সোমবার | আগস্ট ১০, ২০২০ | ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

সিল্করুট

নূর-এ-জাহাঁ

জয়িতা দাস

শীতকাল। নভেম্বর মাস। ঠাণ্ডাটা বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। সময় প্রতি বছর বাদশা জাহাঙ্গীর বেরিয়ে পড়েন শিকারে। তার বড় প্রিয় শখ। বেশ কয়েক মাস আগেই শুরু হয়ে যায় এর প্রস্তুতি। বাদশার মৃগয়া বলে কথা! গোটা দরবার, হারেম আর প্রায় অর্ধেক শহর অরণ্য পথে অনুসরণ করে তাকে।

তা যুদ্ধভূমি হোক কিংবা মৃগয়া যাত্রামোগল বাদশারা যেখানেই যান, তাদের পিছু পিছু সমস্ত রাজধানী শহরটাকে তুলে নিয়ে যাওয়াই নিয়ম। আর এই মৃগয়া যাত্রা মোটেই দু-এক সপ্তাহের জন্য নয়। কম করেও চার-চারটা মাস বাদশা ছুটে বেড়াবেন বুনো জন্তুদের পেছনে। সেই মার্চে, উত্তরে হাওয়া যখন পাততাড়ি গোটাবে, আর ধীরে ধীরে গরম হয়ে উঠবে পায়ের তলার মাটি, ঠিক তখন মৃগয়া ক্লান্ত সম্রাট ফিরে আসবেন রাজধানীতে। মৃগয়ায় কত না নিত্যনতুন অভিজ্ঞতা হয়। বীরপুরুষদের বীরত্ব দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। একবার এমনই এক মৃগয়ায় দরবারিদের এক বীরাঙ্গনার বীরত্ব দেখারও সৌভাগ্য হয়েছিল।

জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালের দ্বাদশ বর্ষের ঘটনা সেটা। সেবার জাহাঙ্গীরের প্রিয় বেগম নূরজাহান বাদশার মৃগয়াসঙ্গী। শিকারস্থল মানডু। রাজদরবারে যেমন, তেমনি শিকারভূমিতেও বাদশার পাশেই হাতির পিঠে হাওদায় বসে আছেন বেগম সাহেবা। পাক্কা শিকারি তিনি। ভৃত্যরা আগে থেকেই চারটি বাঘ ঘেরাও করে রেখেছিল। জাহাঙ্গীরের হাতের বন্দুক তৈরি। শেষ মুহূর্তে ট্রিগারে চাপ দেয়ার আগে বাদশা চোখ রাখলেন বেগম সাহেবার চোখে। পরমুহূর্তে হাতের বন্দুক নামিয়ে রাখলেন তিনি। বেগমের সুরমা রঙিন চোখে এক আবদার। বাঘদের নিজের হাতে শিকার করতে চান তিনি।

জাহাঙ্গীরের চোখ-মুখে প্রশ্রয়ের হাসি। ইশারায় মঞ্জুর হয় বেগমের প্রার্থনা। সঙ্গে সঙ্গে গর্জে ওঠে নূরজাহানের হাতের বন্দুক। চারটি বাঘই মুহূর্তে ধরাশায়ী। প্রথম দুটি বাঘ এক-একটা গুলিতেই। বাকি দুটির জন্য দুটি করে চারটি গুলি।

বাদশা মুগ্ধ। আত্মকথায় স্বীকার করেছেন খুব কম শিকারিকে এমন অব্যর্থ লক্ষ্যে বাঘ শিকার করতে দেখেছেন তিনি। সেবার বেগম সাহেবা তার এই কারনামার জন্য এক জোড়া হীরার ব্রেসলেট ইনাম পেয়েছিলেন বাদশার কাছ থেকে। মূল্য তার লাখ টাকা। সেই সঙ্গে পেয়েছিলেন হাজার টাকার মোহরও। একই সঙ্গে আদায় করে নিয়েছিলেন সমীহ। বাদশার সঙ্গী দরবারিদের কাছে। এতটাই যে এক আমির ঘটনা নিয়ে আস্ত একটা বয়েৎ লিখে ফেললেন:

নূরজহান্ গরেচ বাসুরৎ জন্ অস্ত্।

দর্ সফ্- মর্দান জন্--শের আফকন্ অস্ত্।।

(নূরজাহান আকৃতিতে স্ত্রীলোক বটে, কিন্তু বীরপুরুষের দলে যে তিনি ব্যাঘ্রহন্ত্রী নারী। অন্য অর্থে, শের আফগানের স্ত্রী)

শের আফগান, নূরজাহানের শওহর। তার প্রথম স্বামী। নূরজাহান তখনো নূরজাহান হয়ে ওঠেননি, তিনি তখন মেহেরুন্নিসা। তার বাবা মা, গিয়াস বেগ আসমত বেগম তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন তাদের কন্যাটিকে। বুদ্ধির সঙ্গে সৌন্দর্য, রাজনীতির সঙ্গে মেধা, শিল্পের সঙ্গে সাহিত্য মিলে যে নারীমূর্তি তৈরি হলো, তার পদপ্রান্তে নতজানু হতে বাধ্য হয়েছিল তামাম হিন্দুস্তান। আসলে নূরজাহান হওয়াটাই ছিল মেহেরুন্নেসার নিয়তি। অবশ্য এর জন্য জীবন তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল অনেক কিছুই। হারিয়েছেন শের আফগানকে। ভেঙে পড়েছিলেন, তবে সামলে নিতে সময় লাগেনি। বাকিটা ইতিহাস। রাজনীতি থেকে ফ্যাশন দুনিয়ানূরজাহানের ছায়া সর্বত্রই। এতটাই যে নূরজাহানের মৃত্যুর প্রায় এক শতাব্দী পরও খানদানি হারেম তার ফ্যাশনকে অনুসরণ করে গেছে।

না, এমনি এমনি হয়নি এসব। সমসাময়িকরা একবাক্যে স্বীকার করেছেন, নূরজাহান ফ্যাশন জগতে এক বিপ্লব ঘটিয়ে গেছেন। এমন সব পোশাক তিনি তৈরি করেছেন, যা এর আগে কারো ভাবনায় আসেনি। তার তৈরি দুদামি পেশওয়াজ বা গাউন দেখে বেগমরা তো বটেই, এমনকি তাদের স্বামীরাও সে সময় দিওয়ানা। মাকড়সার জালের মতো সেই সূক্ষ্ম পোশাক সেদিন সত্যিই ঝড় তুলেছিল বেগম মহলে।

দুদামি’—অর্থাৎ কিনা ওজনে দুদাম।দামহলো তামার ছোট মুদ্রা। সেকালে একদাম’-এর ওজন ছিল টাকা বাতঙ্কা চল্লিশ ভাগের এক ভাগ। মোগল আমলে বিশেষ করে আকবরের সময়ে খুব ব্যবহূত হতো এই টাকা। একেপয়সাবাবহলুলি বলা হতো। দামের এক পিঠে থাকত তারিখ, আরেক পিঠে যেখানে তৈরি হতো, সেই স্থানের নাম।

তা কী দিয়ে তৈরি হতো এমন সূক্ষ্ম দুদামি ওজনের পোশাক! অবশ্যই বাংলার মসলিন দিয়ে। ঐতিহাসিকেরা বলেন, শের আফগানের গিন্নি হয়ে নূরজাহান যখন বাংলাদেশে এলেন, তখনই বাংলার মসলিনের সঙ্গে তার প্রথম আলাপ। পরে যখন জাহাঙ্গীরের হারেমে ঠাঁই হলো তার, তখন নূরজাহানের মাধ্যমে বাংলার মসলিনের সঙ্গে পরিচয় হলো মোগলকন্যাদের। সেই থেকে তারাও মসলিনের অনুরাগী।

এসব সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম দিককার কথা। অনেকে অবশ্য বলেন, মোগল হারেমে বাংলার মসলিন প্রথম প্রবেশ করে আকবরের আমলে। তথ্যকে যদি সত্য বলে মেনেও নিই, তবু কথা জোর দিয়ে বলা যায় যে নূরজাহানই প্রথম ফ্যাশন জগতে মসলিনকে জনপ্রিয় করেলন। এর প্রভাব পড়েছিল জাহাঙ্গীরের ওপরও। বেগমের রুচির দ্বারা তিনি বরাবরই প্রভাবিত। মসলিনের তৈরি পোশাক না হলে তার চলত না। চলত না বেগমদেরও। মসলিনের তুলতুলে নরম স্পর্শে বেগম মহল মাতোয়ারা। ওড়নার জন্যও তাদের মসলিন চাই- চাই। শোনা যায়, নূরজাহানের আমলে নাকি একখানা সরেস মসলিন শাড়ির দাম ছিল চারেক টাকা। বলতে গেলে আকাশছোঁয়া দাম। ইতিহাস বলে, নূরজাহানের বেশ কিছুকাল পরে শায়েস্তা খাঁর আমলে বাংলাদেশে টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত। সেই হিসাবে মসলিনকে দুর্মূল্যই বলতে হয়।

তা বেগম মহল কবেই বা জিনিসপত্রের মূল্য নিয়ে মাথা ঘামিয়েছে! মাথা ঘামায়নি খানদানি মহলও। সুতরাং বাদশার হারেম থেকে আমির-ওমরাহের হারেম, সর্বত্রই জনপ্রিয় হয়েছিল বাংলার মসলিন দিয়ে তৈরি দুদামিওজনের পোশাক। তবে শুধু দুদামিই নয়, মোগল হারেমের ফ্যাশন জগতে তখন একের পর বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন নূরজাহান। জামার ভেতরে আঙ্গিয়া বা বডিস পরতেন তিনি। একেবারে আধুনিক সেই আঙ্গিয়া। কিছুদিনের মধ্যেই রইস খানদানি মহলে জনপ্রিয় হয়ে উঠল সেই নতুন ডিজাইনের আঙ্গিয়া। জনপ্রিয় হতে শুরু করেছিল তার উদ্ভাবিত নিচোল বা স্কার্টও। পরবর্তী সময়ে নিচোল জনপ্রিয় হয়ে উঠবে লক্ষেৗর বেগম মহলেও। আর কিনারি বা লেস! কিংবা বাদলা বা ব্রোকেড। উড়ানি বা ওড়না! মেয়েদের ফ্যাশন জগতে সবকিছুর আবির্ভাব যে বেগম সাহেবার হাত ধরেই।

জামার বাহারি বোতাম! ফ্যাশন জগতে এরও আবির্ভাব বেগমকে অনুসরণ করেই। বেগম মহলের দোরগোড়ায় একদিন বাদশা এসে দাঁড়িয়েছেন। তর সইছে না তার। এক্ষুনি চাই বেগমের দর্শন। বেগম নতুন পোশাক পরে তাড়াহুড়ো করে তৈরি হচ্ছেন, দেখেন একি! দর্জি যে জামায় ফিতা লাগাতেই ভুলে গেছে। পোশাক পাল্টানোর কি আর তখন সময় আছে! চটপটে বাঁদিটি তার কান থেকে জমকালো ঝুমকাটা খুলে সেটা দিয়েই আটকে দিল জামা। ব্যস, সেই থেকে খানদানি মহলগুলোতে চালু হয়ে গেল বোতামের ফ্যাশন।

এরপর আছে নূরমহালি। পরিচিত শব্দে যাকে বলা যায় বেনারসি শাড়ি। দিলদরাজ মেজাজ বেগমের। সাধারণ মানুষের দুঃখে সম্রাজ্ঞীর মনটা কাঁদে। কত অনাথ মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন তিনি। তা বিয়ের দিনে প্রত্যেকের মনেই তো একটু ঝলমলে পোশাক পরার ইচ্ছা জাগে। সবাই কি আর এই বিশেষ দিনটিতে বাদশা-বেগমের মতো বহুমূল্য কিংখাবের পোশাক পরতে পারে!

তাই নূরমহালি। সেই নূরমহালির নকশা তৈরি করলেন তিনি নিজের হাতে। তাঁতিদের হুকুম দিলেন, সোনার জরির বদলে কৃত্রিম জরি দিয়ে বোনা হোক এই শাড়ি। অবশ্য কাপড়ের সোনালি নকশা দেখে আসল-নকল বোঝার উপায় নেই। আর দামও আসলের তুলনায় অনেক কম। মাত্র ২৫ টাকা। সাধারণ পরিবারের বর-কনের আনন্দ আর ধরে না। মহলের বাঁদিরা যখন নূরমহালি পরে তাকে তসলিম করে বিয়ে করতে যেত, এক অদ্ভুত আনন্দে ভরে উঠত বেগম সাহেবার মনটা।

আর ফরাস--চন্দনি! চন্দন কাঠের রঙ করা ফরাস বা কার্পেট! ঘরে একখানা সুগন্ধি ফরাস--চন্দনি পাতা থাকলে নিশ্চিন্ত। ঘরের ভেতর মৃগনাভি, আতর কিংবা চন্দন কাঠ আর আলাদা করে পোড়ানোর দরকার পড়ত না। ফরাস--চন্দনির সৌরভেই তখন ঘর আমোদিত।

দস্তরখানের কথাও বলা দরকার। মোগলরা বরাবরই ফরাসের ওপর বসে আয়েশ করে খানাপিনা করতে অভ্যস্ত। ভোজের সেই গালিচাকে বলা হয় দস্তরখান। নূরজাহানের নিজস্ব উদ্ভাবনীশক্তি সেই দস্তরখানের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলেছিল হাজার গুণ। দস্তরখানে সমস্ত খাবার বিভিন্ন ফুলের সাজে সাজিয়ে পরিবেশন করার কৃতিত্ব যে তারই।

গানও জানতেন বেগম সাহিবা। যেন সুর নয়, অমৃতক্ষরণ হচ্ছে তার গলা থেকে। বেগম সাহেবার গান একবার যে শুনেছে, সে- স্বীকার করতে বাধ্য, সেই সুর দুনিয়ার সমস্ত বেদনা ভুলিয়ে দিতে সক্ষম।

তবে সবচেয়ে সুখ্যাতি তার ওইঅত্র--জহাঙ্গীরি জন্য। যদিও অনেকে এর কৃতিত্ব দিতে চান আসমত বেগমকে। তা এই আতর নাকি আবিষ্কার হয়েছিল লাহোরের শালিমার বাগিচায়। আবার কেউ বলেন, দিল্লিতে। এর উৎস গোলাপ জল। আরো অনেক আবিষ্কারের মতো নূরজাহানের আবিষ্কারটিও নাকি এক আকস্মিক ঘটনা। অন্তত এক ইউরোপীয় সাহেবের বিবরণ শুনে তা- মনে হয়।

তাই বলে নূরজাহানের কৃতিত্বকে অস্বীকার করার উপায় নেই। কপালগুণে সুগন্ধি তিনি আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন বটে। তবে এর জন্য নিজের মাথাটাও তাকে খাটাতে হয়েছে। তবেই না গোলাপ সার থেকে তৈরি হলোঅত্র--জাহাঙ্গীরি যে আতরের দিওয়ানা সেকালের প্রতিটি শৌখিন লোক। এতটাই যে এক ভরি আতরের জন্য গুনে গুনে ৮০টি টাকা তারা তুলে দিতেন গন্ধ বণিকের হাতে।

বেগম সাহেবা নিজেও ছিলেন প্রচণ্ড শৌখিন। প্রতিবার স্নানের জন্য তার নাকি ব্যয় হতো হাজার টাকা। গোলাপজল না হলে তার স্নান হয় না। এর জন্য বাগিচায় রয়েছে এক গোলাপজলের সরোবর। একদিন এই গোলাপসরোবরে বাদশার সঙ্গে বেড়াতে গিয়েই তার প্রথম চোখে পড়ে গোলাপ নির্যাস। সেই ইউরোপীয় পর্যটকের বিবরণ অনুযায়ী, “...This canal Nur-Jahan had caused to be entirely filled with rose water. The perfumed water was used for a bath. Whilst the emperor was walking with Nur-Jaham, on the bank of the canal, they perceived a crust, that been formed, resembling moss, which floated on the surface of the water. In order to take it off the water, and examine it, they waited till it was near the brink. They, then, perceived, that it was a substance derived from the roses, which had been baked, and collected into a mass by the power of the sun’s rays. It appeared to the whole harem the most exquisite perfume, which had ever been produced in the indies.’’

অ্তর--জাহাঙ্গীরির খুশবু! এর সঙ্গে বুঝি তুলনা হয় না পৃথিবীর অন্য কোনো সুগন্ধির। তুলনাহীনা নূরজাহানও। আবার অহংকারী, গর্বিতা এবং ক্ষমতালোভীও। এককালে জাহাঙ্গীরের নামে রাজপাট সামাল দিয়েছেন তিনিই। কলঙ্কমুক্ত নয় সেই সময়কার ইতিহাস। বরং হিংসা আর বিদ্বেষে পরিপূর্ণ। তবে তার অতিবড় শত্রুও স্বীকার করতে বাধ্য যে জাহাঙ্গীরের বেগম ছিলেন এক দক্ষ রাজনীতিক। জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর সেই ক্ষমতা আর আঁকড়ে থাকা সম্ভব হয়নি। শাহজাহান কেড়ে নিয়েছিলেন তার সব ক্ষমতা। শুধু পারেননি তার অহংকার খর্ব করতে। নূরজাহান যে সম্রাজ্ঞী! মাথানত করতে শেখেননি কোনোদিন। শাহজাহানের সামনে নত হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। হলেনই বা তিনি বাদশা। নিজের চারপাশে এক লক্ষ্মণরেখা টেনে নিলেন তিনি। বেছে নিলেন স্বেচ্ছানির্বাসন। রাজনীতি নিয়ে আর কোনোদিন মাথা ঘামাননি। চেষ্টা করেননি নিজের পুরনো ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার। এমনই ছিল আত্মমর্যাদা। শাহজাহান অবশ্য বিমাতার প্রতি অবিচার করেননি। বার্ষিক লাখ টাকা ভাতার ব্যবস্থা করেছিলেন। নূরজাহানের নিজস্ব জায়গিরের আয় তো ছিলই। বেগম সাহেবার শেষ জীবন কেটেছে জাহাঙ্গীরের প্রিয় শহর লাহোরে। সঙ্গী বলতে লাডলি বেগম, তার কন্যা। তার শেষ জীবনের বর্ণনা দিতে গিয়ে খাফি খাঁ লিখেছেন, ‘জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর নূরজাহান হিন্দু বিধবার মতো সাদা কাপড় পরিতেন; স্বেচ্ছায় কোনো উৎসব-আনন্দে (শাদি) যোগ দিতেন না; কেবল স্বামীর স্মৃতি হূদয়ে ধরিয়া, মনের দুঃখে নির্জ্জনে দিনাতিপাত করিতেন।

জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর প্রায় ১৮ বছর বেঁচে ছিলেন নূরজাহান। সে জীবন সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রিয়তমা বেগমের জীবন নয়। বরং বলা ভালো, সে জীবন এক ব্রহ্মচারিণীর জীবন। বিলাস-ব্যসন থেকে দূরে, ত্যাগের মধ্য দিয়ে নূরজাহান তখন নিজের আত্মশুদ্ধির জন্য সাধনা করে চলেছেন। সেই পথে তার একমাত্র সঙ্গী জাহাঙ্গীরের স্মৃতি। সম্রাজ্ঞী নূরজাহান হয়তো ঐতিহাসিকদের সহানুভূতি আদায় করতে পারেননি, কিন্তু সর্বত্যাগী নূরজাহান প্রত্যেকের কাছ থেকে সমীহ আদায় করে নিয়েছেন।

লাহোর শহরের শাহদারা অঞ্চল। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ইরাবতী নদী। এক সমাধিভবন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। যেন গর্বের সঙ্গে বলতে চাইছে, একবার এসে দেখে যাও তোমরা, কে শুয়ে আছেন এখানে! বাদশা জাহাঙ্গীর। হ্যাঁ, এখানেই, তার এই প্রিয় শহরেই শেষ বিশ্রাম নিচ্ছেন তামাম হিন্দুস্তানের বাদশা জাহাঙ্গীর।

পাশেই আরেকটি সমাধিভবন। অতি সাধারণ। আড়ম্বরহীন। কোনো বাহুল্য নেই কোথাও। নিরাভরণ সমাধিভবনটি তৈরি করতে খরচ পড়েছিল লাখ টাকা। সময় লেগেছিল চার বছর। সমাধিভবনের ভেতরে রয়েছে পাশাপাশি দুটো কবর। মা মেয়ের কবর। নূরজাহান লাডলি বেগমের।

৭০ বছরে মৃত্যু হয় তার। ইচ্ছা করলে নিজের জন্য এক জমকালো সমাধিভবন তৈরি করতে পারতেন তিনি। ব্যয় নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ ছিল না। তার জায়গিরের আয় ছিল বিশাল। কিন্তু ইচ্ছাটাই জাগেনি। সমস্ত পার্থিব আকাঙ্ক্ষা থেকে তিনি তখন মুক্ত। সমাধি ফলকের জন্য স্বরচিত ফার্সি বয়েিট সে কথাই বলে

বর্ মজার--মা গরিবাঁ না চিরাগে না গুলে

নই পর--পরওয়ানা সূজদ্ না সদা- বুলবুলে।

(গরিব গোরে দীপ জ্বেলো না ফুল দিও না কেউ ভুলে—/ শামা পোকার না পোড়ে পাখ, দাগা না পায় বুলবুলে)

 

জয়িতা দাস: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নন-ফিকশন লেখিকা