রবিবার| এপ্রিল ০৫, ২০২০| ২১চৈত্র১৪২৬

সংকেত

বিশ্ব অর্থনীতিতে অশনিসংকেত

বৈশ্বিক মহামারীর রূপ ধারণ করেছে নভেল করোনাভাইরাস। চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে যখন এ নতুন করোনার সংক্রমণ শুরু, তখন অনেকেই চীনা অর্থনীতিতে ভয়াবহ ধসের আশঙ্কা করেছিলেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে কেবল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিই নয়, বরং করোনার ভয়াল থাবা পড়তে পারে পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিতেই।

নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণে সৃষ্ট রোগ কভিড-১৯-এ মৃতের সংখ্যায় চীনকে ছাড়িয়ে গেছে ইতালি। ইউরোপের আরেক দেশ স্পেনেও আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, বেলজিয়ামসহ ইউরোজোনের অন্যান্য দেশ, যুক্তরাজ্য, উত্তর আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, এশিয়ায় ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ইরাক, এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও করোনার সংক্রমণ বাড়ছে দ্রুতগতিতে। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ২৪ জন। তাই করোনা এখন আর কেবল চীনের সমস্যা নয়। বর্তমানে এটি বৈশ্বিক সংকট।

করোনার বিস্তার রোধে আইসোলেশন, কোয়ারেন্টিন, লকডাউনের মতো পদক্ষেপের কারণে বিশ্বজুড়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। মানুষের চলাচল সীমিত রাখতে একের পর এক ফ্লাইট বাতিল করা হচ্ছে। স্থগিত করা হচ্ছে ভিসা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পর্যটন ও আকাশসেবা খাত। বৈদেশিক বাণিজ্য সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বাতিল করা হচ্ছে একের পর এক কার্যাদেশ। ফলে সংকটে পড়েছে ম্যানুফ্যাকচারিং খাত। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা কমে যাওয়ায় তাদের আর্থিক প্রতিবেদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, এমন আশঙ্কায় ধস নেমেছে শেয়ারবাজারে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, তাতে বিশ্ব অর্থনীতিকে আরেকটি মন্দা দেখতে হতে পারে।

 

প্রবৃদ্ধি সংকোচনের আশঙ্কা

করোনা মহামারীর কারণে একের পর এক ফিন্যান্সিয়াল কনসাল্ট্যান্সি ফার্ম ও ব্যাংকগুলো বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির বিষয়ে তাদের পূর্বাভাস কমাচ্ছে। এ তালিকায় রয়েছে অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) মার্চ মাসের প্রতিবেদনে সংস্থাটি চলতি বছরের জন্য বিশ্বের প্রায় সব অর্থনীতিতেই জিডিপির প্রকৃত প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে। ওইসিডির প্রতিবেদনে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সবচেয়ে বেশি কমেছে চীনের। আগের পূর্বাভাসে ধারণা করা হচ্ছিল, এশিয়ার অর্থনৈতিক পরাশক্তির জিডিপিতে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে। তবে নতুন পূর্বাভাসে ওইসিডি বলছে এ হার ৪ দশমিক ৯ শতাংশের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

ওইসিডির নতুন পূর্বাভাসে চলতি বছর বিশ্ব অর্থনীতিতে ২ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের কথা বলা হয়েছে। সংস্থাটির আগের পূর্বাভাসে সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২ দশমিক ৯ শতাংশ।

 


সংকটে ম্যানুফ্যাকচারিং খাত

এখন পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ম্যানুফ্যাকচারিং খাত। করোনাভাইরাসের কারণে চীনে এ খাত এরই মধ্যে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেইজিংভিত্তিক মিডিয়া গ্রুপ কেইক্সিন ও লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএইচএস মার্কিট প্রণীত ম্যানুফ্যাকচারিং পারচেজিং ইনডেক্স (পিএমআই) সে কথাই বলছে। পিএমআই হলো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা পরিমাপের একটি সূচক। পিএমআই ৫০-এর উপরে থাকার অর্থ অর্থনীতি সম্প্রসারণ হচ্ছে। আর সূচকটির অবস্থান এর নিচে থাকলে ধরে নিতে হবে অর্থনীতি সংকুচিত হচ্ছে। কেইক্সিন-মার্কিটের পিএমআই ইনডেক্সে ফেব্রুয়ারি মাসে চীনের অবস্থান ৪০ দশমিক ৩-এ, যা রেকর্ড সর্বনিম্ন।

চীনের ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের এ সংকোচনের কারণে দেশটির সঙ্গে গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে, এমন দেশগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে অন্যান্য দেশে দ্রুত করোনা ছড়িয়ে পড়ার কারণে বৈশ্বিক ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা দেখা যেতে পারে বলে বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন।

 


টালমাটাল শেয়ারবাজার

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই শেয়ারবাজারে মন্দা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ৯ মার্চ একটি ঐতিহাসিক মহাধসের পুনরাবৃত্তি হয় বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে। একদিকে বিশ্বজুড়ে করোনার ভয়াবহ প্রকোপ, অন্যদিকে জ্বালানির বাজারে সৌদি আরব ও রাশিয়ার মধ্যে আকস্মিক মূল্যযুদ্ধ এ দুয়ের যুগপৎ সংক্রমণে টালমাটাল হয়ে পড়ে শেয়ারবাজার। সেদিন ডাও জোনস ও এসঅ্যান্ডপি-৫০০ উভয় সূচকই প্রায় ৮ শতাংশ হারে পয়েন্ট হারায়। ১৯৮৭ সালের ১৯ অক্টোবর ভয়াবহ এক ধসের মুখে পড়ে বৈশ্বিক পুঁজিবাজার। দিনটি সোমবার থাকায় বৈশ্বিক আর্থিক ইতিহাসে দিনটিকে স্মরণ করা হয়ব্ল্যাক মানডে হিসেবে। ওয়াল স্ট্রিটসহ বিশ্বের সব শীর্ষ সূচকে ভয়াবহ পতনের মাধ্যমে ৯ মার্চ আরেকটিব্ল্যাক মানডে প্রত্যক্ষ করে বৈশ্বিক শেয়ারবাজার। পতনমুখী বাজারের ধাক্কা এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। শেয়ারবাজার মানেই উত্থান-পতন। করোনাভাইরাসের কারণে টালমাটাল শেয়ারবাজার ফের চাঙ্গা হবে, এমন আশা করাই যেতে পারে। তবে কবে হবে, এমনকি করোনার প্রকোপ থেমে যাওয়ার পরও কতদিন অপেক্ষা করতে হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা আসলেই কঠিন!

 

সিএনবিসি অবলম্বনে

শরিফুল আলম শিমুল