর তার সবার অগোচরে নীরবে সত্কারের প্রসঙ্গটি তুলে আনেন। যেন তিনি দেখাতে চান, সমাজের চোখে সমালোচিত ব্যক্তি আর মহামারীতে আক্রান্ত রোগী উভয়েরই প্রস্থানে অনেক মানুষই নীরব থাকতে পছন্দ করে।

শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রীকান্ত উপন্যাসের নামচরিত্রের ভবঘুরে জীবনের প্রেক্ষাপটে কলেরা-ওলাওঠা রোগের মহামারীর প্রসঙ্গ এসেছে মর্মস্পর্শীরূপে; শ্রীকান্তের বয়ানে তার ফ্রেন্ড-ফিলোসফার-গাইড ইন্দ্রনাথ কী করে এক কলেরায় মৃত শিশুর বেওয়ারিশ লাশ পথের মধ্যে পেয়ে সাহস মানবিকতার তাড়নায় দেহটিকে সত্কারের কাজে নেমে পড়েসেই বর্ণনা ভারি মর্মস্পর্শীভাবে পাই এখানে। জ্যান্ত রোগীর চিকিৎসা দূরে থাক, কলেরায় মারা যাওয়া ব্যক্তিকেও যে ভয়ে কেউ সত্কারের সাহস পেত নাসেই বর্ণনা পাঠ করলে মন আপনাআপনিই অসহায় হয়ে ওঠে বৈকি। ইচ্ছা করেই তাই এখানে খানিক দীর্ঘ উদ্ধৃতি দেয়া গেল: ইন্দ্র কহিল, যে বটগাছ, ওর পাশেতেই একটা সরু ঘাট আছে।...কিছুক্ষণ হইতে কেমন একটা দুর্গন্ধ মাঝে মাঝে হাওয়ার সঙ্গে নাকে আসিয়া লাগিতেছিল। যত অগ্রসর হইতেছিলাম, ততই সেটা বাড়িতেছিল। এখন হঠাৎ একটা দমকা বাতাসের সঙ্গে সেই দুর্গন্ধটা এমন বিকট হইয়া নাকে লাগিল যে, অসহ্য বোধ হইল। নাকে কাপড় চাপা দিয়া বলিলাম, নিশ্চয় কিছু পচেছে, ইন্দ্র!...ইন্দ্র বলিল, মড়া। আজকাল ভয়ানক কলেরা হচ্ছে কিনা! সবাই পোড়াতে পারে না...মুখে একটুখানি আগুন ছুঁইয়ে ফেলে দিয়ে যায়। শিয়াল-কুকুরে খায় আর পচে। তারই অত গন্ধ।...কোন্খানে ফেলে দিয়ে যায় ভাই?... হোথা থেকে হেথা পর্যন্তসবটাই শ্মশান কিনা। যেখানে হোক ফেলে রেখে বটতলার ঘাটে চান করে বাড়ি লে যায়...গাছের ছায়ার মধ্যে আসিয়া পড়ায়, অদূরেই সেই ঘাটটি চোখে পড়িল। যেখানে আমাদের অবতরণ করিতে হইবে, তাহার উপর যে গাছপালা নাই, স্থানটি স্নান জ্যোত্স্নালোকেও বেশ আলোকিত হইয়া আছে, দেখিয়া অত দুঃখেও একটু আরাম বোধ করিলাম। ঘাটের কাঁকরে ডিঙি ধাক্কা না খায়, এইজন্য ইন্দ্র পূর্বাহ্নেই প্রস্তুত হইয়া মুখের কাছে সরিয়া আসিল এবং লাগিতে না লাগিতে লাফাইয়া পড়িয়াই একটা ভয়জড়িত স্বরে ইস্ করিয়া উঠিল। আমিও তাহার পশ্চাতে ছিলাম, সুতরাং উভয়েই প্রায় একসময়েই সেই বস্তুটির উপর দৃষ্টিপাত করিলাম। তবে সে নীচে, আমি নৌকার উপরে।...অকালমৃত্যু বোধ করি আর কখনও তেমন করুণভাবে আমার চোখে পড়ে নাই। ইহা যে কত বড় হূদয়ভেদী ব্যথার আধার, তাহা তেমন করিয়া না দেখিলে বোধ করি দেখাই হয় না! গভীর নিশীথে চারিদিক নিবিড় স্তব্ধতায় পরিপূর্ণশুধু মাঝে মাঝে ঝোপঝাড়ের অন্তরালে শ্মশানচারী শৃগালের ক্ষুধার্ত কলহ-চিত্কার, কখন বা বৃক্ষোপবিষ্ট অর্ধসুপ্ত বৃহত্কায় পক্ষীর পক্ষতাড়নশব্দ, আর বহুদূরাগত তীব্র জলপ্রবাহের অবিশ্রাম হু-হু-হু আর্তনাদইহার মধ্যে দাঁড়াইয়া উভয়েই নির্বাক্, নিস্তব্ধ হইয়া, এই মহাকরুণ দৃশ্যটির পানে চাহিয়া রহিলাম। একটি গৌরবর্ণ ছয়-সাত বৎসরের হূষ্টপুষ্ট বালকতাহার সর্বাঙ্গ জলে ভাসিতেছে, শুধু মাথাটি ঘাটের উপর। শৃগালেরা বোধ করি জল হইতে তাহাকে এইমাত্র তুলিতেছিল, শুধু আমাদের আকস্মিক আগমনে নিকটে কোথাও গিয়া অপেক্ষা করিয়া আছে। খুব সম্ভব তিন-চারি ঘণ্টার অধিক তাহার মৃত্যু হয় নাই। ঠিক যেন বিসূচিকার নিদারুণ যাতনা ভোগ করিয়া সে বেচারা মা-গঙ্গার কোলের উপরেই ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। মা অতি সন্তর্পণে তাহার সুকুমার নধর দেহটিকে এইমাত্র কোল হইতে বিছানায় শোয়াইয়া দিতেছিলেন। জলে-স্থলে বিন্যস্ত এমনিভাবেই সেই ঘুমন্ত শিশু-দেহটির উপর সেদিন আমাদের চোখ পড়িয়াছিল।...মুখ তুলিয়া দেখি, ইন্দ্রের দুই চোখ বাহিয়া বড় বড় অশ্রুর ফোঁটা ঝরিয়া পড়িতেছে। সে কহিল, তুই একটু সরে দাঁড়া শ্রীকান্ত, আমি বেচারাকে ডিঙিতে তুলে চড়ার ঝাউবনের মধ্যে জলে রেখে আসি!...

শরত্চন্দ্রের লালু গল্পেও ইন্দ্রনাথের মতো এমন আরেক সাহসী পরোপকারী ব্যক্তির দেখা মেলে, নাম তার গোপালখুড়ো। তার মতে, কলেরা রোগীর সেবা করার চেয়ে পুণ্যকর্ম সংসারে নেই কলেরার ভয়াবহতা তার বিরুদ্ধে লড়া গোপালখুড়োর চরিত্র শরত্চন্দ্র অঙ্কন করেছেন এভাবে: আমাদের শহরে তখন শীত পড়েছে, হঠাৎ কলেরা দেখা দিলে। তখনকার দিনে ওলাউঠার নামে মানুষে ভয়ে হতজ্ঞান হতো। কারও কলেরা হয়েছে শুনতে পেলে সে-পাড়ায় মানুষ থাকতো না। মারা গেলে দাহ করার লোক মেলা দুর্ঘট হতো। কিন্তু সে দুর্দিনেও আমাদের ওখানে একজন ছিলেন যাঁর কখনো আপত্তি ছিল না। গোপালখুড়ো তাঁর নাম, জীবনের ব্রত ছিল মড়া-পোড়ানো। কারও অসুখ শক্ত হয়ে উঠলে তিনি ডাক্তারের কাছে প্রত্যহ সংবাদ নিতেন। আশা নেই শুনলে খালি পায়ে গামছা কাঁধে তিনি ঘণ্টা-দুই পূর্বেই সেখানে গিয়ে উপস্থিত হতেন।

কথাসাহিত্যিকের কলমে কলেরা অন্ধবিশ্বাস

অধুনা তুলনামূলকভাবে অনালোচিত কথাসাহিত্যিক-অনুবাদক আকবর উদ্দীনের একটি গল্প ছাপা হয়েছিল মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ সম্পাদিত মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায়১৩৩৫ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে প্রকাশিত একঘরে নামের সেই গল্পে কী করে কলেরা-ওলাওঠার মহামারী ঠেকাতে মানুষ ভণ্ড পীরের আশ্রয় নেয় এবং সেই সুযোগে ধর্ম ব্যবসায়ীরাও মানুষের সরল মনকে পুঁজি করে নিজেদের আখের গোছায় আর জালাল নামের এক শিক্ষিত তরুণ সেই ব্যবসা ঠেকাতে গিয়ে হেনস্তা হয়তার অনুপুঙ্খ চিত্র পাই: গ্রামে সেবার ওলাওঠা রোগ একটু জোর করিয়া দেখা দিল; প্রত্যহ দুই চারিটি করিয়া মরিতে লাগিল; জালাল নিজের দল লইয়া প্রাণান্ত চেষ্টা করিয়াও রোগের প্রকোপ নিবারণ করিতে পারিল না। তখন গ্রামের সকলে মিলিয়া রোগের প্রকোপ বন্ধ করিবার জন্য পীর মৌলানা সহীদউদ্দীনকে আনিবার উদ্যোগ করিল।...জালাল সকলকে কহিলআপনারা পীর সাহেবকে আনছেন কেন? রোগে তিনি এসে কী করবেন?...জনৈক বৃদ্ধ কহিলেনআরে বাবা,...জানো না তো মৌলানা সাহেব ভারি কামেল লোক...তাঁর দোয়া হলে এক মুহূর্তে রোগ দেশ ছেড়ে পালাবে...হাজার হাজার জিন তাঁর মুরিদ।...পর দিনই মৌলানা সাহেবকে আনতে লোক চলিয়া গেল।...সন্ধ্যার সময় ফিরিয়া আসিয়া সে দশজনকে সংবাদ দিল যে পীর সাহেব অগ্রিম একশত এক টাকা না হইলে আসিবেন না, কারণ তিনি ওজিফায় বসিয়া জানিতে পারিয়াছেন যে খোদার গজল নাজেল হইয়াছে...তথাপি তিনি দয়ার বশবর্তি হইয়া...আসিবার হুকুম পাইয়াছেন, কিন্তু অল্প মূল্যে খোদার কালাম বিক্রয় করিতে নিষেধও করিয়াছেন।...

জহির রায়হানের উপন্যাস হাজার বছর ধরে-তেও কলেরা-ওলাওঠার প্রাদুর্ভাবে কবিরাজ-চিকিৎসকের ওপর ভরসা হারিয়ে ঝাড়ফুঁকে ভরসা রাখার বিবরণ মেলে। গ্রামের বৃদ্ধ ব্যক্তিরা ছেলেমেয়েদের ওলাওঠার সময় বংশের বাতি জ্বালিয়ে রাখার ভরসায় পাঠিয়ে দিতেন বাইরে, আর কবিরাজের চিকিৎসায় আস্থা না রেখে গ্রামে ঝাড়ফুঁক করার ব্যবস্থা করতেন গ্রামের অন্যরা। কিন্তু প্রাণ ঠিকই যেত মানুষের। বহু মৃত্যুর পর প্রকৃতির নিয়মে সব ঠিক হয়ে মানুষ আবার নিত্যদিনের কাজে নেমে পড়ে ভাবত, এই নিরাময় এসেছে নিছক ঝাড়ফুঁকের কল্যাণে: অবশেষে আরও দশটি প্রাণ হরণ করে তবে গ্রাম থেকে বিদায় নিলেন ওলা বিবি।...ওলা বিবি গেলেন। আর দিন কয়েক বৃষ্টি এলো জোরে। আকাশ কালো করে নেমে এলো অবিরাম বর্ষণ। সারা রাত মেঘ গর্জন করলো। বাতাস বইলো আর প্রচণ্ড বেগে ঝড় হলো।...ভোর না হতেই সবাই বেরিয়ে পড়লো মাঠে।...

 

শাকের আনোয়ার: প্রাবন্ধিক