সোমবার | আগস্ট ১০, ২০২০ | ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

সিল্করুট

নূরজাহান

মোগল নারীবাদী আইকন

রুবি লাল । অনুবাদ: হাসান তানভীর

নূরজাহানের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় নয় বছর বয়সে, তখন আমি দেরাদুনে বেড়ে উঠতে থাকা এক দুরন্ত বালিকা। আমি গল্প শুনতে পছন্দ করতাম আর আমার মা ছিলেন চমকপ্রদ সব গল্পের ভাণ্ডার। গ্রীষ্মের দুপুরে আমাদের দুই বোনের সঙ্গে খেলার সময় বা সারা দিন সংসারের কাজের পর ক্লান্ত হয়ে গেলে তিনি বাছাই করা কিছু গল্প আমাদের শোনাতেন। একটি তোতা যে তার মালিককে পরামর্শ দিত; একটি চতুর শিয়াল যে কৃষকদের বোকা বানিয়েছিলমায়ের কিছু গল্প রকম হলেও বেশির ভাগই ছিল অসাধারণ সব নারী চরিত্র সম্পর্কে। আমরা মায়ের কাছে ঝাঁসির সাহসী রানীর পাশাপাশি ব্রিটিশ রানী ভিক্টোরিয়ার কথা শুনেছি; হির-রান্ঝার অমর প্রেমের কাহিনী থেকে হিরের গল্প শুনেছি; দেবী পার্বতীর কথা শুনেছি, যিনি তার স্বামী শিবের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন। মায়ের শোনানো প্রতিটি গল্প আমাদেরকে অসাধারণ সাহসী স্বাধীনচেতা নারীদের মতো পথচলার কথা মনে করিয়ে দিত।

এক অলস বিকালে মা এবং আমি পাঁচ ঘুঁটি খেলছিলাম, যাতে এক হাত দিয়ে একটি ছোট্ট ঘুঁটি উপরে ছুড়ে অন্য হাতে পাঁচটি ঘুঁটি সরাতে হয়। খেলতে খেলতে এক সময় আমি বিরক্ত হয়ে উঠি। মাকে বললাম গল্প শুনতে চাই। আমরা খেলাটি শেষ করেছিলাম কিনা তা আমি মনে করতে পারি না, তবে গল্পটি আমার খুব ভালো মনে আছে।

তার গল্পটি ছিল ১৭ শতাব্দীর মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্ত্রী নূরজাহানকে নিয়ে। বছরখানেক পরে নূরজাহানের গল্পের প্রতি আমার আকর্ষণ মোগল রাজদরবারের ইতিহাস, বিশেষত মোগল নারীদের প্রতি ভালোবাসায় রূপান্তরিত হয়। কালক্রমে আমি একজন নারীবাদী ঐতিহাসিক হয়ে উঠি এবং অনতিবিলম্বেসম্রাজ্ঞী: নূরজাহানের বিস্ময়কর রাজত্বশিরোনামে আমার শৈশবের নায়িকার জীবনী লিখতে শুরু করি।

শাসনকার্যে ভূমিকা

গবেষণাকালে আমি লক্ষ করেছি, জাহাঙ্গীরের স্মৃতিচারণায় নূরজাহানের শিকারের কৃতিত্বের প্রচুর বর্ণনা রয়েছে। শিকার ছিল একটি রাজকীয় ঐতিহ্য, নিছক অবসর কাটানোর বিষয় নয়। এর দ্বারা রাজকীয় আধিপত্য চিত্রিত হতো। নূরজাহানের বন্দুকের নির্ভুল নিশানা একটি বাঘকে হত্যা করেছিল, যে বাঘটি মথুরার লোকালয়ে চলে এসে স্থানীয় জনগণকে আতঙ্কিত করেছিল। বাঘ হত্যার ঘটনার মাধ্যমে নূরজাহান  ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তবে শিকারই একমাত্র কাজ নয়, যা তাকে এত অসাধারণ করে তুলেছিল।

১৬১১ সালে ৩৪ বছর বয়সে মোগল দরবারের বিশিষ্ট অমাত্যের কন্যা এবং একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিধবা নূরজাহান খেয়ালি দার্শনিক সম্রাট জাহাঙ্গীরের ২০তম এবং সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রী হয়েছিলেন। জাহাঙ্গীর ছিলেন শিল্পকলার অনুরাগী প্রকৃতিবিদ; তিনি পরিসংখ্যান ভ্রমণ পছন্দ করতেন। তিনি নূরজাহানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা প্রত্যক্ষ করে ধীরে ধীরে ঐতিহ্য উপেক্ষা করে শাসনক্ষমতা দায়িত্ব তার দক্ষ হাতে ন্যস্ত করেছিলেন। ১৬১৩ সালের শুরুর দিকে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আজমিরের প্রায় তিন মাইল এলাকাজুড়ে স্থাপিত একটি শিবিরে নূরজাহান একজন সার্বভৌম শাসক হিসেবে তার প্রথম হুকুম জারি করেছিলেন। তিনি ছিলেন মোগল রাজবংশের একমাত্র নারী, যিনি প্রকাশ্য সক্রিয়ভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করেছিলেন। জাহাঙ্গীর তারব্যক্তিত্বের শক্তিদ্বারা এতটাই প্রভাবিত হয়েছিলেন যে এক সভাসদ বলেছিলেন, কাহিনীর প্রেমিক মজনু খুসরোও তার কাছে ম্লান হয়ে গিয়েছিল। নূরজাহানের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছিল হারেমে, তার স্বামীর কাছে এবং শেষ পর্যন্ত প্রশাসনে।

নূরজাহানের রাজত্ব এক বিরাট কীর্তি। মাত্র কয়েক দশক আগে নূরজাহানের শ্বশুর মহামতি আকবর রাজকীয় নারীদের পবিত্র নির্জন মোগল হারেমে থাকার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। পর্দার আড়ালের সার্বভৌম ভূমিকা ছাড়াও দরবারের ঐতিহাসিকরা লক্ষ করেছিলেন যে নূরজাহান প্রাসাদের বারান্দায় দেবীর মতো বসতেন এবং তার ব্যক্তিত্ব জনসাধারণকে দেখাতেন, যা ছিল শুধু পুরুষ শাসকদের জন্য সংরক্ষিত একটি চর্চা। অভূতপূর্বভাবে সাম্রাজ্যের মুদ্রায় সার্বভৌমত্বের চিহ্নস্বরূপ তার স্বামীর সঙ্গে তার নামও অঙ্কিত হয়েছিল।

মোগল নারীবাদী

নূরজাহানের রাজত্বকাল আরো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তিনি কেবল একজন শিকারি প্রশাসক হিসেবেই আবির্ভূত হননি, তিনি একজন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ নারী অধিকার রক্ষকও ছিলেন। প্রাথমিক বছরগুলোয় তিনি রাজনৈতিক জোট গঠন এবং রাষ্ট্রীয় বিষয়গুলো ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তিনি সীমাহীন দাক্ষিণ্যের জন্য পরিচিত ছিলেন। রাজকীয় পুরুষ নারীদের গহনা, ঘোড়া, হাতি অর্থ উপহার দিতেন। তিনি ৫০০ এতিম মেয়ের বিয়ের খরচ প্রদান করেছিলেন এবং একটি স্বল্পমূল্যের বিয়ের পোশাক ডিজাইন করেন। আগ্রার ট্যুর গাইডরা বলেন, সেই নকশার পোশাক এখনো বিক্রি হয় এবং আজও দরিদ্র পরিবারের কনেদের বিয়েতে ব্যবহূত হয়!

নূরজাহান ৪০ বছরের কম বয়সী তার নারী সঙ্গীদের জাহাঙ্গীরের সৈন্যদল এবং পরিচারকদের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন এবং ৪০ থেকে ৭০ বছর বয়সী নারীদের নিজেদের স্বামী খুঁজে নিতে প্রাসাদ ত্যাগ করা বা তার সঙ্গে থাকার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। সুবিধাবঞ্চিত এবং হারেমের সবচেয়ে দুর্বল বাসিন্দাদের স্বাধীনতা দান করে তিনি মোগল ইতিহাসে একটিনারীবাদীকালপর্বের সূচনা করেছিলেন।

প্রায় চার শতাব্দী আগে নূরজাহান কীভাবে একজননারীবাদী প্রতীকহন? আমরা সম্ভবত শব্দটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে দ্বিমত করতে পারি, যেহেতু শব্দটি বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে রাজনৈতিকভাবে সচেতন আমাদের নারী পূর্বসূরিদের দ্বারা প্রস্তাবিত হয়েছিল। কিন্তু আমরা নারীবাদের একটি মূলনীতির বিষয়ে একমত হতে পারি। নীতি স্থান-কাল ছাপিয়ে নারীদের বিভিন্ন ধরনের সৃজনশীলতা উদ্যোগ সম্পর্কে কৌতূহলী হওয়ার জন্য আহ্বান করে। তার নিজের জীবন সাম্রাজ্য গড়ার ক্ষেত্রে নূরজাহান রাজনৈতিক নান্দনিক যত কাজ করেছিলেন, সেগুলোর সঙ্গে নারীবাদী নীতির সম্পর্ক রয়েছে। তিনি ভেবেচিন্তে, সরাসরি, জামার হাতা গুটিয়ে (যেমনটি আমরা করি) নিজের কাজ চালিয়ে গেছেন এবং কখনো থেমে যাননি।

আমার মা নূরজাহানকে মহারানী বলতেন। নূরজাহান সম্পর্কে যে কাহিনী আমি শুনেছিলাম, তার মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল স্বামীর সঙ্গে সাম্রাজ্যের সর্বত্র ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সাহসিকতাপূর্ণ যুদ্ধের পরিকল্পনা ছাড়াও তিনি কবিতা লিখতেন এবং পোশাক, বাগান এমনকি ভবনের নকশাও করেছিলেন। নূরজাহানের কর্তৃত্ব প্রতিভা ছিল প্রকাশ্য, কারণ তিনি সরাসরি দৃশ্যমান ক্ষমতার চর্চা করেছিলেন। এসব তিনি এমন একটি সময় স্থানে করেছিলেন, যখন একজন নারীর ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়া ছিল খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। কিন্তু নূরজাহানের সাফল্য তার প্রতিজ্ঞা, সাহস, স্বাধীনচেতা মন আত্মবিশ্বাসের প্রমাণ দেয়। নূরজাহানের এসব বৈশিষ্ট্য কি নারীবাদ নয়?

 

রুবি লাল: ইতিহাসের অধ্যাপক নূরজাহানের জীবনী গ্রন্থ এমপ্রেস: দ্য অ্যাসটোনিশিং রেন অব নূরজাহান -এর রচয়িতা