মঙ্গলবার | জুন ০২, ২০২০ | ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সিল্করুট

ক্রিস আদ্রিয়ানের “দ্য চিলড্রেন’স হসপিটাল”

দ্বিতীয় মহাপ্রলয়ের আখ্যান

জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আরিফ

একটা মহাপ্রলয় সংঘটনে চারজন দেবদূত প্রয়োজন: একজন বর্ণনাকারী যিনি নতুন পৃথিবীর জন্য শাস্ত্র লিখে যাবেন; একজন সংরক্ষণকারী যিনি নতুন পৃথিবীর প্রথম প্রজন্মকে রক্ষা করে নিরাপদ রাখবেন; একজন অভিযোগকারী যিনি সবাইকে মনে করিয়ে দেবেন কেন তারা কষ্ট ভোগ করছেন এবং একজন ধ্বংসকারী যিনি বেঁচে থাকার মুক্তি পাওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করবেন এবং ভয়াবহ আশ্রয়ের অনুগ্রহের রূঢ় সত্যতা সম্পর্কে শিক্ষা দেবেন।

(আদ্রিয়ান, ক্রিস; দ্য চিলড্রেন হসপিটাল; ম্যাকসুয়েনি, ২০০৬)

সমকালীন মার্কিন কথাসাহিত্যিক ক্রিস আদ্রিয়ানের উপন্যাস দ্য চিলড্রেন হসপিটাল নিয়ে আলোচনা করার আগে তার নিজের ইতিহাসটা একটু দেখা দরকার। ১৯৭০ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে জন্ম নেয়া ক্রিস ১৯৯৩ সালে ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডা থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক হন। ২০০১ সালে ইস্টার্ন ভার্জিনিয়া মেডিকেল স্কুল থেকে এমডি ডিগ্রি লাভ করেন। ২০১১ সালে সানফ্রান্সিসকোর ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া থেকে শিশুদের হেমাটোলজি-অনকোলজির ফেলো হন। এর বাইরে তিনি হার্ভার্ড ডিভাইনিটি স্কুলে ধর্মতত্ত্ব এবং ইউনিভার্সিটি অব আইওয়ায় সৃজনশীল রচনার জন্য প্রসিদ্ধ আইওয়া রাইটার্স ওয়ার্কশপ সম্পন্ন করেছেন। তিনটি ভিন্ন বিষয়ে উচ্চতর পাঠ নেয়ার ফলে ক্রিস এক অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে পেরেছেন, যার প্রতিফলন আলোচ্য উপন্যাসটিতে দেখা যায়। বস্তুত এটা এমন এক উপন্যাস, যা লেখার জন্য লেখককে একই সঙ্গে শিশু বিশেষজ্ঞ, ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ধর্মতাত্ত্বিক হওয়া প্রয়োজন।

উপন্যাসটি নিয়ে আলোচনার আগে এর কাহিনীর দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। জেমা ক্লাফিন একটা শিশু হাসপাতালে মেডিকেলের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। চিকিৎসা পেশার ব্যাপারে তার আগ্রহ কম। নার্স আর শিক্ষকেরা তাকে জ্বালাতন করেন। নিজ পরিবারের সদস্যদের নির্মম মৃত্যু তার মধ্যে এমন ধারণা জন্মিয়েছে যে সে কাউকে ভালোবাসলে তারও এমন নির্মম পরিণতি হবে। ভাই ক্যালভিন তার শৈশবকে অতিপ্রাকৃত সবকিছুতে ভরিয়ে দিয়েছিলেন। ক্যালভিনের আত্মহত্যা তাকে শূন্য করে দেয়। জেমা তার সহপাঠী রব ডিকেন্সের প্রেমে পড়েন। এক ঝড়ের রাতে জেমা প্রাচ্যের রাজা স্ত্রীকে সন্তান প্রসবে সাহায্য করেন। মা এক বিকলাঙ্গ কন্যার জন্ম দেন। রাজকুমারীর নাম রাখা হয় ব্রেন্ডা। জেমা অস্বস্তির সঙ্গে লক্ষ করেন, ব্রেন্ডা প্রায়ই তার দিকে আঙুল তুলে রাখে। অস্বস্তি কাটাতে জেমা রবের সঙ্গে অন-কল রুমে মিলিত হন। তখন এক মহাপ্রলয়ঙ্করী ঝড় ওঠে, সারা পৃথিবী এক মহাসমুদ্রে ডুবে যায়, শুধু বাসিন্দাসহ শিশু হাসপাতালটি ভেসে থাকে। ঝড়ের পর হঠাৎ করে হাসপাতালের শিশু রোগীদের অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে যায়। ফলে বড়রা তাদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাই ধ্বংস হয়ে যাওয়া দুনিয়া নিয়ে কারো শোক করার উপায় থাকে না। সময় হাসপাতালের মূল কম্পিউটার এক দেবদূত হিসেবে আবির্ভূত হয়। সে বলে,

সৃষ্টিকূল, আমি রক্ষাকারী দেবদূত! ভয় পেয়ো না, আমি তোমাদের রক্ষা করব। ভয় পেয়ো না, আমি তোমাদের বিপদ থেকে বাঁচাব। ভয় পেয়ো না, আমি তোমাদের সঙ্গে থাকব। ভয় পেয়ো না, আমি তোমাদের নতুন পৃথিবীতে নিয়ে যাব।

হাসপাতালের স্থপতি হওয়ার দাবিদার জন গ্রাম্পাস নামে একজন জানান, বহুকাল আগে দেবদূত তাকে হাসপাতালটি এমনভাবে ডিজাইন করতে বলেছিলেন, যাতে মহাপ্রলয়ের কালে এটি নূহের নৌকার মতো কাজ করে। দেবদূতের আবির্ভাবে হাসপাতাল তার স্বাভাবিক রুটিনে ফিরে যায়। দেবদূত রেপ্লিকেটরের মাধ্যমে যার যা প্রয়োজন সেটা জোগাতে লাগল, এমনকি আগে কখনো ছিল না এমন কিছুও।

মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের একেকজন একেক সমস্যায় আক্রান্ত। যেমন ডা. চান্দ্রা নিঃসঙ্গতায় ডুবে থাকেন, জেমার অন্তরঙ্গ বন্ধু ভিভিয়ান কী কী কারণে পৃথিবী শেষ হয়ে যেতে পারে, তার তালিকা করেন। জেমা হাসপাতালে রাউন্ডের সময় রোগীদের সমস্যার কথা শোনেন, কিন্তু তাদের কোনো সাহায্য করেন না। সাতটা বাচ্চার সঙ্গে তার আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যার মধ্যে একজন হচ্ছে মানসিক বিকারগ্রস্ত পিকি বিচার, যে রক্ত পান করে; আরেকজন জার্ভিস, যে জন গ্রাম্পাসের কাছ থেকে পূর্বাভাস শুনে মহাপ্রলয়ের রাতে পালিয়েছিল। একদিন রবের মাথায় সার্জিক্যাল ল্যাম্পের আঘাত লাগলে তার মস্তিষ্ক জখম হয়। তখন দুঃখে জেমার মধ্য থেকে সব রোগ নিরাময়ের গোপন ক্ষমতা সবুজ আগুন আকারে বের হয়ে আসে। তিনি রবকে আর হাসপাতালের সব রোগীকে সারিয়ে তোলেন। তখন হাসপাতালে একটা কাউন্সিল গঠন করে জেমাকে সর্বোচ্চ সম্মানসূচক ইউনিভার্সাল ফ্রেন্ড অভিধা দেয়া হয়; আর মহাপ্রলয়ে মৃতদের শিশুদের হাসপাতালের বয়োজ্যেষ্ঠরা দত্তক নেন। জেমা আর রব মিলে পিকি বিচারকে দত্তক নেন।

যে মহাসমুদ্র এতদিন প্রাণশূন্য মনে হয়েছিল, সেখানে মাছ আর অন্যান্য জলজ প্রাণী দেখা দেয়। সমুদ্র থেকে একদিন একজনকে উদ্ধার করা হয়। স্মৃতিলুপ্ত মানুষটির নাম দেয়া হয় ইসমাইল এমন সময় আবিষ্কৃত হলো জেমা অন্তঃসত্ত্বা। সারা হাসপাতাল আনন্দের সঙ্গে রব আর জেমাকে বিয়ে দেয়। এরপর হাসপাতাল থেকে দূরে একটা জাহাজ দেখা গেলে জেমা আর কয়েকজন জাহাজটা দেখতে যান এবং সেখান থেকে একটা ঘুমন্ত কিশোরকে নিয়ে আসেন। কিশোরের সঙ্গে একটা ডায়েরি পাওয়া যায়, যেখানে বহুকাল আগে জাহাজ থেকে হারিয়ে যাওয়া নারী-পুরুষের সঙ্গে কিশোরটির যৌন সংসর্গের কথা লেখা আছে। হাসপাতালে এসেও কিশোরটির ঘুম ভাঙে না।


এর পর থেকে হাসপাতালের সবাই ফুসকুড়ি রোগে আক্রান্ত হতে থাকে, যা একেকজনের ক্ষেত্রে একেকভাবে দেখা দেয়। কিন্তু জেমার পক্ষে আর রোগের নিরাময় করা সম্ভব হয় না। তার সবুজ আগুন সারিয়ে তোলার বদলে রোগীদের মেরে ফেলতে থাকে। ক্রুদ্ধ কাউন্সিল জেমার ইউনিভার্সাল ফ্রেন্ড অভিধা কেড়ে নেয়। প্রাপ্তবয়স্করা মরে গিয়ে তেলতেলে ছাইয়ে পরিণত হতে থাকে, আর অনূর্ধ্ব-২১-এর সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়তে থাকে। অচিরেই হাসপাতালে ঘুমন্ত শিশুরা, অন্তঃসত্ত্বা জেমা, রব আর ইসমাইল ছাড়া আর কেউ বেঁচে রইল না। ফুসকুড়ি আক্রান্ত রবকে জেমার ভালোবাসা টিকিয়ে রাখলেও তিনি ধীরে ধীরে শারীরিক আর মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে থাকেন। ইসমাইল হাসপাতালে ঘুরে বেড়াতে থাকে। রব জেমার সঙ্গে ঘুমন্ত শিশুদের পরিচর্যা করতে করতে একসময় মারা পড়েন। জেমার প্রসব বেদনা উঠলে তিনি প্রসবের জন্য ছাদে উঠে দেখেন, সেখানে ইসমাইল আছে। ছাদ থেকে দেখা যায়, হাসপাতাল একটা ভূখণ্ডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। জেমা শিশুর জন্ম দিতেই সারা হাসপাতালের ঘুমন্ত শিশুরা জেগে ওঠে, আর হাসপাতালটা ভূখণ্ডটাকে স্পর্শ করে। জেমা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পড়তে দেখেন, হাসপাতালের শিশুরা হাসপাতাল ছেড়ে নতুন পৃথিবীতে চলে যাচ্ছে। জেমার দত্তক পুত্র পিকি বিচার রাজকুমারী ব্রেন্ডা আর তার সদ্যোজাত পুত্রকে নিয়ে চলে যায়। উপন্যাসের এখানে সমাপ্তি।

উপন্যাসে মোট চারজন দেবদূতের উপস্থিতি আছে, যা লেখার শুরুতে উদ্ধৃত করা হয়েছে। প্রথমজন রক্ষাকারী, যিনি হাসপাতালটিকে প্রলয় থেকে রক্ষা করে সবার প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ করেছেন। দ্বিতীয়জন বর্ণনাকারী, যিনি সারা জীবন জেমার ওপর দৃষ্টি রেখেছিলেন এবং গোটা কাহিনীর একাংশ বর্ণনা করেছেন। তৃতীয়জন অভিযোগকারী, যিনি কেন সবাই কষ্ট ভোগ করছেন, সেটা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন এবং চতুর্থজন ধ্বংসকারী, যিনি বেঁচে থাকার মুক্তি পাওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করেছেন। চারজনের কাঠামো উপন্যাসটির গতিপ্রবাহ সম্পর্কে পাঠককে ধারণা দেয়। উপন্যাসের বাকি অংশ জেমার মৃত ভাই বর্ণনা করেছেন, যিনি সম্ভবত শয়তানের প্ররোচণায় আত্মহত্যা করেছিলেন। আমরা যদি হাসপাতালের মূল কম্পিউটারটিকে রক্ষাকারী দেবদূত ধরি, তাহলে জেমার ভাই হন বর্ণনাকারী দেবদূত, অসুস্থ না হয়েও হাসপাতালে থাকা শিশু জার্ভিসকে অভিযোগকারী দেবদূত ধরা যায়।

উপন্যাসটি একই সঙ্গে সায়েন্স ফিকশন, ফ্যান্টাসি আর হরর উপন্যাসের উপাদানযুক্ত। এখানে খুব স্পষ্টভাবে বাইবেলে বর্ণিত ধর্মীয় আবহ ব্যবহার করা হয়েছে। এটা একই সঙ্গে মজাদার আর তমসাচ্ছন্ন। এখানে কিছু চরিত্র ঘোর বাস্তব আর কিছু চরিত্র ঘোর কাল্পনিক। দ্বিতীয় মহাপ্রলয়ে ভেসে থাকা শিশুদের হাসপাতালে ক্রিস আসলে এক খুুদে মহাবিশ্ব নির্মাণের প্রয়াস পেয়েছেন। তিনি সবকিছুর ভেতরটা গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছেন, যাতে সেসব থেকে ক্রোধ আর বিদ্রোহ বিস্ফোরিত হয়। অনেক ঔপন্যাসিক তাদের লেখায় অশুভের সঙ্গে লড়াই করার কথা বলেন, কিন্তু খুব কমজন সেটা নিরাময়ের চেষ্টা করেন। উপন্যাসে ক্রিস সেটার চেষ্টা করেছেন। তিনি অলৌকিক ঘটনাবলির সঙ্গে নিত্যদিনের সাধারণ ঘটনাবলির ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। উপন্যাসের বিশালায়তনের জন্য (৬১৫ পৃষ্ঠা) শেষের দিকে কিছুটা ঝুলে গেলেও ক্রিসের গল্প বলার দক্ষতায় সেটা উতরে গেছে।

লেখার শুরুটা যেমন উপন্যাস থেকে ক্রিসকে উদ্ধৃত করে হয়েছিল, শেষটাও সেভাবে হোক:

কিন্তু যেভাবে নিশ্চিতভাবে চাঁদ ওঠে এবং সূর্য ডুবে যায়, ভ্রষ্টাচার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে যায়, কারণ আমরা যা হই এবং আমাদের যা হওয়া উচিত, তার মধ্যে সর্বদা ফাঁক থাকে এবং আমাদের অনুশোচনাতাড়িত অভিভাবকেরা আশায় আমাদের পৃথিবীতে আনেন যে আমরা তাদের চেয়ে ভালো হব এবং তারা যা কিছু করেছেনপ্রত্যেকটি গ্রহণ বা বর্জন, এটা নিশ্চিত করতে যে আমরা কখনই অমন হব না।

 

জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আরিফ: লেখক প্রকৌশলী